ছেলেধরা গুজব এবং সমাজের নিষ্ঠুরতা-কামরুল হাসান বাদল লেখক কবিও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 22/07/2019-08:25am:   
ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি এবং কয়েক স্থানে গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় আতঙ্কিত না হয়ে পারা যাচ্ছে না। দিনদিন এর প্রকোপ বাড়ছে। পরিস্থিতি এখন এতই ভয়াবহ যে নিজের সন্তান নিয়ে বের হওয়াও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। রাজধানীর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে যে নারীকে তার সন্তানের স্কুলের অন্যান্য অভিভাবক ও বহিরাগতরা গণপিটুনি দিয়ে মেরেছে পরে জানা গেছে সে নারী মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। ওই নারীর নাম তসলিমা বেগম রেনু। তিনি তার মেয়েকে ভর্তি করার জন্য স্কুলে গিয়েছিলেন।
‘চুলের মুঠি ধরে এক নারীর মাথা দেয়ালে ঠুকছেন কয়েকজন। মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। এক পর্যায়ে অচেতন হয়ে তিনি পড়ে যান মাটিতে এরপরও চলতে থাকে উপর্যুপরি লাথি-ঘুষি। কয়েকজন তরুণ লাঠি দিয়ে মারতে শুরু করে’। বাড্ডার ওই মহিলার মৃত্যুর খবর এভাবেই ছাপিয়েছে একটি জাতীয় দৈনিক।
ছেলেধরা সন্দেহে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ও কেরানিগঞ্জে নিহত হয়েছেন আরও দুই যুবক। সিদ্ধিরগঞ্জে মারধর করা হয়েছে আরও এক নারীকে। এছাড়া গাজীপুর, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম ও পাবনায় ছেলেধরা সন্দেহে দুই নারীসহ চারজনকে পিটুনি দিয়ে পুলিশে দিয়েছে জনতা। কেরানীগঞ্জের রসুলপুর গ্রামের দু যুবককে ঘোরাফিরা করতে দেখে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে মারাত্মক আহত করে এলাকাবাসী। পুলিশ উদ্ধার করে দুজনকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে একজনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
গত শুক্রবার বান্দরবানে ছেলেধরা সন্দেহে এক নারীকে পিটিয়ে গুরম্নতর জখম করা হয়। পুলিশ এসে রক্ষা করে নারীটিকে। পরে জানা গেছে ওই নারী কক্সবাজার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। বৃহস্পতিবার খাগড়াছড়িতে চারজনকে পুলিশে দেয় এলাকাবাসী। পুলিশ বলছে, ওই চার ব্যক্তি বিভিন্ন স্কুলের সামনে হাওয়াই মিঠা ফেরি করতো। গাজীপুরে যে নারীকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে আহত করা হয়, সে নারী একজন মানসিক প্রতিবন্ধী। এক দম্পতির শিশুকে আদর করতে গেলে ওই দম্পতি নারীটিকে আটক করে এবং পরে লোকজন এসে তাকে গণপিটুনি দেয়।
আমাদের বাসায় কাজের বেশি চাপ থাকায় আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে তাদের গৃহকর্মী তরুণীটিকে কয়েক ঘণ্টার জন্য আনা হয় গতকাল। কাজ শেষে তাকে খাইয়ে দাইয়ে চলে যেতে বললে সে একা যেতে ভয় পেয়ে বলে, খালাম্মা আমি তো ভালোমতো চিনি না। এদিক ওদিক যদি যাইয়া পড়ি পোলাধরা সন্দেহে আমারে মাইরা ফেলাবে। আমার লগে আফনের বুয়াটারে দ্যান। পরে তাকে সেভাবেই পাঠানো হয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য ঘটনাটির উল্লেখ করলাম।
পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে-সম্প্রতি এমন একটি গুজবে সারা দেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কিছু ব্যক্তি এমন গুজব ছড়ায় যাদের কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এই গুজবের পর সারাদেশে ছেলেধরা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তার ফলে বেশ কজন নিরীহ ব্যক্তি প্রাণ হারায়। সবকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে ভিকটিমের মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি এবং এরা সবাই মানসিকভাবে অসুস্থ।
ছোটবেলায় এমন গুজব আমরাও শুনতাম। সে সময় আমাদের বাবা-মাকেও গভীর আতঙ্কে ভুগতে দেখেছি। ওই সময় আমাদেরও বাসার বাইরে বেশি যেতে দেওয়া হতো না। চোখে চোখে রাখা হতো। তবে এবারের গুজবটি নিয়ে অন্য উদ্দেশ্য আছে বলে মনে হয়। এ পর্যন্ত কয়েকবার পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে বলে গুজব ছড়ানো হয়েছে। ফেসবুকে যারা গুজবটি ছড়াচ্ছেন তাদের ফেসবুক আইডি দেখে মনে হয় তারা বিশেষ একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষে এমন গুজব ছড়াচ্ছেন।
আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, দেশের এযাবৎ কালের সবচেয়ে বড় প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। একজন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ, দেশের দুটি দৈনিক এবং সে দৈনিক দুটিকে ঘিরে এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও সুশীল শ্রেণির অংশ পদ্মা সেতু নির্মাণ বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। সবকিছুকে উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উৎসাহ, সাহস ও উদ্যোগে সম্পূর্ণ দেশের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি এখন প্রায় শেষের দিকে। অনেকে মনে করছেন একটি মহল নিতান্তই ঈর্ষাপ্রবণ হয়েই পদ্মা সেতুর নির্মাণ নিয়ে এমন ভীতিকর ও বিপজ্জনক গুজব ছড়াচ্ছে।
কোনো এককালে আদিম সমাজের কোথাও কোথাও নরবলি দেওয়ার রেওয়াজ হয়ত ছিল। বর্তমানে বিশ্বে যে সমস্ত ধর্ম প্রচলিত আছে তার কোনোটিই নরবলিকে অনুমোদন করে না।
এছাড়া আধুনিক বিশ্বে কোনো স্থাপনা নির্মাণে কখনোই এ ধরনের উদ্ভট কাজ অর্থাৎ মানুষের কাটা মাথা ব্যবহারের প্রশ্নই ওঠে না। মাথার প্রয়োজন যদি হয়েই থাকে তবে তা কাটা মাথা নয়। মেধাবী মানুষের মাথার দরকার হয় যারা নিত্যনতুন উদ্ভাবনী শক্তি ও সামর্থ দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারেন। যারা সাগরের বুকে ব্রিজ নির্মাণ করেন। সাগরের বুকে মধ্যপ্রাচ্যে বুর্জ খলিফার মতো আধুনিক বিস্ময় হোটেল নির্মাণ করেন। এ ধরনের বড় বড় বিস্ময়কর স্থাপনাগুলো কাটা মাথা দিয়ে নয়, সতেজ এবং মেধাবী মাথার বিচক্ষণতায় নির্মিত হয়েছে।
আসলে এ ধরনের গুজব এবং গুজবে বিশ্বাস করে নিরপরাধ মানুষ হত্যার ঘটনা একটি আধুনিক রাষ্ট্র বা সমাজে সম্ভব নয়। আমাদের মতো পশ্চাদপদ, অনাধুনিক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মান্ধ সমাজে এ ধরনের গুজব রটনা করা সহজ কারণ সমাজের কোটি কোটি অন্ধ মানুষ এমন গুজব বিশ্বাস করার জন্য বসে আছে। এই দৃশ্য বা এমন ঘটনা কোনো উন্নত বিশ্বে অসম্ভব। এমন নিষ্ঠুরতাও সে সব সমাজে কল্পনা করা যায় না।
আজ পর্যন্ত দেশের কোনো স্থাপনা নির্মাণে মানুষের কাটা মাথার প্রয়োজন হয়েছে তেমন কোনো নজির না থাকা সত্ত্বেও মানুষ এই গুজব বিশ্বাস করছে। এবং কোনো ধরনের অনুসন্ধান না করে, ঘটনার সত্যাসত্য যাচাই না করে নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করছে।
এই নির্মমতা, এই হত্যাযজ্ঞ অচিরেই বন্ধ করতে হবে। বিবেকবান, সুস্থ মানুষগুলোকে এই ধরনের নিষ্ঠুরতা, এই ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রয়োজনে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে। সরকার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে। সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে দেশের গণমাধ্যমগুলো।
এই অসার, অসত্য গুজব প্রতিহত করতে এবং সত্যটি তুলে ধরতে, সাধারণ মানুষের মন থেকে এই কুসংস্কার, ভীতি দূর করতে দেশের গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে।
আর সে সাথে সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যেতে, মিথ্যা, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্তি দিতে জ্ঞানের চর্চা বাড়াতে হবে। বুঝতে হবে একটি ধর্মান্ধ, কূপমণ্ডুক সমাজ মানুষের কল্যাণ সাধন করতে পারে না। মানুষের মুক্তি দিতে পারে না। মানুষের মুক্তির জন্য, মানুষের প্রকৃতভাবে বাঁচার জন্য একটি আধুনিক, জ্ঞাননির্ভর ও মানষিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাহলেই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। এমন নিষ্ঠুর আচরণ মানুষ করবে না।

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।