কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে -কামরুল হাসান বাদল লেখক কবিও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 15/05/2019-08:02am:    একটি সময়ে যখন গ্রামে ছিলাম মা-বাবা ভাই-বোন মিলে সে সময় পরিবারের সবমিলিয়ে ১৬/১৭ জনের সারা বছরের চাল আসতো নিজেদের জমির ধান থেকে। আমাদের নিজেদের চাষাবাদ ছিল না। বর্গাচাষীরা সেসব জমি চাষ করতেন। কানিপ্রতি নির্দিষ্ট আড়ি (চট্টগ্রামের গ্রামাঞ্চলে চাল মাপার একটি পরিমাপক) ধান প্রদানের শর্তে কৃষকরা আমাদের জমি চাষ করতেন। এটি গ্রাম বাংলার হাজার বছরের পদ্ধতি ও সংস্কৃতি। সে সময় দেখতাম কৃষকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো। কে আরও বেশি আড়ি ধান দেবে। আরও বেশি বর্গাচাষ করবে। অনেকে ধানের পরিবর্তে একটি হিসাব করে টাকার বিনিময়েও জমি বর্গা দিতেন।< br> একসময় সবাই শহরবাসী হলে মা গ্রাম থেকে আমাদের সব ভাইদের বাসায় চাল পাঠিয়ে দিতেন। মা মারা যাওযার পর দুতিন বছর কৃষকরা কেমন একটা হিসাব করে টাকা-পয়সা দিয়েছিল। গত আট-নয় বছর ধরে তারও কোনো হিসাব নেই। এই জমি এখন কে চাষ করে, কিসের বিনিময়ে চাষ করে তার কোনো খবর নেই। ভাইদের বললে তারা বলেন, গ্রামে এখন কোনো কৃষক বর্গাচাষ করতে আগ্রহী না। কারণ অন্যের জমি চাষ করলে উৎপাদন ব্যয় তাদের পোষায় না। ফলে তারা ধান উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। অর্থনৈতিকভাবে অধিক লাভজনক কিছু হলে চাষ করে নতুবা জমি এমনিতেই পড়ে থাকে।< br> আমাদের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলায়। বর্তমানে আমাদের গ্রামে ধানি জমির দামও কমে গেছে আগের তুলনায়। বিক্রিও কমে গেছে। আমি ধরে নিয়েছিলাম আমাদের এলাকাতেই বোধহয় এ সমস্যা। চট্টগ্রামের মানুষ এমনিতেই অর্থনৈতিকভাবে অন্যান্য জেলার মানুষের চেয়ে অধিক সচ্ছল। চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় স্থানীয় দিনমজুর পাওয়াও কঠিন। আমাদের রাউজানে দিনমজুর, রিকশাচালক হিসেবে উত্তরবঙ্গের বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রামের লোক কাজ করে। বর্তমানে এদের পারিশ্রমিক অনেক বেশি। এত বেশি পারিশ্রমিক দিয়ে জমিতে কাজ করিয়ে একজন কৃষক যে ধান উৎপাদন করেন বিক্রি করে তিনি লাভ করাতো দূরের কথা অনেক সময় উৎপাদন ব্যয়ও তুলতে পারেন না। এ পরিস্থিতি দেখে গত কয়েক বছর ধরে ভেবেছি, এ অবস্থা যদি দেশের অন্যান্য স্থানেও চলে তাহলে দেশের জন্য ভয়াবহ এক ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। < br> গত সোমবারের একটি সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছে। ধানের দাম কম আবার কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেশি এই রাগে টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার বানকিনা গ্রামের কৃষক আবদুল মালেক শিকদার গত রোববার দুপুরে নিজের পাকা ধানে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেন। ধানের দাম কম অন্যদিকে কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেশি। এই রাগে তিনি এই কাজ করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, টাঙ্গাইলে ধান কাটতে একজন শ্রমিককে মজুরি দিতে হচ্ছে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা। সঙ্গে তিনবেলা খাবার। অথচ ওই এলাকায় প্রতিমণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। এত কম দামে ধান বেচে উৎপাদন খরচ উঠছে না কৃষকের। তাই নিজের পাকা ধানে আগুন দিয়ে ব্যতিক্রমী এই প্রতিবাদ জানিয়েছেন কৃষক আবদুল মালেক শিকদার। < br> ধানের দাম না পেয়ে প্রেসক্লাবের সামনে ধান ছিটিয়ে প্রতিবাদ করার খবরও এসেছে গণমাধ্যমে। লক্ষ্মীপুর জেলায়ও একই অবস্থা। দুই মণ ধানে এক কেজি ইলিশ কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। এ বছর লক্ষ্মীপুর জেলায়ও বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। < br> কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ বছর চাল রপ্তানির জন্য সরকারের কাছে আবেদনও করেছেন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। ধান ছাড়াও মাছ, সবজি, ফল, ফার্মের মুরগি ও গরু-ছাগল উৎপাদনেও আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছে দেশ। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে এদেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ থেকে আট কোটি। তার পাশাপাশি দেশে তখন আবাদি জমির পরিমাণ ছিল বর্তমান সময়ের চেয়ে ৩৫ শতাংশ বেশি। তারপরও দেশের খাদ্য উৎপাদন মোট চাহিদা পূরণ করতে পারতো না। খাদ্য আমদানিকারক দেশের শীর্ষে ছিল বাংলাদেশের নাম। তখন দেশের অনেক জেলায় মঙ্গা হতো। বেশ কয়েকমাস দেশজুড়ে থাকতো প্রবল খাদ্যাভাব। ধীরে ধীরে সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে জনসংখ্যা ১৭ কোটির অধিক। নদীভাঙন, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন নির্মাণের কারণে আবাদি জমির পরিমাণ অন্তত ৩৫ শতাংশ কমেছে। তারপরও দেশ ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এমন কি বিদেশে রপ্তানির কথাও ভাবছে। বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার শুরু থেকেই কৃষি ও কৃষকবান্ধব সরকার। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে শেখ হাসিনার সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। কৃষকদের জন্য সার-কীটনাশক ও সেচের ব্যবস্থা করেছে। দশ টাকায় কৃষকদের ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দিয়েছে সরকার, সে হিসাবে সরকারের ভর্তুকির টাকা পৌঁছে যায়। < br> আওয়ামী লীগ তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে শুরু থেকেই খাদ্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও টানা রাজনৈতিক সহিংসতার সময়েও বাজারে পণ্য সরবরাহ নিয়মিত রেখেছে। মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে। সরকার প্রধানের সদিচ্ছা, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর আন্তরিকতা এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশে গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ধান উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষিজাত অন্যান্য পণ্য নিয়ে বিপাকে না পড়লেও কৃষকরা ধানের ব্যাপক উৎপাদন নিয়ে বিপাকে পড়েছে। সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম কমে গেছে ধানের। এই বিষয়টি সরকারকেও বেশ বেকায়দায় ফেলেছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রধান খাদ্য চালের দাম বাড়তে দেয় না সরকার। অন্যদিকে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে চালের প্রকৃত দাম পাচ্ছে না কৃষকরা। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার প্রতিবছর নির্ধারিত দামে ধান চাল ক্রয় করে কৃষকদের কাছ থেকে। এ লক্ষ্যে প্রতি উপজেলায় গড়ে তোলা হয়েছে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, সরকারিভাবে ধান-চাল কেনা শুরু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। কিন্তু কৃষকদের অভিজ্ঞতা সেক্ষেত্রে ভিন্ন। অধিকাংশ সরকারি ক্রয়কেন্দ্র এবং এর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় কৃষকদের বিস্তর অভিযোগ আছে। কৃষকরা অভিযোগ করেন ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে তারা সরাসরি ক্রয়কেন্দ্রে ধান-চাল বিক্রি করতে পারেন না। একটা চক্র সবসময় ক্রয়কেন্দ্রগুলোতে সক্রিয় থাকে। < br> যা হোক, ধানের দাম, দিনমজুরের অভাব এবং ধান উৎপাদনে কৃষকের অনীহা ইত্যাদি বিষয় হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। মনে রাখতে হবে এই কৃষকরাই ১৭-১৮ কোটি মানুষের মুখে ভাতের সংস্থান করে দিচ্ছে। অন্তত খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারের মনোবলও শক্ত হয়েছে। তা না হলে রপ্তানিকারক দেশগুলোর মর্জির ওপর আমাদের নির্ভর করতে হতো। সে অভিজ্ঞতা কখনো সুখের ও সম্মানের নয়।< br> সরকার তৈরি পোশাক শিল্প মালিক, শিল্পকারখানার মালিক এবং ঋণ খেলাপিদের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে আসছে। এবার দেশের কৃষকদের বাঁচাতে, খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে, খাদ্যে পরনির্ভরশীলতা কমাতো কোনো পন্থা উদ্ভাবন করুক। আমাদের দেশ এখনো কৃষিপ্রধান দেশ। ফলে সবকিছুর আগে কৃষি ব্যবস্থাপনা অগ্রাধিকার পাক। আগে অন্নের চিন্তা পরে অন্যকিছু। যে অন্নের সংস্থান করে দিচ্ছে তার ভালোমন্দ ভাবতে হবে আগে। যে কৃষকরা একদিনের জন্যও কোনো হরতাল-ধর্মঘট করেনি, এক ঘণ্টার জন্যও কখনো কর্মবিরতি করেনি, রোদে পুড়ে, জলে ভিজে, নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও খাদ্য উৎপাদন বন্ধ করেনি, এখন সময় এসেছে তাদের কথা ভাববার। তাদের ‘ইনসেন্টিভ’ দেওয়ার। তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়ার। কয়েক মাসের অপরিসীম শ্রমের ফসল ঘরে তোলার আগে আগুন দেওয়ার মতো পরিস্থিতি যেন কোনো কৃষকের না হয়।< br> মনে রাখতে হবে-কৃষক বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে।

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক