রেলের কালো বিড়াল ভালোই আছে-কামরুল হাসান বাদল লেখক কবিও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 09/05/2019-09:37am:   
অতি ব্যবহারে ‘রেলের কালো বিড়াল’ শব্দত্রয় ক্লিশে হয়ে গেছে। আমার নিজেরও ভালো লাগে তা উচ্চারণ করতে। আসলে রেলওয়ে নিয়ে লিখতেও ইচ্ছে করে না। রেলের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা নিয়ে এত বেশি লেখা হয়েছে যে, নতুন কোন লেখা বা সমালোচনা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এখন আর গায়েও মাখে না। জনগণও মেনে নিয়েছে বোধ হয়, এর আর কোন উন্নতি হবে না। তারপরও লিখতে হয়। কারণ রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হওয়া মানে তো রাষ্ট্রের ক্ষতি হওয়া। আর রাষ্ট্রের মালিক তো জনগণ। কাজেই জনগণের স্বার্থেই লিখতে হয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়। অনিয়মগুলো তুলে ধরতে হয়।
স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রীয় এই গণপরিবহন সংস্থাটি লোকসান দিয়ে আসছে। সারাবিশ্বের যেসব দেশে রেল যোগাযোগ আছে তার মধ্যে সম্ভবত বাংলাদেশ রেলওয়েই বছরের পর বছর লোকসান গুনে যাচ্ছে। উপমহাদেশে আরেকটি দেশ পাকিস্তান এই খাতে লোকসান দিচ্ছে সম্প্রতি তবে বাংলাদেশের তুলনায় তা অত্যন্ত নগণ্য।
কোন প্রতিষ্ঠানের লাভ-লোকসানের হিসাবটি হয় এভাবে, ১০০ টাকা আয় করতে আপনি কত টাকা ব্যয় করলেন তার ওপর। একটি প্রতিষ্ঠান প্রতি ১০০ টাকা আয় করতে যত কম ব্যয় করবে তত বেশি লাভ করছে প্রতিষ্ঠানটি। হিসাবটি এভাবে করা হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালন দক্ষতা পরিমাপের একটি মাপদণ্ড হলো অপারেটিং রেশিও। মোট পরিচালন ব্যয় রাজস্ব আয়ের যত শতাংশ সেটিকেই প্রতিষ্ঠানের অপারেটিং রেশিও বলে। অপারেটিং রেশিও যত বেশি হয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালন অদক্ষতা বা লোকসানের মাত্রাও তত বেশি হয়। অর্থাৎ এ রেশিও ১০০ হতে যত কম হবে লাভ তত বেশি বলে ধরা হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যসূত্র বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সংস্থাটির অপারেটিং রেশিও ছিল ১৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা আয় করতে বাংলাদেশ রেলওয়েকে ব্যয় করতে হয়েছে ১৯৬ টাকা। (সূত্র: বণিকবার্তা)। যেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারতের রেল সংস্থার হার ৯৬ শতাংশ। চীনে এই হার ৯৪, জাপানে ৮৪, যুক্তরাষ্ট্রে ৬৩, পাকিস্তানে ১০৫, কানাডায় ৬১ শতাংশ। এই দেশগুলোর রেশিওর সাথে বাংলাদেশ রেলওয়ের রেশিও মেলালে বোঝা যায় দক্ষতার দিক দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে কতটা পিছিয়ে আছে। যদিও ব্যবস্থাপনা, যাত্রী সেবা ও আরামদায়ক ভ্রমণের দিক দিয়ে ওসব দেশ অনেক বেশি অগ্রসর, অনেক বেশি অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে থাকে।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের ৩৫২টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে প্রতিদিন। পণ্যবাহী ট্রেন চলছে ৫১টি। গত অর্থবছরে যাত্রী পরিবহন করে ৯০৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা ও পণ্য পরিবহন করে ২৮৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা আয় করেছে। অন্যান্য খাত থেকে আরও আয় করেছে ২৯৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে আয় করেছে ১ হাজার ৪৮৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর বিপরীতে পরিচালন ব্যয় করেছে ২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। সার্বিকভাবে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় রেলের পরিচালন দক্ষতা, স্বচ্ছতা, দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাধীনতার আগে দেশের বৃহৎ এই গণপরিবহন সংস্থাটি লাভজনক ছিল। যাত্রী সেবার মান, ব্যবস্থাপনাও সন্তোষজনক ছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয় রেলওয়ে। স্বাধীনতার পর পর অনেক ব্রিজ, রেলপথ ইত্যাদি অত্যন্ত দ্রুতগতির সঙ্গে মেরামত ও সংস্কার করে বঙ্গবন্ধুর তৎকালীন সরকার। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর যে সরকারগুলো ক্ষমতায় এসেছিল তারা আর রেলের উন্নয়নের জন্য ফলপ্রসূ কোন উদ্যোগ নেয় নি। তবে জেনারেল এরশাদের শাসনকালে প্রথমবারের মতো আন্তনগর ট্রেন সার্ভিস চালু হয়। এরশাদের পতনের পর খালেদা জিয়ার সরকার রেল সংস্থাকে সংকোচন করে এবং গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে মূলত রেলের দক্ষ ব্যক্তিদের বিদায় করে দেয়।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে রেলের উন্নয়নের লক্ষ্যে আলাদা রেল মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। দায়িত্ব নিয়ে রেলের কালো বিড়াল খেদানোর কথা বললেও কয়েক মাসের মধ্যে নিয়োগ বাণিজ্যের ঘুষ কেলেঙ্কারির দায়ে তাকে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করে রাখা হয়। পরে কুমিল্লার বর্ষিয়ান আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুল হককে রেলমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং রেলের উন্নয়নে বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। এর আওতায় রেল লাইন সংস্কার, নতুন রেল লাইন স্থাপন ও পুরাতন স্টেশনগুলো সংস্কার করা হয়। ২০০৮-৯ সাল থেকে ২০১৭-১৮ সময়ে ১৪ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকার ৬৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। চলমান রয়েছে আরো ৪৮টি প্রকল্প। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৮ হাজার কোটি টাকা। এত বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের পরও পরিচালন অদক্ষতার কারণে লোকসানের ধারা থেকে বের হতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে।
পরিকল্পনা ও পরিচালন ব্যর্থতার আরেকটি নজির হলো ডেমু ট্রেন। অনেক অর্থ ব্যয় করে, ঢাকঢোল পিটিয়ে রেল কর্তৃপক্ষ চীন থেকে ডেমু ট্রেন আমদানি করে। চালু করার প্রথম দিন থেকেই ডেমু ট্রেন নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগের শেষ নেই। সাধারণ প্লাটফর্ম থেকে অনেক উঁচু হওয়ায় এই ট্রেনে ওঠা-নামার ক্ষেত্রে দেখা দেয় জটিলতা। কামড়ায় টয়লেট না থাকা এবং প্রতিটি কম্পার্টমেন্টের নিচে ইঞ্জিন থাকার কারণে এই গাড়িতে গরমে যাত্রী চলাচল কষ্টকর হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে কয়েক বছর আগে একটি জাতীয় দৈনিক লিখেছিল, যে প্রতিনিধি দল চীনে গিয়ে এই ডেমু ট্রেন আমদানির জন্য নির্বাচন করেছিলেন, ভুলটা করেছিলেন তারা। কারণ প্রচণ্ড শীতের সময়ে তারা ওই ট্রেনে ভ্রমণ করেছিলেন ফলে প্রচণ্ড গরমে এই ট্রেনের অবস্থা কী হবে তা তারা ভাববার অবকাশ পান নি।
সুবর্ণ এক্সপ্রেস এক সময় যাত্রীদের মোটামুটি সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল। বর্তমানে সে সার্ভিসও ঠিক নেই। অধিকাংশ টয়লেটের অবস্থা খারাপ। অনেক সিট বসার উপযুক্ত নয়। সোনার বাংলার অবস্থাও খুব সন্তোষজনক নয়। সোনার বাংলায় টিকেটের সাথে ২০০ টাকার খাবার বিল বাধ্য করায় অনেকে অসন্তোষ প্রকাশ করে এসেছেন প্রথম থেকেই। ২০০ টাকা খাবারের বিল নিলেও খাদ্যমান সন্তোষজনক ও মানসম্মত নয়। রেল কর্তৃপক্ষ সে সময় ব্যাখ্যা দিয়েছিল বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের ক্যাটারার সার্ভিসকে লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে সোনার বাংলার খাবার সরবরাহের দায়িত্ব সে প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের লোকসান ঠেকানোর দায় কেন রেলের যাত্রীরা নেবে সে কথার ব্যাখ্যা কেউ দেয় নি।
একই ঘটনা ঘটেছে বনলতা এক্সপ্রেস নিয়ে। ২৫ এপ্রিল ঢাকা-রাজশাহীর মধ্যে বিরতিহীন ট্রেন বনলতা এক্সপ্রেসের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এই ট্রেনেও খাবার বাধ্যতামূলক করে রেল কর্তৃপক্ষ। যাত্রীদের আপত্তির মুখে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন রেলমন্ত্রীকে ফোন করে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন। খবরে জানা গেছে, এ বিষয়ে মন্ত্রী মহোদয় ইতিবাচক সারা দিয়েছেন। অর্থাৎ বনলতার বাধ্যতামূলক খাবার খাওয়া থেকে বেঁচে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের মানুষ। এবার চট্টগ্রামের সোনার বাংলা নিয়ে ভাবা দরকার।
যেসব দেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিদ্যমান তার মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের অবস্থাই শুধু নাজুক। এমনকি পাকিস্তান, সেখানেও রেল ব্যবস্থা ও পরিচালন দক্ষতা বাংলাদেশের চেয়ে ভালো।
নিরাপদ, আরামদায়ক ও অনেকটা দুর্ঘটনামুক্ত বলে দেশের মানুষ এখনো রেলে ভ্রমণ করতে চায়। এখনো রেলের একটি টিকেট যোগাড় করা সৌভাগ্য বলে মনে করে যাত্রীরা। সে অবস্থায় রেল কেন এত বিপুল পরিমাণ লোকসান দেবে তা খতিয়ে দেখা দরকার। দরকার কালো বিড়ালটাকে সত্যি সত্যি বধ করা। বিড়ালের আশ্রয়দাতাদের বিচারের মুখোমুখি করা।
দেশের বৃহৎ এই গণপরিবহন সংস্থাকে বাঁচাতে এবং যাত্রীবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে তা যত সহসা সম্ভব ততই মঙ্গল হবে রাষ্ট্রের তথা জনগণের।
Email : [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ