ও পরান’র তালতো ভাই...-কামরুল হাসান বাদল,লেখক,কবি, সাংবাদিক ও টিভি ব্যক্তিত্ব

পোস্ট করা হয়েছে 03/04/2019-05:32pm:    তালতো ভাই বোনের সম্পর্ক নিয়ে আঞ্চলিক গানের সংখ্যা প্রায় শ’খানেক বলে উল্লেখ করেছেন চট্টগ্রামের কয়েকজন শিল্পী ও গীতিকার-সুরকার। যে আবেগ ভালোবাসা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে এসব গান রচিত হয়েছিল তা হয়তো কালের পরিবর্তনে প্রাসঙ্গিকতা, জনপ্রিয়তা হারাবে একদিন। কিন্তু এই গানগুলোর মধ্যেই নিহিত হয়ে থাকবে চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও জীবনাচারের চিত্র। এ সব গানের কথার মধ্যেই ভবিষ্যত গবেষক ও ইতিহাসবিদের জন্য আছে অনন্য উপাদান।
সত্তর দশকের শেষের দিকে প্রয়াত এম.এন আকতার লিখেছিলেন গানটি। তাঁর করা সুরে প্রথমে ওতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী উমা নন্দী (বর্তমানে উমা খান)। পরে সন্ধ্যা রানী ও শেফালী ঘোষও এ গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। বর্তমানে কল্যানী ঘোষসহ অনেক শিল্পীই এ গানটি গেয়ে থাকেন। গানটির স্থায়ীটা হচ্ছে- ও পরান’র তালতোভাই, চিডি দিলাম পত্র দিলাম ন আইলা কিল্লাই। আঁর পরাননান কে’ন করেদ্দে মিডা মিডা কথার লায়-ই...। যে কোনো আঞ্চলিক গানের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা একেবারে সে অঞ্চলের মাটি ও মানুষের প্রাণের গহীন কথা, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহকে একেবারে সহজ-সরলভাবে শ্রোতা-দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করে। এ যেন চিরকালীন মানব সম্পর্কের এক একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি। উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া গানেও আমরা তেমনি একটি চিত্র পাই। নারীর বিরহ ব্যথা কী অসাধারণ নৈপুণ্যে তুলে ধরা হয়েছে একটি গানে- ‘যদি বন্ধু যাইবার চাও, ঘাড়ের গামছা থুইয়্যা যাওরে- ও বন্ধু কাজল ভ্রমরারে কোনদিন আসিবেন বন্ধু কয়্যা যাও কয়্যা যাওরে---।’ ওই নারীর প্রেমিক পুরুষ পেশায় যিনি গাড়োয়ান (গরু মহিষের গাড়ির চালক) একবার-বের হলে ঘরে ফেরে অনেকদিন পরে, তাঁর বিরহে নারীটি থাকতে পারে না, অন্তত তাঁর ঘাড়ের গামছাটি রেখে যাওয়ার অনুরোধ করে সে। একটি অঞ্চলের মানুষের জীবন-যাপন, আচার-সংস্কৃতি, পেশা ও জীবনমান বুঝতে এ ধরনের আঞ্চলিক গানগুলো বিশাল ভূমিকা রাখে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে কর্ণফুলী নদী, সাগর, সাম্পান ও সাম্পান মাঝির প্রসঙ্গ আসে কারণ এসব নিয়েই চট্টগ্রাম। অন্যদিকে উত্তর বঙ্গে যেহেতু গরু-ও মহিষের গাড়িই ছিল এক সময়ের একমাত্র বাহন সেহেতু ওই অঞ্চলের গানে গরুর গাড়ি ও গাড়োয়ানের প্রসঙ্গ আসে ঘুরে ঘুরে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানেও এমন অনেক উপাদান আছে যা একান্তই চট্টগ্রামের। যেমন উপর্যুক্ত গান- যেখানে তালতো ভাইয়ের জন্য তালতো বোনের প্রেমানুভূতি, আকর্ষণ ও বিরহের ব্যথা অসাধারণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তালতো ভাই ও তালতো বোন সম্পর্কের ব্যাখ্যাটি হচ্ছে- বোন বা ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ির পক্ষের- ভাই-বোন। অর্থাৎ বোনের দেবর, ননদ বা ভাইয়ের শালা-শালী পরস্পরকে তালতো ভাই বা তালতো বোন বলে সম্বোধন করে। বাংলাদেশের অন্যজেলায় যা বেয়াই-বেয়াইন হিসেবে সম্বোধিত হয়। অন্যজেলার বেয়াই-বেয়াইন চট্টগ্রামে তালতো ভাই বা বোন হিসেবে সম্বোধিত হলেও চট্টগ্রামে এই সম্পর্কটি যেন চিরকালীন এক রোমান্টিক সম্পর্ক। তালতো ভাই-তালতো বোনের মধ্যে ঠাট্টা-মশকরা একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। চট্টগ্রামের মুসলিম সমাজ খানিকটা রক্ষণশীল হলেও এই সম্পর্কের ব্যাপারে অধিকাংশ পরিবারেই একটু উদারতার ভাব আছে। পরস্পরের মধ্যে আড্ডা দেওয়া, হাসি ঠাট্টা করা দল বেঁধে বা মাঝে মধ্যে শুধু তালতো ভাই-তালতো বোন বেড়াতে যাওয়া নিয়েও খুব বেশি আপত্তি থাকে না দু’পরিবারেই। ভাই বা বোনের পক্ষ থেকেও একটু প্রশ্রয় বা আস্কারা পাওয়া যায়। এর ফলে অনেক সময় ঠাট্টা-মশকরার এই সম্পর্ক প্রেম-ভালোবাসায়ও রূপ নেয়। এখনকার কথা বেশি জানি না। আমাদের সময় থেকে তার আগে পর্যন্ত প্রায় কিশোর-কিশোরী বা তরুণ, তরুণীর প্রথম ভালোবাসার পাঠ শুরু হতো তালতো ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। চট্টগ্রামের মানুষ অতিথি ও ঐতিহ্য পরায়ণ। বর্তমানে আধুনিকতার নামে কিছুটা পরিবর্তন এলেও বছর বিশেক আগেও একটি বিয়ের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মহা উৎসবের আয়োজন হতো। সপ্তাহ পনরদিন আগে থেকে বিয়ে বাড়িতে নাইওরি আসতো। টিনের বাক্সে যাকে চট্টগ্রামের ভাষায় ‘কাত্তি’ বলা হয় তা ভর্তি করে নানা জাতের ‘পাক্কন’ পিঠা আনা হতো। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর আনাগোনা ও খাওয়া দাওয়া মিলে সে এক মহামিলন যেন। হবু বর ও তার পক্ষের তালতো ভাই-বোনদের কীভাবে জব্দ করা যায়- তা নিয়ে ফন্দি করা শুরু হতো অনেক আগে থেকেই। বিয়ে বাড়িতে হয়ত সামান্য বিষয় নিয়ে দু-পক্ষের দ্বন্দ্ব-রাগারাগি লেগে গেল অথচ তার মধ্যেও দেখা গেল নতুন তালতো ভাই-বোনদের মধ্যে হাসি-ঠাট্টা চলছে অবিরাম ও অকৃত্রিমভাবে।
বলছিলাম তালতো ভাই-তালতো বোনের মধ্যে চিরকালীন রোমান্টিক সম্পর্কে নিয়ে। বলেছিলাম অনেকের প্রেমের প্রথম পাঠ শুরু হয় এই সম্পর্কের ভেতরেই। অনেকের সম্পর্কটি পারিবারিকভাবে অনুমোদন পায়- অনেকেরটা পায় না। এ ক্ষেত্রে অনেকে পালিয়ে বিয়ে করেন অনেকে পরিবারের চাপে অন্যের ঘরণী হয়ে বা অন্য নারীকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়ে অতীত আকুলতায় ভোগেন। পরবর্তী জীবনে দেখা হলেও দীর্ঘশ্বাসটি গোপন করে স্বাভাবিক আচরণের চেষ্টা করেন। একটি সময়ে যে যোগাযোগের অন্যতম একটি মাধ্যম ছিল চিঠি লেখা, যা এই প্রজন্মের সন্তানদের কাছে প্রায় অপরিচিত ও সেকেলে একটি ব্যাপার; এ গানের মাধ্যমে তারও একটি চমৎকার চিত্র ফুটে ওঠে। প্রেমাকুল তালতোবোন চিঠি লেখার পরেও তার দেখা না পেয়ে আক্ষেপ করে বলছে- আঁর পরান্নান কেন গরেদ্দে মিডা মিডা কথার-লায়-ই, চিডি দিলাম পত্র দিলাম না আইলে কিল্লাই।’ গানের তরজমাটি এখানে দিলাম এ কারণে যে, আমার লেখার পাঠকরা অধিকাংশই চট্টগ্রামের আর যারা চট্টগ্রামের আদিবাসী নন দীর্ঘদিন বসবাসের কারণে এই শব্দগুলো তাঁদের কাছেও পরিচিত হয়ে উঠেছে।
আমার ধারণা চট্টগ্রামের মতো অন্য জেলায় এই সম্পর্কটি এত গভীর, আন্তরিক ও মধুময় নয়। এমন কি বর্তমানে চট্টগ্রামেও আধুনিক ও নতুন প্রজন্মের কাছে এই সম্পর্কটির আলাদা কোনো তাৎপর্য আছে বলে মনে হয় না। তার কারণ এখন সমাজে অনেকটা পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষার হার ও তার সাথে নারী পুরুষের মেলামেশার ক্ষেত্রেও রক্ষণশীলতা অনেকটা দূরীভূত হয়েছে। সে কারণে হয়ত কোনো তরুণের কাছে তালতোবোনের বক্র চাহনী আগের দিনের মতো কাঙিক্ষত নয়।
তালতোভাই বোনের সম্পর্ক নিয়ে আঞ্চলিক গানের সংখ্যা প্রায় শ’খানেক বলে উল্লেখ করেছেন চট্টগ্রামের কয়েকজন শিল্পী ও গীতিকার-সুরকার। যে আবেগ ভালোবাসা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে এসব গান রচিত হয়েছিল তা হয়তো কালের পরিবর্তনে প্রাসঙ্গিকতা, জনপ্রিয়তা হারাবে একদিন। কিন্তু এই গানগুলোর মধ্যেই নিহিত হয়ে থাকবে চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও জীবনাচারের চিত্র। এ সব গানের কথার মধ্যেই ভবিষ্যত গবেষক ও ইতিহাসবিদের জন্য আছে অনন্য উপাদান।
চট্টগ্রামের পুরনো কালচারকে সওদাগরী কালচার বলে ভীষণ তাচ্ছিল্যের সাথে দেখা হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের অনেক কিছুকে গ্রাম্য ও সেকেলে বলে ভাবতে ভালোবাসে অনেকে। তবে এ কথা স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশের অন্য যে কোনো জেলা থেকে চট্টগ্রাম (বৃহত্তর) জেলার মানুষের জীবনযাপন , কৃষ্টি সংস্কৃতি অর্থাৎ পোশাক-পরিচ্ছদ, খাবার-দাবার, আনন্দ উৎসব, রাগ-অভিমান, ভাষা ও সঙ্গীত সম্পূর্ণ আলাদা। বাংলা সংস্কৃতি বলতে আমরা যা বোঝতে চেষ্টা করি তা থেকে একটু ভিন্নতর। এর ঐতিহাসিক কারণও আছে। সে প্রসঙ্গে আজ আলোচনা করা যাবে না। তবে চট্টগ্রাম ও চাটগাঁইয়াদের বিষয়ে বলতে চাই এই জেলার স্বকীয়তাই এখানকার ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার মধ্যে কোনো অপমানতো নেই-ই বরং এতে আছে আত্মপরিচয় উন্মোচনের অনির্বাণ গৌরব।
সময়ের সাথে সাথে আমাদের অনেক কিছুই পালটে যাচ্ছে। সামাজিক প্রথা, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন। আত্মীয়তার সূত্রে দুপরিবারে যে বন্ধনের সৃষ্টি হতো আজ তা অনেকটা কৃত্রিম ও মেকি হয়ে উঠছে। ক্লাবে বা কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠানে কিছুক্ষণের জন্য উপস্থিত হয়েই আমরা এখন দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদন করি। অনেক সময় বিয়ের কনে বা বর দেখার সময়ও থাকে না। ক্ষণিকের উপস্থিতির মধ্যে দুচার জনের মধ্যে যা দেখা হওয়ার তা হলো হয়তো। নতুন আত্মীয়ের অনেকের সাথে দেখা বা পরিচিত হওয়ার সুযোগেও হয় না অনেকের। বর্তমানের ড্রয়িং রুম কেন্দ্রিক আতিথেয়তায় আগের সেই আন্তরিকতা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। রোমান্টিকতার বাইরেও দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আন্তরিকতা ও সৌভ্রাতৃত্বের যে বন্ধন হতো তা-ও আজ হারিয়ে যাচ্ছে। দেখা গেল ঘনিষ্ঠ তালতোভাই তালতোবোনদের আবার দেখা হলো হয়তো দম্পতির বিয়ে বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে। কথা, সুর ও গায়কী সব কিছু মিলিয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান আমাকে ভীষণ মুগ্ধ করে। ভবিষ্যতে এসব গান নিয়ে আরও আলোচনার আশা রইল।
[email protected]

সর্বশেষ সংবাদ