আমাদের সততা ও নৈতিকতার মানদণ্ড এবং জাদুঘরে মুনীর চৌধুরী-কামরুল হাসান বাদল

পোস্ট করা হয়েছে 21/03/2019-10:23am:    মন্ত্রী-এমপিদের কাছে ঘেঁষতে পারি না। মন্ত্রী-এমপির মধ্যে কারো সাথে আমার সামান্য পরিচয় থাকলেও ঘনিষ্ঠতা নেই। কাজেই তারা কীভাবে অফিস করেন, কাজকর্ম সমাধা করেন তা জানার বা দেখার সুযোগ কখনো হয়নি। তবে এই নগরে বাস করার সুবাদে বিভিন্ন কাজে সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে যেতে হয়, গিয়েছি কয়েকবার। এবং তা শুধুমাত্র মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র থাকাকালীন এবং বর্তমান মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দীন সাহেবের কাছে।
আমি যতবারই যাই অবাক হই, তাঁরা অর্থাৎ মেয়রের দায়িত্বে যাঁরা থাকেন, এত ঝামেলার মধ্যে, এত লোকের এত এত সমস্যার মধ্যে এবং এত চাপের মধ্যে কাজ করেন কী করে।
৪১টি ওয়ার্ডের উন্নয়ন-সমস্যার সঙ্গে নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিকেন্দ্র, রাস্তা-ঘাটের সমস্যা। সেসাথে অনেকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা নিয়েও মেয়রের কাছে আসেন। মেয়র মহোদয় অত্যন্ত ধৈর্য্যের সাথে তাদের সমস্যার কথা শোনেন। কারো কারো সমস্যার সমাধান দেন এবং একইসাথে কয়েকশ ফাইলে স্বাক্ষরও করেন।
প্রচুর দর্শনার্থীদের ভরা থাকে তাঁর অফিস। কিছু কিছু লোক আছেন যাঁরা সর্বক্ষণ তার সঙ্গে লেগে থাকেন। কয়েকবার দেখেছি, তিনি সময়মতো খাওয়ার সুযোগও পান না। পেলেও সেখানে অন্তত দশ পনেরজন লোক থাকেন। তারাও সে খাবারে ভাগ বসান। সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার মেয়র সাহেব রোজা রাখেন। কয়েকবার দেখেছি, মানুষের যন্ত্রণায় তিনি ভালোমতে ইফতারও করতে পারেন না। কয়েকদিন আগে তাঁর অফিসে যেতে হয়েছিল। এত চাপ ও ভিড় উপেক্ষা করে নিজেদের কথা বলা সম্ভব নয়। ফলে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল। দেখলাম এক ভদ্রলোক শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত, সফেদ পাজামা-পাঞ্জাবিতে দেখলেই ভক্তি আসবে এমন নূরানি চেহারা তাঁর। তিনি একটি আবেদন নিয়ে এসেছেন মেয়রের কাছে। আবেদনটি হলো, গৃহকর কমানোর। ভদ্রলোক মেয়র সাহেবের পূর্ব পরিচিত তা তাদের কথাবার্তায় বুঝলাম। ভদ্রলোক দুটি ফ্ল্যাট কিনে পরে তা একত্র করেছেন। ফ্ল্যাট দুটো বানানো হয়েছিল আলাদাভাবে। ফলে তার নাম্বারও আলাদাভাবে চিহ্নিত হয়েছে। মূলত ফ্ল্যাট দুটো হলেও এখন যেহেতু তিনি দুটোকে একত্র করে বসবাস করছেন সেহেতু তিনি একটি ফ্ল্যাটের কর দিতে চান। মেয়র সাহেব তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে তাঁর কিছু করার নেই। ফ্ল্যাট দুটিকে একটিতে পরিণত করা হলেও তার আয়তন তো বেড়েছে। তাঁকে সেভাবেই কর প্রদান করতে হবে। মেয়র বললেন, ভদ্রলোককে, আপনি আমার ফুফাকে চেনেন, আপনার পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন। থাকেন মানে, দেশের বাইরে থেকে এলে বছরে ২০/২৫ দিন থাকেন কখনো। আমি তো তার ট্যাক্সও কমাতে পারিনি।
ভদ্রলোক লিখেছেন, তার ফ্ল্যাটভাড়া ছয় হাজার টাকা। মেয়র তাকে জিজ্ঞেস করলেন এই টাকায় এই শহরের কোনো এলাকায় বাসা ভাড়া পাওয়া যাবে কি না। মেয়র হিসাব করে দেখলেন ভদ্রলোকের বছরে গৃহকর আসবে ২১ হাজার টাকা। একটি ফ্ল্যাটের তথ্য গোপন করে তিনি বছরে বাঁচাতে চাইছেন দশ কিংবা এগারো হাজার টাকা। এই টাকা বাঁচানোর জন্য তিনি মিথ্যা স্টেটমেন্ট দিচ্ছেন। মেয়র সাহেব বললেন, আপনি ফ্ল্যাটের ইউটিলিটি বিল সাড়ে তিন হাজার টাকা মাসে দিতে পারলে সিটি করপোরেশনকে বছরে ২১ হাজার (মাসে দুহাজার টাকারও কম) টাকা কেন দিতে পারবেন না। তিনি বললেন, শুধু ঘুষ খাওয়া দুর্নীতি নয়, তথ্য গোপন করে সরকার বা সিটি করপোরেশনকে কর কম দেওয়াটাও কি দুর্নীতি নয়?
লোকটি হাসছেন। তার মুখে অনুশোচনা বা লজ্জার কোনো চিহ্ন দেখলাম না। মনে হলো, এমন পরিস্থিতিতে তিনি আগেও পড়েছেন। সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে তার। ভাবছিলাম, এদেশের মানুষের কথা। শ্মশ্রুমণ্ডিত থেকে চোর-ডাকাত সবাই নিজের স্বার্থে মিথ্যা কথা বলেন। আমি বললাম, ভাই ট্যাক্স না দিলে করপোরেশন সেবা দেবে কী করে? এই যে ময়লা পরিষ্কার করা, রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা, সড়কে বাতির ব্যবস্থা করা। তিনি বললেন, আমার বাসার ময়লা আমি নিজে গিয়ে নিচে ফেলে আসি। তা সিটি করপোরেশন করে না। বুঝলাম, ভদ্রলোকের সাথে বেহুদা তর্ক করে সময় নষ্ট করার অর্থ হয় না।
এই হচ্ছে আমাদের সততার মানদণ্ড। মিথ্যা তো মিথ্যাই। তা যে কোনো কারণেই হোক। তা যত ছোট কারণেই হোক। এ দেশের মানুষ শত চেষ্টা করে সরকার বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঠকাতো। সরকারকে দুপয়সা কম দিতে পারলে স্বর্গীয় সুখ অনুভব করেন অনেকে। কর প্রদান করা যে একটি নাগরিক দায়িত্ব তা মনেই করেন না অনেকে। আয়কর ফাঁকি দেওয়া, কাস্টমস ফাঁকি দেওয়া, মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমদানি ও রপ্তানি করা, সোনা বা অন্যকিছু চোরাচালান করা, দেশে বা বিদেশে অবৈধ ব্যবসা করা, এমনকি মাদকের ব্যবসা করাকেও ‘গুনাহ’ বলে মনে করে না।
এই সমাজেই অনেকে আছেন দানশীল হিসেবে পরিচিত। স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ কমিটির বড় বড় পদ আঁকড়ে থাকেন। ধর্ম-কর্ম করেন। বছর-দুবছরে ওমরাহ বা হজ পালন করতে যান, তীর্থ পরিদর্শনে যান কিন্তু তার আয় বৈধ নয়। ধর্মীয় ব্যাখ্যায় তা হালালও নয়। তারা তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ড, আয় এবং সম্পদকে নিরাপদ করতে ধর্মের লেবাস ধারণ করেন। তারা প্রকৃত ধার্মিক নন। ধর্মের আবরণে অধর্মের কাজ করেন। সাধারণ মানুষ তাদের এই ভণ্ডামি অনেক সময় ধরতে পারে না। তাই তারা অনেকে মনে করে তাদের ভণ্ডামি সৃষ্টিকর্তাও বোধহয় ধরতে পারেন না, বুঝতে পারেন না। এরা ঘুষ দিয়ে সবকিছু ‘ম্যানেজ’ করতে করতে ভাবেন সৃষ্টিকর্তাকেও বোধ হয় ঘুষ দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করা যাবে। এ কারণে এরা জনহিতকর কাজের পরিবর্তে ধর্মীয় উৎসবে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে পছন্দ করেন। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে টাকা না দিয়ে মাদ্রাসা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে চাঁদা দেন এবং ভাবেন এভাবে তাদের পাপমোচন হচ্ছে।
আমরা অধিকাংশই নিজেরা সৎ নই। তবে অন্যের কাছ থেকে সততা আশা করি। আমরা নিজেরা কাজে ফাঁকি দিই কিন্তু অন্যের কাছ থেকে শতভাগ কাজ আদায় করার চেষ্টা করি। আমাদের মন-মানসিকতা মধ্যযুগের কিন্তু রাষ্ট্রের কাছ থেকে ইউরোপীয় শাসন ব্যবস্থার দাবি করি। আমরা মনে প্রাণে একেকজন কুসংস্কার, কূপমণ্ডুকতাকে ধারণ করি অথচ জীবনযাপন করি আধুনিক সব সুবিধা ভোগ করে। আমরা বিজ্ঞানকে স্বীকার করি না কিন্তু বিজ্ঞানের সকল আবিষ্কারের সুফল ভোগ করি। মোট কথা, যা বলি তা বিশ্বাস করি না। যা বিশ্বাস করি তা প্রকাশ করি না। আমাদের সকলের বগলে ইট মুখে শেখ ফরিদ।
এ এক চরম বৈপরীত্য আমাদের সমাজে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশই অসৎ। কেউ কেউ সৎ আছি আসলে অসৎ হওয়ার সুযোগ আসেনি বলে। পরীক্ষিত সৎ মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর এই সমাজে। আমি ভীষণ অবাক হই। এদেশের মানুষের মনোজাগতিক এই দুর্দশা দেখে। যে দেশের মানুষ ভাষার অধিকারের জন্য প্রাণ দিতে পারে। যে দেশের ত্রিশ লাখ মানুষ স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে পারে। যে দেশের মানুষ অনেক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এতটা পথ এসেছে সে দেশের মানুষের চরিত্রে এমন বৈপরীত্য কেন? কেন তারা সুযোগ পেলে নিজের দেশকে সমাজকে ঠকাতে চায়? কেন রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে চায়। রাষ্ট্রকে ঠকিয়ে, বঞ্চিত করে সে কেন এত অপার আনন্দ পায়!
হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, ‘আপনি যখন একটি ভুল করেন তখন আপনি একজন মানুষ। এই ভুল করার পর আপনি যখন লজ্জিত বা অনুতপ্ত হবেন তখন আপনি একজন ভালোমানুষ।’ প্রতিটি সমাজ বা রাষ্ট্রে কমবেশি দুর্নীতি আছে। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্নীতিটা এমন পর্যায়ে গেছে যে, দুর্নীতিবাজরা এখন সামান্য লজ্জাও পায় না। দুর্নীতির টাকায় সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার পর সমাজে দোর্দণ্ড প্রতাপে সে চলাফেরা করে তাতে না আছে তার দ্বিধা-সংকোচ না আছে সমাজের প্রতিক্রিয়া। সমাজের মানুষও জানে লোকটির আয় বৈধ নয় তারপরও সমাজ বা সমাজের লোকজন তাকে সম্মান জানাতে কার্পণ্য করে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আবজলের অবৈধ সম্পদের খবর বেরিয়েছে সম্প্রতি। আবজল শত কোটি টাকার মালিক। ইতিমধ্যেই পাঠকরা জেনেছেন উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সড়কের পাশাপাশি দুটি ছয়তলা বাড়ি আছে তার। আরও একটি বাড়ির নির্মাণ কাজ চলছে ৪৯ নম্বর প্লটে। ৬৬ নম্বর বহুতল বিশিষ্ট বাড়িটিও তার। এছাড়া ১৬ নম্বর সড়কের ১৬ নম্বর বহুতলা বাড়িটিও তার ও তার স্ত্রীর নামে। দুদক বলছে, তাদের আরও সম্পদ আছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। ফরিদপুর শহরে এবং অস্ট্রেলিয়ায়। এর সব তথ্য প্রমাণ দুদকের কাছে আছে বলে দাবি করেছে দুদক। আবজল চাকরি করছেন ২০ বছর ধরে। এই ২০ বছরেই তিনি এমন অঢেল-সম্পদের মালিক হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন মাঝারিগোছের কর্মকর্তা ২০ বছরে যদি এমন সম্পদের মালিক হয়ে যেতে পারেন তাহলে অন্যদের বিষয়টি সহজেই অনুমেয়। এটি একটি সামান্য চিত্র মাত্র। এমন কত শত আবজল বাংলাদেশে আছে তার কোনো ইয়াত্তা নেই। আবজল তার সম্পদের পাহাড় গড়েছেন দেশে এবং দেশের বাইরে। দেশে যে এমন সম্পত্তির মালিক হলেন, বাড়ির পর বাড়ি গড়ে তুলছেন সে বিষয়ে এত বছর তাকে কোথাও জবাবদিহি করতে হয়নি। কেউ প্রশ্ন তোলেনি একজন সরকারি কর্মকর্তা যার বেতন সর্বসাকুল্যে ৭০ হাজার টাকার বেশি হওয়ার কথা নয় সে প্রতিমাসে ৭০ লাখ টাকা কামাচ্ছে কীভাবে?
লিখতে হয় বলে লিখলাম। বলতে হয় বলে বললাম। এসব করে খুব যে পরিবর্তন করতে পারব তা মনে হয় না। কারণ ব্যক্তি সৎ না হলে সমাজ সৎ হবে না, সমাজ সৎ না হলে রাষ্ট্র সৎ হবে না। সর্বশেষ খবরটি হলো মুনীর চৌধুরীকে দুদকের মহাপরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর স্থান হয়েছে শেষ পর্যন্ত জাদুঘরে। এর ফলে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান প্রশ্নের সম্মুখীন হলো। হঠাৎ কেন তাকে সরিয়ে দেওয়া হলো? সে ব্যাখ্যা চাওয়ার অধিকার তো আমার নাই।
লেখক,কবি, সাংবাদিক ও টিভি ব্যক্তিত্ব Email. [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।