এক জীবনতো কেটেই গেল এভাবে কামরুল হাসান বাদল লেখক কবিও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 05/02/2019-09:37am:    ১৯৬১ সালে জন্ম আমার। সে হিসেবে আসছে এপ্রিলে ৫৩ বছর পূর্ণ হবে। একটি মানুষের জীবনে ৫৩ বছরও কম নয়। বিশ্বের অনেক খ্যাতি ও প্রতিভাবান ব্যক্তি এতদিন বাঁচেননি। এর অনেক আগেই তারা অমরত্বের খাতায় নিজেদের নাম খচিত করেছেন। বর্তমান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আমার বয়সে ছোট। বঙ্গবন্ধু এই বয়সে ছিলেন একটি জাতির অবিসংবাদিত নেতা ও জাতির জনক। এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। তাতে লেখার কলেবর বৃদ্ধি হবে শুধু। আমার ব্যর্থতার ভার তাতে বাড়বে বৈ কমবে না। আমি যেহেতু ৯ বছরে হইনি সেহেতু ৯০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থেকে বিশ্বকে ভারাক্রান্ত করব শুধু কল্যাণকর কিছুই হবে না। তারপরেও আজ জীবনের পেছনে তাকিয়ে মাঝে মধ্যে ভাবি নাইবা করতে পারলাম কিছু কিন্তু জীবনটাতো কাটলো না আনন্দবৈভবে। বোঝার সক্ষমতা যখন থেকে অর্জন করেছি তখন থেকেই দেখছি একটি বিক্ষুব্ধ স্বদেশ। আন্দোলন সংগ্রাম-বুলেট-মৃত্যু নিপীড়ন আর বঞ্চনা। বড়দের মুখে শুনতাম ‘এখন ক্রান্তিকাল’। জীবনের অর্ধশতক অতিক্রম করেছি। কত কিছুর পরিবর্তন হয়েছে দেশে-বিদেশে কিন্তু আমাদের ‘ক্রান্তিকাল’ আর শেষ হয় না। এখনো শুনতে হয় এখন ‘ক্রান্তিকাল।’ জীবনের সুবর্ণ সময়গুলো কেটে গেল-স্বৈরাচার বিরোধী, রাজাকার বিরোধী, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিরোধী নানা আন্দোলন সংগ্রামে উত্তপ্ত, অস্থির ও বেপরোয়া সময়ে। অবারিত আনন্দ নিয়ে, মুক্তির স্বাদ নিয়ে জীবনকে উপভোগ করার, একটু যেন হাওয়ায় বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার সুযোগটাওতো কখনো হলো না। এভাবেই কেটে গেল একটি জীবন।
তখন কৈশোরকাল। রাজনীতি অর্থনীতির কিছুই বুঝি না। যে সময় শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ছিল না। স্কুল খোলা থাকতো, তবে তা হতো মর্নিং শিফটে। কোনো কারণে ঘরে সেদিন সকালে রেডিও শোনেনি কেউ। অন্যদিনের মতো স্কুলে রওয়ানা দিয়েছি। পথে পথে কিছু কিছু লোকের নানান কথা শুনতে পেলাম। তবে স্কুলে গিয়ে চরম সংবাদটি পেতাম- জাতির জনক সপরিবারে নিহত হয়েছেন। ঘটনার আকস্মিকতায় সবার মধ্যে একটি আতঙ্ক কাজ করছিল। স্কুল ছুটি ঘোষণা করা হলো। বাড়িতে এসে বড়দের কাছে বিস্তারিত শুনলাম। বাবাকে দেখলাম কাঁদতে। আমারও ভীষণ মনে পড়ছিল বঙ্গবন্ধুকে। কারণ ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি বেতবুনিয়ার কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ উদ্বোধন করতে যাওয়ার পথে আমাদের গহিরা স্কুলের মাঠে একটি সমাবেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। আমরা খুব কাছ থেকে তখন তাঁকে দেখেছি। কারণ তাঁকে সংবর্ধনার অংশ হিসেবে গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য আমাদের বিদ্যালয়ের ব্রতচারী টিমের একজন সদস্য ছিলাম আমি। যদিও বঙ্গবন্ধুর সময় সংকীর্ণতার কারণে ব্রতচারী নৃত্য প্রদর্শনের সুযোগ হয়নি আমাদের।
একটি পরাধীন দেশে জন্ম হয়েছিল আমার এবং আমার সমবয়সী একটি প্রজন্মের। পরাধীনতার গ্লানি বুঝে ওঠার আগে দশ বছর বয়সে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধকে। কিন্তু তারপর একটু বোঝার বয়স হওয়ার সাথে সাথে দেখতে হয়েছে- জাতির জনকের হত্যাকাণ্ড। আর এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই দেশে শুরু হয়েছে- হত্যা ক্যু ষড়যন্ত্র আর হিংসা ও বিদ্বেষের রাজনীতি। যা থেকে আমাদের মুক্তি আজও মিলল না। তারুণ্যের উন্মাতাল সময় কেটেছে স্বৈরতন্ত্রের স্টিম রোলারের নিচে। হরতাল-অবরোধ-ধর্মঘট- লাঠি-গুলি- টিয়ার গ্যাস আর নির্বাচনের নামে জাতির সাথে চরম তামাশার কালে। তারপরে অনেক ত্যাগ অনেক রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা। স্বৈরাচারের পতনে একদিন নতুন করে স্বপ্ন বপন করেছিল যারা, তাদের যে স্বপ্নভঙ্গ হতে দেরি হয়নি। আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজপথ। আন্দোলন-সংগ্রাম- লাঠি-গুলি- টিয়ার গ্যাস আর মৃত্যু।
পৃথিবী কত এগিয়ে গেল। আশেপাশের দৃশ্যপট কত পাল্টে গেল কিন্তু এদেশের মানুষের জীবন থেকে জ্বালাও-পোড়াও আর হত্যা ও বিভীষিকা নির্বাপিত হলো না। আজন্ম এদেশকে মাতৃরূপে দেখেছি। সকাল সন্ধ্যা তার আঁচলে ঠাঁই নিয়েছি। তার মলিন মুখ দেখে নয়নজলে ভেসেছি। জীবিকার জন্যও দেশ ছেড়ে কোথাও যাওয়ার কথা কখনো ভাবিনি। কিন্তু আজ জীবনের প্রৌঢ়ত্বে এসে দুএকবার মনের কোণায় কি একটু ঈর্ষা এসে জমেনি যে- ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া অর্থাৎ উন্নত দেশের সন্তানরা কী সৌভাগ্য নিয়ে জন্মলাভ করে। আমরা কেন বঞ্চিত হলাম। কী করে কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে এমন ভাবনা ভর করে। ‘অভিমানের বিশাল আকাশ আমারওতো আছে।’
কিছুদিন থেকে সারাদেশের মানুষের মতো আমার মনটাও ভারাক্রান্ত, বিক্ষিপ্ত। সুস্থ চিন্তার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছি। কিছু নেয়ার মতো মানসিক অবস্থাও নেই। তারপরও প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য লিখতে হয়, লিখছি। এই লেখাটি যখন লিখতে বসেছি তখন বিভিন্ন চ্যানেলে কুমিল্লায় বাসে পেট্রোল বোমায় নিহতদের সংবাদটি প্রচারিত হচ্ছিল বারবার। এ দৃশ্য প্রতিদিন প্রতিনিয়ত দেখছি গত প্রায় এক মাস জুড়ে। এই অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে বসবাস করে মানসিকভাবে সুস্থ থাকা সম্ভব কীভাবে। এ কোন স্বদেশ দেখছি আমরা। এর জন্যে কি ত্রিশ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল। প্রায় তিন লাখ মা-বোন তাঁদের সম্ভ্রম দিয়েছিল?
প্রতিদিন এই হত্যাযজ্ঞ দেখতে দেখতে, এই নিষ্ঠুরতা দেখতে দেখতে আমরা বড়রাতো আছি-ই, শিশুদের মনোজগতে তার কী প্রভাব পড়ছে? তারা কি সুস্থ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। যে শিশুরা জীবনের দশটি বছর তিলে তিলে নিজেদের তৈরি করেছে জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা অর্থাৎ এসএসসি দেবে বলে- রাজনীতির কারণে, হিংসা ও বিদ্বেষের কারণে বারবার তাদের পরীক্ষা পেছানো ও দুরভিসন্ধিমূলকভাবে তাদের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলে খবর রটিয়ে তাদের মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করা হচ্ছে। তাদের অসুস্থ করে তোলা হচ্ছে- এসব অনাচারের বিরুদ্ধে আমরা বড়রা প্রতিবাদহীন কেন? কেন আজ আমাদের সন্তানরা পরীক্ষা দিতে পারবে না। রাজনীতি বা ক্ষমতাবদলের এই হিংস্র প্রতিযোগিতার মধ্যে ওদের ভূমিকা কী? ওরা এখনও ভোটারও হতে পারেনি। আন্দোলনকারী নেত্রীর নাতি-নাতনীরা যদি পিতার শোক ভোলার আগে পরীক্ষা দিতে মালয়েশিয়া যেতে পারে। এবং মালয়েশিয়া যেতে বিমানবন্দর র্পযন্ত যদি গাড়ি ব্যবহার করতে পারে তবে আমাদের সন্তানদের দোষ কী? তারা কেন পরীক্ষা দিতে পারবে না? তারা কেন গাড়িতে চড়লে- তাদের পেট্রোল বোমায় জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। শিশুদের ওপর এই নির্মমতা কেন? নিরীহ মানুষরা আন্দোলনের টার্গেট কেন? সরকারই বা কেন এসব দানবদের হাত থেকে তার নাগরিকদের রক্ষা করতে পারে না। বিএনপির উদ্দেশ্যই মনে হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা ভণ্ডুল করে দেওয়া। প্রশ্ন হচ্ছে কেন? কোনো বিপ্লব, কোনো মহৎ উদ্দেশ্যতো নেই। স্রেফ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এত নৃশংসতা, এত ধ্বংস আর হত্যার উৎসব!
ধরে নিলাম বিএনপি ক্ষমতায় গেল। তাতে কী হবে? আওয়ামী লীগের চেয়ে ভালো শাসন দেবে? অতীত অভিজ্ঞতাতো তা বলে না। শুধু অতীত অভিজ্ঞতার কথাই বা বলি কেন। বর্তমানে বিএনপি যে শক্তির ওপর ভর করে দেশে সন্ত্রাসবাদ পরিচালিত করছে ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কি সে শক্তিকে সন্তুষ্ট করতে পারবে? খালেদা জিয়ার পরিস্থিতি কি নরেন্দ্র মোদির মতো হবে? মোদি নিজেতো সাম্প্রদায়িক দল করেনই- তার ওপরে তার চেয়ে বেশি উগ্রদলের সাথে জোট করে ক্ষমতায় গিয়ে টের পাচ্ছেন- সাম্প্রদায়িক উস্কানি বাইরে থেকে দেওয়া যতটা সহজ হয়েছিল ভারতের মতো একটি রাষ্ট্রে ক্ষমতায় গিয়ে তা সম্ভব নয়।
শুধু উপমহাদেশে নয়, বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের মধ্যে একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু দেশের এই উন্নতি, এই অগ্রগতিকে ব্যাহত করাই যাদের লক্ষ্য দেশকে বিপর্যস্ত করে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে যারা আজ ক্ষমতায় যেতে চাইছে তারা ক্ষমতায় গিয়ে ’৭১ এর বাংলাদেশ, ’৫২’র বাংলাদেশ, ত্রিশ লাখ শহীদের বাংলাদেশকে নয়। তারা মূলত শাসন করতে চায় আরেকটি ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তানের, শাসন করতে চায় মিনি আফগানিস্তানের, শাসন করতে চায় ইরাক, লিবিয়ার, সিরিয়ার মতো কোনো মৃত্যুসংকুল উপত্যকা।
লেখাটি শুরু করেছিলাম আমাদের প্রজন্মের হাহাকার, বেদনা, ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে। শেষ করতে হচ্ছে তার চেয়েও বেশি বেদনার কথা বলে। আমাদের শিশু-কৈশোর ও তারুণ্যের কাল অস্থির সময়ে কাটলেও এমন হিংস্র, বিপদসংকুল সময়ে কাটেনি। আজকের দিন দেখে মনে হয়, এর চেয়েতো ভালো ছিল অন্তত। এমন অগ্নিকুণ্ডতো ছিল না অন্তত। বরং লজ্জিত হচ্ছি, আমাদের অগ্রজেরা মুক্তিযুদ্ধ করে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছিলেন আমাদের। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের পরবর্তী প্রজন্ম। সে স্বাধীনতাকে কতটা অর্থবহ করে তুলতে পেরেছি। বড় হয়ে যেরূপে মাতৃভূমিকে পেয়েছিলাম তার চেয়ে কয়েক গুণ খারাপ (রাজনীতি, সততা ও আদর্শিক) বাংলাদেশ রেখে যাচ্ছি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। এরা কি আমাদের ক্ষমা করবে? Email: [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ