শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও কামাল-সেলিমের ব্যর্থতা কবি কামরুল হাসান বাদল

পোস্ট করা হয়েছে 16/01/2019-09:54am:    নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্যদিয়ে শেখ হাসিনা দেশের রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জনগণকে একটি নতুন বার্তা দিয়েছেন। ১৯৭৩ সালের পর এই প্রথম একটি মন্ত্রিসভা গঠিত হলো শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের সাংসদদের নিয়ে। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ ২১ বছর নিজেদের অস্তিত্ব এবং সে সঙ্গে মানুষের অধিকারের জন্য নিরলস সংগ্রাম করে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দেশ শাসনের সুযোগ পায়।
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসনের জন্য সেবার জাতীয় পার্টি থেকে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও জেএসডির আ স ম আবদুর রবকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলো। সে থেকে সর্বশেষ মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছিল যৌথ ও জোটগতভাবে। গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় মহাজোটের জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগের পুরানো মিত্র ১৪ দলীয় জোটের কাউকে মন্ত্রিত্বে রাখা হয়নি। শেখ হাসিনা তার এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে তা একেবারে খোলাসা করে না বললেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তা ঠিকই ধরতে পেরেছেন বলে আমার ধারণা। তিনি জোটের অন্যান্য দলকে এবার সরকারে না রেখে তাদের নিজেদের দল গোছাতে পরামর্শ দিয়েছেন। মন্ত্রিসভা গঠনের পর দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বিভিন্ন মন্তব্য ও বক্তৃতায়ও দলের নতুন সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট করার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তিনি বলেছেন, দলকে গোছানোর কাজে প্রবীণ নেতাদের মেধা ও পরামর্শকে কাজে লাগানো হবে। তিনি সরকার থেকে দলকে আলাদা করা এবং দলকে তৃণমূল পর্যন্ত শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছেন। এমনকি আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোটবদ্ধভাবে নয়, দলীয়ভাবে অংশ নেবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন। আপাত দৃষ্টিতে নিন্দুকদের কাছে বিষয়টি আওয়ামী লীগের আত্মঅহমিকা বা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বলে মনে হলেও আমার কাছে মনে হয় আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুণগত ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে, তা সরকারে থেকে হোক বা বিরোধী দলে থেকে হোক তা যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অর্থাৎ বাংলাদেশের দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, জাতির জনক, ত্রিশ লাখ শহিদ, একাত্তরের গণহত্যাকে স্বীকার করে হয় তারই একটি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন শেখ হাসিনা।
এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ সাম্প্রদায়িকতাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচনের আগে পূর্বের ন্যায় আওয়ামী লীগ ভারতের দালাল, এই দলকে ভোট দিলে ইসলাম বিপন্ন হবে, মসজিদে আজানের পরিবর্তে উলুধ্বনি শোনা যাবে, বিসমিলস্নাহ খেয়ে ফেলবে, বাংলাদেশ ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হবে এমন অভিযোগ কেউ তুলতে পারেনি। কারণ এসব কথা এখন আর জনগণ বিশ্বাস করে না। দেশ স্বাধীনের পর থেকে ২০১৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনের আগে-পরে দেশের সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের ভয়ভীতি দেখানো, তাদের মন্দির-আবাসস্থলে হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, উচ্ছেদ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা এবার ঘটেইনি। এমনকি ড. কামালের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তথা বিএনপির ভরাডুবির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সে জোটে জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে সঙ্গে রাখা। নির্বাচনের আগে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমকে জোটে জামায়াতকে রাখার বিষয়ে নিজের অজ্ঞতার কথা স্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে হেরে ড. কামাল হোসেন সংবাদ সম্মেলনে এবার প্রকাশ্যে বলেছেন, জোটে জামায়াতকে রাখা ভুল ছিল।
ড. কামাল হোসেন যে অনেক দেরিতে ভুল বুঝতে পেরেছেন তা তিনি অনুধাবন করতে না পারলেও দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষরা অনেক আগেই অনুধাবন করেছেন। এক্ষেত্রে শুধু ড. কামালই নন, বাংলাদেশে বাম-গণতান্ত্রিক দল যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে বিশ্বাসী (যদি সত্যিকার অর্থে তারা বিশ্বাস করে থাকেন) তেমন দল ও দলের নেতারাও ভুল করেছেন। গত ১০ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। এরমধ্যে সরকারের অনেক পদক্ষেপ ছিল যা নিয়ে মানুষের পক্ষে আন্দোলন-সংগ্রাম করার সুযোগ ছিল। যা অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপি গড়ে তুলতে পারেনি। গত ১০ বছর ধরে বিএনপি সরকারবিরোধী যে কর্মসূচিগুলো দিয়েছিল তার অধিকাংশই ছিল খালেদা-তারেক তথা জিয়া পরিবারকে রক্ষা করার আন্দোলন। জনগণের কল্যাণে, স্বার্থে তারা তেমন সোচ্চার হয়নি। তাছাড়া বিএনপি একটি সাম্প্রদায়িক দল। যুদ্ধাপরাধের দায়ে নিন্দিত জামায়াতের সঙ্গে এই দলের ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের। জামায়াত প্রকাশ্যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল। আর বিএনপির রাজনীতি এখনো পাকিস্তানের মুসলিম লীগের মতো। বাংলাদেশে বিএনপির শাসন মানেই পাকিস্তানি ভাবধারায় দেশ পরিচালনা। এই দলের অতীত ইতিহাসের বর্ণনা দিতে গেলে লেখার কলেবর বৃদ্ধি পাবে বলে শুধু এটুকু বলতে চাই, বিএনপির রাজনীতি মূলত একাত্তরের বাংলাদেশবিরোধী এবং সাম্প্রদায়িক। এটি জাতি হিসেবে অত্যন্ত লজ্জার বিষয় যে, দেশের অন্যতম বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে স্বীকার করে না। যুদ্ধ করে স্বাধীন করা কোনো দেশে এমন কোনো নজির নেই। ২০১৩ সালের পর থেকে এই রাজনৈতিক দলটি ক্রমেই বিতর্কিত, নিন্দিত হয়ে উঠছিল এবং তাদের কার্যকলাপের কারণে দেশের মানুষের আস্থা হারাচ্ছিল।
বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সন্তানেরা যারা মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে গর্ব করে এবং সে চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, শোষণহীন, বঞ্চনাহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্থান থেকে তারাও মুখ ফিরিয়ে নেয় বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতি থেকে। এই সময়টিতে একটি ঐতিহাসিক এবং যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন ড. কামাল, সিপিবির মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, যারা ৭২ এর সংবিধানের কথা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কথা বলেন। ড. কামাল রাজনীতিতে এতিম হয়ে পড়া জামায়াতের অভিন্ন হৃদয় বিএনপিকে রক্ষার দায়িত্ব না নিয়ে যদি তৃতীয় একটি রাজনৈতিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিতেন তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা সুবাতাস বয়ে যেত। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং তাদের জোটের নেতারা বিএনপি যা, আওয়ামী লীগও তা এই ‘যা-তা’ রাজনীতি না করে অন্তত গত দশ বছর ধরে একটি উদার গণতান্ত্রিক ও মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে পারতেন এবং নির্বাচনে অংশ নিতেন তাহলে একটি সম্মানজনক আসন লাভে সমর্থ হতেন। আর এটাই হচ্ছে হাসিনার দূরদর্শিতা আর ড. কামাল- সেলিম ও অন্যান্যের ব্যর্থতা।
আমি ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনার এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই, স্বাগত জানাই। ১৪ দলীয় জোটের অন্যান্য শরীক দলগুলো এবার নিজেদের পায়ে দাঁড়াক।
আওয়ামী লীগের বাইরে এসে রাজনীতি করুক এবং সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিক। বাংলাদেশে বিশ্বাসী দলগুলোই শুধু বাংলাদেশে রাজনীতি করুক।

সর্বশেষ সংবাদ