তিনটি ইশতেহার এবং অভিন্ন শত্রু-মিত্র- কামরুল হাসান বাদল লেখক কবিও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 26/12/2018-07:07pm:    একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সোম এবং মঙ্গলবার তিনটি ইশতেহার প্রকাশিত হলো। সোমবার ঘোষণা করা হয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার। তার পরদিন মঙ্গলবার সকালে আওয়ামী লীগের ইশতেহার এবং এর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বিএনপি ঘোষণা করে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার। ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে তা হলো, প্রশাসনিক সংস্কার, নির্বাচনকালীন সরকারের বিধান তৈরি, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা চাকরিতে প্রবেশে বয়সসীমা তুলে নেওয়া, বেকার ভাতা চালু, পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল, গার্মেন্ট শ্রমিকের বেতন ন্যূনতম ১২ হাজার করা, মোবাইলের কলরেট কমানো। বিএনপি’র ইশতেহারের উল্লেখযোগ্য হলো, গণতন্ত্রের অনুশীলন, রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রীর পদে না থাকা, গণভোট পদ্ধতির পুনঃপ্রবর্তন, সংসদের উচ্চ কক্ষ, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ, ন্যায়পাল নিয়োগ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল, অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট ও ৭৪ এর বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিল এবং বেকারভাতা প্রদান।
আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বলা হয়েছে প্রতিটি গ্রামে নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, যুব সমাজকে দক্ষ-জনশক্তিতে রূপান্তর, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো এবং ব্যাংকিং খাতে আর্থিক অনিয়ম বন্ধ করে দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ইত্যাদি।
নির্বাচনের আগে ইশতেহার প্রকাশ করা একটি রাজনৈতিক রেওয়াজ। নির্বাচিত হলে দলটি কী কাজ করবে তার একটি ধারণা দেওয়া। উন্নত দেশগুলোতে ইশতেহারের ওপর জয়-পরাজয় অনেকটা নির্ভর করলেও বাংলাদেশে সে সংস্কৃতি এখনো জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। খুব সাধারণ ভোটাররা ইশতেহারের বিষয়টি বোঝেন না। তারা মার্কা ও ব্যক্তি দেখে ভোট প্রদান করে থাকেন। ২০০৮ সালের পর থেকে ইশতেহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ভোটযুদ্ধে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি তরুণ ভোটারদের বেশ আকৃষ্ট করেছিল। ফলে তাদের ভোটে ব্রুট মেজরিটি পাওয়া সহজ হয়েছিল আওয়ামী লীগের। আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় গিয়ে ইশতেহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিল। বিচারের মুখোমুখি করে শাস্তি প্রদান করেছে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের। এ জন্য গঠিত মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনালে এখনো বিচার কাজ চলছে অন্যান্যদের বিচার সম্পন্ন করতে।
সঙ্গত কারণে এবার রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে কী থাকছে তা নিয়ে একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। এরই মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটেছে। বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, আ স ম আবদুর রবের জেএসডি, কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ মিলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছে। দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কারাগারে, দলের দ্বিতীয় নেতা তারেক রহমান সাজাপ্রাপ্ত হয়ে লন্ডনে পালিয়ে থাকায় বিএনপি’র রাজনীতি যখন দিকভ্রান্ত ও কার্যত নেতৃত্বহীন সে সময় ড. কামাল ঐক্যফ্রন্টের নামে বিএনপি’র রাজনীতিকে চাঙা করেন। বর্তমানে ঐক্যফ্রন্টের সবাই একযোগে এমনকি নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হওয়া জামায়াতসহ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। ড. কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্টে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটও আছে যেখানে জামায়াতে ইসলামী অন্যতম একটি অংশীদল।
ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে তারা সরকার গঠন করলে তা কিসের ভিত্তিতে পরিচালিত করবেন তার একটা ধারণা দিয়েছেন। সাধারণ মানুষ ধরে নিয়েছিল ইশতেহারটি একটি কমন ইশতেহার। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার ঘোষণার একদিন পর বিএনপি আলাদাভাবে ইশতেহার ঘোষণা করায় প্রশ্ন উঠেছে ঐক্যফ্রন্ট জিতলে কোন ইশতেহারটি বাস্তবায়ন করা হবে। ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি’র ইশতেহার নিয়ে ইতিমধ্যে কিছু বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গটি। ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে বলা হয়েছে, তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে তার একদিন পর ঘোষিত বিএনপি’র ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের প্রসঙ্গটাই পুরো চেপে যাওয়া হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, ঐক্যফ্রন্ট জিতলে বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে কীভাবে। বিএনপিতো এই বিচার চায় না। ঐক্যফ্রন্ট জিতলেও মূল ক্ষমতাতো থাকবে বিএনপি-জামায়াতের হাতে। স্বল্প সংখ্যক আসন নিয়ে ড. কামাল হোসেনরা বিএনপিকে তাদের ইশতেহার মানাতে বাধ্য করবেন কী করে। যদিও এরই মধ্যে ড. কামাল হোসেনদের ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে কৌতুককর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রথমত হচ্ছে, তাদের জোটে জামায়াতের উপস্থিতি, যাদের নেতারাই যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত এবং আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত। বিএনপি’র নেতা সালাউদ্দিন কাদেরও যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন এবং তার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এই জোটের সঙ্গে থেকে তাদের উপস্থিতিতে উপস্থাপিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আশ্বাস কতটা তরুণ ভোলানো আর কতটা অন্তসারশূন্য তা বুঝতে বেশি গবেষণার দরকার নেই। দ্বিতীয়ত, ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার প্রকাশের পরদিন নিজেদের ইশতেহার প্রকাশ করে এবং সেখানে যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়টি উহ্য রেখে বিএনপি তার ভবিষ্যত রাজনীতির একটি ধারণা পরিষ্কার করেছে এবং সে সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টকেও বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে যে, ঐক্যফ্রন্ট জিতলেও বিচারের কোনো ব্যবস্থা করা হবে না।
বিএনপি-জামায়াত যে তাদের কঠিন সময়টি পার করার জন্য ড. কামালকে ব্যবহার করছেন তা তারা মনোনয়নের ক্ষেত্রে তারেক জিয়ার নির্দেশ গ্রহণ করেই প্রমাণ করেছেন। কাজেই বর্তমান ইশতেহারে ড. কামাল গং যে ভালো ভালো কথাগুলো উচ্চারণ করেছেন তা শুধু ইশতেহারেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তবে রূপ নেবে না। নেওয়ার মতো ক্ষমতা বা আসনও তারা পাচ্ছেন না। কারণ ২০ দলীয় জোট থেকে ইতিমধ্যে জামায়াতের ২৫ জনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে যারা জামায়াতের হলেও ড. কামালদের মতো ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গে ড. কামালের কথা বা প্রতিশ্রুতির মধ্যেও যে আন্তরিকতা আছে তাও নয়। কারণ তিনি এবং তার পরিবার শুরু থেকেই এই বিচার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ছিল। তাঁর জামাতা বার্গম্যান জামায়াতের বেতনভোগী লবিষ্ট হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে ট্রাইব্যুনালের বিচার ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করার সব ধরনের চেষ্টা করে গেছেন এবং এ কারণে তিনি আদালত কর্তৃক তিরস্কৃতও হয়েছেন।
১৯৭১ সালে ড. কামালের ভূমিকা এবং ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তার কর্মকাণ্ড অত্যন্ত বিতর্কিত ও রহস্যময়। ফলে তাঁর এই প্রতিশ্রুতি দেশের তরুণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করা ছাড়া অন্য কিছু নয় বলে সবার কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে।
ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের ১ নম্বরে আছে, প্রতিহিংসা বা জিঘাংসা নয় জাতীয় ঐক্যই লক্ষ্য। ৩ নম্বরে আছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ। সেখানে বলা হয়েছে, মত প্রকাশের ক্ষেত্রে মানুষ পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে। গণমাধ্যমের ওপর কোনো রকম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। কিন্তু গত ১৪ ডিসেম্বর মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ থেকে ফেরার সময় তিনি সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে যেভাবে ধমকালেন, খামোশ বললেন, সাংবাদিককে চিনে রাখতে বললেন এবং নাম লিখে রাখতে বললেন তা দেখেতো মনে হয় না এরা ক্ষমতায় গেলে প্রতিহিংসা করবেন না এবং গণমাধ্যমের ওপর কোনো প্রকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। শুধু তিনি নন তার সাথে থাকা রব-মান্না-কাদের সিদ্দিকীদের কথাবার্তা বা আচরণে তো মনে হয় না ক্ষমতা পেলে তারা প্রতিপক্ষের ওপর অহিংস আচরণ করবেন। তাদের ইশতেহারের ৮ নম্বরে বলা হয়েছে। দুর্নীতি দমনের কথা। সেখানে বলা হয়েছে, দায়িত্ব পাবার সাথে সাথে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বর্তমান সরকারের সব দুর্নীতির তদন্ত করে জড়িতদের বিচার করা হবে। নিরপেক্ষভাবে দুর্নীতির বিচার যদি করতেই হয় তাহলে তার আগের সরকারের অর্থাৎ হাওয়া ভবনের দুর্নীতির বিষয়গুলোর কী হবে তবে? সে মামলাগুলো কি তামাদি হয়ে যাবে? তার অন্যতম সহযোগী কাদের সিদ্দিকীকে বলেই ফেলেছেন তিন তারিখেই তিনি জেলের তালা খুলে খালেদা জিয়াকে জেল থেকে মুক্ত করে আনবেন। আদালত দ্বারা সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে তালা ভেঙে কী করে বাইরে নিয়ে আসবেন কাদের সিদ্দিকী? সেখানে আইনের শাসন বিচারবিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের ভূমিকা কী হবে তখন? কোনো নীতি আদর্শ নয়। স্রেফ শেখ হাসিনার ওপর ব্যক্তিগত আক্রোশ ও প্রতিহিংসার কারণে যারা জামায়াতের মতো একটি দণ্ডিত, চিহ্নিত সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুগপৎ এবং অভিন্ন প্রতীকে নির্বাচন করতে পারেন তারা কোন মুখে ইশতেহারে প্রতিহিংসা জিঘাংসা নয় কথাগুলো উদ্ধৃত করতে পারেন।
গত দশ বছর ধরে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর টকশোতে সরকার এবং সরকারি দলকে সমালোচনা করে বিদ্রুপ করে কটাক্ষ করে আক্রমণ করে অনেক কথা বলা হয়েছে। মন্ত্রী থেকে এমপি এবং সে সাথে নেতাদের উপস্থিতিতে উস্কানিমূলক অনেক কথাও বলা হয়েছে। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী এমপি এবং নেতাকে বহুবার বিব্রত এমনকি প্রশ্নবানে জর্জরিত করা হয়েছে সেখানে তো দুএকটি ঘটনা ছাড়া অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি। বরং সে টক শোগুলোতে বিএনপি ঘরানার নেতা ও বুদ্ধিজীবীদেরই বারবার উত্তেজিত হতে দেখা গেছে, অমার্জিত বক্তব্য প্রদান করতে দেখা গেছে। সর্বক্ষেত্রে সহনশীলতা শেখ হাসিনা আর আওয়ামী লীগকেই দেখাতে হবে বিরোধীদলে কোনো দায়িত্ব থাকতে নেই ?
২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকারে খালেদা জিয়াকে মন্ত্রীত্বের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো পদও বিরোধীদলকে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। হরতাল প্রত্যাহার করে আলোচনায় বসতে খালেদা জিয়ার কাছে শেখ হাসিনা টেলিফোনও করেছিলেন। খালেদা জিয়ার ছোট সন্তান আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর সমবেদনা জানাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার বাড়িতেও গিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে বাড়িতে ঢুকতেও দেওয়া হয়নি। এইসব ঘটনা ও আচরণের কথা ভুলে গেলেতো চলবে না। ড. কামাল হোসেনরা প্রতিহিংসার রাজনীতি না করার কথা বলেছেন কিন্তু একবারও তো ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য তিরস্কার বা দুঃখ প্রকাশের কথা বললেন না। আহসানউল্লাহ মাস্টার ও শাহ এএম এস কিবরিয়াকে হত্যার প্রসঙ্গ তুললেন না। দুঃখ প্রকাশ করলেন না। এমনকি তারা নির্বাচিত হলে ২০০১ সালের মতো হত্যা-ধর্ষণের ঘটনা, সংখ্যালঘু নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না তেমন আশ্বাসও দিলেন না। বরং তাঁর আচরণে স্পষ্ট করলেন নির্বাচিত হলে প্রশ্নকারী সাংবাদিকদের কী দুরবস্থা হবে তারই চিত্র।
ড. কামাল হোসেন আজকাল বেশি বেশি গণতন্ত্রের কথা বলছেন এবং তার জন্য একটি অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি করছেন। আমি পূর্বেও বহুবার লিখেছি, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই কি একমাত্র প্রধান শর্ত গণতন্ত্রের? গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে অগণতান্ত্রিক শক্তিকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে গেলে গণতন্ত্রের লাভ কী হবে শেষ পর্যন্ত। ইদানীং বিএনপি-ফ্রন্টের নেতা ও সংগঠকরা নতুন একটি তত্ত্ব খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন জনগণকে। অলি-জাফরুল্লাহ কামালসহ অন্যরা হরদম বলে বলে জনগণকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করছেন তারা। কয়েকদিন আগে চট্টগ্রামে প্রেস ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে বিএনপির এক বর্ষীয়ান নেতা ও নির্বাচনের প্রার্থীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে সময় তিনি একই কথাটি বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন আমাদের। তত্ত্বটি হলো, দেশে অবাধ নির্বাচন না হলে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটবে। এটি তারা কিসের ভিত্তিতে বলছেন তা বোধগম্য হচ্ছে না। বাংলাদেশের চেয়ে অনেক অনেক গুণ কম গণতন্ত্র সত্ত্বেও মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য দেশে জঙ্গিবাদের ব্যাপক প্রসার ঘটেনি। অধিকাংশ মুসলিম দেশেতো গণতন্ত্রই নেই। বরং দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারই জঙ্গিবাদকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে যার প্রসার ঘটেছিল বিএনপি-জামায়াত জোটের সময়ে।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের মাতৃসংগঠন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করতে এসে ওনারা বলছেন (পক্ষান্তরে) তারা না জিতলে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হবে। সম্ভবত তারা এই তত্ত্বের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ও শান্তিপ্রিয় মানুষকে হুমকি দিচ্ছেন। নির্বাচনে হেরে গেলে তারা সবাই জঙ্গিবাদকে উস্কে দেবেন, সমর্থন করবেন এবং বাংলাদেশকে পাকিস্তান আফগানিস্তান বানাবেন। সবসময় বিএনপির প্রতি দুর্বল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের বারবার জামায়াতকে একটি জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও বিএনপি এবং নব্য ঐক্যফ্রন্ট জামায়াতকে পরিত্যাগ করেনি।
২। জঙ্গিবাদ গণতন্ত্রের শত্রু, মানবতার শত্রু, সভ্যতার শত্রু। বাংলাদেশে সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের জন্য যারা রাজনীতি করেন তাদেরও প্রধান শত্রু (হওয়া উচিত) জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা। বিশেষ করে বামদলের সঙ্গে জঙ্গিবাদের সম্পর্ক হবে সাপে-নেউলের মতো। এই দলগুলো কথায় কথায় গণতন্ত্র বিকাশের কথা বলেন, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বলেন, সাম্প্রদায়িক ও অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে বক্তৃতা বিবৃতি করে থাকেন। এরা কথায় কথায় সরকারের সাথে হেফাজতে ইসলামীর সখ্যের কথা উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেন। সেই জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদীদের প্রধান টার্গেট হচ্ছেন আওয়ামী লীগ প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ পর্যন্ত অন্তত ২৫ বার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করেছে জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলো। যার কোনো কোনোটির সাথে বিএনপিও জড়িত আছে। এর পাশাপাশি বেগম খালেদা জিয়াকে একবারও হুমকি দেয়নি জঙ্গি ও উগ্রবাদীরা। কোনো সময় খালেদা জিয়া তাদের টার্গেটে পরিণত হননি। জঙ্গিবাদ যদি বামদের প্রবল প্রতিপক্ষ হয় সেক্ষেত্রে শত্রুর শত্রু হিসেবে তাদের মিত্র হওয়ার কথা শেখ হাসিনা। কিন্তু সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি উল্টো। বাংলাদেশের বামরা উঠতে বসতে শেখ হাসিনাকে যেভাবে শাপ-শাপান্ত করে থাকেন তদ্রুপ করেন না বিএনপি বা বেগম খালেদা জিয়াকে। বরং আওয়ামী লীগ বিরোধিতায় আক্রমণের ভাষা বাম-ডানের মধ্যে অভিন্ন। বরং বর্তমানে বামদের আচরণে মনে হয় আওয়ামী লীগের পতন বা সে দলকে গালাগাল করতে আর ডান বা জঙ্গিদের প্রয়োজন নেই। তারা যা করতে পারছে না তা করে সে শূন্যতা পূরণ করে দিচ্ছে বাম দলগুলো।
দেশে জঙ্গিবাদ প্রসারে প্রধান অন্তরায় কোন দল বা কোন নেতা? নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা। তা না হলে জঙ্গিবাদের আক্রমণের লক্ষবস্তু কেন হচ্ছেন শেখ হাসিনা। কারণ তারা জানে শেখ হাসিনার বর্তমানে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের প্রসার ও উত্থান সম্ভব নয়। ফলে ড. কামালসহ ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নেতারা নতুন করে যে তত্ত্ব বাজারে ছাড়তে চাইছেন তার কোনো ভিত্তি নেই সত্যতা নেই। বরং তারা জঙ্গিবাদের সমর্থনেই আজ মাঠ গরম করছেন এবং শেখ হাসিনাকে পরাজিত করার জন্য জোটবদ্ধ হয়েছেন।
আমি আগেও বলেছি, ঐক্যফ্রন্টে যারা ভিড়েছেন তারা সবাই শেখ হাসিনার ওপর ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে তাকে পরাজিত করতে একাট্টা হয়েছেন। এখানে কোনো নীতি আদর্শের বালাই নেই। মান্নাতো বলেই ফেলেছেন এর জন্য প্রয়োজনে শয়তানের সঙ্গেও হাত মেলাবেন। জিঘাংসা কতটুকু হলে কোনো রাজনীতিক এমন বক্তব্য দিতে পারেন, যদিও ইশতেহারে তারা প্রতিহিংসা ও জিঘাংসার অবসান চেয়েছেন।
আওয়ামী লীগের ইশতেহার নিয়ে তেমন কিছু লিখিনি। কারণ গত দশ বছরের কার্যক্রম এবং তার ধারাবাহিকতাই তাদের ইশতেহার। আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং জাতি যা প্রত্যাশা করেছিল তিনি তা গ্রহণ করেছেন। তিনি অতীতের ভুলভ্রান্তির জন্য ক্ষমা চেয়ে নির্বাচিত হলে দুর্নীতির বিষয়ে জঙ্গিবাদের মতো জিরো টলারেন্স দেখানোর ঘোষণা দিয়েছেন এবং সে সাথে ব্যাংকিং সেক্টরে সংঘটিত অনিয়ম দুর্নীতির বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। আমি মনে করি অতীতের মতো এবারও তিনি নির্বাচিত হলে ইশতেহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন।
ঐক্যফ্রন্ট এবং বিএনপির ইশতেহার নিয়ে আর কিছু লিখলাম না, কারণ নির্বাচিত হলে তারা কোন্‌্‌ ইশতেহার বাস্তবায়ন করবেন তা বুঝতে পারছি না। কারণ ঐক্যফ্রন্টে কামাল-কাদের-মান্নারা মিলে যে কয়টি আসনে ছাড় পেয়েছেন তার চেয়ে জামায়াতে ইসলামী একাই বেশি পেয়েছেন। ফলে ঐক্যফ্রন্ট নামে জিতলে (যদি জেতে) প্রকৃতপক্ষে দেশের শাসনভার পরিচালনা করবেন তারেক জিয়ার বিএনপি এবং জঙ্গিবাদের ‘মাদার অর্গানাইজেশন’ জামায়াতে ইসলামী। E-mail : [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।