চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল মো.ওসমান গণি লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট

পোস্ট করা হয়েছে 15/12/2018-11:57am:    সারাবিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।বাংলাদেশ কে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে দেশের প্রতিটি উন্নয়নশীল খাত সমানভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।সব খাতের সাথে দেশের মানুষের প্রধান পেশা কৃষিখাতও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮৫জন লোক কৃষি পেশার সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত।এই কৃষকদের হাড়ভাঙ্গা কঠোর পরিশ্রমের ফলে বাংলাদেশ আজ চাল উৎপাদনে বিশ্বজয়ের পথে রয়েছে। আয়তন অনুযায়ী বাংলাদেশ এখনই বিশ্বের এক নম্বর চাল উৎপাদনকারী দেশ। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে এ দেশ হবে বিশ্বের রোল মডেল। আর এই সাফল্যের জন্য ইতিহাসের মাইলফলক হয়ে উঠেছেন আমাদের দেশের প্রান্তিক চাষিরা।
ওয়াকিবহাল সূত্রের তথ্যানুযায়ী, বহুমুখী সমস্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেও চাল খাতে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। ছোট আয়তনের দেশ হলেও এ বছর চাল উৎপাদনে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন কৃষকরা। ৩ কোটি ৬২ লাখ ৭৯ হাজার টন চাল উৎপাদনের রেকর্ড অর্জন করে তারা মাইলফলক ছুঁয়ে দিয়েছেন।
স্বাধীনতার পর কখনো এত চাল উৎপাদন করতে সক্ষম হয়নি বাংলাদেশ। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ধান উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন বিদেশেও রপ্তানি করতে সক্ষম হচ্ছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে চাল রপ্তানি করে বাংলাদেশ ছুঁয়েছে আরেকটি মাইলফলক। এর মধ্য দিয়ে কৃষির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জীবিকার ধারা। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি)নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনে অর্থনীতির নতুন এক দিগন্ত দেখছেন দেশবাসী। এতে নতুন আরেক স্বপ্ন দেখাচ্ছে কৃষি খাত। এভাবে ধান, চাল উৎপাদনে এগোতে থাকলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের রোল মডেল। হবে হাজার কোটি বৈদেশিক মুদ্রা আয়। আর এ পথেই এগোচ্ছে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা কৃষকরা। বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে তিন কোটি ৬২ লাখ ৭৯ হাজার টন চাল উৎপাদন হয়েছে। দেশের জনসংখ্যা অনুযায়ী আমাদের খাদ্যের চাহিদা রয়েছে দুই কোটি ৯১ লাখ টন। সেই হিসাবে এবার অতিরিক্ত ৭১ লাখ ৭৯ হাজার টন চাল রয়েছে। ২০১৮ সালে দেশে গম উৎপাদন হয়েছে ১১ লাখ ৫৩ হাজার টন, ভুট্টা ৩৮ লাখ ৯৩ হাজার টন, আলু এক কোটি তিন লাখ ১৭ হাজার টন, ডাল ১০ লাখ ৩১ হাজার টন, তেলবীজ ৯ লাখ ৭০ হাজার টন ও শাকসবজি উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ৫৯ লাখ ৫৪ হাজার টন। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, ফসলের উৎপাদনশীলতার ধারাবাহিকতায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দানাদার খাদ্যশস্যের লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার কোটি সাত লাখ ১৪ হাজার টন। উৎপাদন হয়েছে চার কোটি ১৩ লাখ ২৫ হাজার টন। আর এতে দানাদার খাদ্যেও দেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। যা ২০০৬ সালে দেশে দানাদার খাদ্যের উৎপাদন ছিল দুই কোটি ৬১ লাখ ৩৩ হাজার টন। এক ও দুই ফসলি জমিগুলো অঞ্চল বিশেষে প্রায় চার ফসলি জমিতে পরিণত করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে ফসলের নিবিড়তা ২১৬ ভাগ।
২০০৬ সালে নিবিড়তা ছিল ১৮০ ভাগ। বর্তমানে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। লবণাক্ততা, খরা, জলমগ্ন সহনশীলতা ও জিংক সমৃদ্ধ ধানসহ এখন পর্যন্ত ১০৮টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা আরও এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। ধারাবাহিকভাবে এ সাফল্যের কারিগর এ দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা সাধারণ কৃষক। আর কৃষকের নেপথ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) আবিষ্কৃত অধিক ফলনশীল নতুন জাতের ধান। এসব ধান চাষ করে কৃষকের মুখে আজ ফুটেছে হাসি। বছরের পর বছর চাষাবাদের জমি কমলেও ধান উৎপাদনে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। আর লক্ষ্যে পৌঁছতে প্রতি বছর ১২০ টনের বেশি বীজ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) থেকে কৃষকের মাঝে সরবরাহ করা হয়।
সঠিকভাবে প্রকৃত কৃষকের মাঝে সরবরাহ করা হলে ২০২১ সালের মধ্যে ৩৭ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদন করা যাবে, যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।ধান গবেষকরা অক্লান্ত পরিশ্রমে ৯৪ ধরনের ধানের বীজ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ৬টি হাইব্রিড জাত।প্রতি বছর ১২০ টনের বেশি বীজ ব্রি থেকে এক হাজার লাইসেন্সধারী ডিলারের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। ডিলাররা যদি সঠিকভাবে প্রান্তিক পর্যায়ে প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে তা সরবরাহ করেন এবং দেশে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি না হয়, তাহলে ২০২১ সালের মধ্যে শতকরা ১০ ভাগ চাল বেশি উৎপাদন হবে। বর্তমানে আমরা ৩৭ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদনের টার্গেট নিচ্ছি। তবে সব মিলিয়ে ৩ কোটি ৭০ লাখ টন চাল উৎপাদন করা সম্ভব। বাংলাদেশ শুধু ডিজিটালের দিকেই এগোচ্ছে না, খাদ্য উৎপাদনসহ কৃষিতেও এগিয়ে যাচ্ছে তাল মিলিয়ে। বহুমুখী সমস্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেও এ খাতে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। অল্প সময়েই খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য এনেছেন দেশের কৃষকরা। ধান উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ।
এরই মধ্যে চাল রপ্তানি করে বাংলাদেশ ছুঁয়েছে আরেকটি মাইলফলক। কৃষির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জীবিকার ধারা। নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনে অর্থনীতির নতুন এক দিগন্ত দেখছেন দেশবাসী। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার জ্বলন্ত উদাহরণ হলো, গত বছর শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের ৫০ হাজার টন চাল রপ্তানি করা হয়। ধারাবাহিকভাবে এ সাফল্যের কারিগর এ দেশের লাখ লাখ সাধারণ কৃষক। কৃষকের শ্রম, কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকি, কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণা ও সরকারের সদিচ্ছায় ধান চাষ ও চাল উৎপাদনের এ রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ।
এ পর্যন্ত ব্রি ৬টি হাইব্রিড ও ৮৮টি উচ্চ ফলনশীলসহ মোট ৯৪টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে রোপা আমন মৌসুমের জন্য ৩৫, বোরো মৌসুমের জন্য ৩৫, রোপা আউশ মৌসুমের জন্য ৪, বোনা আউশ মৌসুমের জন্য ৭, রোপা ও বোনা আউশের উপযোগী ১ এবং বোরো আউশ মৌসুমে চাষ উপযোগী ১২টি জাত রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আমন মৌসুমে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধান বিআর-১১ ও বোরো মৌসুমে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্রি ধান ২৮ ও ২৯। এ ছাড়া প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীলতা ও পুষ্টিগুণ বিচারে ৭২টি হাইব্রিড জাতের মধ্যে ৮টি লবণ-সহনশীল, ২টি জলমগ্নতাসহিষ্ণু, ২টি ঠাণ্ডাসহিষ্ণু, ২টি খরা-সহনশীল ও ২টি খরাপরিহারী, ৩টি জিংক সমৃদ্ধ এবং সুগন্ধি ও রপ্তানি উপযোগী ৪টি ধানের জাত রয়েছে।
১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত এবং ধান উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে ব্রি। গত ৪৬ বছরে ধান উৎপাদন তিনগুণের বেশি বেড়েছে। ফলে ধান গবেষণায় ব্রি সারা বিশ্বে অর্জন করেছে খ্যাতি। বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। সরকার ব্রিকে বিভিন্নভাবে তদারক করছে। ব্রির গবেষকদের মেধা ও কৃষকের শ্রম কাজে লাগানোয় এসেছে সাফল্য।
সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মৌসুম ও পরিবেশ-উপযোগী উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ধানের জাত এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ফসল, মাটি, পানি, সারসহ নানা কলাকৌশল উদ্ভাবন করছে। ব্রি উদ্ভাবিত ধানের জাত দেশের মোট ধানি জমির ৮০ ভাগে চাষাবাদ করা হচ্ছে। আর এ থেকে পাওয়া যাচ্ছে মোট উৎপাদনের ৯০ ভাগ। প্রতিষ্ঠানটি গবেষণার মাধ্যমে এ পর্যন্ত উদ্ভাবন করেছে ৯৪টি ধানের জাত। বাংলাদেশ বিশ্বের ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ হলেও এখানকার হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৪.২ টন।
চীন, জাপান ও কোরিয়ায় এ ফলন হেক্টরপ্রতি ৬ থেকে সাড়ে ৬ টন। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ধানের ফলন বাড়ানোর বিষয়টি ভাবনায় এনে সনাতন জাতের ধান এবং মান্ধাতা আমলের আবাদ পদ্ধতি ছেড়ে উফশী ধান ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলা হচ্ছে।

সর্বশেষ সংবাদ