সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর বহুমাত্রিক পরিবর্তন মো.ওসমান গনি.লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট

পোস্ট করা হয়েছে 26/11/2018-09:15pm:    আর মাত্র কিছুদিন পরই (৩০ডিসেম্বর)দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন।এ নির্বাচন নিয়ে দেশে ও বিদেশের মানুষের কাছে একটা সংশয় ছিল নির্বাচনটা কেমন হবে?নির্বাচনে দেশের সব রাজনৈতিক দল অংশ গ্রহন করবে কিনা এমনটাই ধারনা ছিল বেশী ভাগ মানুষের।তবে মানুষের ধারনা পাল্টে দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো দেশের স্বার্থে ও নিজের দলের স্বার্থে সম্মিলিতভাবে সবাই অংশ গ্রহন করছে।আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থী তালিকাও প্রকাশ করছে।হয়তো আগামী দুই/একদিনের মধ্যে ঐক্যফ্রন্টও তাদের প্রার্থী তালিকা ঘোষনা করবে।তবে সব রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহন করলেও এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির বহুমাত্রিক পরিবর্তন ঘটছে। পাল্টাচ্ছে ভোটের অঙ্কও। বিশেষ করে ভোট এলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সুবিধাজনক ব্যবহার ও চেতনার পক্ষ-বিপক্ষ দাঁড় করিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার হীনপ্রবৃত্তি এবং যত্রতত্র ধর্মের নগ্ন ব্যবহার এবার তেমন একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। পাশাপাশি আগের নির্বাচনগুলোতে যে হারে ভারতবিদ্বেষী প্রচারণা চালানো হতো, রাজনৈতিক দলগুলো সে প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে এসেছে। এর ফলে রাজনীতিতে গুণগতও পরিবর্তন আসছে। এর মধ্য দিয়ে রাজনীতির অঙ্কে যেমন নতুন ধারা তৈরি হচ্ছে তেমনি নির্বাচনী সংস্কৃতিতেও আসছে নতুন ভাবনা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগের নির্বাচনগুলোতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতিতে স্পষ্টত দুটি মেরু ছিল। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ বরাবরই জামায়াত ও অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রচারণায় এগিয়ে থাকতো। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে জামায়াত অন্তর্ভুক্ত থাকায় বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মেরুরই দল হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিএনপির বিরুদ্ধে সে বদনাম কিছুটা ঘুচেছে।
জামায়াতকে অবাঞ্ছিত করে গড়ে ওঠা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়ে কার্যত জামায়াত বা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক হাল্কা করেছে বিএনপি। তাদের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে জামায়াত থাকলেও দলটি ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন হারিয়ে অনেকটাই ‘অচ্ছুত’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দলটি তার প্রতীকও হারিয়েছে এর মধ্যে। গোপনে জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি থাকলেও রাজনীতির মাঠে তারা তেমন একটা সুবিধা করতে পারছে না। কারণ এরই মধ্যে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দলটির কয়েকজন শীর্ষনেতার ফাঁসি হয়েছে। নতুন প্রজন্মের ভোটাররা চিহ্নিত এ দলটির সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করছে না।
বিশ্লেষকরা এর সব কৃতিত্বই দিচ্ছেন আওয়ামী লীগকে। জামায়াতের বিরুদ্ধে দলটির অবস্থান, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে জামায়াতকে জনগণের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার কাজটি তারা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। ফলে অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে যে কোনো জোট করতে গেলে প্রথমেই ভাবতে হচ্ছে, জামায়াত বা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোনো শক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে কি না। কেউই আর এ কাজটি সচেতনভাবে করতে চায় না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এটা এক ধরনের বিজয়ও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নতুন প্রজন্মের ভোটাররাও জামায়াতের প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত সংঘটিত বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামেও জামায়াত-শিবির ছিল স্পষ্টতই ‘অবাঞ্ছিত’। যদিও গোপনে গোপনে জামায়াত-শিবির আন্দোলন সংগ্রামগুলো নিয়ে নানা রাজনীতি করার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মূলত, নতুন প্রজন্মের ভোটারদের মনোভঙ্গি বুঝতে পেরেই বিএনপি কৌশলে জামায়াত থেকে নিজেদের মুক্ত করছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। যদিও ভোটের মাঠের হিসাব মাথায় রেখে এখনও বিএনপি জামায়াতকে তার জোট থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি। জামায়াতকে রেখে ২০ দলীয় জোটের বাইরে পৃথক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তোলায় বিএনপির শীর্ষনেতা ও বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে জামায়াত অবাঞ্ছিত হওয়ায় এ জোটের নেতাকর্মীদের ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ বলেও আখ্যা দিতে পারছে না আওয়ামী লীগ। কোনো কোনো আওয়ামী লীগ নেতা ঐক্যফ্রন্টকে ‘জামায়াতপন্থী’ বলে দুয়েক কথা বললেও রাজনীতির মাঠে তেমন একটা সুবিধা করতে পারছে না তারা। কারণ জামায়াত প্রশ্নে ঐক্যফ্রন্টে গণফোরামসহ অন্য দলগুলো দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। জোটটি গঠনের আগে ঐক্যফ্রন্ট থেকে বিএনপিকে সাফ বলে দেওয়া হয়েছিল, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেই তাদের জোটে আসতে হবে। যদিও কৌশলগত কারণে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক একেবারেই ছিন্ন করতে পারেনি। তবে জামায়াতকে ছাড়াই তারা ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে বিএনপিসহ অন্য দল নির্বাচনে আসার ঘোষণা দেওয়ার পর জামায়াত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলে এই জোটের বিরুদ্ধে প্রচারণায় তেমন একটা সুবিধা করতে পারছে না আওয়ামী লীগ। বিএনপিও এর পূর্ণ সুবিধা নিচ্ছে।
অন্যবার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ধর্মভিত্তিক দলগুলো রাজনীতির মাঠে ধর্মকে ব্যবহার করে নির্বাচনী ফায়দা লোটার চেষ্টা করত। এবার সে পরিস্থিতিও পাল্টেছে। কারণ জামায়াত ছাড়া অধিকাংশ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ শিবিরে সম্পৃক্ত হয়েছে। সর্বশেষ চরম আওয়ামী লীগবিদ্বেষী হেফাজতে ইসলামও ভিড়েছে আওয়ামী শিবিরে। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলাম রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল জনসভা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মূলত, ধর্মনিরপেক্ষ দল আওয়ামী লীগকে ধর্মাশ্রয়ী দলে পরিণত করেছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, যে যা-ই মন্তব্য করুক না কেন, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ‘ধর্মবিরোধী’ দল হিসেবে প্রচারণার সুযোগ একদমই মাঠে মেরে দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৬ থেকে শুরু করে প্রতিটি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতের প্রচারণা ছিল-দলটি ধর্মবিরোধী। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশের মসজিদে মসজিদে আজানের পরিবর্তে উলুধ্বনি হবে। দেশ ভারতের প্রদেশে রূপান্তরিত হবে ইত্যাদি। আওয়ামী লীগ টানা ১০ বছরের ক্ষমতাকালে ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো ধরনের বক্তব্যকেই প্রশ্রয় দেয়নি।
উপরন্তু ইসলামের নামের সমালোচনা করে লেখালেখির অভিযোগ ওঠায় বেশ কিছু লেখক-ব্লগারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে তাদের। এমনকি জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে ব্লগার হত্যাকেও আওয়ামী লীগ প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়ে গেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন অনেকে। শত সমালোচনার পরও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উন্নয়ন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের মডেল মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের মতো বড় প্রকল্পও হাতে নিয়েছে দলটি। এত দিন ধরে অবহেলিত ও নিগৃহীত কওমি ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির মর্যাদা দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সহানুভূতি আদায় করেছেন তারা। ফলে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আর ধর্মকে ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে না বিএনপিসহ অন্য ধর্মভিত্তিক দল।
ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপির বিরুদ্ধে যেমন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি বলে তোলা অভিযোগ ধোপে টিকছে না তেমনি আওয়ামী লীগকেও ইসলাম ধর্মবিদ্বেষী দল হিসেবে প্রচারণার জায়গা পাচ্ছে না বিএনপি। শুধু তাই নয়, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট দল বলেও প্রোপাগান্ডা চালাতে পারছে না বিএনপি-জামায়াত। অন্যবার নির্বাচনে ভারতের হস্তক্ষেপ, আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের পক্ষপাত, ইত্যাদির অভিযোগ তোলা হতো। এসব প্রচারণা ভোটের মাঠে ‘হট কেকের’ মতো চলত। কিন্তু এবার বিএনপি এ ধরনের প্রচারণা থেকে একেবারেই দূরে রয়েছে। উপরন্তু নির্বাচনে নিজেদের পক্ষে ভারতের সমর্থন বাগাতে নানা ধরনের চেষ্টা-তদবির চালাচ্ছে। কিছুদিন আগে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল গিয়ে সাক্ষাৎ করে এসেছে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির উচ্চপদের নেতাদের সঙ্গে। ভারতও দেশের চলমান নির্বাচনী পরিবেশকে যথেষ্ট স্বাস্থ্যকর ও গণতান্ত্রিক বলে মনে করছে। এ দেশে ভারতবিরোধী জনমনস্তাপ যেন কোনোভাবেই উসকে না ওঠে এবং সেটা যেন কোনো রাজনৈতিক দলকে ফায়দা লুটার সুযোগ না দেয়, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ রয়েছে ভারত-এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।

সর্বশেষ সংবাদ