জিবরান কাহলিলের গল্প ও অন্যান্য- কামরুল হাসান বাদল,লেখক,কবি ও সংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 26/11/2018-12:13pm:    তোমারে বধিবে যে, গোকূলে বাড়িছে সে। একটু কঠিন হয়ে গেল সাধারণ পাঠকদের জন্যে। এর ব্যাখ্যা পরে দিচ্ছি, আগে আরেকটি বলি- ডিমকে বলছে মুরগির ছানা, আরে দোস্ত তোমারে তো দেহি পোছ (পোচ) বানাইয়া ফালাইছে -হি - হি- হি। শুনে ডিম বলছে, ‘আমারে তো পোছ বানাইছে কটা দিন সবুর লও, দেহনা তোমারে কেমন চিকেন রোস্ট বানায়। যারা এখনও ধরতে পারেননি কী বলতে চাইছি, তাদের জন্যে আরেকটি গল্প।
নিজেদের রাজ্য ছেড়ে দু’বন্ধু বেরিয়ে পড়ল শান্তির খোঁজে। এমন যেতে যেতে একদিন তারা উপস্থিত হলো এক আজব রাজ্যে। তারা দেখতে পেল সেখানে সব কিছু সস্তা। এমন কি তেলের দামেই ঘি বিক্রি হয়। প্রথম বন্ধু তা দেখে মুগ্ধ। দ্বিতীয় বন্ধুকে বলল, ‘দোস্ত এমন দেশতো আর হয় না। তেলের দামে ঘি। এ রাজ্যে থেকে যাবো, তেলের বদলে ঘি খাব শুধু। দ্বিতীয় বন্ধু বলল, ‘মাথা খারাপ যে দেশে তেলও ঘিয়ের দাম একই সে দেশে আমি থাকব না। এ দেশে কোনো আইনশৃঙ্খলা নেই। ভালোর মূল্য নেই। প্রথম বন্ধু নাছোরবান্দা সেই থাকবেন আর দ্বিতীয় বন্ধু থাকবে না। শেষে প্রথম বন্ধু বলল, তাহলে আমি থেকে যাই তোমার না পোষালে যাউগা।’ প্রথম বন্ধু চলে গেল অন্য রাজ্যে। এদিকে তেলের দামে ঘি পেয়ে খেয়ে খেয়ে প্রথম বন্ধু দিন দিন প্রশস্ত হতে থাকল। এভাবে দিন যায়। হঠাৎ সে রাজ্যে একটি খুনের ঘটনা ঘটল। কিন্তু খুনিকে পাওয়া গেল না কোনো ভাবেই। রাজাতো রেগে-মেগে আগুন। আমার রাজ্যে খুন হবে আর বিচার হবে না। উজির-নাজির আমাত্য বর্গ ঘেমে নেয়ে একসা। কী আর করা, যে কাউকে তো শাস্তি দিতে হবে। শেষে সিদ্ধান্ত হলো রাজ্যের সব চেয়ে মোটা ব্যক্তিটিকে ধরে এনে শূলে চড়ানো হবে। রাজ্যে খোঁজ পড়ে গেল মোটা মানুষের। শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল ওই প্রথম বন্ধু যে খেয়ে দেয়ে বেশ মোটা তাজা হয়েছিল। তাকে ধরে আনা হলো শূলে চড়ানোর জন্যে। এদিকে দ্বিতীয় বন্ধু অনেক দিন পরে বন্ধুর খোঁজ নিতে এসে দেখে এই কাণ্ড। অনেক ফন্দি ফিকির করে প্রথম বন্ধুকে বাঁচাতে সক্ষম হয় সে।
এবার শেষ গল্পটি বলি। এটি জিবরান কাহলিলের। পাহাড়ের উপত্যকায় মা মেষ তার শাবকদের নিয়ে খাদ্য অন্বেষণ করছিল। এমন সময় মা মেষ খেয়াল করল একটি বাজপাখি উড়ে আসছে তার শাবকদের দিকে। সে তার শাবকদের আগলাতে আগলাতে খেয়াল করল আর একটি বাজপাখি এসে প্রথম পাখিটিকে বাধা দিচ্ছে। এ নিয়ে দু পাখির মধ্যে লেগে গেল তুমুল যুদ্ধ। শাবকরা মাকে বলছে তখন। মা ওরা দুজন কি আমাদের খেয়ে ফেলতে আসছে। শুনে মা বলল, বাছা তোমরা এখনও বুঝতে পারছো না এদের মধ্যে কে তোমাদের খেতে আসছে আর কে রক্ষা করতে আসছে।
প্রিয় পাঠক প্রতি সপ্তাহে রাজনীতি নিয়ে না লিখে আজকে শুধু কাহিনী ও কাহিনীর অংশ বিশেষ শোনালাম। তবে হ্যাঁ, লেখা কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রতিটি কাহিনীর মধ্যে একটি শিক্ষনীয় বিষয় থাকে, আজকে অন্তত সে টুকুই আলোচনা করি। উল্টো দিক থেকে আসি।
জিবরানের গল্প-বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অনেকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্ল্য করেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলছি তারা মেষ শাবকদের মতো বুঝতে পারছে না কোন বাজ পাখিটি তাদের গ্রাস করতে চায়। আর কোনটি তাদের বাঁচাতে চায়।
দু বন্ধুর গল্প যে দেশে তেল ও ঘি অর্থাৎ ভালো-মন্দের একই ফল সে দেশ বাসযোগ্য নয়। সে দেশে কোনো বিচার নেই। ভালো-মন্দ সত্য-মিথ্যা যাচাই করার ক্ষমতা থাকে না জনগণের। তারা বোকা। মন্দ লোকের কথায় তারা সহজে বিভ্রান্ত হয়। মন্দরা দেশ শাসনের সুযোগ পায়। গুণীরা কদর পায় না। নায়কেরা পরাস্ত হয় ভিলেনের কাছে। ডিম ও মুরগি ছানার গল্প-অনেক কিছু মিলে বর্তমান সরকার একটু বেকায়দায় পড়েছে। বিশেষ করে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার কার্যক্রম হাতে নিয়ে। সামাজিক-রাজনৈতিক বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে বেশ পোক্ত হওয়া জামায়াতের নেতাদের বিচার খুব সহজ সাধ্য নয় তা এখন টের পাচ্ছে সরকার। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বহুবিধ চাপের মধ্যে এই বিচার কাজ চালাতে হচ্ছে। এর মধ্যেও অনেক ভাবে এই বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ার পরপর জামায়াত-শিবির নৈরাজ্য ও ধ্বংস লীলা চালিয়েছে দেশে। সরকারের মেয়াদ শেষে তারা এখন অসম্ভব বেপরোয়া। গত ৬০ ঘণ্টার হরতালে ব্যাপক বোমাবাজি করা হয়েছে দেশজুড়ে। ট্রাইব্যুনালের বিচারক থেকে শুরু করে সাক্ষী ও সমর্থক এমন কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় ও কর্মীদের ওপরও বোমা হামলা ও আক্রমণ পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও আক্রমণের শিকার হচ্ছে আওয়ামী, যুব ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে মৃত্যুবরণও করেছে অনেকে। অনেককে না পেয়ে তাদের বসত বাড়িতেও আগুন দেওয়া হচ্ছে। মোট কথা সরকারের শেষ সময়ে এসে জামায়াত-শিবির কর্মীরা বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ওপর। এ পরিস্থিতিতে নিরাপদ দূরত্বে থেকে কিছু কিছু ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপহাস করছেন। যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবি করতেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিলম্ব হচ্ছে বা করছে বলেন সরকার তথা আওয়ামী লীগকে গালাগাল করতেন তাদের উদ্দেশ্যে পোচ করা ডিমের ভাষায় বলি, এবার ক্ষমতায় গেলে লীগের ছেলেদের হয়ত পোচ করা হবে ঠিকই কিন্তু অন্যদের যে চিকেন ফ্রাই হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে হবে সে কথাটি বলে রাখি।
প্রথম উদ্ধৃতি যা বহুল প্রচলিত তা নিয়ে বিশদ বলতে হয়। বর্তমান বিএনপির কর্মকাণ্ড ও কর্মসূচি দেখে মনে হয় এই দলটি স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে পারছে না। কোথাও কোনো শক্তির কাছে এর দায়বদ্ধতা আছে। আজকাল এই দলের কর্মসূচিতে জঙ্গিরূপে অংশ নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির। তাদের বিশেষ সর্বশেষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশ মঞ্চ নির্মাণ থেকে শুরু করে এর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিল ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মীরা। এমনকি সমাবেশের প্রথম বক্তাও ছিলেন শিবিরের এক নেতা। সে সমাবেশে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও শাস্তিপ্রাপ্ত জামায়াতের সকল নেতার মুক্তি দাবি সম্বলিত সচিত্র ব্যানার ফেস্টুন শোভা পেলেও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আবদুল আলিমের মুক্তি বা তাদের নিয়ে কোনো ব্যানার ফেস্টুন দেখা যায়নি। বিএনপি বা ছাত্রদলের কর্মী সমর্থকদের কখনও বেপরোয়া আচরণ করতে দেখা যায় না। অথচ গত এক বছর ধরে বিরোধী দলের আন্দোলন সংগ্রামে বেশ ধ্বংস নৈরাজ্য দেখা গেছে। অভিজ্ঞ মহলের মতে এসবের সাথে জড়িতদের অধিকাংশই জামায়াত-হেফাজতের কর্মী। বিএনপি বা ছাত্রদলের নয়। ছাত্রদলের রাজনীতি যারা পর্যবেক্ষণ করেছেন তারাও এর সাথে একমত পোষণ করবেন বলেই আমার ধারণা। অর্থাৎ এক সময়ের মধ্য পন্থার দল বা মডার্ন ইসলামিক দল বিএনপি এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অতি মাত্রায় নির্ভর করছে এই ধরনের জঙ্গি ও চরমপন্থী দলের উপর। যা আখেরে বিএনপিরই সর্বনাশ ডেকে আনবে।
যে শক্তি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। বাক স্বাধীনতা বা অন্যের মতামতকে সহ্য করে না। নারী স্বাধীনতা ও জাগরণে বিশ্বাসী নয় তেমন একটি শক্তির সাথে গাঁটছড়া বেধে বিএনপি কতদূর যেতে পারবে। এই শক্তিতো নারী নেতৃত্বেও বিশ্বাসী নয়। নারী শিক্ষায় তো নয়-ই।
আজ ক্ষমতায় না থেকেও দেশব্যাপী এদের যে তাণ্ডব, এদের সাথে জোটগতভাবে ক্ষমতায় গেলে বিএনপি রাশ টেনে রাখতে পারবে? না কি এদের গর্ভেই বিলীন হয়ে যাবে একদিন। কিন্তু বিএনপির মতো বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল কেন এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। দেশের মধ্যপন্থার বিশাল একটি জনসমর্থন রয়েছে এ দলটির প্রতি। দুবার তারা গণতান্ত্রিক পর্যায়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায়ও গেছে। এ কথাগুলোও আজ লিখতাম না যদি না খালেদা জিয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর সাথে দেখা করে বাংলাদেশে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গিদের আশ্রয় না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি না দিতেন। বলতাম না যদি তিনি অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না বলে প্রতিশ্রুতি না দিতেন। যদি না তিনি তাঁর সন্তান তারেকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত জঙ্গি কানেকশানের সংবাদকে মিথ্যা না বলতেন।
আসলে বলা উচিত ছিল, ‘তোমারে বধিবে যে, জোটেই বাড়িছে সে।’ ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর আজাদীতে প্রকাশিত লেখা। এখনো প্রাসঙ্গিক মনে হলো।

সর্বশেষ সংবাদ