আত্মহত্যা হত্যার হার বেড়ে চলছে মো.ওসমান গনি.লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট

পোস্ট করা হয়েছে 25/11/2018-10:20am:    ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহত্যা মহাপাপ।মানুষ কখন আত্মহত্যা করে থাকে? যখন সমাজের কোনো ব্যক্তি তার বিবেক, বুদ্ধিমত্তা বা বিচার বিবেচনা হারিয়ে ফেলে তখন সে নিজেকে হত্যা করে। নিজেকে হত্যা করাই আত্মহত্যা। আত্মহত্যা এক অর্থে আত্ম খুন-নিজেকে নিজে খুন করা। আত্মহত্যা বলতে এমন এক ধরনের মৃত্যুকে বুঝায় যেখানে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় বা নিজের হাতে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়। এটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হতে পারে।
কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা করে না বরং বিভিন্ন সামাজিক ঘটনা ব্যক্তির আত্মহত্যা করার প্রবণতাকে প্রভাবিত করে। ফরাসি সমাজ বিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম তার বিখ্যাত ‘The Suicide’ গ্রন্থে আত্মহত্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, আধুনিক সমাজে বিভিন্ন সামাজিক সংহতির ভিত্তিতে আত্মহত্যা লক্ষ্য করা যায়। তার মতে, আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তিগত, মানসিক, বংশগত, ভৌগোলিক বা দৈহিক কারণে ঘটে না বরং সামাজিক সংহতির মধ্যে নিহিত থাকে। তিনি মনে করেন, আত্মহত্যা হচ্ছে যান্ত্রিক সংহতির নেতিবাচক ফলশ্রুতি।
বিগত কয়েক মাস ধরে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে হঠাৎ করে বেড়ে গেছে আত্মহত্যার প্রবণতা। পত্রিকার পাতা উল্টালেই কমবেশি প্রতিদিনই আত্মহননের নিষ্ঠুর সংবাদগুলো পাওয়া যায়। সমাজ বিশ্লেষক ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যখন কোনো ব্যক্তির জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক ও উপলব্ধি-অনুধাবন শক্তি লোপ পায়, নিজেকে অসহায়-ভরসাহীন মনে করে, তখনই ধর্ম-কর্ম ভুলে মানুষ আত্মহত্যা করে বসে। প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপও আত্মহত্যার পেছনে কাজ করে। আবার জাগতিক দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে আত্মরক্ষা করতে দুর্বল চিত্তের ব্যক্তিরা আত্মহননের মধ্য দিয়ে মুক্তি খোঁজে।
বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার প্রবণতা দিন দিন উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। আত্মহত্যার ওপর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চল, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো এবং জাপানে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি (লাখে পঁচিশের ওপরে)। গত ৫০ বছরে সারা পৃথিবীতে, মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আত্মহত্যার হার শতকরা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। সারা পৃথিবীর যত মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করে, তার মধ্যে ২.০৬ শতাংশ বাংলাদেশি। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রতি লাখে ১২৮.০৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতিবছর এ সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন মানুষ আত্মহত্যা করে।
অ্যা সোর্স ফর মিডিয়া প্রফেশনালস ২০১৭’-এ বলা হয়, প্রতি বছর বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে একটি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০২০ সালে এ সংখ্যা প্রতি ২০ সেকেন্ডে একজনে পৌঁছবে। একই প্রকাশনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যা আরও বলছে, গত ৪৫ বছরে আত্মহত্যার ঘটনা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বে বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হল আত্মহত্যা। হু’র চলতি বছরের আগস্ট মাসের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বে যত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে এর মধ্যে নিম্ম ও নিন্মমধ্যম আয়ের দেশেই ৭৯ শতাংশ ঘটছে। ১৯৯০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ভারতে আত্মহত্যা বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। আর চীনে গত ত্রিশ বছরে বেড়েছে ত্রিশ শতাংশ।
বাংলাদেশেও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। পুলিশ সদর দফতরের হিসেব অনুযায়ী শুধু ২০১৭ সালেই বাংলাদেশে আত্মহত্যা করেছিল ১১ হাজার ৯৫ জন। গড় হিসেবে দাঁড়ায় দিনে ৩০ জন। এ সংখ্যা ২০১৬ সালে ছিল ১০ হাজার ৬শ’ এবং ২০১৫ সালে ছিল ১০ হাজার ৫শ’ জন। তবে আত্মহত্যার চেষ্টা করে এর চেয়ে আরও ১০ গুণ বেশি।
বর্তমানে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মাদক, প্রেমে ব্যর্থতা, পারিবারিক কলহ, অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে তরুণ-তরুণীরা বেশি হারে আত্মহত্যা করছেন। আত্মহত্যার দুটি ধরন আছে পরিকল্পিতভাবে এবং আবেগতাড়িত হয়ে আত্মহত্যা। বাংলাদেশে অধিকাংশ তরুণ-তরুণীদের আত্মহত্যার ঘটনা আবেগতাড়িত। হতাশা, প্রেমে ব্যর্থ, পরীক্ষার ফল খারাপ, বাবা মায়ের সঙ্গে ঝগড়াসহ ছোটখাটো বিষয়েই আবেগতাড়িত হয়ে অনেকে আত্মহননের পথ বেছে নেন। নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি। এ পেছনে রয়েছে আমাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা, নির্যাতন, ইভটিজিং, যৌতুক, সম্ভ্রমহানি, অবমাননা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা ইত্যাদি। শহর বা গ্রাম নয় আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি কম হয় অঞ্চলভেদে। আত্মহত্যার উপকরণের সহজলভ্যতা আত্মহত্যার একটি বড় কারণ। আবার আত্মহত্যার ঘটনা প্রচার হলে বা কেউ প্রত্যক্ষ করলে অনেকের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
মনোচিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা আত্মহত্যা করেন তাদের ৯৫ ভাগই কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভোগেন। এ মানসিক রোগের সঠিক চিকৎসা করা গেলে আত্মহত্যা কমবে। মাদকাসক্তি আত্মহত্যা প্রবণতার জন্য একটি বড় কারণ। তাই মাদকাসক্তদের সঠিক চিকিৎসা এবং মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া দরকার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) হিসাবে, ১৫-৪৪ বছর বয়সি জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হল আত্মহত্যা। ডাব্লিউএইচও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রতি বছর সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মঘাতী হবেন। আত্মহত্যার চেষ্টা চালাবেন এর কমপক্ষে ১০ থেকে ২০ গুণ মানুষ।
মানসিক রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি থাকে, যেমন- বিষণ্ণতা, বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, মাদকাসক্ত, উদ্বেগে আক্রান্ত ইত্যাদি রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার উচ্চ। বিষণ্ণতার রোগীদের মধ্যে এক ধরনের তীব্র আশাহীনতা তৈরি হয়। দুনিয়ার সবকিছু তারা নেতিবাচকভাবে দেখে। তারা নিজের সম্পর্কে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ও অন্য মানুষ সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা পোষণ করে। তারা ভাবে, এ পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হবে এবং এটি পরিবর্তনের জন্য শত চেষ্টায়ও কোনো লাভ হবে না। এর চেয়ে মুক্তির একমাত্র উপায় নিজেকে মেরে ফেলা। এ চিন্তায় তাড়িত হয়ে তারা আত্মহত্যা করে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে আত্মহত্যার হার বেড়ে যায়। সমাজে যখন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যখন মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগে, তখন আত্মহত্যার হারও যায় বেড়ে।
অনেকে আবার বাধ্য হয়েও আত্মহত্যা করে যেমন,বন্দিশিবিরের তীব্র নির্যাতন সইতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যা করেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীরা অনেক সময় আত্মহত্যা করে। অসুখের তীব্র যন্ত্রণা সইতে না পেরে অনেকে এ পথ বেছে নেয়।
বাংলাদেশে পরিচালিত এক গবেষণায় পারিবারিক সমস্যা (৪১.২%), পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া (১১.৮%), বৈবাহিক সমস্যা (১১.৮%), ভালোবাসায় কষ্ট পাওয়া (১১.৮%), বিবাহবহির্ভূত গর্ভধারণ ও যৌন সম্পর্ক (১১.৮%), স্বামীর নির্যাতন (৫.৯%) এবং অর্থকষ্ট (৫.৯%) থেকে রেহাই পেতে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ বিষণ্ণতায় ভুগছেন। আর বাংলাদেশে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থাৎ ৭৪ লাখেরও বেশি। বিগত দশ বছরে বিশ্বব্যাপী এ রোগের ব্যাপকতা বেড়েছে ১৮ শতাংশ। শুধু বিষণ্ণতার কারণে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন।
নানা কারণে একজন মানুষের মধ্যে বিষণ্ণতা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক কলহের কারণেই সবচেয়ে বেশি মানুষ বিষণ্ণতা, একাকিত্ব কিংবা মানসিক রোগে আক্রান্ত হন। যেমন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি হলে, বিশ্বাস না থাকলে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কেউ অন্য কোনো নারী-পুরুষে আসক্ত হলে মানসিক অশান্তি থেকে রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের পরিবারের ছেলে-মেয়েরাও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
ভঙ্গুর পরিবারের সদস্যরা সামান্য কারণে আত্মহননের পথ বেছে নেন। এছাড়াও হতাশা, জীবনের আনন্দ হারিয়ে ফেলা, বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগ। সমস্যা সমাধান করার ক্ষমতা কমে যাওয়া, ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া যা আগে ছিল এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা ও ভূমিকা পালন করে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অন্যদের বোঝা হওয়ার অনুভূতি অনেক সময় আত্মহত্যার কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ নানা কারণে বিষণ্ণতায় ভুগছেন। আমাদের মোট জনসংখ্যার হিসাবে বিষণ্ণতায় ভুগছেন এমন লোকের সংখ্যা ৭২ লাখ। কাজেই এ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেই হবে। মানসিক অশান্তি, একাকিত্ব বা বিষণ্ণতার কারণে আত্মহত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে।
প্রত্যেক আত্মহত্যাকারীই মৃত্যুর আগে একজন মানসিক রোগী হন। জাতীয় মানসিক ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিভিন্ন মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষ শতকরা ১৬ শতাংশ। আমাদের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি হিসাব করলে সেই সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ। দুই কোটিরও বেশি মানসিক রোগে আক্রান্তের চিকিৎসার জন্য মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন মাত্র ৩০০-এর কিছু বেশি। যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে সবার চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাটা বেশ দুরূহ। সবার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। ক্লিনিক্যাল সাইক্লোজিস্টসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।