‘আয় খুকু আয়’-রোকসানা বন্যা,লেখক ,সংগঠক

পোস্ট করা হয়েছে 20/10/2018-12:08pm:    কাটে না সময় যখন আর কিছুতে। বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না, জানালার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা, মনে হয় বাবার মত কেউ বলে না, আয় খুকু আয়, খুকু আয়। আয়রে আমার সাথে গান গেয়ে যা, নতুন নতুন সুর নে শিখে নে, কিছুই যখন ভালো লাগবে তোর পিয়ানোয় বসে তুই বাজাবিরে। আয় খুকু আয়।’
সন্তানের শেষ আশ্রয়স্থল হলো মা, বাবা। আমরা বাবাকে আব্বা বলেই ডাকতাম। কিন্তু লিখতে গেলে বাবা শব্দটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। ছোট্ট একটা শব্দ বাবা, অথচ এর ব্যাপকতা বিশাল। ডাকটার মাঝেই যেন গভীর ভালোবাসা, নির্ভরতা, নিরাপত্তা লুকিয়ে থাকে। দুঃসময়ে বাবা সন্তানের পাশে থাকেন, বুকে চেপে রেখে সব কষ্ট ঘুচিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। বাবা তো বাবাই। বাবাকে আমার বটবৃক্ষের মতো মনে হয়। যার বিশালতা অনেক। বটবৃক্ষের ডালে তরতরিয়ে ওঠা যায়, দোল খাওয়া যায় নির্ভয়ে।এই ডালের শাখাপ্রশাখা বিস্মৃত হয়ে আমাদের ছায়া দিয়ে রাখতেন। এই পৃথিবীর রং, রূপ আলোর দর্শন বাবার কারণেই। সন্তানের জন্য পরিশ্রম করেছেন সব বাবা, যাতে সন্তান বেড়ে ওঠে প্রকৃত মানুষ হয়ে। একজন বাবা তার সব অর্জনটুকু প্রিয় সন্তানের জন্য উৎসর্গ করেন।
আমার বাবা আবু তাহের মো. সিদ্দিকুর রহমান ছিলেন একজন নিঃস্বার্থ সমাজসেবক। লামাবাজার সিটি করপোরেশন বালক উচ্চ বিদ্যালয় ও বলুয়ারদীঘি সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য। বিদ্যালয় দুটির প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তিনি স্কাউটের প্রশিক্ষক ছিলেন। আমৃত্যু মহল্লা কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। সমাজের যেকোনো শুভ উদ্যোগের সঙ্গে তিনি নিজেকে সংযুক্ত রাখতেন। আমাদের লেখাপড়ার ব্যাপারে বাবার তদারকি বেশি থাকতো। পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে বসে গল্পের বই পড়তেন তিনি। ঘরে বিনোদনের জন্য টেলিভিশন ছিলো না। কিন্তু প্রচুর বই থাকতো। আর একটা রেডিও ছিলো। আমাদের জন্য সেরা খাবারগুলো থাকতো সব সময়ে। মধ্যবিত্ত পরিবারে, শিক্ষিত পরিবার বলতে যা বুঝায় তার সবটুকু করার আপ্রাণ চেষ্টায় ছিলেন। বিশেষ করে মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোকে জীবনের সব ভেবেছিলেন। উদার মনের মানুষ ছিলেন আমার বাবা। গোড়ামি উনাকে কোনদিন স্পর্শ করতে পারেনি। সবসময়ে প্রতিবাদ করে আসতেন এসবের বিরুদ্ধে। এই জন্য নিন্দুকেরা অনেক কথায় বলে বেড়াতেন উনার আড়ালে। এসবের তোয়াক্কা করতেন না কোনদিন।
বাবা সাংস্কৃতিমনের মানুষ ছিলেন। প্রায়দিন উনি গানের আসর বসাতেন আমাদের বাড়িতে। বিশেষ করে বন্ধের দিনগুলোতে খুব গান বাজনা হতো বাড়িতে। জ্যোৎস্না রাতে পুকুরঘাটে পাটি বিছিয়ে বাবা গানের আসর বসাতেন। অনেক রাত পর্যন্ত চলতো এসব। শচীন দেব বর্মন এ সময়ে এই আসরে অনেকটা জায়গা করে নিতেন। জ্যোৎস্না রাতে শচীনের গান এ এক অসাধারণ মুহূর্ত। কতটুকু বুঝতাম জানি না। তবে ভালো লাগাগুলো জড়িয়ে থাকতো সে সময়ে।
বাবা নিজেও খুব ভালো গান করতেন। হেমন্ত, জগন্ময়মিত্র, শচীন দেব বর্মনের গান খুব পছন্দ করতেন। জগন্ময় মিত্রের চিঠি ‘তুমি আজ কতদূরে’ গানগুলো প্রায় প্রতিদিন শুনতেন। একটা গানের কথা আমার সবসময়ে মনে পড়ে। বাবা প্রায় সময়ে গুনগুনিয়ে গাইতেন, ‘কোন এক গাঁয়ের বধূর কথা শোন’ অসাধারণ লাগতো বাবার কণ্ঠে। এই গানটা আমার স্কুলের আর্ট কম্পিটিশনে, গানের সাথে স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ডে আঁকা শিখিয়ে দিলেন। প্রথম পুরস্কারটা আমারই হয়েছিলো। আমি আঁকতে জানতাম না। বাবাই আমাকে গ্রামের দৃশ্যে আঁকা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। স্কুলের এমন কোন প্রতিযোগিতা ছিলো না যেটাতে আমি নাই এমনটি কখনও করতে পারতাম না। সবখানেই বাবার ভয়ে নাম দিতে হতো।এই সবে বাবা খুব উৎসাহ দিতেন। স্পোর্টস, রবীন্দ্র, নজরুল জয়ন্তীতে, বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে, সিটি কর্পোরেশন স্কুলের আন্তঃজেলা স্কুল প্রতিযোগিতায়, গালর্সগাইড সবখানেই আমার অংশগ্রহণ থাকতো শুধু বাবার কারণেই। আমার ইচ্ছা, অনিচ্ছা কোন কাজ করতো না তখন। এসব করতে করতে একটা সময়ে আমি নিজেই স্বাচ্ছন্দ্যে অংশগ্রহণ করতাম। বাবা খুব খুশি হতেন। আমার সমবয়সী মেয়ে খুব কম ছিলো বাড়িতে। যারা ছিলো তারা তেমন খেলাধুলা করতো না। খেলাধুলা সব ছেলেদের সাথেই করতাম। বাবা কখনও এসবে বাধা দেয়নি। আমার বন্ধুরা খুব ভয় পেতো। কিন্তু বাবা বেশ আদর করতেন আমার বন্ধুদের। উনার কথা হলো, লেখাপড়া ঠিক রেখে সবকিছুই করতে হবে।
আমাদের ঘরের কিছু নিয়মের নমুনা ছিলো এ রকম। ভোর ছয়টা উঠে আমরা চার ভাইবোনকে প্রথমে গোসল করতে হতো। শীত বা গরম সব ঋতুতে। তারপরে পড়তে বসতে হবে।পড়ার মাঝে নাস্তা খাওয়ার ডাক পড়তো। খাওয়া শেষে স্কুলে যাবার জন্য তৈরি হওয়া। স্কুল কখনও মিস করা যেতো না। এমন কি সাইক্লোনের সময়েও। ও সময়ে স্কুলে গিয়ে দেখি কেউ আসেনি আমি ছাড়া। টিচাররা বুঝতে পারতেন বাবার ভয়ে হাজির হয়েছি। ঘন্টাখানেক বসিয়ে ছুটি দিয়ে দিতেন।নিয়মিত হাজিরার জন্য স্কুলে একটা পুরস্কার নির্ধারিত ছিলো। সেটা আমার জন্য বরাদ্দ থাকতো। স্কুল ছুটির পর কাপড় ছেড়ে গানের রেওয়াজে বসতে হতো।এসব একেবারেই বাধ্যতামূলক ছিলো।
আমার বিয়ের আগে পর্যন্ত দুটো সিনেমা দেখার অনুমতি পেয়েছিলাম। অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা। একটা বাবার সাথে, আরেকটা চাচা, চাচির সাথে। যৌথপরিবার ছিলো আমাদের। বাবার শাসন সব জায়গাতেই ছিলো। তখন বিনোদন বলতে সিনেমা দেখতো বড়রা। ওদের যাওয়াটা দেখতাম শুধু আমি।নিজে যেতে পারতাম না। বাবা, মা প্রতি সপ্তাহে সিনেমা দেখতেন। তখন নয়টা /বারোটা শো দেখতে যেতো বন্ধুদের সাথে নিয়ে। সেসময়ের পরিবেশটা অন্যরকম ছিলো।এতো রাতে মেয়ে নিয়ে সিনেমা দেখাটা এখন কল্পনা করতেও পারবে না কেউ। বাবা খুব গান পাগল মানুষ। রাতে ঘুমানোর সময়ে রেডিওতে গান শুনতেন। গল্পের বইয়ের নেশা ছিলো খুব।এখনও মনে পড়ে, নিহারঞ্জন গুপ্ত, সমরেশ মজুমদার, রবীন্দ্রনাথের বই সাজানো থাকতো তাকে। যত বড় হচ্ছি ততই উনার কথাগুলো, কাজগুলো মনের গভীরে অনুধাবন করতে পারছি। এই মানুষটার ভেতরে শিশুসুলভ একটা মন আছে।আমরা শুধু শাসনটাই দেখতাম।আদরটা বুঝতে পারতাম না তখন। বাবাকে দেখতাম আমার স্কুল সাপ্তাহিক ছুটির পর সাদা কেডসগুলো ধুয়ে চক ঘষে রোদে শুকাতে দিতো। জামাগুলো স্ত্রী করে রাখতো। দুটো সেট জামা ছিলো।এ কাজগুলো উনিই করতেন সব সময়ে। খাতা বাঁধাই করা, বইয়ের ছেঁড়াপাতা জোড়া দেওয়া, সেন্ডেলের সেলাই, ফিতা বদলানো সবিই বাবা করতেন। বাবা খুব গোছানো ছিলেন। গোছানো এই স্বভাবটা কিন্তু বাবার কাছ থেকে পেয়েছি আমি। জীবনের পুরোটা জুড়েই তো বাবার ছায়া। পৃথিবীটাকে দেখতে শিখেছি বাবার হাত ধরে।গান শোনা, বই পড়া, ঘুরে বেড়ানো, আড্ডা দেয়া বন্ধুদের সাথে সবই বাবার কাছ থেকে পাওয়া।
হার্ট অ্যাটাকের পর এই প্রতাপশালী মানুষটাই একটু অসুস্থবোধ করলেই ভয় পেয়ে যেতেন। আমার বাবা বয়স হতে হতে অনেকটা নমনীয় হয়ে গিয়েছিলেন। নিজেকে বদলে ফেলেছেন শেষ বয়সে অনেকটা। বাবাকে কোন সময়ে ভালোবাসি কথাটা বলতে পারিনি। এমনকি মৃত্যুশয্যায়ও বাবার খুব কাছে থেকেও ক্ষমা চাইতে পারিনি ভয়ে, সংকোচে। বাবা যদি বুঝতে পেরে ভয় পেয়ে যান, ঘাবরে যান, সে চিন্তায়, ভয়ে অনেক কথা বলতে পারিনি।আমি জানি বাবা, কিছু ভালোবাসা আছে যা না বললেও তুমি বুঝে নিতে পেরেছো। আমি মনে মনে সহস্রবার বলেছি, বাবা আপনাকে খুব খুব খুব ভালোবাসি। আপনি জানেন না আপনাকে নিয়ে আমি কতোটা গর্ববোধ করি। আমি একজন সাহসী ও বিপ্লবী মানুষের সন্তান। যার পরিচয় দিতে একটুও দ্বিধাবোধ করিনা। আপনার এই কড়াশাসনের বেড়ে ওঠা আমি অনেকের কাছে গল্প করে বেড়ায় এই কঠিন শাসনের কথা।
আপনার শৃঙ্খলাবোধ আমাকে এখনও শক্তি দেয়।আমার অজান্তেই আমি আপনাকে অনুকরণ, অনুসরণ করে বড় হয়েছি। আত্মমর্যাদা রক্ষা কীভাবে করতে হয়, কীভাবে সৎ থেকে নিজেকে বড় করা যায় তার সবই শেখা আপনার কাছে।ভুল মানুষের কাছে কখনও মাথা নত না করা, এতো আমার রক্তে মিশে গেছে সব বাবা। লেখাগুলো লিখছি আর বাবাকে দেখছি।
মায়াভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছেন। খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা আপনাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে। বারবার চোখ ভিজে আসছে। ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে লেখাগুলো। বারবার হাত যাচ্ছে চোখে।চোখ মুছতে মুছতে আমি বারান্দায় গিয়ে আপনার শেষ সময়ের কথাগুলো ভাবছি। কতটা বিশ্বাস করতেন আমাকে। আপনার খুব কষ্ট হতো এতো যন্ত্রপাতির অত্যাচারে। খুলে দিতে বলতেন সেসব। এতো কষ্টেও আমি বলতাম ভালো হয়ে যাবেন। দু’দিন পর সব খুলে দেবো ওরা। তখনি চুপ হয়ে যেতেন। যে বাবা কখনও নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথাও থাকেনি। নিজের ঘর, নিজের উঠোন এর বাইরে গেলে শেকড় ছাড়া গাছের মতোন ছটফটান। সে বাবা গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে আমাদের সবাইকে ছেড়ে আকাশের তারা হয়ে গেছেন। বাড়ির উঠোনে, ঘরে এখন আর মানুষের ভিড় নেই। কেউ আর সালিশবিচারের জন্য আপনার অপেক্ষায় থাকে না। নেই সেই কোলাহল। সব যেন কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। সেই চেয়ারটা খালি পড়ে আছে। আপনাকে ছেড়ে থাকা এতো কষ্টের হবে কখনও ভাবিনি।
লেখক : উপদেষ্টা, নারীকণ্ঠ

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।