নির্বাচন নিয়ে তামাশা নয় কামরুল হাসান বাদল ,লেখক কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 13/09/2018-01:43pm:    বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন ঘনিয়ে এলে কিছু ব্যক্তি ও দলের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। তাদের ক্ষুদ্র সামর্থ্যে কুলায় এমন আয়োজন করে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে। নিজেদের তারা গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করে। মূল কথা এরা কোরবানি ঈদের পশুর মতো একটা মৌসুমে এলে নিজেদের দামি করে তোলে, প্রয়োজনীয় করে তোলে। অনেকে লোক দেখানো কোরবান করে। পশু বা গরুর দাম কত হলো, কতটি গরু কোরবান দেওয়া হলো ইত্যাদি দিয়ে নিজের সামর্থ্য প্রকাশের চেষ্টা করে তেমনি নির্বাচন এলে রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের সঙ্গে কতটি রাজনৈতিক দল আছে (প্রকৃতপক্ষে ভিড়েছে) তা প্রকাশ করে আত্মতৃপ্তিতে ভোগে এবং জনগণকে দেখাতে চায় কার কত বড় অ্যালায়েন্স। এ বছরের শেষে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কোনো গন্ডগোল না হলে তা ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর প্রতিবারই যেমন ঘটে থাকে তেমনি এবারও কিছু ব্যক্তি ও দল নড়েচড়ে উঠেছে। নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে মোট ত্রিশজন সমর্থকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান করে নির্বাচনে বিরাট ও বিশাল ভূমিকা পালনের গলাবাজি করছে।
পাঠকদের নিশ্চয়ই সিলেটের ছক্কা ছয়ফুরের কথা মনে আছে। ছক্কা ছয়পুর নির্বাচন এলেই দাঁড়িয়ে যেতেন সে নির্বাচন ইউনিয়ন পরিষদ হোক আর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হোক। তবে তার এই নির্বাচন করার ‘আপোষহীন’ ভূমিকাকে সম্মান করে জনগণ একবার উপজেলা চেয়ারম্যান পদে জয়ী করে দিয়েছিল তাকে। সেখানে তিনি সফলতা দেখাতে পারেননি। আসলে রাজনীতি করা, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং জেতাও কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো নির্বাচনের পর আপনার ভূমিকা কী হলো, জনগণের প্রত্যাশা কতটুকু পালন করতে পারলেন সেটাই।
দেশে কয়েক মাস ধরে কিছু ছক্কা ছয়ফুর সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।তবে ছক্কা ছয়ফুর ছিলেন অতি সাধারণ মানুষ, অনেকটা সহজ–সরল। কিন্তু এই ছক্কা ছয়ফুররা শিক্ষিত, জ্ঞানী এবং চতুর। ছক্কা ছয়ফুর নির্বাচন করতেন অনেকটা নেশায় আর এরা নির্বাচন নিয়ে খেলছেন, খেলবেন এবং নির্বাচনকে হাস্যকর করে তুলতে, অগ্রহণীয় করে তুলতে, নির্বাচনকে নিজেদের স্বার্থ ব্যবহার করতে তৎপর এবং মূলত ক্ষমতার স্বাদ পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
এরা বাংলাদেশের মানুষদের কাছে বেশ পরিচিত। এরা রাজনীতিক বলে দাবি করেন কিন্তু রাজনীতিতে এদের সামান্যতম ভূমিকা নেই। দেশের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশও এদের সমর্থন করেন কি না তা নিয়ে তারা নিজেরাও সন্দিহান। এরা রজনীতিতে বসন্তের কোকিল বলে পরিচিত। এরা সারা বছর ঝিমায় আর ঘুমায়। নির্বাচন এলেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এবং কোনো একটি দলে বা জোটে ভিড়ে গিয়ে সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। এরা নির্বাচনকে তামাশা মনে করেন।
এরা ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারা, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, আ স ম আবদুর রবের জেএসডি, কাদের সিদ্দিকীর কৃষক–শ্রমিক জনতা লীগ, অলি আহমদের এলডিপি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দ্বিদলীয় রাজনীতির সংস্কৃতিতে চলছে।
এছাড়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী (বর্তমানে দলটি নিবন্ধিত নয়) ও জাতীয় পার্টি ছাড়া অন্যদলগুলো তেমন কোনো আসনও পায় না নির্বাচনে। তবে জোটবদ্ধ নির্বাচন করলে নৌকা বা ধানের শীষ নিয়ে দুচারজন নির্বাচনে জয়লাভ করেন। বর্তমানে যারা যুক্তফ্রন্ট করে কিংবা তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের কথা বলে মাঠে নেমেছেন তাদের কথাবার্তা, বক্তৃতা বিবৃতি এবং কাজে কর্মে মনে হচ্ছে তারা নির্বাচনকে তামাশা মনে করেছেন তাই নির্বাচন নিয়ে আবোল–তাবোল বকছেন।
মূলত বাংলাদেশের রাজনীতি দুধারায় বিভক্ত মুখে তারা যে যাই বলুক না কেন। একটি আওয়ামী লীগ অন্যটি আওয়ামী লীগ বিরোধী। বর্তমানে ছক্কা ছয়ফুররা বলছেন তারা এর বাইরে আরেকটি তৃতীয় ধারার রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে চাইছেন। আপাতদৃষ্টিতে উদ্যোগটি শুভ বলে মনে হবে। আমরাও চাই গড়ে উঠুক। আওয়ামী লীগের চেয়ে আরও গণতান্ত্রিক, আরও উদার, আরও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল গড়ে উঠলে তাতে দেশের লাভ, জনগণের লাভ। তেমন রাজনৈতিক দল গড়ে উঠলে আমিই প্রথম তাদের স্বাগত জানাব। কিন্তু এদেরতো সে ইচ্ছে নেই তা তাদের কর্মকান্ডেই প্রকাশ পাচ্ছে স্পষ্টভাবে। এক এগারোর ঘটনার পর বাংলাদেশে দু বছর শাসন করেছে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এ সে সময়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই রাজনীতিবিদরা ভুলে যাননি। সে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে প্রথমে জনগণ স্বাগত জানালেও তাদের পরবর্তী কার্যকলাপে তারা দেশের জন্য বোঝা হয়ে উঠেছিল। ১/১১ এর ঘটনাকে অনিবার্য করে তুলেছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি।
আজ বিএনপি ক্ষমতার জন্য, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছে যে প্রয়োজনে দেশে আরেকটি ১/১১ এর মতো ঘটনা ঘটাতেও তাদের কোনো আপত্তি নেই। আর সে সাথে ড. কামাল, মান্না, বদরুদ্দোজা, আ স ম রবরাও অপেক্ষায় আছে যদি এমন ঘটনা ঘটে তাহলে মাঝখানে তাদের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে পড়তেও পারে। আর তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন দেশের এক শ্রেণির সুশীল, যাঁরা অপেক্ষা করেন কোনো অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে তারা ডাক পাবেন। উপদেষ্টার মতো পদ পেয়ে নিজেদের দাপট ও গুরুত্ব দেখানোর সুযোগ পাবেন। কয়েকদিন আগে বিকল্পধারার উদ্যোগে রাজধানী ঢাকায় তারা একটি অনুষ্ঠান করেছে। আয়োজকদের অন্যতম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পারিবারিক সংগঠন বিকল্পধারার সচিব, বদরুদ্দোজার গুণধর সন্তান এবং এক সময়ে তারেকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মাহি বি চৌধুরী অনুষ্ঠানের শুরুতে বলেছেন, আজ এখানে কারো নামে কোনো নেতিবাচক কথা বলা যাবে না।
এরপর সেখানে বক্তারা যা বলেছেন তা পাড়ার শিশু–কিশোরদের রম্যবিতর্ক প্রতিযোগিতা বলে মনে হয়েছে। এই ঘটনার কয়েকদিন আগে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন জিতলে বিএনপিকে দুবছরের জন্য ক্ষমতা মান্নার হাতে ছেড়ে দিতে হবে। তিনি দেখিয়ে দেবেন সুশাসন কীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। যে লোক নিজের দলটির একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেননি এত বছরে, সে লোক দু বছরের জন্য ক্ষমতা পেয়ে দেশকে সুশাসন উপহার দেবেন তেমন কথায় আস্থা রাখি কী করে। আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কি শিশু–কিশোরদের রম্যবিতর্ক যে পাঁচ মিনিট–পাঁচ মিনিট করে দলের সব সদস্য একবার করে বলার সুযোগ পাবেন?
আসলে এরা ক্ষমতার জন্য পাগল হয়ে গেছেন। বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এখন শরীকদের যে কোনো শর্ত মেনে নেওয়ার মতো নমনীয়তা দেখাচ্ছে ফলে মান্না–রবদের মতো রাজনৈতিক বর্জ্যও এখন ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
যদি তারা সত্যিই একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির উত্থান চাইতেন তাহলে তারা গত ১০ বছর ধরে দেশের রাজনীতিতে সে চেষ্টাই করতেন। কিন্তু তারা তা করেননি। দশ বছর জনগণের কোনো খবর নেননি। মাঠে ময়দানে জনগণের দাবি নিয়ে, অধিকার নিয়ে দাঁড়াননি। নির্বাচন এসেছে বলে তারা বিএনপির কাঁধে ভর করে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
বদরুদ্দোজা চৌধুরীদের সাথে বৈঠকের পর ড. কামাল হোসেন একটি টেলিভিশনকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বলেছেন, তিনি বায়াত্তরের সংবিধানের চার মৌলিক নীতির প্রতিষ্ঠা চান, বাস্তবায়ন চান। তিনি কাদের নিয়ে বায়াত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠান চান? বদরুদ্দোজার মতো নেতাদের নিয়ে? যিনি এক হাতে কোরআন আর অন্য হাতে গীতা নিয়ে বিএনপির পক্ষে চরম সাম্প্রদায়িক অসভ্য, অশোভন নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন? সংবিধানের এই মূল চারনীতির বিষয়ে তার সাথে অন্যদের বক্তব্য ও অবস্থান কী তাতো এখনো পরিষ্কার নয়। অন্তত গত ১০ বছর তাহলে ড. কামাল সংবিধানের এই মূল চারনীতি নিয়ে কথা বলেননি কেন? মান্না যখন বলেন, জামায়াতের সাথে ঐক্য করতেও তেমন বাধা নেই তখন সেই মান্নাকে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট বা আরেকটি ঐক্য করবেন কীভাবে ড. কামাল।
অন্যদিকে এদের নড়াচড়া দেখে আরও দুজন রাজনীতিক সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তারাও দেশের রাজনীতিতে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তা জানাতে ইতিমধ্যে কাদের সিদ্দিকী ও কর্ণেল অলি সভা করে জানিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ তারাও ভাগের কিছুটা চান বলে জানিয়ে দিলেন।
মান্নারা স্বপ্ন দেখছেন বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। যে স্বপ্ন খোদ বিএনপি নিজে দেখতেই ভয় পাচ্ছে। মান্না গং দেশের কিছু সুশীল এবং একটি জাতীয় দৈনিক চাচ্ছেন যে কোনোভাবে ঠেলেটুলেও হলেও বিএনপিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসিয়ে দিতে। প্রতিদিন সে জাতীয় দৈনিকের প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠা লক্ষ করলে পাঠকদের কাছে তা স্পষ্ট হবে। একটি ছোট্ট উদাহরণ দিই, গত সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপি একটি মানববন্ধন করেছিল। সে পত্রিকা মঙ্গলবার প্রথম পৃষ্ঠায় সে ছবি ছাপিয়ে লিখেছে, মানববন্ধনে নেতাকর্মীদের একাংশ। একই সমাবেশ যদি আওয়ামী লীগ বা তার কোনো অঙ্গ সংগঠন করতো তাহলে একই পত্রিকা ট্রাফিক জ্যামের ছবি ছাপিয়ে লিখতো, সমাবেশের কারণে রাজধানী জুড়ে ছিল ব্যাপক ট্রাফিক জ্যাম। এই পত্রিকাটিই এখন মোটামুটি কঠোর সরকার বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। যে কারণে কোটা আন্দোলন, শিক্ষার্থী আন্দোলনকে প্রথম পৃষ্ঠায় নানা প্রকার কায়দায় শিরোনাম করে রেখেছে।
নির্বাচন হবে দেশের সংবিধান অনুযায়ী। যে দলের ইচ্ছা নির্বাচনে অংশ নেবে। যতই চেষ্টা করুক মূল পরিবর্তনটি আনবে জনগণ। জনগণের ওপর তাদের আস্থা রাখা দরকার। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করছি। একটি ধারনা সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হচ্ছে যে, নির্বাচন অবাধ হলে আওয়ামী লীগ জিতবে না। আমি দেখেছি অনেক আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরা ধীরে ধীরে এই ধারনা গিলতে বসেছে। তাদের উদ্দেশ্যে বলি, এটি একটি সুকৌশল প্রচারণা। আওয়ামী লীগের অবস্থা এখনও তেমন খারাপ পর্যায়ে যায়নি যে, অবাধ নির্বাচন হলে দলটি হেরে যাবে। অতীত ইতিহাস বলে হত্যা, ষড়যন্ত্র ছাড়া এই দলটিকে কখনো পরাজিত করা যায়নি। ভবিষ্যতেও করা যাবে না। শুধু দেখতে হবে ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর, ২১ আগস্টের মতো ঘটনা যেন ঘটতে না পারে। ১৯৯১ এবং ২০০১ সালের মতো নির্বাচনে কারচুপি যেন করতে না পারে।

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।