জীবনের কিছু খণ্ডচিত্র -কামরুল হাসান বাদল,লেখক কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 29/08/2018-11:44am:    এক. খাটে দুজন মানুষ পরস্পরের সাথে কথা বলছে। রুমটি খুব ছোট। একটি খাট পাতার পর হাঁটাচলার খুব বেশি জায়গা অবশিষ্ট নেই। রাতের খাওয়া শেষে ঘুমের আয়োজন করে খাটের দুপ্রান্তে শুয়েছেন তারা।
প্রথমে কথা বললেন পুরুষটি। বয়স সত্তর পেরিয়ে গেছে। শরীরে নানা রোগ নিয়ে বেঁচে আছেন। বললেন তিনি, কী দিয়ে খেলে আজ? যাঁকে প্রশ্ন করলেন তিনি তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের মা। তার বয়সও ষাট পেরিয়ে গেছে। শীর্ণ ও জীর্ণ শরীরটি দেখলে বোঝা যায় জীবনটা একপ্রকার বয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রশ্নের জবাবে বললেন, ডিমভাজি আর ডাল দিয়ে। বউমার শরীরটা ভালো না। তাই আজ বাজারে যায়নি। খোকারও সময় হয়নি বাজার করার তাই।
একটি দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনলেন তিনি। অন্ধকারে সে শব্দকে অনুসরণ করে বললেন, তুমি কী দিয়ে খেলে। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বৃদ্ধ বললেন, গত কয়েকদিন থেকে নাকি ইলিশ মাছ খুব সস্তা হয়েছে। আমাকে দিয়েছিল খেতে। কিন’ খেতে পারলাম না। তোমার কথা মনে পড়ছিল। তুমিতো ইলিশ খুব পছন্দ করো। খেতে বসে ভেবেছিলাম, তোমার জন্য পাঠাবো কি না। বৌমা রাগ করতে পারে ভেবে পাঠাইনি। আমার খেতে ইচ্ছে করেনি মাছটি। খাইনি। বলেছি শরীর ভালো না আজ খেতে ইচ্ছা করছে না।
উত্তরে আরেকটি দীর্ঘশ্বাস। সে শব্দ লক্ষ্য করে বৃদ্ধ বললেন, কিছু বলবে? না। বৌমার এলার্জি আছে বলে ছোটটা ঘরে ইলিশ মাছ আনে না। এরপর ঘরে অন্ধকার আর নীরবতা বিরাজ করে।
এই শহরের একটি পাড়ায় নিজের বাড়িতে থাকেন এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। দুটো মেয়ে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে। দু সন্তানের সংসারে এখন তারা ভাগাভাগি করে খায়। দুভাই আলাদা হওয়ার সময় মা-বাবাকেও আলাদা করে নিয়েছে। এক ভাইয়ের ঘরে বাবা আর অন্য ভাইয়ের ঘরে মায়ের খাওয়ার ব্যবস’া হয়েছে। তবে দিন শেষে একটি রুমে থাকার জায়গা হয়েছে তাদের। এই পরিবারকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। কয়েক মাস পূর্বে বৃদ্ধ মৃত্যুবরণ করেছেন। মা এখন একা কার ভাগে পড়েছেন জানি না। নাকি ১৫ দিন করে ভাগাভাগি হয়েছে সে খবর জানি না।
দুই. গ্রাম্য সালিশে বাবার বিরুদ্ধে সন্তানেরা অভিযোগ এনেছে। অপরাধ পিতা তাদের সংসার খরচ দেয় না। পুত্রদের এই অভিযোগের পর সালিশে উপসি’ত লোকজন পিতার কাছে জানতে চাইলেন কী ঘটনা। পিতা জানালেন, অভিযোগকারী তার তিন সন্তানই বিবাহিত এবং প্রত্যেকের ছেলেপুলে আছে। দুজন আগে মধ্যপ্রাচ্যে ছিল এখন ফিরে এসে বেকার জীবনযাপন করছে। অন্য ছেলেটার ক্যান্সার রোগ ধরা পড়েছে। বৃদ্ধ বাবা হিসাব দিলেন কোন ছেলেকে কত লাখ টাকা দিয়েছেন। সবশেষে বললেন, টাকার জন্য তাঁর সন্তানেরা তাঁর গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছে। তিনদিন আগে হার্ট অ্যাটাকে বাবাটি মারা গেছেন। এরমধ্যে তাঁর সন্তানেরা সালিশকারীদের দুয়ারে দুয়ারে ধর্না দিচ্ছেন। বাবার রেখে যাওয়া নগদ টাকা আর সম্পত্তি ভাগ করে দিতে। তিন সন্তানের প্রত্যেকেই দাবি করছেন নগদ টাকা থেকে বেশি টাকা তাকেই দিতে, তার প্রয়োজন বেশি। তিন. জীর্ণ-শীর্ণ চেহারার লোকটি ট্রেনের সিটে বসে পাশে বসা সহযাত্রী তরুণীকে বললেন, মা ‘অমুক’ স্টেশন এলে আমাকে বলিও, আমি সেখানেই নামবো। প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে আর সে সময়ে ট্রেনটি এসে থামলো সে স্টেশনে। তরুণী বৃদ্ধকে বললেন, আপনি নামবেন না? বৃদ্ধ একটু ইতস্তত করে বললেন, না মা। এখানে নয়, ‘অমুক’ স্টেশনে নামবো। কৌতূহলী তরুণী জানতে চাইলো, আপনার বাড়ি কোথায়? পরের স্টেশনেই বা কেন যাবেন। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বৃদ্ধ বললেন, এই স্টেশনে আমার ছোট ছেলে থাকে। আমি পনেরদিন বড় ছেলে পনেরদিন ছোট ছেলের বাড়িতে থাকি। ওদের মা গত হয়েছেন কয়েক বছর আগে। ১৫দিন ছোট ছেলের বাসায় ছিলাম। শরীর ভালো লাগছিলো না। বৌমাকে বলেছিলাম, কয়েকটা দিন থাকি।
কিন’ বৌমা থাকতে দিতে রাজি হলো না। তাই গিয়েছিলাম বড় ছেলের বাড়িতে। ওরা জানে আজ আমি যাবো। তারপরও তারা বাড়িতে তালা দিয়ে কোথাও যেন বেড়াতে গেছে। তাই ফিরে আসতে হলো। কিন’ আজ মনে হলো, ছোট ছেলের বাড়িতেও যাব না আজ। মেয়ের বাড়িতে যাব। মেয়েটি অনেকদিন ধরে বলছিল তার কাছে গিয়ে থাকতে। মেয়ে বলে লজ্জা পাচ্ছিলাম, তবে আজ যাব। গিয়ে তার কাছে মাফ চাইব। ছেলে দুটোকে উচ্চ শিক্ষিত করবে বলে মেয়েটিকে বেশি দূর পড়াশোনা করাইনি। বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলাম, আজ মেয়ের কাছে গিয়ে মাফ চাইব।
চার. বয়স্ক মহিলা। প্রায় প্রতিদিন বিকেলে ডিসি হিলে আসেন। হাঁটেন। পরিচিতজনদের সাথে কথা বলেন। বেশভুষা আর চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ। দেখলে বোঝা যায় সম্পন্ন পরিবারের কেউ। থাকেন জামালখান এলাকায় দামি ও আধুনিক ফ্লাটে। স্বামী-স্ত্রী দুজন। একমাত্র ছেলেটি আমেরিকায় থাকে। জিনিয়াস। চিকিৎসা শাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। একটি কৃত্রিম অঙ্গ আবিষ্কার করে আমেরিকাসহ তাবৎ বিশ্বে নন্দিত হয়েছেন। বাংলাদেশে বাবা-মা থাকেন একা। পাঁচ. এসএসসি পাশের পর ছেলেটি আর কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। বছর দুয়েক পর তাকে চলে যেতে হয় দুবাই। প্রথম কয়েক বছর এই দোকান সেই দোকানে চাকরি করে কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি লাভজনক ব্যবসার সুযোগ পেয়ে যায়। তারপর আর তাকে পিছে তাকাতে হয়নি। এলাকার কেউ জায়গা বিক্রি করবে শুনলেই এখন তারাই হচ্ছেন বড় ক্রেতা। বাড়ি-গাড়ি সবই আছে গ্রামে। বাবা-মায়ের-রুমেই প্রথম এসি লাগিয়ে দিয়েছে সে। দুয়েক বছর পরপর বাবা-মাকে দুবাইতে নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখে।
ছয়. ইন্টারের পরে আর লেখাপড়ার সুযোগ হয়নি। ফলে ভালো চাকরি জুটিয়ে নেওয়া সম্ভবও হয়নি। বর্তমানে একটি শপিংমলে সেলসম্যানের চাকরি করে জীবন চলছে। শহরে সহকর্মীদের সাথে মেসে ভাগাভাগি করে থাকে। সাপ্তাহিক ছুটির সময়ে বাড়ি যায়। যাওয়ার সময় বাবা-মায়ের জন্য কোনো না কোনো একটা ফল কিনে নিয়ে যাবে সে। সীমিত আয় সত্ত্বেও মা-বাবাকে সঙ্গে রেখেছে। বলে, জনম দিছে না ভাই, ফেলে দিতে পারব?
সাত. আমার ছেলে দেশেই আছে এবং দেশীয় একটি কোম্পানিতে চাকরি করে শুনে আমার হাত দুটি নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। শেষে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, খুব ভালো করেছেন বিদেশে পাঠাননি। আমি জমি-জমা বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম পড়াশোনা করতে। ছেলেটি পড়েছে। অর্থাৎ তার ডিগ্রি অর্জন করেছে এবং ভালো একটি জবও করে। তারপর শুনেছে। এমনভাবে বললেন, আমি একটু চমকে উঠে বললাম তারপর শুনেছে মানে? ভদ্রলোক অত্যন্ত করুণ হাসি হেসে বললেন, বৌমার কথা শুনেছে। ও দেশে বিয়ে করেছে। বৌমা বাংলাদেশে আসতে চায় না, ছেলেকেও আসতে মানা করেছে। ছেলেটি বৌমার কথা শুনেছে।
আট. ভদ্রলোক বাংলাদেশি কিন’ চাকরি করেন একটি বিদেশি কোম্পানিতে। লন্ডনে গেছেন অফিসের কাজে। একদিন এক ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং এবং লাঞ্চ সি’র হয়েছে একটি হোটেলে। গাড়ি থেকে নেমে ফুটপাত পেরিয়ে হোটেলে ঢুকতে যাবেন সে সময় তার ব্রিটিশ ক্লায়েন্ট এক বয়স্ক ভদ্রলোককে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। তার দিকে ফিরে বললেন, মাফ করবেন। আপনি হোটেলে গিয়ে বসুন। আমি কয়েক মিনিটের মধ্যে আসছি। ঠিকই মিনিট দশেকের মধ্যে ভদ্রলোক ফিরে এলেন এবং উচ্ছ্বসিতভাবে নিজ থেকে জানালেন, জানো কার সাথে কথা বললাম? আমার বাবা। প্রায় দশ বছর পর দেখা হলো। লাঞ্চের অফার দিয়ে বললেন, অনেকদিন পর দেখা চলো লাঞ্চ করি। আমি বললাম, সরি, আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। তুমি যে ভদ্রলোককে দেখলে তিনি অপেক্ষা করছেন আমার জন্য।
পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে আমাদের সমাজে, পরিবারে। জীবনের জন্য, জীবিকার জন্য আমাদের ব্যস্ততা বাড়ছে, বিচ্ছিন্নতাও বাড়ছে। ফলে আমাদের মা-বাবারা যে জীবনযাপন করে গেছেন তা হয়ত আমরা পাব না কিংবা পাচ্ছি না। আর পরিবর্তনের ফলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জীবনযাপন হয়ত এরচেয়ে কঠিন হবে। হয়ত নির্মমও হতে পারে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক

সর্বশেষ সংবাদ