রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও অন্যান্য-কামরুল হাসান বাদল লেখক কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 10/08/2018-12:56pm:    কাল সকালে পত্রিকা খুলে কোনও পাঠক যদি এমন একটি সংবাদ পড়ে যে, নরওয়ের সব অধিবাসী কয়েক দিনের ছুটি কাটাতে অন্যত্র চলে যাচ্ছে, কেমন চমকপ্রদ হবে তা? অথবা সুইজারল্যান্ডের সব জনগণ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের সব মানুষ?
এমন ঘটনা হয়তো কখনোই ঘটবে না, তবে আমাদের দেশের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে প্রসঙ্গটি তুললাম। কেন তুললাম তা বলার আগে আপাতত এই কয়েকটি দেশের আয়তন ও জনসংখ্যার বিষয়ে একটু ধারণা দিই।
সুইডেনের আয়তন ১৭৩,৮৬০ বর্গমাইল বা ৪৫০২৯৫ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ৯৫ লাখ। নরওয়ের আয়তন ৩৮৫,২৫২ কিলোমিটার, জনসংখ্যা ৪৯ লাখ। সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা ৭৫০৭০০০ (পঁচাত্তর লাখ সাত হাজার) আর মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের মোট জনসংখ্যা হবে ৫০ লাখের কাছাকাছি। নরওয়ের প্রায় ৫০ লাখ মানুষ মাত্র দুই থেকে তিন দিনের ব্যবধানে যদি অন্যত্র ছুটি কাটাতে যায় তখন কী হতে পারে পরিস্থিতি। তা-ও আবার ৩,৮৫,২৫২ বর্গকিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষ। বিশ্বের অন্যতম ধনী ও আধুনিক এই রাষ্ট্রের পক্ষে কি সম্ভব এত বিপুল জনগোষ্ঠীকে সুচারুভাবে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দেওয়া? এত যানবাহন, এত অবকাঠামো এবং এত এত সুশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও। অন্যতম ধনী দেশ সুইজারল্যান্ড, যার জনসংখ্যা ৭৫ লাখ। কিংবা বিশাল দেশ আর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো?
অথচ বাংলাদেশে এমন ঘটনাই ঘটছে অন্তত বছরে দুবার এবং তা বছরের পর বছর ধরে। শুধু তাই নয়, নরওয়ে বা সুইজারল্যান্ড কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের মতো বিস্তীর্ণ ও বিশাল এলাকা থেকে নয়। মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার এলাকা থেকে নরওয়ে কিংবা তার চেয়ে একটু বেশি সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যার সমান মানুষ দুই ঈদের আগে মাত্র দুই বা তিন দিনের ব্যবধানে রাজধানী ছেড়ে অন্যত্র যাচ্ছে।
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট এ দেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি। শুধু রাজধানী ঢাকায়ই বাস করে এক কোটি ২০ লাখ মানুষ। বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমের তথ্য মতে, শুধু ঢাকা শহর থেকে প্রতি ঈদে ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বা অন্যান্য জেলায় গমন করে। অর্থাৎ প্রায় ৮০ লাখ মানুষ রাজধানী ছেড়ে যায় মাত্র দুই বা তিন দিনের ব্যবধানে।
রমজান ও ঈদ কাছাকাছি এলে আমাদের সংবাদমাধ্যমজুড়ে থাকে দুটি বিষয়। রমজানের আগে থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত কোন পণ্যের দাম কত? কোন পণ্যের দাম বাড়ল বা কমল এবং কাঁচামরিচ, বেগুন ইত্যাদির মতো দুয়েকটি পণ্যের দাম কীভাবে হঠাৎ আকাশচুম্বী হল তা। আর ঈদের আগে কোন শপিংমলে কী পাওয়া যায়, এবারের সবচেয়ে জনপ্রিয় পোশাক তার দাম ইত্যাদি। বিষয়গুলো দৈনন্দিন ও উৎসব-সংশ্লিষ্ট বলে পাঠক বা দর্শকেরও জানার আগ্রহ থাকে। তবে ঈদের সপ্তাহখানেক আগে থেকে শুরু হওয়া ট্রেন, বাস, স্টিমারের টিকিট বিড়ম্বনা ও যাত্রী হয়রানির সংবাদ আমি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখি। মানুষের বাড়ি যাওয়ার আকাক্সক্ষা, প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ করার আনন্দ, লটারি পাওয়ার মতো যানবাহনের টিকিট পাওয়ার আনন্দ, বাস, স্টিমারের টিকিটের দাম বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমের শিডিউল বিপর্যয় এবং অনিবার্য নিয়তির মতো দুর্ঘটনার সংবাদ আমি ভীষণ মনোযোগ দিয়ে দেখার চেষ্টা করি। অবশ্য শুধু আমি নই, দেশের প্রায় মানুষই তা দেখেন বা জানার চেষ্টা করেন। ঈদের আনন্দের মধ্যে মাঝে মাঝে দুর্ঘটনার খবর হরিষে বিষাদ হয়ে আসে আমাদের জীবনে। অন্যদের বেলায় কী হয় জানি না, তবে আমি ভীষণ অবাক হই। বিস্মিত হই এবং প্রতিবারেই আমার বিস্ময়ের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে। আমি ভাবতে থাকি এটি কী করে সম্ভব! এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা বাংলাদেশের মতো একটি অনুন্নত দেশে, যেখানে সুষ্ঠু কোনও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নেই, সুষ্ঠু গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই। আধুনিক ট্রেন নেই, ভালো সড়ক নেই, আধুনিক ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাসমৃদ্ধ নৌপরিবহনব্যবস্থা নেই, এমন একটি দেশে তা সম্ভব হয়ে উঠছে কী করে! টিকিট পাব না পাব না বলে এক সময়ে ঠিকই টিকিট পাওয়া যাচ্ছে, যেতে পারব পারব না করে এক সময়ে ঠিকই বাড়ি যাওয়া হচ্ছে। এই অসাধারণ কর্মযজ্ঞ শেষ পর্যন্ত কী করে সম্ভব হয়ে উঠছে। ভাঙা সড়ক, মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি, ফিটনেসহীন স্টিমার, বৈরী আবহাওয়া, পুরনো ও সেকেলে বগি, সংস্কারবিহীন রেলপথ, কী করে এত বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে পারল। তা-ও আবার মাত্র দুটি রেলস্টেশন (কমলাপুর ও বিমানবন্দর), একটি স্টিমারঘাট (সদরঘাট) ও মাত্র কয়েকটি বাস স্টেশন থেকে। (দেশের অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরের হিসাব এখানে ধরা হল না) ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যের ওই সব ধনী দেশ কী এর চেয়ে সুচারুভাবে এত বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে পারত? আমার ভীষণ ইচ্ছে হয়, তেমন একটি বাস্তবতা দেখতে।
ঈদের আগে ও পরে বেশ কদিন ধরে আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো অনবরত নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করে থাকে। কোথায় ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় হল, কোথায় কোন কাউন্টারে টিকিট পাওয়া গেল না। টিকিট পাওয়া গেলেও দাম বেশি নিচ্ছে ইত্যাদি। কিন্তু একবারও কেউ প্রচার করে না, এত বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে পুরো সিস্টেমে কেমন একটু নড়াচড়া হতে পারে। আমার তো মনে হয়, বাংলাদেশের বর্তমান যে সক্ষমতা তার তুলনায় এই কাজটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং ‘ওভারলোডেড’ তো বটেই। আমার বিস্ময়ের সীমা থাকে না ভাঙাচোরা সড়ক, দীর্ঘ যানজট আর প্রায় পুরনো গাড়িগুলো এত লাখ লাখ মানুষ পরিবহন করে কীভাবে। শত বছরের পুরনো সংস্কারবিহীন রেলপথ এত যাত্রীকে শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছয় কী করে! আর বেশিরভাগ লঞ্চ-স্টিমার ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ-তিনগুণ যাত্রী নিয়ে বৈরী আবহাওয়ায় যাত্রী পরিবহন করে কী করে। অন্য কোনও দেশে বাংলাদেশের মতো সক্ষমতা নিয়ে এর চেয়ে ভালো সেবা কি পাওয়া যেত! আমার জানার বড় আগ্রহ। কারণ আমাদের কোনও সংবাদমাধ্যম আজ পর্যন্ত এক প্রকার অসাধ্য সাধনের গল্প বা চিত্রটি ইতিবাচকভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেনি। শুধু ব্যর্থতার চিত্র নয়- সাফল্যের চিত্রও সমানভাবে উপস্থাপন করা জরুরি। একটি উন্নয়নশীল দেশ, যেখানে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাই প্রধান বৈশিষ্ট্য সেখানে এ ধরনের সফলতার কাহিনি প্রচার হওয়া বড্ড প্রয়োজন। আমার মনে হয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি একটু পাল্টানো দরকার। যে বাসচালক ও হেলপার দিনের পর দিন বিশ্রামহীনভাবে কখনও ৪৮ ঘণ্টারও বেশি বাসের ওপরে কাটাল, যে লোকোমোটিভ মাস্টার নির্ঘুম রাত জেগে ট্রেনটিকে গন্তব্যে পৌঁছাল কিংবা যাদের অকান্ত পরিশ্রমে দুই ঈদের এই মহাযজ্ঞ সমাধা হয় তাদের কথাও একটু তুলে ধরা দরকার। তাদের পক্ষেও দু-চার বাক্য ব্যয় করা দরকার। তবে তার পরও কথা থাকে। কথা থাকে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের ঈদের আনন্দ নিয়ে, তাদের যাত্রার বিড়ম্বনা আর দুর্ঘটনা নিয়ে আরও কথা থাকে। আর তা হল এই বিড়ম্বনা ও দুর্ভোগ থেকে মানুষকে একটু স্বস্তি ও মুক্তি দিতে ঈদের ছুটি নিয়ে কথা থাকে। যে যাই বলুক রমজানে এমনিতেই বিপুল শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়, বিশেষ করে সরকারি, আধা-সরকারি ও কিছু কিছু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে পুরো রমজান মাসেই কাজ চলে ঢিলেঢালাভাবে, অধিকাংশ অফিসে জোহরের নামাজের পর তেমন কোনও কাজই হয় না। অবশ্য যেসব প্রতিষ্ঠান বা দপ্তরে ঘুষের কাজ আছে তার চিত্র ভিন্ন। এসব অফিসে শবেকদরের পরে ‘সিরিয়াসলি’ কোনও কাজ হয় বলে মনে হয় না। তাই আমার মনে হয় ঈদের ছুটি শবেকদরের বন্ধের সঙ্গেই শুরু হলে যানবাহন বা বাড়ি ফেরার ক্ষেত্রে অত্যধিক চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব। বর্তমানে ঈদের ছুটি মাত্র তিন দিন। এর আগে পরে লাগোয়া সাপ্তাহিক বন্ধ পড়লে তা কিছুটা দীর্ঘ হয়। কাজেই ঈদে অত্যাবশ্যকীয় যেমন পরিবহন, আইনশৃঙ্খলা, চিকিৎসার মতো কিছু বিভাগ ছাড়া সরকারি অন্যান্য বিভাগে একটু আগে ছুটি দিলে ঈদের দুদিন আগের চাপ অনেকটা কমে আসত। তাতে অন্তত যানবাহন খাতে অরাজকতা ও দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
বাংলাদেশের মানুষ নগরবাসী হয়েছে সম্প্রতি। এখনও গ্রামেই রয়ে গেছে তাদের নাড়ির টান। কাজেই প্রতি ঈদে নগরবাসীর একটি বিশাল অংশ বাড়ি ফিরবে। আমাদের সীমিত সাধ্য ও ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে ঈদের ছুটি যদি আরও দুদিন বাড়ানো যায়, আমার ধারণা তাতে মানুষের আনন্দ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ঝামেলাও অনেকাংশে কমে যাবে।
লেখক : সাংবাদিক

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক