বন্ধ সিমে বোনাস ও আওয়ামী রাজনীতি লেখক : কবি ও সাংবাদিক কামরুল হাসান বাদল

পোস্ট করা হয়েছে 12/07/2018-09:01am:    দেশের মোবাইল ফোন অপারেটররা গ্রাহক বাড়ানোর লক্ষ্যে নানা প্রকার বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বন্ধ সিম চালু করার টোপ। বিজ্ঞাপনে লোভ দেখিয়ে বলা হয়, বন্ধ সিম চালু করলেই ১০০ভাগ কখনোবা ২০০ ভাগ বোনাস এবং তার সঙ্গে আরও নানা প্রকার সুবিধা। বোনাসটা হলো এমন, বন্ধ সিম চালু করে ১০০ টাকা রিচার্জ করলে বাড়তি ১০০ বা ২০০ টাকা জমে যাবে একাউন্টে।
বিজ্ঞাপনটা দেখে আমি ভাবি, অপারেটর কোম্পানিগুলোর কী অবিচার! যারা বছরের পর বছর তাদের কোম্পানির সিম ব্যবহার করে কোম্পানির একাউন্টে প্রচুর টাকা ভরলো তাদের জন্য কোনোরূপ সুবিধা নেই। যে বা যারা এতদিন তাদের সিমটি বন্ধ রাখলো তাদের জন্য কী সুবিধা। এটি অবশ্য করপোরেট বাণিজ্যের বিপণন রীতি, গ্রাহক বাড়ানোর কৌশল। তারপরও ভাবি, কেমন যুগে এসে পড়লাম বাবা! যে তোমাকে একদিন ছেড়ে গিয়েছিল তার জন্য তোমার কী টান, আর তোমাকে ছেড়ে যায়নি যে তার প্রতি কী ঔদাসীন্য।
আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণেও মাঝেমধ্যে তেমন ক্রিয়া প্রত্যক্ষ করি। বিশেষ করে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে। যারা একদিন দল ছেড়েছিল, যারা একদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে কঠিন করে তুলেছিল, যারা একদিন এই দলের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছিল তাদের প্রতি আওয়ামী লীগের দরদ দেখে, আচরণ দেখে বন্ধ সিমে বোনাস দেওয়ার বিজ্ঞাপনটির কথা মনে পড়ে আমার।
১৯৪৯ সালে দলটির জন্মের পর থেকে এই দলে নতুন নতুন কর্মী-নেতা যোগদান করেছেন। এখনও সে ধারা অব্যাহত আছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ এই দলে কিংবা দলের অঙ্গ সংগঠনে যোগদান করছে। আওয়ামী লীগ একটি বড় দল। এর ছাত্র সংগঠনটিও দেশেরই শুধু নয় উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন ছাত্র সংগঠন। এর সদস্য সংখ্যা কত তা বোধহয় কমিটির নেতাদেরই জানা নেই। যোগদান এবং নতুন সমর্থক ও কর্মীদের কারণেই দলটি এখনো দেশের সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন। একই কথা খাটে মূল দল আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও। ফলে আমি এই দলে যোগদান বা নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির সমালোচনা করছি না। আমার কিংবা আমার মতো অনেকের আপত্তিটি হলো যোগদান করা কিংবা নতুন করে দলে ভেড়া লোকদের ধাক্কায় যেন পুরনো, ত্যাগী ও নিবেদিত কর্মী-সমর্থকরা দূরে সরে না যায়। এদের কারণে যেন পুরনোদের অমর্যাদা, অবমূল্যায়ন না হয়।
একজন রাজনীতিক স্বপ্ন দেখেন তিনিও একদিন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হবেন। দলে নেতৃত্ব দেবেন। অনেকে স্বপ্ন দেখেন একদিন দলের মনোনয়নে এমপি নির্বাচন করবেন বা কোনো নির্বাচনে অংশ নেবেন। এমন স্বপ্ন দেখা দোষের কিছু নয়। রাজনৈতিক দলের অন্যতম লক্ষ্যই হলো একদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়া। ফলে দলের নেতা হিসেবে তার অংশ হওয়ার স্বপ্ন দেখায় কোনো দোষ নেই। কিন’ সবসময় সে স্বপ্ন পূরণ হয় না। সবার ভাগ্যে সে সুযোগ ঘটে না। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ দলে, যেখানে সমর্থক-কর্মী ও নেতাদের অভাব নেই। সেখানে অন্যদের ডিঙিয়ে জাতীয় নির্বাচন বা স’ানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে অংশ নেওয়া সহজসাধ্য কাজ নয়। তবে তা যদি যোগ্য, সৎ, নিবেদিত নেতার কারণে হয় অর্থাৎ দলের মনোনয়ন যদি তেমন কাউকে দেওয়া হয় সে ক্ষেত্রে আফসোস বা মর্মবেদনা কম হয়। কিন’ তা যদি বন্ধ সিমের বোনাসের মতো হয়। অন্য অপারেটরের গ্রাহকের বেলায় হয় তখন তা সত্যি দুঃখ ও হতাশাজনক হয়ে দাঁড়ায়।
চট্টগ্রামের কয়েকটি নির্বাচনী এলাকা নিয়ে আলোচনা করা যাক। চট্টগ্রাম বন্দর নির্বাচনী এলাকার আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি যিনি আছেন তিনি চট্টগ্রামে বেশ আলোচিত ও পরিচিত ব্যক্তি। একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁকে সবাই চেনে। কিন’ তিনি কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এমন প্রমাণ কেউ দেবেন না। এলাকার অনেক ত্যাগী নেতাকে বঞ্চিত করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাঁকে যেদিন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হলো সেদিন চট্টগ্রামের আওয়ামী পরিবারে বিস্ময়ের সীমা ছিল না। এই আসনে অন্যতম প্রার্থী ছিলেন তুখোড় ছাত্রনেতা এবং রাজপথের সংগ্রামী নেতা খোরশেদ আলম সুজন। সেদিন এক অজ্ঞাত কারণে সুজনের মতো ত্যাগী, পরীক্ষিত ও নিবেদিত আওয়ামী লীগ নেতার পরিবর্তে দলের মনোনয়ন পেলেন এমন একজন যাঁকে এখনো মূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সাদরে গ্রহণ করতে পারেনি। শুধু ২০০৮ সালেই নয়, একই আচরণ করা হলো ২০১৪ সালের নির্বাচনেও। সৎ, পরিচ্ছন্ন, নিবেদিত প্রাণ খোরশেদ আলম সুজন এখনো সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে আপোষহীন ও সোচ্চার। তিনি বন্ধ সিম বোনাস কার্যক্রমের মতো আগামী নির্বাচনেও বঞ্চিত হবেন কিনা তা দেখার জন্য আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। ২০০৮ সালে মনোনয়ন বঞ্চিত খোরশেদ আলম সুজনের কাছে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনার প্রতিক্রিয়া কী। তিনি প্রশ্নের উত্তর দিলেন একটি জনপ্রিয় হিন্দি গানের চরণ দিয়ে- ‘দিলতো দে দিয়া সনম’। অর্থাৎ-হৃদয়তো দিয়ে দিয়েছি। বঞ্চিত হলেও সুজন দল পরিত্যাগ করেননি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে সামান্যতমও বিচ্যুৎ হননি।
দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমদ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে সিটি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। স্বাধীনতার পর হয়েছিলেন সাধারণ সম্পাদক। ছয় দফা ঘোষণার পর চট্টগ্রামে তা প্রচারের কাজে ছাত্রলীগের অন্যান্য নেতাদের সাথে তিনিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ নেভাল অ্যাভেনিউ সড়ক থেকে পাক নেভি অফিসারদের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। কারাবরণ করেছিলেন এবং পাকিস্তান আর্মি দ্বারা অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।
পরবর্তীতে তিনি দক্ষিণ জেলা যুবলীগ পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। দীর্ঘকাল সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জন্মেছিলেন একটি সচ্ছল পরিবারে। চট্টগ্রামে যখন অনেক আওয়ামী লীগ নেতার কোনো বাড়ি বা স’ায়ী ঠিকানা ছিল না সে সময়েই এই শহরে তাদের পৈত্রিক বাড়ি ছিল চারটি। তাঁকে দল থেকে দুবার মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৬ ও ২০০১ দুবারই পটিয়া নির্বাচনী এলাকা থেকে। অথচ তাঁর বাড়ি পাশের উপজেলা বোয়ালখালীতে। পটিয়ায় তিনি বহিরাগত হওয়ায় অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক কোন্দলে দুবারই তিনি পরাজিত হতে বাধ্য হন। যদিও সে সময় পটিয়ায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি অনেক ভালো অবস’ানে ছিল। তাঁকে তাঁর নির্বাচনী এলাকা থেকে একবারও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তিনি বন্ধ সিম বোনাস সিস্টেমের কাছে হেরে গেছেন। ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেই জয় যেখানে সুনিশ্চিত সে সময়েও তিনি মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এই দুজনের তুলনায় উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ সালাম কিছুটা ভাগ্যবান। সমস্ত যোগ্যতা, সম্ভাবনা, জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও সালাম তাঁর নির্বাচনী এলাকা থেকে একবারও মনোনয়ন পাননি। হাটহাজারীর প্রবীণ ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এম এ ওহাবের প্রয়াণের পর হাটহাজারীতে সবদিক বিবেচনায় এমএ সালাম ছিলেন সবার চেয়ে এগিয়ে কিন’ ‘জোটের ভোট’ বিবেচনায় তাঁকে তাঁর প্রাপ্য ছেড়ে দিতে হয়েছে। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে স্বচ্ছ, সৎ সজ্জন ও নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিক হিসেবে এমএ সালাম নির্দ্বিধায় দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সামান্য হলেও মূল্যায়ন করেছেন। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ড, নগরের কোতোয়ালী, পটিয়া, সাতকানিয়ায়। দলে নবাগত, দল ছেড়ে যাওয়া এবং মতাদর্শবিরোধীদের বাড়তি বোনাস দিতে গিয়ে ঠকে গেছে শুরু থেকে সিম ব্যবহারকারী গ্রাহকেরা। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এসব আমার নিজস্ব মূল্যায়ন। যারা রাজনীতি করেন, দল পরিচালনা করেন এবং যারা দলকে ক্ষমতায় আনার পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন তাদের কাছে আমার মূল্যায়নের হয়তো কোনো মুল্য হবে না। অথবা এভাবে বলা যায় যিনি বা যারা দল পরিচালনা করেন তারা দলের প্রয়োজনে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। তা আমার মতো, রাজনীতির বাইরে থাকা লোকের পক্ষে বোঝা বা অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো সংশয় নেই, দ্বিমত নেই। বরং আমি মনে করি তাঁর কিছু কিছু সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে বোধগম্য না হলেও পরবর্তীতে দেখা গেছে তার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। রাজনীতিতে এমন ঘটে থাকে। গণতান্ত্রিক প্রায় সবদেশেই এমন ঘটে। দলের বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে কখনো কখনো কাউকে না কাউকে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আমি সেসব নেতাদের সম্মান করি যারা দলীয় সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বঞ্চিত হলেও দলের বিপক্ষে স’ান নেন না। বরং দলের প্রতি আস’া রেখে রাজপথে লড়াই-সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন। মন্ত্রী-এমপি হওয়ার চেয়ে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা অনেক বড় ও গৌরবের কাজ। তারপরও বলি, যারা দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে নিজেদের অধিকার ও প্রাপ্যকে বিসর্জন দিয়েছেন, দলের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন তাদের প্রতি অন্তত আগামী নির্বাচনে দল সদয় আচরণ করবে।

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।