৯৯৯ পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনবে?- কামরুল হাসান বাদল,লেখক,কবি, সাংবাদিক ও টিভি ব্যক্তিত্ব

পোস্ট করা হয়েছে 28/06/2018-09:57pm:    ১। আমার বন্ধুটির চাপে যেতে হচ্ছে থানায়। থানা আমার তিন অপছন্দের জায়গার একটি। থানা, কোর্ট আর হাসপাতাল এই তিনটি জায়গায় আমার যেতে ইচ্ছে করে না। আমি সবসময় ভাবি, জীবনে একবারও যদি না গিয়ে পারা যেত। কিন্তু তা সম্ভব নয়। মানুষের জীবনের সাথে অপরিহার্যতার সাথে এবং মনে হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়তির সাথে এই তিনস্থানের যোগসূত্র থাকে ফলে মানুষকে যেতে হয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেতে হয় যেমন আমাকে যেতে হচ্ছে।
জীবনে কোনো না কোনো সময় পুলিশের কাছে যেতে হয়। আসামি হিসেবে কাউকে কাউকে যেতে হয় আর বেশির ভাগ মানুষকে যেতে হয় সাহায্যের আশায়। আধুনিক রাষ্ট্রে পুলিশ এখন নাগরিক জীবনের অংশ। জন্মিলে মরতে হবে। আর সে মৃত্যুর জন্য নানাবিধ রোগে পড়তে হবে। আমাদের দেশে এমনিতেই রোগ বালাই বেশি। প্রতিটি নাগরিক কোনো না কোনোভাবে চিকিৎসার প্রয়োজন আছে এমন অসুস্থ। ফলে ডাক্তার বা হাসপাতাল তাও এখন জীবনেরই অপরিহার্য অংশ। আর ভাগ্য খারাপ হলে জড়িয়ে যেতে হয় মামলায় বা তেমন কোনো বিষয় নিয়ে যেতে হয় কোর্টকাছারিতে। অবশ্য কিছু ব্যক্তি আছেন যারা স্বপ্রণোদিত হয়েই কোর্টবিল্ডিং যান। অনেক মামলাবাজ আছেন যাদের কারণে কোর্টবিল্ডিংয়ের আইনজীবীদের চেম্বার সরগরম থাকে সবসময়।
এই তিন জায়গার সবচেয়ে অপ্রিয় থানায় যেতে হচ্ছে আমায়। বন্ধুটি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে বাড়িওয়ালার সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গেছেন। বিষয়টি থানা পর্যন্ত গড়িয়েছে। ওসি মহোদয় একজন ইন্সপেক্টরকে দায়িত্ব দিয়েছেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও দুপক্ষের সাথে কথা বলে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য। থানায় আজ প্রথম বৈঠক। আমার বন্ধু একজন সৃজনশীল মানুষ। লেখালেখি করেন। তিনি নিজেও থানায় যেতে অস্বস্তিবোধ করছেন। জীবনের প্রয়োজনের কাছে শত অনিচ্ছাও নস্যি। ফলে তাঁকে যেতে হচ্ছে। সঙ্গে তিনি তাঁর পক্ষের আইনজীবীকে নিয়েছেন। আমার অফিসের সামনে থেকে আমাকে তুলে নিলেন। তাঁর গাড়িতে করে থানায় যেতে যেতে যা আলাপ হলো তা থেকে জানলাম দারোগা সাহেবের চাহিদামতো একটি টাকার বান্ডিল দুপুরেই তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বন্ধু এবং তাঁর আইনজীবী নিশ্চিত হয়েছেন দারোগা সাহেবকে অপরপক্ষও খুশী করেছেন। তবে সে অংক আমাদের বন্ধুদের চেয়ে বেশি বলে আমার বন্ধু এবং তার আইনজীবী কিছুটা মানসিক প্রশান্তিও পাচ্ছেন। তারা এটাকে প্রাথমিক বিজয় হিসেবে বিবেচনা করে খানিকটা মানসিক তৃপ্তি পাচ্ছেন বলে মনে হলো আমার।
আমরা থানায় গেলাম। সবাই যথেষ্ট আদব কায়দার সাথে দারোগা তথা ইন্সপেক্টর সাহেবকে সালাম দিয়ে তার সদয়দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলাম। তিনি একসময় বসতে বললেন। এরমধ্যে অপরপক্ষের লোকজনও এসেছেন। দারোগা দুপক্ষের বক্তব্য শুনলেন। মাঝেমধ্যে হুমকি–ধমকি দিতেও কার্পণ ্য করলেন না। একসময় চা এলো। চা পানের পর চা বিক্রেতা কিশোর কর্মচারী আমাদের কাছে চায়ের বিল চাইলে তাকে ধমকে দিয়ে তিনি বললেন, ব্যাটা এনারা আমার গেস্ট। টাকা আমি দিমু। আমরা তাঁর আতিথেয়তা ও ভদ্রতায় মুগ্ধ হওয়ার চেষ্টা করলাম। চা পানের পর এবার দারোগা বেশ আয়েশীভঙ্গিতে চেয়ারে শরীর ছেড়ে দিয়ে আড়মোড়া ভাঙলেন। তারপর আমাদের দিকে দৃষ্টিপাত করে জানতে চাইলেন, আমাদের মধ্যে কেউ অমুসলিম আছি কিনা। আমাদের পক্ষে কেউ নেই। ওদের পক্ষের দুজন বললেন তারা মুসলিম নন। দারোগা বললেন কোনো সমস্যা নেই। মুসলমান না হইলেও আমার কথা শুনতে পারবেন। আপনারা সবাই ব্যবসায়ী। আমি ব্যবসায়ীদের অধিক সম্মান করি। আবার আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, কেন করি জানেন? আমরা না সুচক মাথা দোলালাম। আমাদের নবী কোন বংশে জন্ম নিছিলেন তা জানেন? আমরা না জানার মতো করে চুপ করে আছি। সম্ভবত বোঝার চেষ্টা করছি এখানে নবীজির প্রসঙ্গ কেন আসছে। তিনি আমাদের জবাব না পেয়ে নিজেই দিলেন তার উত্তর। কুরাইশ বংশে। কুরাইশ শব্দটির অর্থ জানেন? উত্তরের আশায় তিনি আমাদের প্রত্যেকের মুখের ওপর চোখ ফেলছেন। দুজন অমুসলিমের মুখের ওপর চোখ পড়তে তা দ্রুত সরিয়ে নিলেন। ভদ্রলোক শুরুতে আমার সাংবাদিক পরিচয়টি পেয়েছিলেন। তাই আমার দিকে দেখছেন একটু বিশেষ নজরে। ভদ্রলোক যতবার আমার দিকে তাকান ততবার আমার ভেতরটা এক প্রকার কেঁপে ওঠে। আমি জানি পুলিশ বনাম সাংবাদিকের সম্পর্কটা এক অদ্ভুত কিসিমের। অনেক সাংবাদিক থানা বা ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের রুমে হরদম বসে থাকেন। গল্পগুজব করেন, চা–নাস্তা খান। আবার সেই পুলিশ কোনো ছুঁতো পেলে সাংবাদিকদের বেধড়ক পেটায়।
এবারও উত্তর না পেয়ে তা নিজেই দিলেন। কুরাইশ মানে ব্যবসায়ী। অর্থাৎ নবীজি ব্যবসায়ী বংশে জন্ম নিছিলেন। কেন নিছিলেন সেই কথা জানেন? পন্ডিতের সামনে বসে থাকা মূর্খের দলের মতো আমরা সমবেতভাবে মাথা নেড়ে জানিয়ে দিলাম, জানি না। আমাদের এহেন অজ্ঞতায় দারোগা সাহেব উত্তেজিত হলেন না। বরং করুণার হাসি হাসলেন। মুখে হাসি ধরে রেখে বললেন, মুসলমানের জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) কাবাঘর নির্মাণ করার পর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, ইব্রাহিম তুমি কী চাও আমার কাছে? ইব্রাহিম (আ.) বললেন, হে আল্লাহ, তুমি তো শেষ নবী পাঠাবে দুনিয়ায়। সেই নবী যেন আমার বংশে জন্ম নেন। তাই আমাদের নবীজি জন্ম নিয়েছেন কুরাইশ বংশে অর্থাৎ ব্যবসায়ী বংশে। সেই জন্য আমি ব্যবসায়ীদের খুব সম্মান করে থাকি। আমি চোখে–মুখে মুগ্ধতার ছাপ আনার চেষ্টা করে বললাম, বাহ! বেশ, জানতাম নাতো! ভেতরে ভেতরে আরও বেশি বিস্মিত হয়ে ভাবছিলাম, এই ওয়াজকারীই কয়েক ঘণ্টা আগে দুই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বান্ডিল গ্রহণ করেছেন।
এটি কয়েক মাস আগের ঘটনা। রিপোর্টটি এখনো ঝুলে আছে। দু’পক্ষ আগে দারোগাকে ‘ম্যানেজ’ করে চলছেন।
২। নিয়মিত বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে যান–এমন কয়েকজন আমাকে পেট্রোল পুলিশের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ করে অনুরোধ করেছেন লিখতে। তাদের অভিযোগ জানার পর আমি নিজেও বিষয়টি খেয়াল করেছি। টাইগারপাস মোড় থেকে আমবাগান সড়ক এবং জাকির হোসেন সড়কের বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সামনে প্রতিদিন পেট্রোল পুলিশের গাড়ি দেখা যায়। তারা যানবাহন থামিয়ে চেক করে থাকেন। তবে তাদের হাতে অধিকাংশ সময় নিরীহ যাত্রীরা হয়রানির শিকার হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। আমবাগান সড়কে টিকিট প্রিন্টিং কলোনি স্কুলের সামনে এবং বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সামনে দায়িত্বরত পুলিশরা অধিকাংশ সময় যুগল তরুণ–তরুণীদের ধরে হেনস্থা করেন। অভিযোগ আছে এমন কাউকে পেলে তারা নানাবিধ আপত্তিকর প্রশ্ন করেন, আচরণ করেন এবং মামলা ও আটক করার ভয় দেখিয়ে বিশেষ করে পুরুষের কাছ থেকে টাকা–পয়সা মোবাইল ইত্যাদি হাতিয়ে নেন। মেয়েদের ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি করেন। থানা–পুলিশ এবং অভিভাবকদের কানে যাবে এই ভয়ে তরুণ–তরুণীরা পুলিশের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন। চট্টগ্রামের অন্যতম পর্যটন এলাকা ফয়’স লেকে বেড়াতে যাওয়া নারী–পুরুষরা এই হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন।
একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও আধুনিক সমাজে তরুণ–তরুণীরাইতো প্রেম করবে, ঘুরবে, আনন্দ করবে। তাতে দোষের তো কিছু নেই। বাংলাদেশ তো সমকামীদের রাষ্ট্র নয় যে এখানে মেয়ে–মেয়ে, পুরুষ–পুরুষ ঘুরে বেড়াবে। কেউ যদি যৌবনে প্রেমই না করে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণবোধ না করে তাহলে বুঝতে হবে তার শারীরিক সমস্যা আছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হতে পারে তাদের মেলামেশা ছিল ‘আপত্তিকর’! প্রকাশ্য বেবি ট্যাক্সিতে কী আর এমন আপত্তিকর হতে পারে। দু’জনের মধ্যে যে কোনো একজন আপত্তি না করা পর্যন্ত সম্পর্কটি আপত্তিকর হয় কি করে? তরুণ–তরুণীদের এই ধরনের হয়রানি নিয়ে রিকশা ও বেবি ট্যাক্সি চালকরাও অভিযোগ করেছেন প্রচুর। বহুদিন থেকে শহরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ এমন হয়রানি ও ঝামেলা করে আসছে। প্রেম করা, প্রেমিকের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া কোনো অপরাধ নয়। শহরে অনেক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, অহরহ, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটছে। পুলিশ নিরীহ নারী–পুরুষদের হয়রানি না করে সেদিকটায় নজর দিক। এই লেখাটি পুলিশ বিভাগের কারো নজরে পড়বে কি না জানি না। একটি বিষয়ে জানার আগ্রহ হচ্ছে– তাহলো, পুলিশের হয়রানি বন্ধে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে কোনো প্রতিকার পাওয়া যাবে কী? যদি যায় তবে নতুন পুলিশ কমিশনার এ বিষয়ে জনগণকে অবহিত করতে পারেন। তাদের অভয় দিতে পারেন।
৩। ছেলেটির নাম শান্ত। মাত্র দু–আড়াই বছর হলো পুলিশে চাকরি হয়েছে। সার্জেন্ট হিসেবে চট্টগ্রামে বদলি হয়ে এসেছে। বাড়িও তার চট্টগ্রামে। লেখালেখির অভ্যাস আছে। সে সূত্রে আমার কাছে আসে। নানাপ্রকার গল্প করে। ইদানীং তার চাকরির বিড়ম্বনা নিয়ে কথা বলে। সার্জেন্ট হওয়ার কারণে তাকে দায়িত্ব পালন করতে হয় সড়কেই। প্রতিদিন তাই তাকে অসংখ্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে হয়। ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে গিয়ে নানা প্রকার ঝামেলা পোহাতে হয়। দেশের বিত্তশালী ও ক্ষমতাবানরা কীভাবে আইন কানুনকে তুচ্ছ করে তার বর্ণনা দেয়। মাঝেমধ্যে চাকরি খোয়া বা বদলি করে দেওয়ার হুমকিও তাকে শুনতে হয়। সে অনেক অনিয়মের কথা বলে, তার আশাভঙ্গের কথা বলে। পাশাপাশি তার স্বপ্নের কথাও বলে। সম্প্রতি সে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে বই সংগ্রহ করছে। দু’দিন আগে আমাকে ফোন করে বই রাখতে বলেছে। বান্দরবানের গহীন গভীর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সে শিশুদের জন্য পাঠাগার গড়তে চায়, তাদের হাতে বই তুলে দিতে চায়। আমি শান্তর কথা ভাবি। ভাবি তার মতো তরুণদের কথা যারা এখনো একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখে। ভাবি শান্তদের মতো অনেক তরুণ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করে যারা চিন্তা–চেতনায় এখনো সজীব ও সৎ। দেশটিকে পাল্টে দিতে এমন তরুণদের দরকার। এমন তরুণদের আরও উৎসাহিত করা দরকার। পুলিশ বিভাগে কুরাইশ বংশের মাহাত্মা বর্ণনাকারী দারোগারা কমে গিয়ে শান্তদের সংখ্যা যেদিন বৃদ্ধি পাবে সেদিন আমার মতো কেউ থানায় যেতে ভয় পাবে না। কারণ তখন তিনি নিশ্চিত হবেন সেখানে অন্তত একজন ঘুষখোরের মুখে ওয়াজ–নসিহত শুনতে হবে না।
আমি যে তিনটি স্থানে যেতে ভয় পাই বলেছি। আমি জানি আমাকে সেখানে যেতে হবে। না গিয়ে উপায় থাকবে না। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়েই সেখানে যেতে হবে। এমন একটি দিন আসুক, আমাদের সন্তানরা সে পরিবর্তনের কান্ডারি হয়ে উঠুক। নতুন শিক্ষিত, মার্জিত ও দেশপ্রেমিক সন্তানরা বদলে দিক বাংলাদেশকে। সেদিন কোথাও যেতে কারো কোনো দ্বিধা থাকবে না।
Email: [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।