দেশীয় ফল, ফরমালিনভ্রান্তি ও পরিবহন সমস্যা-কামরুল হাসান বাদললেখক,কবি, সাংবাদিক ও টিভি ব্যক্তিত্ব

পোস্ট করা হয়েছে 28/06/2018-09:51pm:    ভদ্রলোক কৃষি অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা। একটি অনুষ্ঠানে আলাপ হচ্ছিল তাঁর সাথে। এক পর্যায়ে বললেন, ফরমালিন প্রয়োগ নিয়ে ভুল তথ্য প্রচার হচ্ছে, মানুষের মনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে এবং সে সাথে আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষতিও হচ্ছে। আপনারাতো কিছু বলছেন না, লিখছেন না। বললাম ব্যাখ্যা করুন। ভদ্রলোক বললেন, আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি ফলে ফরমালিন কার্যকর হয় না। আম, জাম, লিচু, আনারস এমনকি বিদেশি ফলমূল আপেল, অরেঞ্জ ইত্যাদিতে ফরমালিন দিলে তা থাকবে না, উড়ে যাবে। ফরমালিন একমাত্র কার্যকর হয় প্রাণিজ প্রোটিনের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ মাছ-মাংস ইত্যাদিতে। মাছ-মাংস ছাড়া অন্যকিছুতে ফরমালিন মেশালেও তা থাকবে না এবং পচনরোধ করার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব তৈরি করবে না।
আমসহ অন্যান্য ফলে ফরমালিন পাওয়া যাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রচুর পরিমাণ আম ধ্বংস করছে, তা কিসের ওপর ভিত্তি করে। ভদ্রলোক খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, অজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে। যাঁরা এমন অভিযান পরিচালনা করে থাকেন তাঁরা বিষয়টি জানেন না। যাঁরা জানেন, অভিযানের সময় তাঁদের ডাকা হয় না, রাখা হয় না এবং তাঁদের কোনো মতামত নেওয়া হয় না। শুধু অজ্ঞতার কারণে টন-টন আম বা দেশীয় ফল ধ্বংস করা হচ্ছে। বললাম, আমেতো ফরমালিনের উপসি’তি আছে। তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, প্রতিটি ফলে প্রাকৃতিক ফরমালিন থাকে। পরীক্ষা করলে প্রতিটি ফলে ফরমালিন পাওয়া যাবে। প্রকৃতিই তার নিজস্ব নিয়ম ও রক্ষাব্যুহ তৈরি করে। সে কারণে ফল পাকার জন্য এবং পাকলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ফলটি খাওয়ার উপযুক্ত থাকতে প্রাকৃতিকভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে থাকে। প্রশ্ন করলাম, আপেল পচে না কেন? তিনি তার ব্যাখ্যা দিলেন। তিনি বললেন, আপেল রফতানির আগে তার ওপর হালকা একটি মোমের প্রলেপ দেওয়া হয় যাতে ফলটির আর্দ্রতা বজায় থাকে। যে জন্য আপেল বা এই ধরনের ফল সহজে পচে না। তিনি বললেন, আপেল প্রাকৃতিকভাবে বেশিদিন টাটকা থাকে।
কথা বলছিলাম, কৃষিবিদ আমিনুল হকের সাথে। তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. রেয়াজুল হক। দুজনেই অনুরোধ করলেন ফরমালিন ও ইথোফেন নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে যেন কিছু লিখি। তাঁদের অনুরোধের উত্তরে বললাম, আপনারাই বিষয়টি পরিষ্কার করছেন না কেন? আপনারাই বা গণমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরে বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করছেন না কেন। তাঁরা অনেক কথা বললেন, কিছু ক্ষোভ ও বঞ্চনার কথাও বললেন। সবকথা প্রকাশ করা যায় না বলে আমিও তা প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকলাম। এই আলাপের ঘটনা ঘটেছিল গত বছরের এমনই একটি সময়ে। এর কয়েক মাস পরে একটি জাতীয় পত্রিকায় এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়েছিল। তবে আমি মনে করি বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা ও বিতর্কের অবকাশ আছে, প্রয়োজন আছে। এ বছর আমের মৌসুম শুরু হওয়ার আগে আগে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স’ানে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করে অপরিপক্ক কিন’ কৃত্রিম উপায়ে পাকা আম উদ্ধার ও ধ্বংস করে। এ বিষয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছিল ফল পাকানোর জন্য ইথোফেনের ব্যবহার বিশ্বস্বীকৃত পন’া। তাতে স্বাসে’্যর জন্য ক্ষতিকর তেমন কিছু নেই। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করেছিলাম ডা. রেয়াজুল হকের সাথে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হক বললেন, ইথোফেন একটি হরমোন। এটি ফল পাকাতে বিশ্বস্বীকৃত উপাদান। যাতে শরীরে ক্ষতি করার মতো কিছু নেই। তবে অপরিপক্ক ফল হরমোন দিয়ে পাকালে তার খাদ্যগুণ কমে যেতে পারে শুধু।
যা হোক আমরা খুব সাধারণ মানুষ। ফলে অনেক খুঁটিনাটি বিষয় আমাদের জানার কথা নয়। বিষয়টি যেহেতু নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্ন সেহেতু তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হওয়া দরকার। কোনো অনিরাপদ খাদ্যও যেনো আমরা গ্রহণ না করি তেমনি করে ভুলজ্ঞানে দেশীয় ফলগুলোও যেন ধ্বংস না করি। সবচেয়ে ভালো হয় যদি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের সময় খাদ্য বিশেষজ্ঞ, পুষ্টিবিদ ও কৃষি দপ্তরের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরও সম্পৃক্ত করা হয়। পূর্বের যে কোনো সময়ের চেয়ে বাংলাদেশে এখন কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবজি, ফল ইত্যাদির উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। মানুষ এখন আবার দেশীয় ফলের দিকে ঝুঁকছে। কাজেই আমাদের উৎপাদিত পণ্য কীভাবে নিরাপদ করা যায় এবং সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তোলা যায় তার উদ্যোগ নিতে হবে।
এ বছর আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। শহরের সর্বত্র আমের ছড়াছড়ি দেখে তা সহজে বোঝা যায়। দামও বেশ সস্তা। জামালখান-মোমিনরোড এলাকায় কোনো কোনো ঠেলাগাড়িতে দেখলাম ৩০ টাকা করে প্রতি কেজি আম বিক্রি করছে। আম ভেদে অবশ্য ৮০ টাকা দামের আমও আছে। ৩০ টাকা করে যে আম বিক্রি হচ্ছে তা-ও খেতে মন্দ নয়। আমি ভাবি এই দামে আম বিক্রি সম্ভব হচ্ছে কীভাবে।
চট্টগ্রাম মহানগর পর্যন্ত পৌঁছে এই আম ৩০ টাকা কেজি বিক্রি হলে এর উৎপাদক অর্থাৎ আমচাষি কত দাম পেয়েছেন? আমের রাজধানী বলে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীতে গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই সর্বনিম্ন দরে আম বেচাকেনা হচ্ছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে। আমে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় অনেক চাষির মাথায় হাত পড়েছে। প্রায় অর্ধেক চাষি পুঁজি হারানোর আশঙ্কা করছেন। কয়েকদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়েছে বাগানে যে আমের কেজি দশ টাকা সে আম ঢাকার বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। আরেকটি সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে গুটিজাতের প্রতিমন আম বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায় অর্থাৎ প্রতিকেজি সাড়ে ১২ টাকায়। গত কয়েক বছর থেকে ধানের প্রকৃত মূল্য না পেয়ে এবং ধানকাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া চাষিরা এ বছর অধিকহারে আমচাষে ঝুঁকেছিলেন। কিন’ বিধিবাম। আমচাষেও তারা এখন ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
আমের প্রকৃত দাম পাচ্ছে না চাষিরা। এর জন্য দায়ী মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়া ব্যবসায়ী এবং পরিবহন সংকট। বাংলাদেশে পরিবহন ব্যয় অত্যন্ত বেশি। তার ওপর রয়েছে দীর্ঘ যানজটে আটকে পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি। দেশে সড়কপথে ট্রাকেই বেশি পণ্য পরিবহন করা হয়। কিন’ পথে পথে অনেক স’ানে, অনেক গ্রুপ, সংস’া, প্রতিষ্ঠানকে চাঁদা প্রদান করতে হয় বলে যে ট্রাকের ভাড়া ১০ হাজার টাকা হওয়া উচিত তা তখন ২০ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকে। বাংলাদেশে প্রচুর আম উৎপাদিত হলেও চাষিরা তা সরাসরি শহরে এসে বিক্রি করার সুযোগ পায় না। কেউ কেউ অর্থাভাবে অগ্রিম বিক্রি করে অন্যরা পরিবহন ঝামেলা এড়াতে তা ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়।
দেশে প্রতি মৌসুমে আমচাষিসহ অন্যান্য উৎপাদকদের জন্য সহজ বিপণন ব্যবস’া গড়ে তোলা যেত তাহলে প্রান্তিক উৎপাদকরা লাভবান হতেন। উৎপাদন বেড়েছে সে সাথে সরকারের উচিত তা সুষ্ঠু বিপণনের ব্যবস’া করে দিয়ে চাষিদের স্বার্থরক্ষা করা। বিশ্বের প্রায় সবদেশেই পরিবহন ও বিপণন ব্যবস’া তদারকি করে কৃষকদের স্বার্থরক্ষা করে সে দেশের সরকার। আমাদের সরকারকেও চাষিদের পাশে দাঁড়াতে হবে। নতুবা উৎপাদনের যে মহাযাত্রা শুরু হয়েছে তা মাঝপথেই থেমে যাবে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক

সর্বশেষ সংবাদ