বারবার বলতে হয় যেসব কথা- কামরুল হাসান বাদল,লেখক,কবি, সাংবাদিক ও টিভি ব্যক্তিত্ব

পোস্ট করা হয়েছে 30/05/2018-09:15am:    আমার অনেক লেখায় এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। তারপরও কিছুদিন পরপর আমাকে তা নিয়ে লিখতে হয়। কারণ পরিসি’তির কোনোরূপ উত্তরণ হয়নি বলে লিখতে হয়। তরুণীটির কণ্ঠে যেন সারা বিশ্বের অপমানিত, লাঞ্ছিত নারীদের মর্মবেদনার সুর বেজে উঠছিল। মেয়েটি বলছে, আমার বয়স তখন মাত্র ১২ বছর। আমাকে বাসায় রেখে মা-বাবা গেছেন হাসপাতালে। সে সময় বাসায় আসেন আমাদের এক পারিবারিক বন্ধু। মা তাঁকে কাকা বলে সম্বোধন করতেন বয়স পঞ্চান্নের মতো। একা পেয়ে লোকটি ইচ্ছেমতো নোংরা আচরণ করলো আমার সাথে। আমি স্তম্ভিত, স’বির। আমি বাধা দিতে পারলাম না। তারপর দীর্ঘদিন সে লোকটি আমার ওপর যৌন-নির্যাতন চালিয়েছে, যা আমি মা-বাবাকে জানাতে পারিনি। এ বর্ণনা দেয়ার সময় মেয়েটির চোখ বেয়ে নামছিল অঝোর ধারা, চোখ মুছে ছিলেন উপস’াপক আর বেদনা ও ক্ষোভে হতবিহবল উপসি’ত দর্শক। এরপরে একটি তরুণের করুণ অভিজ্ঞতার বর্ণনা। তখন তার বয়স মাত্র সাড়ে ছ’ বছর। গোসলখানায় গা ধুয়ে দিচ্ছিল বয়স্ক এক আত্মীয়। স্বাভাবিকভাবে শিশুটি ছিল নগ্ন। গোসল করানোর ফাঁকে শিশুটির মা কিছুক্ষণের জন্যে ঘরের বাইরে গেলে নোংরামীতে মেতে ওঠে পুুরুষটি। তরুণটি তাঁর এই করুণ অভিজ্ঞতা ও নিপীড়নের বর্ণনা দেয়ার সময়ও কাঁদছিলেন। সাথে বিস্মিত উপস’াপক ও হলভর্তি দর্শকও। প্রিয় পাঠক, এ দৃশ্য ভারতের একটি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলের নতুন অনুষ্ঠান ‘সত্যমেব জয়তের’ দ্বিতীয় এপিসোডের। অনুষ্ঠানটির নির্মাতা ও উপস’াপক মুম্বাইয়ের জনপ্রিয় অভিনেতা’ ‘মিস্টার পারফেক্সনিস্ট’ হিসেবে খ্যাত আমির খান। কয়েক বছর আগের ঘটনা, এখন অনুষ্ঠানটি আর প্রচার হয় না। নিজস্ব প্রডাকসন্স হাউজ থেকে নির্মিত এ অনুষ্ঠানের প্রযোজক ছিলেন আমির খানের স্ত্রী কিরণ। ঝলমলে মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগৎ আর পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী, সামপ্রতিক বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত গণতান্ত্রিক ভারতের সমাজের গোপন, অন্ধকার দিক এটি। আমির খান অত্যন্ত নিষ্ঠা, সাহস আর আন্তরিকতার সাথে এ অনুষ্ঠানটি নির্মাণ করলেও আমি মনে করি এতে সবচেয়ে সাহসী ভূমিকাটি পালন করেছে দুজন তরুণ তরুণী বিশেষ করে তরুণীটি। এমন প্রকাশ্যে সে তার ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিতে এতটুকু কুণ্ঠিত হয়নি, বরং সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে সে বলেছে, আমি যখন এ অনুষ্ঠানে এসে এসব বলব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তখন অনেকেই আমাকে বলেছে আমি এখনো অবিবাহিত বলে সমস্যা হতে পারে। এ পর্যায়ে তরুণটি একটু রসিকতা করেই বললো, আমি মনে করি বরং এ অনুষ্ঠানটি দেখার পরেই আমার বিয়ের প্রস্তাব আসতে পারে। অনুষ্ঠানটি দেখতে দেখতে আমার মনে হলো, বাংলাদেশে কি এমন একটি অনুষ্ঠান করা সম্ভব? কোনো টিভি চ্যানেল কিংবা কোনো নির্মাতা প্রাতিষ্ঠানিক এমন একটি ভূমিকা নিতে পারে? যদি কেউ উদ্যোগ নেয়ও এমন কাউকে কি পাওয়া যাবে যিনি বা যাঁরা তাঁদের জীবনের অপমানের কষ্টের, লাঞ্ছনার কথা এমনভাবে তুলে ধরতে পারবেন? এই রাষ্ট্র, এই সমাজ, এই ধর্মীয় অনুশাসন তা কি করতে দেবে? না কি মেনে নিতে হবে আমাদের দেশে আমাদের সমাজে, আমাদের পরিবারে এমন ঘটনা ঘটে না? সত্যি কি তাই। শুধু এদেশের কেন, আমারতো মনে হয় পৃথিবীর কোন নারীই বলতে পারবেন না জীবনের কোনো না কোনো সময়ে কারো না কারো দ্বারা তিনি অপমানিত হননি, খুলে বললে যৌন হয়রানির শিকার হননি। চাহনি, কথা, ইশারা বা ব্যবহারে? আমি শুধু নারীদের কথাইবা বলছি কেন? এমন বিকৃত পুরুষের দ্বারা (ছেলে) শিশু-কিশোররাও কি নির্যাতিত হয়নি? আমার নিজের শিশু ও কৈশোর কালটিও তো কেটেছে এমন আতংক আর নিরাপত্তাহীনতায়। একজন পুরুষের চেহারা কতটা কদর্য হতে পারে একজন পুরুষ হয়েও আমি কতবার তা প্রত্যক্ষ করেছি। এ বিষয়ে সবচেয়ে ভাল বলেছিলেন বিখ্যাত ছড়াশিল্পী লুৎফর রহমান রিটন। ’৯৭, ’৯৮ সালের দিকের ঘটনা। তিনি তখন ‘ছোটদের কাগজ’ বের করছেন। বাংলা একাডেমির মাঠে আড্ডা দিতে দিতে উঠে এসেছিল প্রসঙ্গটি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মেয়ের ব্যাপারে আমি আমার বাবাকেও বিশ্বাস করি না’। এরপরে “মেয়ে তুমি বড় হচ্ছো” প্রচ্ছদ কাহিনী করে ছোটদের কাগজের একটি সংখ্যাও করেছিলেন। ও সংখ্যায় তিনি মেয়েদের বেড়ে ওঠার সময়ের বিভিন্ন প্রশ্ন ও সমস্যার বিষয়ে চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। পরে ‘ছেলে তুমি বড় হচ্ছো’ বিষয়ে আরেকটি সংখ্যা করার কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আমার জানা এক মহিলার অভিজ্ঞতার কথা বলি। স্কুল জীবনে সে তার গৃহ শিক্ষকের দ্বারা আপত্তিকর আচরণের শিকার হলেও সে কখনো তা তার মা-বাবাকে জানাতে সাহস পায়নি কারণ তার বাবা মা’র অগাধ আস’া ছিল গৃহ শিক্ষকটির প্রতি। এই শিক্ষকটি তাঁর বিকৃতি চরিতার্থ করতে না পারলে পড়া না পারার অজুহাতে কিশোরীটিকে যখন বেদম প্রহার করতো তখনও তাতে তার বাবা মা’রও সায় থাকতো। এমন ঘটনা এদেশের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরেইতো ঘটে। মেয়েরাতো প্রথম নিপীড়নের শিকার হয় পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনদের দ্বারা। এ আত্মীয়রা বয়স, মর্যাদা ও সম্পর্কে এমন অবস’ানের হয় যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা একটি শিশু বা উঠতি বয়সী কারু পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় চতুর পুরুষরা, বাহিরে যারা চরম ভদ্র, পরহেজগার বা ভীষণ খ্যাতিমান। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে থাকে বাসার কাজের লোক, ড্রাইভার এমন কি যে কেউ। বস’ত নারী কোথাও নিরাপদ নয়। কোনো পুরুষের কাছে, সম্পর্কে সে যাই-ই হোক। এ অভিজ্ঞতা কমবেশি সব নারীরই আছে। এই চরম পুরুষশাসিত সমাজে এটাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এমন নিপীড়নের শিকার হওয়া শিশুদের মানসিক বিকাশ স্বাভাবিক হবে না। তাদের মধ্যে তৈরি হতে পারে নানাবিধ উপসর্গ। অবশেসনে ভুগতে পারে তারা, তৈরি হতে পারে পুরুষের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা ও ঘৃণা। স্বাভাবিক জীবনযাপন চিন্তা ও পড়াশোনায়ও বিঘ্ন ঘটতে পারে তাদের। এমনকি তাদের মধ্যে জন্ম নিতে পারে এমন বিকৃতিরও। প্রিয় পাঠক, একটি সন্তান জন্ম দিয়ে তাকে খাওয়া পড়া আর বিদ্যালয়ে পাঠিয়েই মা বাবার কর্তব্য শেষ হতে পারে না। ফুলের মতো শিশুদের জীবনকে বিকশিত করে তুলতে মা-বাবার আরও সতর্ক ও মনোযোগী হওয়া জরুরি। কাজেই যে কোনোভাবে, যে কোনো কিছুর বিনিময়ে আপনার সন্তানের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলুন। সে যেন তার যে কোনো সমস্যা বা প্রশ্ন নিয়ে আপনার সাথে খোলামেলা আলোচনা করতে পারে, সে পরিবেশ গড়ে তুলুন। তাকে অভয় দিন। তার মতামত বা পছন্দ অপছন্দকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিন। কারো ব্যবহার বা আচরণ নিয়ে অভিযোগ করলে তাকে তিরস্কার বা ধমক না দিয়ে কৌশলে তার অভিযোগ খতিয়ে দেখার চেষ্টা করুন। বিভিন্ন হোস্টেল, মাদ্রাসা, মক্তব বা এমন ধরনের প্রতিষ্ঠানে সাধারণত যেখানে কো-এডুকেশন নেই শিশু-কিশোর এমনকি তরুণরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হোস্টেলগুলোতে র্যাগিংয়ের নামে সিনিয়ররা জুনিয়রদের ওপর যে ধরনের পাশবিক নির্যাতন চালায় তার বর্ণনা যে কোন সুস’ মানুষকে স্তম্ভিত করে দেবে। আমাদের সমাজে এমন অনেক ধরনের দুষ্কর্ম, ব্যভিচার প্রচলিত আছে যা নিয়ে আলোচনা করতেও আমরা বিব্রতবোধ করি। তার কারণ হয়ত এমন যে কেঁচো খুড়তে শেষে না সাপ বেরিয়ে আসে। আমার এমন একটি লেখায় অনেকে অস্বস্তি বা বিরক্তিবোধ করতে পারেন। কিন’ আমি বলতে চাই একটি সুস’ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের জন্যে চাই সুস’ মানসিকতার মানুষ। আর একজন মানুষ তৈরি হয় অর্থাৎ একজন মানুষের প্রকৃত মানসিক বিকাশের ভিত্তিটা তৈরি হয় তার প্রথম দশ বছরের মধ্যেই। এসময় একটি শিশুর সুস’ পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে তার মানসিক বিকাশও সুস’ভাবে হবে না। কাজেই আমরা যা-ই করিনা কেন আমার আপনার সন্তান কীভাবে বা কোন পরিবেশে বড় হচ্ছে তা লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। প্রয়োজন তার জন্যে একটি সুন্দর, পবিত্র ও আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করা। একটি জাতি কতটা সভ্য তা নির্ধারিত হয় সে জাতি তার নারী ও শিশুদের ওপর কী ধরনের আচরণ করছে তার ওপর। একটি ছেলে যখন একটি মেয়েকে উত্ত্যক্ত করে তা অনেকের চোখে পড়ে কারণ বিপরীত লিঙ্গ বলে এবং তা ইভ-টিজিং হিসেবে চিহ্নিত হয়। কিন’ একটি ছেলে যখন অপর আরেকটি পুরুষ কর্তৃক উত্ত্যক্ত হয় তখন তা অনেকের চোখে পড়তে না, অনেকে তা দোষ হিসেবেও নেয় না। সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া গেলে হয়ত বলা যেতো এদেশে ধর্ষণের চেয়ে বলাৎকারের সংখ্যাও কম নয়। এদেশে শিশুদের আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করতে হলে এসবের বিরুদ্ধে সমাজের ভেতরেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ‘সত্যমেব জয়তে’র আরেকটি এপিসোডে আমির খান শিশুদের শিখিয়ে দিয়েছিলেন, বড়দের কোন কোন আপত্তিকর আচরণের প্রতিবাদ করবে তারা। আর কিছু না হোক চিৎকার করে হলেও যেন আশেপাশের কাউকে জানিয়ে দেয় তার অস্বস্তির কথা। ভিডিওটি ইউটিউবে পাওয়া যায়। অভিভাবকদের উচিত ভিডিওটি তাদের সন্তানদের দেখানো।

সর্বশেষ সংবাদ