দূরের টানে বাহির পানে, হাসান আকবর-লেখক,সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 30/05/2018-09:11am:    কেবলই ছুটছিল আমাদের টেক্সি। প্যারিস নগরীর কোন প্রান্ত থেকে যে কোন প্রান্তে ছুটছি বুঝতে পারছিলাম না। তবে কেবলই ছুটে চলছিলাম। প্যারিসের রাস্তা নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। কারণ রাস্তাটি প্যারিসের। ইউরোপের আর দশটি শহরের মতো এই শহরের রাস্তাও যেন থালার উপর সাজিয়ে রাখা চালের রুটি। একেবারে মসৃণ। কোন খানাখন্দক নেই। ভাঙাচোরার তো প্রশ্নই উঠে না। কয়েকশ’ বছরের প্রাচীন এই নগরীতে বহু পুরানো বাড়ি ঘর থাকলেও রাস্তাগুলো চকচকে। আসন্ন অলিম্পিককে ঘিরে প্যারিস নগরীকে সাজানোর উৎসব শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের অলিম্পিক নিয়ে এখনই তোড়জোড়! বেশ কয়েকটি শতবর্ষী মেট্রো স্টেশনকে পুরোপুরি নয়া করে গড়ে তোলা হচ্ছে। তবে আদল রাখা হচ্ছে সেই শতবর্ষী। অলিম্পিকের জন্য তৈরি হচ্ছে প্যারিস। বিশ্বকে তাক লাগানোর প্রস্তুতিতে মাঠে নেমেছে প্যারিস। যাক, আমরা টেক্সি নিয়ে ছুটছি সোহেল ভাইর বাড়ির দিকে। উনি কোথায় থাকেন তা আমরা জানি না। আমাদের হোটেল থেকে কতদূরে তাও অজানা। তবে নিজের বাড়ির ঠিকানা এসএমএস করে দিয়েছেন সোহেল ভাই। বলেছেন, যে কোন টেক্সিকে ঠিকানা দিলে তারা জিপিএস দিয়ে নিয়ে যাবে। ভাড়া নিয়ে দরাদরি করতে হবে না। মিটারেই ভাড়া উঠবে। এখানে টেক্সি ভাড়ার নামে অহেতুক কারো গলা কাটা হয়না। কারো সাথে প্রতারণাও নয়। সোহেল ভাই প্রতিদিন ট্রেনে যাতায়াত করেন। আমাদেরকেও ট্রেনের রুট বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু এডিটর স্যার (দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক) বললেন, ‘এই রাত বিরাতে এত খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে সমস্যায় পড়বো। টেক্সি নিয়ে নাও।’ আমীর হুমায়ুন ভাইও এডিটর স্যারের সাথে কণ্ঠ মিলালেন। এতে করে আমরা ছুটছি টেক্সিতে। কিন্তু পথ যেন ফুরোচ্ছে না। আমার চোখ টেক্সির মিটারে। মনে হচ্ছে চরকার মতো ঘুরছে। মিটার ঘোরার শব্দ আমি টের পাচ্ছিলাম বুকের গভীরে। মিটারের ভাড়া নিয়ে আমার আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। মিটারে ভাড়া যা উঠুক না কেন তা আমাকে দিতে হবে না, কারণ এডিটর স্যারের সঙ্গে থাকলে আমার খরচ করতে হয়না। এটা অঘোষিতভাবে নিয়ম হয়ে গেছে। যা ইচ্ছে খরচ করা যায়। যা ইচ্ছে খাওয়া যায়। যেভাবে ইচ্ছে উড়া যায়। টাকা–পয়সা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়না। কিন্তু এত দূর কেন? সোহেল ভাই কী প্রতিদিন এত দূর থেকে আমাদের কাছে যেতেন? আহারে!! শহরের কোন দিকে ছুটছি কে জানে? ঠিকানা ভুল করলো কিনা তাও বুঝতেছি না। জায়গার নাম পড়ে যে সোহেল ভাইকে জানাবো সেই সুযোগও পাচ্ছি না। আশে পাশের সাইনবোর্ডগুলোর একটিও ইংরেজীতে নেই। সবগুলো অচিন ভাষায়। ফরাসি। ফ্রান্সের সাথে ইংল্যান্ডের দূরত্ব ছোট্ট একটি নদী। ইংলিশ চ্যানেল। ইংলিশ চ্যানেলের এপারে ফ্রান্স ওপারে ইংল্যান্ড। ভাষা হিসেবে ইংরেজী বিশ্বজয় করলেও একেবারে পাশের দেশ ফ্রান্সে ঢুকতে পারেনি। জয়তো বহু দূরের কথা। ফ্রান্সের লোকজন পারতপক্ষে একটি শব্দও ইংরেজী বলেন না। বলতে চান না। তারকাখচিত হোটেল রেস্তোরাঁগুলোতে কিছু ইংরেজীর চলন থাকলেও সাধারণ মানের হোটেল রেস্তোরাঁয় কিংবা দোকানপাটে নৈব নৈব। প্যারিসে কিছু করতে হলে আপনাকে ফরাসি ভাষা শিখতে হবে। ইংরেজেরাও ফরাসি শিখে ফ্রান্সে ব্যবসা বাণিজ্য করেন, ইংরেজদের স্বাগত জানাতে ফরাসিরা ইংরেজী শিখেন না। শুধু ভাষার দিকে নয়, প্রাত্যহিক জীবনেও ফরাসিরা ইংরেজদের শুধু মনে মনে নয়, প্রাণ উজাড় করেই ঘৃণা করেন। জেলে বলেও প্রকাশ্যে গালি দেন। ইংরেজেরাও যে ফরাসিদের গালি দেন না তা নয়। দুই জাতির মধ্যে শুরু হওয়া বিশ্বযুদ্ধকালীন বিরোধ যেন কিছুতেই ফুরোচ্ছে না। ছুটছিল টেক্সি। কোথায় যে যাচ্ছি কে জানে! মিটারের অংক যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে তাও বুঝতে পারছিলাম না। ইতোমধ্যে পঞ্চাশ ইউরো পার হয়ে গেছে। মানে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা! আরও কতদূর যেতে হবে তাও অজানা। ভাড়া যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা নিয়ে রীতিমতো আতংকিত হয়ে উঠলাম আমি। এডিটর স্যার ছাড়াও চিটাগাং সোস্যাল বিজনেস সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী এবং সাংবাদিক ওসমান গনি মনসুর রয়েছেন টেক্সিতে। গল্পে গল্পে এগুচ্ছিলাম আমরা। নানা বিষয়ে ‘চাঁটগাইয়্যা’ ভাষায় আমাদের জম্পেশ আড্ডা চলছিল। ফরাসি টেক্সিচালক কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। তিনি শুধু মাঝে মাঝে আমাদের দিকে তাকিয়ে একটু করে হেসে দিচ্ছিলেন। তার ভাবটা এমন যে তিনি যেন সব বুঝতে পারছেন! আমি ইংরেজীতে আর কতদূর যেতে হবে জিজ্ঞেস করলাম। ভাঙা ভাঙা ইংরেজীতে তিনি বুঝালেন যে, আর বেশি দূর নেই। একটি জায়গায় দুইবার চক্কর দিল টেক্সি। জিপিএস দেখাচ্ছে যে, চলে এসেছি। সোহেল ভাই বলছেন, তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু সোহেল ভাইকে আমরা দেখছিলাম না। তাই দুইবার চক্কর দিল গাড়ি। ষাট ইউরো ভাড়া দিয়ে আমরা নামলাম। সোহেল ভাইর সাথে দেখা হয়ে গেল। ছোটখাটো একটি মার্কেট এবং রেলওয়ে স্টেশনের কাছেই সোহেল ভাইর বাড়ি। এডিটর স্যার মার্কেটের দিকে গেলেন। বাসার জন্য কিছু ফলমূল কিনতে। কিন্তু সোহেল ভাই আমাদের চারজনের সাথে এমন করে কুস্তি খেলা শুরু করলেন যে, কিছুই কেনা গেল না। অনেকটা টানতে টানতে, ঠেলতে ঠেলতে তিনি আমাদেরকে মার্কেটের সামনে থেকে বাসার দিকে নিয়ে আসলেন। আমরা কিছুটা মনক্ষুণ্ন হলেও কিছু করতে পারলাম না। চমৎকার সাজানো গোছানো একটি ড্রয়িং রুম। বিশাল বিশাল সোফা। এক পাশেই ডাইনিং। ইউরোপে সাত আটশ’ বর্গফুটের বাড়ি মানেই বিশাল বাড়ি। অধিকাংশ বাড়িই চারশ’ থেকে পাঁচশ’ বর্গফুটের। পুরো বাড়িতে একটি মাত্র ওয়াশরুম। ড্রয়িং লিভিং এবং ডাইনিং একই সাথে। সোহেল ভাইর বাড়িটি দুই বেড রুমের। তিনি বাড়ি কিনেছেন বেশ কয়েকবছর আগে। নিজের বাড়ি হওয়ায় জীবনযাত্রা অনেক সহজ হয়ে গেছে। অন্যথায় মাসে প্রায় লাখ দেড়েক টাকা এমন একটি বাড়ির ভাড়া বাবদ গুণতে হতো বলেও সোহেল ভাই জানালেন। ড্রয়িং রুমের সোফায় আয়েশ করে বসলাম। শীতের কাপড় চোপড় খুলে ফেললাম। হিটার চলছে ঘরে। সোহেল ভাইও আড্ডায় যোগ দিলেন। রান্নাবান্না কী শেষ? হয়তোবা। না হয় সোহেল ভাইকে এত নির্ভার মনে হচ্ছে কেন? ভাবী মনে হয় পর্দা করেন। আমাদের সামনে এলেন না। তবে ভিতর থেকে সালাম দিলেন। আমরা নানা বিষয়ে কথা বলছিলাম। সোহেল ভাইর ড্রয়িং রুমকে আমরা প্যারিসের বুকে এক টুকরো চট্টগ্রামে পরিণত করলাম। রাত বাড়ছিল। আমাদের ফিরতে হবে। বহু দূরের পথ। যাওয়ার সময় ঠিকঠাকভাবে টেক্সি পাওয়া না গেলে বিপদে পড়তে হবে। খাবার সার্ভ করা হলো। সাদা ভাতের পাশাপাশি পোলাও। মাংসের আইটেমই করা হয়েছে অনেকগুলো। মশুরের ডাল, মাছ, শুটকি। শুটকির ভর্তা, মরিচ ভর্তাসহ আরো কত কি! আমরা খাস চাঁটগাইয়া স্টাইলে খাওয়া দাওয়া শেষ করলাম। ধুমায়িত চাও খেলাম। সর ভাসা চা অসাধারণ লাগলো। ফিরতি পথে নিচে নেমে টেক্সি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই সোহেল ভাই মোবাইলের বিশেষ এ্যাপস ব্যবহার করে উবার টাইপের একটি সার্ভিস থেকে টেক্সি আনালেন। টেক্সি নিচে এসে সোহেল ভাইকে ফোন দিল। আমরা সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে টেক্সিতে উঠলাম। উঠার সময় সোহেল ভাই বললেন, টেক্সির ভাড়া দিয়ে দিয়েছি। কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবুও পৌঁছে আমাকে ফোন করবেন। আমরা সকলেই হই হই করে উঠলাম। কিন্তু সোহেল ভাই বললেন, টেক্সি ডাকার সময় আগেই ক্রেডিট কার্ড থেকে ভাড়া পরিশোধ করে দিতে হয়। নাহলে টেক্সি আসতো না। তিনি ব্যাপারটিকে কিছু নয় বলে উড়িয়ে দিলেও আমরা বুঝলাম যে, এত রাজকীয় আয়োজনে খাওয়া দাওয়া করানোর পর আবার প্রায় সাত হাজার টাকা টেক্সিভাড়া দিয়ে হোটেলে ফেরত পাঠানো কষ্টকর! সোহেল ভাই হাসছিলেন। আমরা গল্পে গল্পে ফিরছিলাম। আমাদের গল্প জুড়ে ছিল সোহেল ভাইর আন্তরিকতা। প্রবাসীদের এই আন্তরিকতা মাপার কোন মানদন্ড আজো আবিষ্কৃত হয়নি। এই আন্তরিকতার আসলেই কোন তুলনা হয়না। (চলবে)

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।