মনে নাই মনে নাই- কামরুল হাসান বাদল ,লেখক,কবি, সাংবাদিক ও টিভি ব্যক্তিত্ব

পোস্ট করা হয়েছে 05/05/2018-09:01am:    হযরতের জন্য শোক ও বিরিয়ানির খুশবু বেশিদিন থাকবে না হযরত। দিনমজুর হযরত বেঁচে থাকতে কতবার বিরিয়ানি খেতে পেরেছিল? অথবা তাঁর স্ত্রী হালিমা ও কন্যা আট বছরের আয়েশা আকতার? জীবনে কখনো কোনো সরকারি কর্মকর্তার সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল হযরতের? থানার ওসি, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা কি কখনো হযরত আলীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন? তাঁর ও তাঁর পরিবারের খোঁজ খবর নিয়েছিলেন? কোনো সাংবাদিক কি হযরতের সঙ্গে কথা বলেছিলেন কোনোদিন? হযরত কি খুব কাছ থেকে ক্যামেরা দেখেছিলেন? টিভিতে তাঁর ছবি দেখেছিলেন কোনো দিন? অথবা পত্রিকার পাতায়? এসব কিছুই ঘটেনি হযরতের জীবনে। হযরতের ঘরে আজ যে বড় বড় ডেকচি থেকে বিরিয়ানির খুশবু বের হচ্ছে, তার বাড়িতে বড় বড় নেতারা আসছেন, থানার ওসি থেকে শুরু করে অনেক সরকারি কর্মকর্তারা আসছেন। টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরা ছোটাছুটি করছেন, পত্রিকার সাংবাদিকরা আশেপাশে লোকদের সঙ্গে কথা বলছেন, এক লহমায় হযরতের ভাঙা বাড়িটি দেশের সবকটি সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠল। হযরতকে নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া হচ্ছে। দেখে মনে হতে পারে যে, হযরতের বাড়িতে কোনো উৎসব হচ্ছে। এসব কিছুই এখন হযরত দেখছেন না। জানছেন না। এই বিরিয়ানির খুশবু, এই টিভি ক্যামেরা, এত এত লোকজন দেখে যে শিশুটি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতো সেই আট বছরের আয়েশা আকতারও এসব কিছুই দেখছে না, জানছে না। কারণ সে এবং তার বাবা হযরত আলী এসব আনন্দ, বেদনা, সুখ-দুঃখ থেকে অনেক অনেক দূরে। এসব কিছুই এখন তাদের স্পর্শ করবে না। ওখানে কারো প্রতিবাদ, তাচ্ছিল্য, বিচারের আশ্বাস ও উদ্যোগ কিছুই পৌঁছাবে না। গত শনিবার সকালে মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মঘাতি হয়েছেন দিনমজুর হযরত আলী। মাত্র এক সপ্তাহ আগে একবেলা মাছ খাওয়ার জন্য ১০০ টাকা ধার করেছিলেন হযরত। এখন তাঁর ঘরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দোয়া মাহফিলের জন্য রান্না করা বিরিয়ানির খুশবু বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। তার ঘরে এখন কমলালেবু নাসপতি, বিস্কুট, পাউরুটি গড়াগড়ি খাচ্ছে। লোকরা দেখতে আসার সময় এসব নিয়ে আসছেন। অথচ এদেরই কেউ কেউ, গ্রামবাসীদের কেউ কেউ পুলিশকে বলেছিল, ‘এরা সব পাগল, মিথ্যা কথা বলে।’ হযরত আলী মিথ্যা বলেনি বরং সত্য বলতে গিয়ে বিতাড়িত হয়েছেন। অপমানিত হয়েছেন এবং শেষে আত্মহত্যা করে সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার অভিযোগের কথা, সমাজের প্রতি তার অভিমানের কথা জানিয়ে দিলেন। হযরত যখন বেঁচে ছিলেন সমাজ তাকে তাচ্ছিল্য করেছে। হযরত এখন মরে গেছেন, সমাজ এখন তাকে নিয়ে আলোচনায় মেতেছে। দিনমজুর হযরত আলী-হালিমা দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান। আয়েশা আকতার তাঁদের পালিতা কন্যা। তিন মাস আগে আয়েশাকে সাইকেলে তুলে শালবনে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেছিল। জোর করে সাইকেলে ওঠাতে গিয়ে পা কেটে গিয়েছিলা আয়েশার। ভালো চিকিৎসা করাতে না পারায় পচন ধরেছিল পায়ে। মেয়ের সাথে এই অন্যায়ের বিচারের জন্য হযরত ও হালিমা প্রথমে গিয়েছিলেন স্থানীয় গোসিঙ্গা ইউপি মেম্বার আবুল হোসেন ব্যাপারির কাছে। পাগল বলে ইউপি মেম্বার তাদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এরপর হালিমা গিয়েছিলেন শ্রীপুর থানায়। একটি জাতীয় দৈনিক লিখেছে, অভিযোগ শুনে এলাকায় পুলিশও এসেছিল। আবুল হোসেনসহ অন্যরা ‘এরা সব পাগল মিথ্যা কথা বলে’ বলে পুলিশকে চা/নাস্তা খাইয়ে বিদায় করে দেয়। এরপর ইউপি মেম্বার ও থানায় নালিশ করায় ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযুক্ত ফারুক হোসেন ও তার লোকজন হযরত আলীর একটি গরু জোর করে নিয়ে গিয়ে জবাই করে খেয়ে ফেলে। এই ঘটনারও কোনো বিচার পাননি হযরত আলী। অগত্যা গত শনিবার শ্রীপুর রেল স্টেশনে এসে মেয়েসহ ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। প্রথমে বিষয়টিকে দুর্ঘটনা বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে গ্রামবাসীর কাছে থেকে প্রকৃত তথ্য জানার পর দেশের সংবাদ মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রশাসন তৎপর হয়ে ওঠে। তবে শ্রীপুর থানার ওসি শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেনি দাবি করে বলেন, হালিমার অভিযোগ পাওয়ার পর একাধিকবার পুলিশ গিয়ে তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছে শিশুটিকে শ্লীলতাহানি করা হয়নি। তিনি উক্ত পত্রিকাকে বলেছেন, “আসল ঘটনা হচ্ছে ওই দম্পতি নিঃসন্তান। তাঁরা প্রায় দুই বিঘা খাসজমির ওপর বসবাস করেন। গ্রামের একটা চক্র চাইছিল তাঁদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ওই জমি থেকে উচ্ছেদ করতে। এ জন্য তারা শিশুটিকে স্কুলে যাতায়াতের সময় বিরক্ত করত।” ওসি আসাদুজ্জামান বলেছেন একাধিকবার পুলিশ গিয়ে তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছে, শিশুটিকে শ্লীলতাহানি করা হয়নি। প্রশ্ন হলো, শ্লীলতাহানি হয়েছে কি হয়নি তা প্রমাণ করতে কিছু বিশেষ মেডিকেল পরীক্ষা করতে হয়। শুধু এলাকায় গিয়ে তদন্ত করে শ্লীলতাহানি না হওয়ার সিদ্ধান্ত ওসি সাহেব কীভাবে নিলেন। তাঁর পরিবারে কারো সাথে এমন ঘটনা ঘটলে কিংবা সমাজের প্রভাবশালী কারো বেলায় ঘটলে ডাক্তারি পরীক্ষা ছাড়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেই কি তিনি এমন সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন।’ হালিমা এমন একটি গুরুতর অপরাধের অভিযোগ জানানোর পরও তিনি অভিযুক্ত ফারুক হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও আটক করেননি কেন? দিন মজুর হযরতের বউয়ের অভিযোগ বলে? ওসি সাহেব, ‘আসল ঘটনা হচ্ছে বলে যা বলেছেন সেসব কি তিনি আগে অর্থাৎ হযরতের আত্মহত্যার আগে শোনেননি? শুনে থাকলে ওই ‘চক্র’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি কেন? একটি শিশুকে জোর করে শালবনে নিয়ে যাওয়া হবে, তার শ্লীলতাহানি করা হবে এই অন্যায়ের বিচার চাওয়ার ‘অপরাধে’ তার ঘরের গরু নিয়ে গিয়ে জবাই করে খেয়ে ফেলা হবে। এতকিছুর পরও হযরত তার বিচার পাবে না। এই-ই আমাদের সমাজ? পিতা তার কন্যার নিরাপত্তা দিতে পারবে না। তার সামনে তার শিশু কন্যার শ্লীলতাহানি দেখতে হবে, চিকিৎসার অভাবে ‘এই শিশুর কচি ও অপুষ্ট পায়ে পচনের দৃশ্য দেখতে হবে। এর চেয়ে মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করেছেন হযরত। যে মেয়ে মাত্র আট বছরেই লাঞ্চিত হচ্ছে সে মেয়ে বড় হয়ে উঠলে কী হবে তার? নিরাপত্তা কে দেবে তার? বড় হয়ে অনেক ফারুক হোসেনের লালসার শিকার হওয়ার চেয়ে শিশুর মৃত্যুই শ্রেয়। হযরত আলী তার কন্যা সন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যা করে সমাজকে, রাষ্ট্রকে বুঝিয়ে দিলেন এই অগ্রগতি এই চাকচিক্য এই সামাজিক সূচকের উর্ধ্বগতি সবকিছুই মিথ্যা, অসার। এদেশে আইন-আদালত, থানা-পুলিশ হযরতদের জন্য নয়, হালিমাদের জন্য নয়। এই সমাজ, এই রাষ্ট্র শিশু আয়েশাদের নিরাপত্তা দিতে পারে না। এদের বিচারের বাণী নীরবে, নিভৃতে কাঁদে। এই কান্নার শব্দ পুরু দেয়াল ভেদ করে সমাজপতিদের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছায় না। আজ হযরতকে নিয়ে মিডিয়া সরব। জনপ্রতিনিধি প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি, ওসি, দারোগা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। যে হযরতের বাড়িতে কোনোদিন আধ কেজি চালের বিরিয়ানি রান্না হয়নি, আজ তার বাড়িতে বড় বড় ডেকচিতে বিরিয়ানির ব্যবস্থা করেছেন উপজেলা প্রশাসন। মাত্র কয়েকদিন। সবকিছুই বিস্মৃতির অতলে ডুবে যাবে। ভুলে যাবে মানুষ হযরত ও তার মেয়ে আয়েশাকে। বিরিয়ানির খুশবু বাতাসে মিলিয়ে যেতে যেতে হযরত ও তার কন্যা আয়েশার জন্য আমাদের শোকও ফিকে হয়ে যাবে দৈনন্দিন ব্যস্ততায়। আমরা আমাদের নাগরিক জীবনের গড্ডালিকায় মিশে যাব আর অন্যদিকে অন্য কোনো আয়েশাকে জোর করে তুলে নিয়ে যাবে কেউ, আর কোনো হযরত আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে রেলপথ খুঁজে নেবে। এসব সংবাদ হয়ে উঠলে আমরা তৎপর হবো, নতুবা জানতেই পারবো না হাজার হাজার শিশু আয়েশার শ্লীলতাহানি ও হযরতের আত্মহত্যার কথা।
Email:[email protected]

সর্বশেষ সংবাদ