বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার শিক্ষা ভাবনা এবং শিক্ষার অগ্রগতি-মো.ওসমান গনি.

পোস্ট করা হয়েছে 27/04/2018-08:00pm:    একজন মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে শিক্ষা হলো একটি অন্যতম চাহিদা।পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য শিক্ষা লাভ করা একান্ত জরুরী।কারন শিক্ষা ছাড়া একজন মানুষ পরিপূর্ণভাবে জীবন গড়তে পারে না।তাছাড়া শিক্ষা ছাড়া কোন মানুষই নয় পৃথিবীর কোন জাতি আদর্শ ও সভ্য জাতি হিসাবে গড়ে উঠতে পারে না।এমন কি পৃথিবীতে উন্নয়নশীল জাতি হিসাবে গড়ে উঠতে হলে শিক্ষার কোন বিকল্প নাই।যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত।আমাদের দেশে বাংলায় একটি প্রবাদ রয়েছে “শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড” এ প্রবাদ থেকে আমরা অতি সহজে বুঝতে পারি যে,শিক্ষা ছাড়া এ পৃথিবীতে কোন মানুষ বা জাতি উঠে দাঁড়ানো সম্ভব না। জীবসত্তার ঘর থেকে মানবসত্তার ঘরে পৌঁছানোর অন্যতম মাধ্যম হলো শিক্ষা। শিক্ষা মানুষের আচরণে কাঙ্খিত পরিবর্তন ঘটিয়ে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়। মানুষ সারাজীবনই শিক্ষা অর্জন করে থাকে এবং তা করে নানাভাবে, নানা উপায়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্যে দিয়ে। অনানুষ্ঠানিক, আনুষ্ঠানিক এবং উপানুষ্ঠানিক এই তিন শিক্ষা কাঠামোর মধ্যে দিয়ে মানুষ জীবসত্তা থেকে মানবসত্তায় উত্তোরিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামসহ যুগে যুগে বিভিন্ন দার্শনিক তাদের শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটিয়ে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে ধাবিত করেছেন। দার্শনিকরা ভাববাদ, প্রয়োগবাদ, প্রকৃতিবাদ, বাস্তববাদ, অপরিহার্যবাদ, জড়বাদ, অস্তিত্ববাদ ইত্যাদি দর্শনের মধ্যে দিয়ে শিক্ষার সরুপ উন্মোচন করে শিক্ষার্থীদের মাঝে মানবিক চেতনার বিকাশ ঘটানোর প্রয়াস পেয়েছেন। এইসব দার্শনিকের সঙ্গে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম যুক্ত করা যায় অনায়াসেই।
শিক্ষা নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শিক্ষা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনার পূর্বে তৎকালীন পাকিস্তানের শিক্ষা পরিস্থিতি কেমন ছিল সেটা জানা দরকার। সত্তরের নির্বাচনের প্রাক্কালে রেডিও-টিভিতে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মধ্যে দিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ সে সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার চরম দুর্গতি উপলব্ধি করা যায়। ‘সুষ্ঠু সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর হতে পারে না। ১৯৪৭ সালের পর বাংলাদেশে প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা হ্রাস পাবার পরিসংখ্যান ভয়াবহ সত্য। আমাদের জনসংখ্যার শতকরা আশি ভাগ অক্ষরজ্ঞানহীন। প্রতিবছর দশ লাখেরও অধিক লোক নিরক্ষর থেকে যাচ্ছে। জাতির অর্ধেকের বেশি শিশু প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শতকরা মাত্র আঠারো জন বালক ও ছয় জন বালিকা প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করছে। জাতীয় উৎপাদনের শতকরা কমপক্ষে চার ভাগ সম্পদ শিক্ষাখাতে ব্যয় হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতির পিতা যুগপৎভাবে শিক্ষার সকল স্তরে, সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের কার্যক্রম গ্রহণ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং সীমিত সম্পদের দেশে শিক্ষার বিস্তারে বঙ্গবন্ধু যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসিক এবং সেই দুঃসাহস কেবল বঙ্গবন্ধুরই ছিল। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে দেশের শতকরা ষাট ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। বিধ্বস্ত সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠনের জন্য ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে একান্ন কোটি টাকা ব্যয় করার ঘোষণা দেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ইউসুফ আলী। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম বাংলার ঘোষণা দেওয়া হয়। তাছাড়া পঞ্চম শ্রেণি পর্র্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক প্রদান ও ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে চল্লিশ ভাগ কম দামে বই সরবরাহের ঘোষণাও করা হয়েছিল। বিশৃঙ্খল শিক্ষাব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য এবং শিক্ষাকে বেগবান করার জন্য নানামুখী কর্মকৌশল গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
শিক্ষার ওপর বঙ্গবন্ধু যে অধিক গুরুত্বারোপ করেছেন তার প্রমাণ মেলে বাংলাদেশের প্রথম বাজেটে। ওই বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতের চেয়ে শিক্ষা খাতে তিন কোটি বাহাত্তর লাখ টাকা বেশি বরাদ্দ করা হয়েছিল। গণশিক্ষা বিস্তারে তথা নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বরাদ্দ করেছিলেন আড়াই কোটি টাকা। তাছাড়া অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রীদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি, যা ছিল নারী শিক্ষা অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের মাঝে বিনামূল্যে বই, খাতা, পেনসিল, দুধ, ছাতু, বিস্কুট বিতরণ করে শিক্ষাগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে। বঙ্গবন্ধু শিক্ষা উন্নয়নের জন্য, সাধারণ মানুষের সন্তানেরা যেন শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করতে পারে, সেজন্য ছত্রিশ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও লক্ষাধিক শিক্ষক বিদ্যালয়ের ভূমিসহ সকল সম্পদ সরকারিকরণ তথা জাতীয়করণ করেন। যেখানে সরকারি কোষাগারে তেমন কোনো অর্থ ছিল না, বিদেশি সাহায্য ছিল অপর্যাপ্ত, সেখানে এই জাতীয়করণের পদক্ষেপটি ছিল সত্যিই দুঃসাহসিক এবং তিনি তা বেশ সফলতার সঙ্গেই সম্পন্ন করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু সবসময়ই গণমুখী শিক্ষাকে পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, গণমুখী শিক্ষা ছাড়া অর্থনৈতিক সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। এজন্যই ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হওয়া সংবিধানের সতের নম্বর অনুচ্ছেদে তার নির্দেশনায় একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্র্ধারিত পর্যাপ্ত বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা পাঠদানের বিষয়টি আবির্ভুত করা হয়। তিনি বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে চেয়েছিলেন জনগণকে। তার দেখানো পথ ধরেই আজকে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় টেকনিক্যাল, পলিটেকনিক্যাল, মহিলা পলিটেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট গড়ে উঠেছে। সেখান থেকে পাশ করা দক্ষ মানবসম্পদ দেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখছে। উচ্চশিক্ষার প্রসারের জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স ঘোষণা করা হয়েছিল, যার মূল উদেশ্যে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিন্তার স্বাধীনতা ও মুক্ত-বুদ্ধিচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করা। এই অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যা মুক্তবুদ্ধির চর্চার পথকে সুগম করেছিল। সেই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই ড. মুহাম্মদ কুদরত-এ-খুদাকে সভাপতি করে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। সেই কমিটিকে বঙ্গবন্ধু দেশের শিক্ষার সামগ্রিক পরিস্থিতি জানা এবং শিক্ষা সম্পর্কে জনগণের মতামত জানার প্রতি গুরুত্বারোপের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী কমিশন জনগণের কাছ থেকে শিক্ষার বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানো ও তাদের সুচিন্তিত মতামত আহ্বান করেন। সেই সবকিছু বিশ্লেষণ করে কমিশন ১৯৭৩ সালের ৮ জুন অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট এবং ১৯৭৪ সালের মে মাসে চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করেন। এই রিপোর্টে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনের বেশির ভাগই প্রতিফলিত হয়েছিল। কমিশন শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ, বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, নারী শিক্ষার প্রসার, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালুকরণ, শিক্ষার সকলক্ষেত্রে বাংলা মাধ্যম প্রবর্তনসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্র্ণ সুপারিশ করে। এই সুপারিশগুলো করা হয়েছিল জাতীয় আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে।
এই কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শিক্ষা নিয়ে ভাবনা-চিন্তার প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু সরকারও এই কমিশনের রিপোর্টকে সাদরে গ্রহণ করে। এবং তা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু পনের আগস্টে পাকিস্তানপন্থি নরখাদক নরকের কীটরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারকে হত্যা করলে অন্য সবকিছুর মতো শিক্ষা কার্যক্রমও আন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজ ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল।
এরপরের দীর্ঘ একুশ বছর এদেশের শিক্ষা বঙ্গবন্ধুর জন্য ছিল অন্ধকারের যুগ, সাম্প্রদায়িকতা শেখানোর যুগ। সেই সময়কার সাম্প্রদায়িক শিক্ষা বিস্তারের জের আজ এখনও আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। তবে আশার কথা, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার শিক্ষা দর্শনকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, আর তাই তার নেতৃত্বে আজকে বাংলাদেশে শিক্ষার সকল স্তরে, সকল ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার পাশাপাশি দেশের উন্নয়নের জন্য ব্যাপক ভাবে কাজ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।বাংলাদেশ যে একটি মধ্যম আয়ের উন্নত দেশে রূপান্তরিত হতে চলেছে, বিষয়টি এখন আর কল্পনা বা অনুমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বিষয়টি এখন বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের কাছে স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এ ধরনের যে সমস্ত সংস্থা রয়েছে, তাদের সকলেরই অভিমত, বাংলাদেশ সামনের পাঁচ বছরের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারও তাদের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশ বলে বিবেচিত হবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীর উন্নত দেশের কাতারে শামিল হবে।
আমরা জানি, একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা ও মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটে। বাংলাদেশে তেমনটি ঘটতে শুরু করেছে। ২০০৮ সালের শেষ ভাগে সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। মোটামুটি এই সরকারের শাসনকাল প্রায় ১০ বছরের মতো চলমান। ১০বছর আগে বাংলাদেশ এমনকি বিশ্বের কোনো দেশ ভাবতেও পারেনি ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মধ্য আয়ের দেশ বলে পরিচিতি পাবে। শেখ হাসিনার সরকার ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পরপরই রাষ্ট্র পরিচালনায় এমন কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করে; যার ফলে দিন দিন দেশের মাথাপিছু আয় বাড়তে থাকে, দেশের অর্থনীতি দিন দিন চাঙ্গা হয়ে উঠতে থাকে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুত্, কৃষি এবং অন্যান্য সেক্টরে উন্নয়নের হাওয়া বইতে থাকে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি যদি শিক্ষার উন্নয়ন না ঘটে, সে অর্থনৈতিক উন্নয়ন স্থায়ী রূপ পেতে পারে না। তবে আশার কথা, আমাদের দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা ও মানবসম্পদের উন্নতি সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলেছে। গত এক দশকে শিক্ষার সর্বস্তরেই চোখে পড়ার মতো অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। শিক্ষার এই ব্যাপক অগ্রগতি ও সক্ষমতা অর্জন দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকেও মজবুত করে তুলেছে। বর্তমান সরকার তার ১০ বছরের শাসনকালে দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার সাফল্য দেখিয়েছে। নিরক্ষরতা দূরীকরণেও অর্জিত হয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য। ১০ বছর আগে যেখানে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ছিল ৬১ শতাংশ, বর্তমানে সেখানে প্রাথমিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় শতভাগ। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তির হার ছিল ৫১ শতাংশ, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ শতাংশ। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ভর্তির হার ছিল ৩৩ শতাংশ, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৪৪ শতাংশ।
শিক্ষাখাত কে আরও বেগবান করে তোলার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাপের ন্যায় দেশের হাজার হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কে জাতীয়করণ করে দিয়েছেন।যা শিক্ষক সমাজের কাছে চিনদিনের জন্য তিনি চিরস্মরনীয় থাকবেন।সাথে সাথে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের বেতন/ভাতা বৃদ্ধি করে দিয়েছেন।এতে দেশের শিক্ষার ধাপ আর কয়েকগুন সামনের এগিয়েছে।স্কুলের ছাত্র/ছাত্রীদের মধ্যে উপবিত্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।যাতে করে দেশের কোন ছেলে/মেয়ে টাকার অভাবে লেখাপড়া বন্ধ করতে না পারে।আর স্কুল/কলেজ শিক্ষকদের কে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও ধারালো করে তোলছেন।যাতে করে তারা ছাত্র/ছাত্রীদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলতে পারেন।নারী শিক্ষার প্রতি তার রয়েছে সুদৃষ্টি।কারন তিনি জানেন দেশের নারী সমাজ কে শিক্ষিত করতে না পারলে দেশ কখনও শতভাগ শিক্ষার আওতায় আনা সম্ভব না।যে জাতি নারীদেরকে শিক্ষিত করে তুলতে পারে, সে জাতির উন্নতি অবধারিত। বর্তমান সরকার শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশে শিক্ষায় ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। একসময় নারী শিক্ষা ছিল শুধু উচ্চবিত্ত ও শহরের কিছু পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। প্রায় শতভাগ মেয়েই এখন স্কুলে যাচ্ছে। মেয়েদের জন্য বিদ্যালয়ে যে পরিবেশ থাকা দরকার, সরকার তা নিশ্চিত করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় ৬০ ভাগ নারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশ প্রথম স্থানে অবস্থান করছে।
পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস বিকৃতি প্রতিরোধে প্রতিথযশা ইতিহাসবিদদের নিয়ে সংশোধন করে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংযোজন করেছে সরকার। ফলে বর্তমান প্রজন্ম স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয় বীরদের সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে।
স্কুল শিক্ষার পাশাপাশি বর্তমান সরকার মাদ্রাসায় ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে সম্পৃক্ত করেছে। সাধারণ শিক্ষার অনুরূপ মাদ্রাসা শিক্ষায় বিজ্ঞান ও কম্পিউটার শাখা চালু করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষায় বিদ্যমান সমস্যার সমাধান ও আধুনিকায়নে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। মাদ্রাসা শিক্ষা পরিচালনার জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর স্থাপিত হচ্ছে। তাছাড়া দেশে একটি ইসলামি-আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উচ্চশিক্ষা দেখভাল করার জন্য মূল দায়িত্ব পালন করে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। দেশে উচ্চশিক্ষার পরিধি প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে, গড়ে উঠছে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৫ সালে এসে দেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ১২৩টি। ক্রমবর্ধমান চাহিদার আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন আর বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষাঙ্গনে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে। ২০০৯ সালের আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে ধরনের সেশন জট ছিল, আজ তা নেই বললেই চলে। প্রতি বছর সময়মতো ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, নিয়মিত ক্লাস চলছে এবং যথাসময়ে তারা ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রাখা বর্তমান সরকারের বড় রকমের সাফল্য।
অব্যাহতভাবে এ কাজ চলতে থাকলে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ শুধু একটি মধ্যম আয়ের দেশ হবে না, শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ একটি মধ্যমানের শিক্ষিত দেশ বলে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করবে।আর সেই মনমানসিকতা নিয়ে কাজ করে বর্তমান সরকার দেশের মানুষ কে সাথে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। লেখক:সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সর্বশেষ সংবাদ