আমি (থা)পড়াতে চাই- কামরুল হাসান বাদল ,লেখক,কবি, সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 26/04/2018-10:51am:    পড়ানো এবং থাপড়ানো বেশ কাছাকাছি দুটো শব্দ। শুধু শব্দ নয়, কাজ দুটোও বেশ কাছাকাছি। পড়াতে গিয়ে কোনো শিক্ষক কখনো কাউকে থাপড়াননি এমন ঘটনা বিরল। আবার পড়তে গিয়ে থাপ্পড় খাননি এমন শিক্ষার্থীও বিরল। ফলে পড়ানোর সাথে থাপড়ানোর একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে। আমাদের দেশের শিক্ষকরা সাধারণত ছেলে পেটানোতে ওস্তাদ। যিনি যত ছাত্র পেটাতে পারেন তাঁর তত বেশি প্রভাব। এমন শিক্ষককে নিয়ে নানা রূপকথা তৈরি হয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে কৌতূহলও সৃষ্টি হয়। রিটনের ছড়া ‘হ্যান করেঙ্গা, ত্যান করেঙ্গা, পিটিয়ে ছাগল ম্যান করেঙ্গা–র মতো আমাদের শিক্ষকরা এক সময় মনে করতেন ছাত্রদের পিটিয়ে মানুষ করাই তাদের একমাত্র কাজ। বাবা–মা ও শিক্ষকদের হাতে নিজ সন্তানের দায়িত্ব ছেড়ে দিতেন। তাঁরাও ভাবতেন না পেটালে তাঁদের ছেলে কোনোদিন মানুষ হবে না। এ কারণে ছাত্র পেটানোর একটি মহান স্বাধীনতা ভোগ করতেন আমাদের শিক্ষকেরা। তবে সবকিছুর যেমন ব্যতিক্রম থাকে তেমনি শিক্ষকদের মধ্যেও ব্যতিক্রম আছে। সব শিক্ষকই পেটান না। তাঁরা অত্যন্ত সজ্জন, দয়ালু এবং শিক্ষার্থীবান্ধব। এ ধরনের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কাছে পূজনীয় হয়ে থাকেন। তাঁরা আদর্শ হয়ে থাকেন। এমন শিক্ষকরা ছাত্রদের না পিটিয়ে শুধু ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। তাতে তাঁরা সফলও হয়েছেন। বর্তমানে ছাত্র পেটানোর সংস্কৃতিতে ভাটা পড়েছে। শেখ হাসিনার সরকার এ বিষয়ে কঠোর হয়েছে। চাকরি প্রদানের সময় ছাত্র না পেটানোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে। ফলে আগের তুলনায় ছাত্র পেটানোর প্রবণতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তবে শিক্ষকের হাতে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি বেড়েছে। খুব ন্যক্কারজনক এসব ঘটনায় শিক্ষকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। শিক্ষকদের প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা–ভক্তি–কমে যাচ্ছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামে শিক্ষার্থী নির্যাতনের একটি ঘটনা ঘটেছে। নগরীর নাসিরাবাদ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় ছাত্রকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। গত রোববার এই ঘটনাটি ঘটে। নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীর নাম সুতনু সব্যসাচী আদিত্য। নাসিরাবাদ স্কুলের নবম শ্রেণির প্রাতঃ শাখার ছাত্র। সুতনু পত্রিকাকে বলেছে, রোববার শিক্ষক আলাউদ্দিন ক্লাস নিতে রুমে ঢুকেছিলেন। তখন আমার ইংরেজি বইটি সহপাঠি আলোকের কাছে ছিল। তাই তার নাম ধরে বইটি দিতে বলি। কিন্তু স্যার মনে করেছেন আমি ব্যঙ্গ করে তার নাম ধরে ডেকেছি। এরপর তিনি আমার দুই পায়ে বেত দিয়ে পেটাতে থাকেন।
সুতনুর বাবা সমর বড়ুয়া দেশের বাইরে। গত মঙ্গলবার তিনি সন্তানের গায়ের নির্যাতনের ছবি আপলোড করে দেয়া ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন “দাগগুলো আমার বড় ছেলে সুতনু সব্যসাচী (আদিত্য’র)। এক একবার যখন দেখি বুকে মোচর দিয়ে ওঠে। ব্যবসায়িক কাজে দেশের বাইরে আছি তাই আদর করতে পারছি না। একটু যদি বুকে নিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ থাকতে পারতাম।’
সমরের এই স্ট্যাটাসটি অনেককে নাড়া দিয়েছে। তারা এর প্রতিবাদ করে নিজেদের পোস্টও দিয়েছেন। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবুল হাসনাত মো. বেলাল তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘সমরদা দেশে না থাকায় সকালে বৌদির সাথে আমি এবং জুয়েল ভাই নাসিরাবাদ বয়েজ স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাই। একজন ছাত্র সম্পর্কে ওনার মনোভাব সত্যি আমাকে বিস্মিত করেছে। উনি যেভাবে সন্তানের বিষয় নিয়ে একজন মাকে ভর্ৎসনা করলেন এবং তার সন্তানতুল্য ছাত্রের জীবনকে বিপদসংকুল করার ভয় দেখালেন তা কখনোই একজন সম্মানিত শিক্ষকের ভাষা হতে পারে না।’ বেলাল তাঁর স্ট্যাটাসের এক স্থানে লিখেছেন ‘অপমানের মাত্রা দেখে একজন অভিভাবক হিসেবে ভাবলাম এবং বুঝলাম রনিদের হাতে আজ তথাকথিত শিক্ষকরা কেন থাপ্পর খায়। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি। দেখি থাপ্পড় ছাড়া দাদার পরিবার ন্যায় বিচার পায় কি না।
ঘটনাটির সংবাদ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিভিন্ন অনলাইন মিডিয়া এবং বুধবার নিউজ মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার হয়েছে। এরপর কী হবে, বিচার আদৌ হবে কিনা, হলেও কতটুকু হবে তা ভবিষ্যতই জানে। বর্তমান সরকার শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের শারীরিক নির্যাতন বন্ধ করার পক্ষে নানা প্রকার পদক্ষেপ নিয়েছে। এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা আছে শিক্ষকদের প্রতি। তবুও এই প্রবণতা বন্ধ হয়নি দেশে। অধিকন্তু প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পর্যন্ত শিক্ষকদের মান যে নিম্নমুখী হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। নীতি আদর্শ–সততার দিক থেকে বর্তমান শিক্ষকদের অবস্থান গর্ব করার মতো নয় এখন। অনেক সময় শিক্ষকদের মধ্যে কারো কারো আচরণে শিক্ষার্থীরাই লজ্জিত হচ্ছে, বিব্রত হচ্ছে এমন বাস্তবতায় এসেছি আমরা।
সাবেক ছাত্রনেতা বেলাল তাঁর স্ট্যাটাসে লিখেছেন, অভিভাবক হিসেবে ভাবলাম এবং বুঝলাম রনিদের হাতে আজ তথাকথিত ‘শিক্ষকরা’ কেন থাপ্পড় খায়। এই উক্তিটি আমার বড় মনে ধরেছে। ইমু–রনির নেতৃত্বে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি গঠিত হওয়ার পর একটি গুণগত পরিবর্তন ঘটেছিল মহানগর ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে শুধু বাম ছাত্র সংগঠনই সংগ্রাম করে এই ধারনার বাইরে এসে অনেক বছর পরে ছাত্রলীগ শিক্ষা ও শিক্ষার্থীবান্ধব বেশ কিছু কর্মসূচি পালন করে রনির নেতৃত্বে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জোর করে বর্ধিত ফি আদায়ের প্রতিবাদে রনি যোদ্ধার ভূমিকা পালন করেছেন। চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজ থেকে ইসলামী ছাত্র শিবিরকে হটিয়ে সেখানে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির পরিবেশ তৈরি করার পেছনে রনির একটি বড় ভূমিকা ছিল।
আমরা সকলেই জানি, সরকার নির্ধারিত ফি’র চেয়ে কয়েকগুণ ফি আদায়কারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এই শহরে কম নয়। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রাইভেট স্কুল কলেজগুলো এক্ষেত্রে সবথেকে এগিয়ে। এরা অধিকাংশই সরকারি নির্দেশনাকে উপেক্ষা করেছে। জেলা প্রশাসনও এক্ষেত্রে খুব বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ফলে এইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী অভিভাবকরা সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনির শরণাপন্ন হয়েছেন। রনি এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তা করতে গিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সাথে বিরোধে লিপ্ত হয়েছেন। তাদের বিরাগভাজন হয়েছেন। সে সাথে বর্ধিত ফি কমাতে তিনি তাদের বাধ্যও করেছেন।
আমরা এও জানি এইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মালিকরা সমাজের উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। ফলে শুরু থেকেই রনি এই শ্রেণির ব্যক্তিদের রোষানলে পড়েছেন। তাঁদের ব্যবসার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এছাড়া জামায়াত–শিবির এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী শিবিরের অন্যতম প্রধান টার্গেটও হয়ে উঠেছিলেন রনি। ছাত্রলীগের কাছ থেকে যাঁরা ভালো ও গঠনমূলক রাজনীতি প্রত্যাশা করেন তাঁদের পছন্দের ছাত্রনেতায় পরিনত হন মহানগর ছাত্রলীগের এই নেতা। কিন্তু সমস্যা হলো রাজনীতি শুধু আবেগ দিয়ে পরিচালিত করা যায় না। তার জন্য একইসাথে প্রয়োজন বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার। শত্রুতার অনেক দরজা খুলে, ঘরে বাইরে অসংখ্য শত্রু রেখে অসতর্ক পদক্ষেপ এবং সামান্য ভুলই যে বড় পরিণতি ডেকে আনতে পারে তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রইলেন রনি।
বলা হয় ‘মানুষ বাপের শোক ভোলে কিন্তু সম্পত্তির শোক ভোলে না।’ রনি যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বর্ধিত ফি নিতে বাধা দিয়েছে, নেওয়ার পর তা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য করেছে তারা রনিকে ছেড়ে দেবে, তাকে স্বস্তিতে থাকতে দেবে–এমন ভাবনা আহম্মক হলেই ভাবা সম্ভব। রনি এখন তার সেসব বোকামি ও অদূরদর্শিতার খেসারত দিচ্ছেন। আমি রনির পক্ষে বলার জন্য এই লেখা লিখছি না। রনি অপরাধ করলে তার শাস্তি তাঁকে পেতেই হবে। এর চেয়েও অনেক বড় বড় অপরাধের তুলনা করে আমি রনির অপরাধকে ছোট বা গৌণ করে তোলার চেষ্টা করব না। একজন শিক্ষককে থাপ্পড় মারার মতো ঘটনায় আমি রনির পক্ষে বলব না। হাটহাজারীর নির্বাচন কেন্দ্রের ঘটনার মামলা নিয়েও বলব না। তবে একটি বিষয় আমার মাথায় ঢুকছে না। রনি যদি চাঁদাবাজি করতে চাইত তাহলে একজন লুজারের কাছে সে চাঁদা চাইবে কেন? যার ব্যবসাই ভালো মতে চলে না। রনি চাঁদা দাবি করলে তো তার বেডরুমে টাকার বান্ডিল পৌঁছে যাওয়ার কথা। বাংলাদেশের কোথাও এই পদের নেতাদের কারো অফিসে গিয়ে সিসিটিভির সামনে চাঁদার জন্য এত চড় থাপ্পড় মারতে হয় না। এই শহরেই প্রতিদিন কয়েক শ কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়, তার জন্য নেতাদের ব্যক্তিগতভাবে কারো অফিসে যেতে হয় না। তা ‘আপনা’ থেকেই পৌঁছে যায় অকুস্থলে।
তারপরও রনি থাপড়িয়েছে। বিষয়টি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তবে এই থাপ্পড় চাঁদার জন্য তাই শুধু বিশ্বাসযোগ্য নয়।
উদ্ধত ও অমার্জিত আচরণ করে রনি ভুল করেছেন। এটি করতে গিয়ে শুধু যে তিনি নিজের ক্ষতি করেছেন তা নয়, অনেকদিন পর যারা ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সামান্য ইতিবাচক দিক দেখতে পেয়েছিলেন তাঁদের তিনি হতাশ করেছেন। শিক্ষাবাণিজ্যের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার হয়েছিলেন তাদেরও তিনি নেতৃত্বশূন্যতায় ফেলে দিলেন।
এই যাত্রায় একটি অশুভ শক্তির কাছে হেরে গেলেন রনি।
[email protected]

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক