ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে কামরুল হাসান বাদল ,লেখক,কবি, সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 20/04/2018-09:32am:    ১৯৭৪ সালে গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী সঞ্জিত আচার্য লিখলেন আঞ্চলিক গান- আঁর খাল কুলত বাড়ি, বন্ধু মন গইল্যু চুরি। রাইতে রাইতে আইসত বন্ধু সাম্পানত গড়ি---। ১৯৭৬ সাল। ঢাকায় নির্মিত হতে যাচ্ছে চট্টগ্রামের লোক গাঁথা নিয়ে চলচ্চিত্র ‘সাম্পানওয়ালা’ এর জন্য গানের প্রয়োজন। ট্রেনে ঢাকায় যেতে যেতে এই গানের স্রষ্টা সঞ্জিত আচার্য সুরের মধ্যে নতুন কথা বসিয়ে দিলেন- ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে/ অভাগিনীর দুঃখর কথা কইও বন্ধুরে, ওরে কর্ণফুলীরে।
এর আগে ৬০ দশকে শিল্পী, সুরকার ও গীতিকার মোহন লাল দাশ সৃষ্ট “ওরে সাম্পানওয়ালা তুই আমারে করলি দিওয়ানা”ই ছিল এই অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান। তবে এই গানের আবেদন এখনও ফুরিয়ে যায়নি।
আমরা একটু লক্ষ্য করলে দেখতে পাব চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে কর্ণফুলী এবং সাম্পান ও সাম্পানওয়ালা (সাম্পান মাঝি) প্রসঙ্গ অনেকভাবে এসেছে। কারণ বৃহত্তর চট্টগ্রামে কর্ণফুলী ও এর শাখা নদী ও খালের বিস্তর প্রভাব আছে দৈনন্দিন জীবন যাপনে।
কর্ণফুলী নদীর উৎপত্তি ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড় হতে। এই নদী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পতেঙ্গায় এসে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। এই নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২০ কিলোমিটার। কর্ণফুলী নদীটি দেশের আর দশটি নদীর মতো নয়। এই নদীর অবস্থান, চরিত্র, গুরুত্ব সবকিছু মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে এই নদীর মতো অবদান আর অন্য নদীর নেই। এই নদীর নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মিথ চালু আছে। সবচেয়ে প্রচলিত মিথটি নিয়ে যে বিখ্যাত গানটি রচিত হয়েছে- ছোড ছোড ঢেউ তুলি পানিত/ ছোড ছোড ঢেউ তুলি/ লুসাই পাহাড়ত নামিয়েরে যারগুই কর্ণফুলী...। এই গানটির মধ্যে নদীর নামকরণের একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। গ্রাম্য বালিকা নদীতে নাইতে নেমে উঠে দেখে তার কানের ফুল নেই- সে থেকে নদীর নাম কর্ণফুলী। আরও একটি কাহিনী প্রচলিত আছে- আরাকানের এক রাজকন্যা চট্টগ্রামের এক আদিবাসী রাজপুত্রের প্রেমে পড়েন। এক জ্যোৎস্না রাতে তারা দু’জন নৌকা নিয়ে নদীতে ভ্রমণ করছিলেন। সে সময় নদীতে চাঁদের প্রতিফলন দেখার জন্যে রাজকুমারী একটু ঝুঁকলে তার কানে গোঁজা ফুলটি নদীতে পড়ে যায়। ফুলটি উদ্ধারে রাজকন্যা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন কিন্তু খড়স্রোতা নদী তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এ অবস্থায় রাজকুমারও নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এভাবে প্রেমিক যুগলের সলিল সমাধি ঘটে। এরপর নদীর নাম হয় কর্ণফুলী।
মানব বসতি গড়ে ওঠা ও মানব সভ্যতা বিকাশে নদীর অবদান অপরিসীম। বিশ্বের আদিকাল থেকে মানব বসতি গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। কারণ বিশ্ব এক সময় ছিল সম্পূর্ণ কৃষি নির্ভর। নদীর দু’কূলের মানুষ নদীর পানির সাহায্যে জীবন ধারণ করেছে, চাষাবাদ ও যোগাযোগের জন্যে নদীর ওপর নির্ভর করেছে। উপমহাদেশের সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সিন্ধু নদীকে কেন্দ্র করে। নীল নদ, ইউফ্রেটিস দজলা-ফোরাত, হোয়াংহো এমন অসংখ্য নদী মানব বসতি ও সভ্যতা বিকাশে ভূমিকা রেখে এসেছে। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি সিন্ধু নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা জনবসতির লোকরাই আজ হিন্দু বলে অভিহিত। এটি সিন্ধুর অপভ্রংশ। কাজেই মনে রাখা প্রয়োজন হিন্দু বলে আলাদা কোনো ধর্মের লোক বোঝায় না।
কর্ণফুলী নদীর অবদানও তদ্রুপ অর্থাৎ এই নদীকে কেন্দ্র করেই হাজার হাজার বছর আগে থেকেই এখানে মানব বসতির শুরু হয়েছে। কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী থেকে নানা পেশার সূত্রপাত হয়েছে পরবর্তীতে। কিন্তু এই নদীর অনন্যতা হচ্ছে এখানেই শেষ হয়নি এর অবদান। এই নদী তার চলার পথে শস্য-শ্যামলে বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে মানবের বাসযোগ্য করার সাথে সাথে তৈরি করে দিয়েছে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক একটি সমুদ্র বন্দর। এই নদী চট্টগ্রাম নগরীর অনতিদূরে পতেঙ্গায় সাগরের সাথে মিলিত হয়েছে- এটি কখন ঘটেছিল তার সঠিক তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব নয়, তবে এই বন্দর যে দেড় হাজার বছর আগেও ছিল তেমন অনেক তথ্য উপাত্ত উদ্ধার হতে শুরু হয়েছে আজ-কাল।
এই নদীর মোহনাটি বন্দর হিসেবে গড়ে ওঠায় এই নদীর সাথে সাথে পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে হয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। নদীর সাথে বেড়েছে চট্টগ্রামের গুরুত্ব। আজ এই বন্দরের মাধ্যমে দেশের আমদানি রফতানির ৮৫ ভাগ নিয়ন্ত্রিত হয়। দেশের অর্থনীতিকে সচল ও সমৃদ্ধ করতে এই বন্দর একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়াও এই নদীটির আরও একটি উল্লেখযোগ্য অবদান আছে। অনেক সময় আমরা তা ভুলেও যাই। এই নদীর উজানে বর্তমান কাপ্তাই উপজেলায় বাঁধ দিয়ে নির্মিত হয় এই উপমহাদেশের প্রথম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। যার মাধ্যমে অত্যন্ত সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়ে আসছে ১৯৬৪ সাল থেকে। অবশ্য এই বাঁধের ফলে তার উজানে রাঙামাটি জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল অর্থাৎ আদি রাঙামাটি ও এর আশপাশ পানির নিচে তলিয়ে যায়। বর্তমান রাঙামাটি সম্পূর্ণ পাহাড় ও টিলার ওপর অবস্থিত।
কাজেই এই নদী চট্টগ্রামের তো বটেই, সারাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও প্রভাবিত করেছে এই জনপদের মানুষকে। সে কারণে এই নদী ও এর বুকে বয়ে চলা সাম্পান ও সাম্পান মাঝি বা সাম্পানওয়ালাকে নিয়ে অসংখ্য গান ও কবিতা রচিত হয়েছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও উপেক্ষা করতে পারেননি কর্ণফুলী নদীকে। তিনি লিখেছেন-
ওগো ও কর্ণফুলী
তোমার সলিলে পড়েছিল
কবে কার কানফুল খুলি
তোমার স্রোতের উজান ঠেলিয়া কোন তরুণী
কে জানে-
সাম্পান নায়ে ফিরেছিল তার দয়িতার সন্ধানে---
এ ছাড়াও কবি ওহিদুল আলম ১৯৪৬ সালে কর্ণফুলী মাঝি নামে একটি কাহিনি-কাব্য রচনা করেছিলেন। উপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ ১৯৬২ সালে লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস কর্ণফুলী। এই ধারা এখনও বহমান। এই নদীকে নিয়ে অবিরাম রচিত হচ্ছে গান, কবিতা, ছড়া ও থিয়েটার কবিতা। এই কর্ণফুলী এখন আর আগের মতো নেই। ভালোও নেই। নিজেকে বিলিয়ে যে মানব সভ্যতা গড়ে তুলেছিল কর্ণফুলী সে সভ্য মানুষরাই দখলে দূষণে এই নদীকে মৃতপ্রায় করে তুলছে। এ নদীর শাখা নদী ও খালগুলো ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে- এর ফলে কর্ণফুলীও তার গভীরতা হারিয়ে মৃত নদীতে পরিণত হতে যাচ্ছে। ক্ষয় ধরেছে নদীতে অসংখ্য চর বুকে নিয়ে এ নদী এখন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। বাংলাদেশের অন্য নদীগুলোর ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে আমাদের প্রিয় কর্ণফুলী। যে কর্ণফুলী বন্দর সৃষ্টি করে হাজার বছর ধরে বিশ্বের সাথে এ অঞ্চলের যোগাযোগের সেতু বন্ধন তৈরি করেছিল, যে কর্ণফুলী নিজের বুকে বাঁধ নিয়ে বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করেছিল, যে কর্ণফুলী ও তার মাঝিকে নিয়ে রচিত হয়েছিল অসংখ্য গান ও কবিতা সে কর্ণফুলী, পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ছুটে চলা স্রোতস্বিনী কর্ণফুলী কাঁদছে- সে ক্রন্দন শোনার সময় আমাদের নেই। এই নদীর জলের উৎস মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল। সেখানে যথেচ্ছ বৃক্ষ নিধনের ফলে ভূমিক্ষয় বাড়ছে। আর সে সাথে ওসব এলাকায় নতুন নতুন জনবসতি বৃদ্ধির ফলে নদী দূষণ ঘটছে। কাপ্তাই হ্রদ ভরাট হয়ে যাওয়ায় জলাধারের সঞ্চিত ও রক্ষিত পানির পরিমাণ কমছে। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির পরিমাণও কমে গেছে আগের তুলনায় অনেক।
এই নদীর বুকে সেতু নির্মাণ করে ওর গতি প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে। দু’পাশের শিল্প কারখানার বর্জ্য ও চট্টগ্রাম নগরীর প্রায় ৪০ লাখ মানুষের সমস্ত তরল বর্জ্য নিক্ষিপ্ত হচ্ছে এই নদীতে। প্রতিদিন এই নদীর বুকে চলা জাহাজ ও যন্ত্রচালিত নৌযানের জ্বালানি ও অন্যান্য বর্জ্যও মিশে যাচ্ছে এই নদীর পানিতে। ফলে কর্ণফুলীর পানি এখন মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কবলে। এখন থেকে সচেতন না হলে বুড়িগঙ্গার চেয়েও ভয়াবহ খারাপের দিকে যাবে পরিস্থিতি।
অথচ এই নদীটি হতে পারত লণ্ডনের টেমস বা কায়রোর নীল নদের মতো। এই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ঠিক রেখে নদীর দু’পাশে গড়ে উঠতে পারত বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি নগরী। নিয়মিত ড্রেজিং ও এর দূষণ নিয়ন্ত্রণে রেখে দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে এই নদীকে এখনও রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু এই দায়িত্বটি নেবে কে? সবাই যে হালুয়া রুটি ভাগাভাগির তালে আছে।
চট্টগ্রামের কোনো এক বিরহ কাতর প্রেমিকা বলেছিল, ‘ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে, অভাগিনীর দুঃখর কথা কইও বন্ধুরে- ওরে কর্ণফুলীরে---
আজ ভাবছি দখলে দূষণে মানুষের নষ্টামীতে অস্তিত্বের সংকটের মুখে কর্ণফুলী তাঁর দুর্দশার সাক্ষী কাকে করবে। [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ