ধর্ষকের অভয়ারণ্য–এ আমার দেশ না-কামরুল হাসান বাদল ,লেখক,কবি, সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 12/04/2018-09:06am:    দেশটি ক্রমশ ধর্ষকদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না ২ বছরের শিশু থেকে প্রায় আশি বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত। দেশের শুভবোধসম্পন্ন মানুষ এইসব ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদ করছে, কিন্তু ফল লাভ বেশি কিছু পরিলক্ষিত হচ্ছে না। মাঝে মধ্যে দুয়েকটির বিচারের কথা সংবাদ মাধ্যমে প্রচার পেলেও ধর্ষণের মামলার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের মন্থরগতি, পুলিশের অসহযোগিতা, হয়রানি, সামাজিক নিন্দা এমন বহুবিধ কারণে ধর্ষণের মামলার বিচার হতে, বিচার পেতে অনেক বেগ পেতে হয়। ফলে ধর্ষকরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে দেশে।
সম্প্রতি একটি ধর্ষণ পরবর্তী খুনের ঘটনায় দেশবাসীর মনে যুগপৎ হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। কয়েকদিন আগে বিউটি নামের এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে হত্যা করার পর তার লাশটি ফেলে রাখা হয় একটি ধানক্ষেতের পাশে। সবুজ ঘাসের ওপর বিউটির নিথর দেহটি পড়ে আছে রক্তাক্ত। স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সময়ে সবুজ ঘাসের ওপর রক্তাক্ত মৃত বিউটির লাশটি এমনভাবে পড়ে আছে দেখে মনে হচ্ছে তা যেন বাংলাদেশের পতাকা। এ যেন বিউটির লাশ নয়– ধর্ষিত বাংলাদেশের লাশ। যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য ত্রিশ লাখের প্রাণের সঙ্গে চার লাখ নারীর সম্ভ্রমহানি হয়েছিল, আমরা গভীর বেদনা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে যখন সেসব বীর, ত্যাগী ও মহৎ নারীদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি তখন বিউটির নিথর দেহটি যেন ব্যঙ্গ করে গেল আমাদের ত্যাগ, গৌরব আর অহংকারকে। বিউটি যেন আমাদের বলে গেল, ধর্ষকের অভয়ারণ্য আমার দেশ না, চার লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশ আমাদের না। আজকের ধর্ষক আর একাত্তরের ধর্ষক এক ও অভিন্ন। সমাজে যদি একজন ধর্ষকও থাকে সে সমাজ আমার না।
শায়েস্তাগঞ্জের ব্রাহ্মণডোরা গ্রামের সায়েদ আলীর কন্যা ও স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী বিউটি আক্তার। একই গ্রামের মলাই মিয়ার ছেলে বাবুল মিয়া গত ২১ জানুয়ারি বিউটিকে অপহরণ করে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় ১ মার্চ বিউটি আক্তারের বাবা সায়েদ আলী বাদী হয়ে বাবুল, তার মা ইউপি সদস্য কলম চাঁনের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অপহরণ ও ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। মামলাটি ৪ মার্চ শায়েস্তাগঞ্জ থানায় পাঠায় আদালত। বিউটির পরিবারকে ভয়ভীতি দেখানোর কারণে বিউটির বাবা মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাকে তাঁর নানার বাড়ি লানাই উপজেলার গুনিপুর গ্রামে পাঠিয়ে দেয়। ওই রাতেই সেখান থেকে নিখোঁজ হয় বিউটি। ১৭ মার্চ সকালে উপজেলার পুরাইকলা বাজার সংলগ্ন হাওরে বিউটির লাশ পাওয়া যায়। এই লেখাটি যখন লিখছি, বুধবার সকাল পর্যন্ত আসামি বাবুলকে গ্রেপ্তার করেছে বলে শুনিনি।
বিউটির ধর্ষণ ও হত্যার সংবাদটি বর্তমানে ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। তার অন্যতম কারণ তার লাশের ছবিটি যেভাবে তোলা হয়েছে তাতে যে কোনো মানুষের ক্ষুব্ধ হয়ে উঠার কথা। হয়েছেও তাই। প্রতিদিন এই ছবি ফেসবুকের নিউজফিডে ভেসে উঠছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, তা কয়েকদিনের জন্য। আমরা জানি এরপর আরেকটি ঘটনা ঘটবে। তার ছবি, তার সংবাদ ভুলিয়ে দেবে বিউটির কথা। অন্য কোনো বিউটির সংবাদ ঠাঁই করে নেবে সংবাদপত্রের পাতায়। অন্য কোনো বড় ঘটনা বা দুর্ঘটনার নিচে চাপা পড়ে যাবে বিউটির ঘটনা। আমরা আর খবরও নেব না বিউটি হত্যার বিচার কতটুকু হলো, পুলিশ যথাযথ রিপোর্ট দিয়েছে কি না। বাবুল গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে গেল কি না। প্রভাবশালীরা বিউটির বাবাকে শেষ পর্যন্ত আপোষ করতে, মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করল কি না। আমরা তখন আরেকটি ধর্ষণ, কিংবা আরেকটি দুর্ঘটনা, কিংবা কোনো আনন্দ সংবাদে বিভোর থাকবো। আর এভাবেই সমাজে বিউটিরা ধর্ষিত হবে। হত্যাকাণ্ডের শিকার হবে, হতে থাকবে।
নারী ও শিশুর প্রতি যে সহিংসতা বাংলাদেশে চলছে তাতে এই সমাজকে সভ্য বলতে বাঁধে। ঘরে–বাইরে যানবাহনে কোথাও কোনো নারীই আজ নিরাপদ নয়। বাংলাদেশের চিত্রটি বেশ অদ্ভুদ! দেশের নারী শিক্ষার হার বেড়েছে, কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বেড়েছে, নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে, মোট কথা নারী এগিয়ে যাওয়ার সূচকে বাংলাদেশ অনেক অগ্রসর হয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে নারীর নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা বেড়েছে। নারীদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত করার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
যারা ধর্ষণের কারণ হিসেবে নারীর পোশাককে দায়ী করছেন, নারীর ঘরের বাইরে আসাকে দায়ী করছেন তারা মূলত ধর্ষণের পক্ষে বলছেন। তারা ধর্ষণকে ‘জাস্টিফাই’ করার চেষ্টা করছেন। ‘উগ্র পোশাক’ বলে তারা যা বোঝাতে চাইছেন তাতে আসলে তাদের মনোবিকৃতির চিত্রই তুলে ধরছেন। বিউটি ধর্ষিত হওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই তার পোশাকের কোনো ভূমিকা ছিল না। সে ছিল গ্রামের আর দশটি মেয়ের মতোই। ওই রক্ষণশীল গ্রামে তার পক্ষে তথাকথিত ‘আপত্তিকর’ পোশাক পরার সুযোগ ছিল না। তার প্রশ্নই আসে না। দু’বছরের শিশু, পাঁচ বা সাত বছরের শিশু কিংবা বলৎকারের ঘটনার সাথে পোশাকের সম্পর্ক কীভাবে মেলানো যায়? ধর্ষণের কারণ প্রকৃতপক্ষে পোশাকে নয়, কিংবা নারীর একলা চলাফেরা নয়, ধর্ষণের কারণ সম্পূর্ণ মানসিক, বিকৃত যৌন অবদমন। এর থেকে রেহাই পেতে সামাজিক জাগরণ, জনসচেতনতার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। বাংলাদেশ–দুঃখজনক হলেও এক্ষেত্রে চরম ব্যর্থ একটি রাষ্ট্র। তার কারণ আগেও উল্লেখ করেছি ধর্ষণ মামলার দীর্ঘসূত্রতা, আইনের দুর্বলতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অসহযোগিতা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। এদেশে ধর্ষকদের ঘৃণা করা হয় না ধর্ষিত নারীকে যতটা করা হয়। ধর্ষিত হলে তার দায় চাপানো হয় ধর্ষিত নারীর ওপরই। যেকোনোভাবেই হোক ধর্ষণের জন্য ওই নারীর কোনো একটি দোষ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়। এদেশে লোকলজ্জার ভয়ে অনেকে ধর্ষণের মতো ঘটনারও বিচার চাইতে কুণ্ঠিত হন। কারণ একবার ধর্ষিত নারীকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার পরিবার, সমাজ এবং বিচারালয়ে প্রতিপক্ষের আইনজীবীদের হাতে অসংখ্যবার পরোক্ষ ধর্ষিত হতে হয়। ধর্ষিত নারীর প্রতি সমাজের মানুষের সহানুভূতির পরিবর্তে থাকে এক ধরনের তাচ্ছিল্য, উপেক্ষা, ঘৃণা। অনেক সময় ধর্ষিত হয়েছে বলে চরিত্রহীনা আখ্যা দিয়ে ধর্ষিতাকে এক প্রকার অপাংক্তেয় করে তোলা হয়। ধর্ষিত কোনো নারীকে শুধু যে ধর্ষণকারীর বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করতে হয় তা নয়, তাকে একই সাথে পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি, আদালতসহ সবকিছুর সাথেই লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। ফলে ধর্ষণের বিচার পাওয়া অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে নারীর পক্ষে।
এক সময় দেশে অ্যাসিড সন্ত্রাস খুব ভয়ানকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটতো। হাজার হাজার নারীর জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে অ্যাসিড সন্ত্রাস। এ বিষয়ে প্রচুর লেখালেখি ও আন্দোলনের পর সরকার অ্যাসিড নিক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর আইন করে। এর ফলে দেশে অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা দ্রুত কমে এসেছে। ধর্ষণের বিচারেও এমন কঠোর আইন করতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর আইন আছে এবং তার কঠোর প্রয়োগও আছে। ফলে ওইসব দেশে ‘অর্ধনগ্ন’ কোনো নারীরও ধর্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। পুরনো আইন, গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় বিচারের মাধ্যমে ধর্ষণের ঘটনা বন্ধ করা যাবে না। আইনের পরিবর্তন দরকার। প্রক্রিয়ার পরিবর্তন দরকার। বছরের পর বছর মামলা চললে তা অবিচারেরই সামিল। ওল যদি বুনো হয় তাহলে তার জন্য বাঘা তেঁতুলের দরকার। ধর্ষণ হলো পৃথিবীর নিকৃষ্টতম অপরাধ। ফলে এই অপরাধীরা সামান্যতম অনুকম্পা পাওয়ারও যোগ্য নয়।
ধর্ষণ ঠেকাতে হলে এর বিচারের জন্য প্রয়োজন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। আইনের সংশোধন করে ১৫ কার্যদিবসে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে তা কার্যকরের বিধান রাখতে হবে। হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট, রিভিউ সবকিছুই হতে হবে ওই ৩০ দিনের মধ্যে। এখানে মানবাধিকারের প্রশ্ন তুলে লাভ নেই কারণ ধর্ষণের চেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘন আর কিছু হতে পারে না।
ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিদিন প্রতিবাদ হচ্ছে। অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি আউড়ানো হচ্ছে। এর প্রতিবাদে সমাবেশ মানববন্ধন হচ্ছে। গণ মাধ্যমে এর মনো সামাজিক বিশ্লেষণ হচ্ছে। আমাদের মতো ছাপোষা সাংবাদিকরা লিখে যাচ্ছি, বলে যাচ্ছি কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না। না হওয়ার কিছু সামাজিক কারণও আছে। বিভিন্ন ওয়াজ–মাহফিলে যে ভাষায় নারীদের আক্রমণ করা হয়, সমালোচনা করা হয় তাতে শ্রোতাদের মনে নারীর প্রতি অশ্রদ্ধা জন্ম নিতে বাধ্য। এর প্রতিফলন ঘটে সমাজে পরিবারে রাষ্ট্রে। এই প্রবণতা, এই নিন্দা, এই অরুচিকর প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে সমাজে নারীদের প্রতি সম্মানবোধ জাগ্রত হবে না। নারীদের সম্মানের দৃষ্টিতে দেখার পরিবেশ তৈরি হবে না। যে সংবিধান নারী পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রদান করেছে সেখানে নারীদের প্রতি বিষোদগার ছড়ানো, তাদের অসম্মান করে বক্তৃতা দেওয়া সংবিধান পরিপন্থী কাজ। কাজেই এই চর্চা ও প্রবণতা বন্ধ করা সরকারের কাজ, যারা সংবিধান সুরক্ষার শপথ নিয়েছে।
কামরুল হাসান বাদল ,লেখক,কবি, সাংবাদিক ও টিভি ব্যক্তিত্ব,ও সংগঠক

সর্বশেষ সংবাদ