আর কত ক্ষয়, আর কত প্রাণের অপচয় -কামরুল হাসান বাদল ,লেখক,কবি, সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 12/04/2018-08:29am:    ১. নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তারা । অনেক সীমাবদ্ধ সুযোগ নিয়ে, অনেক প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস’তি নিচ্ছিলেন । তাদের বাবা-মা এক বুক আশা নিয়ে ভবিষ্যতের সোনালী স্বপ্ন বপন করেছিলেন বুকে । কত বন্ধু-কত স্বজন-আত্মীয় অপেক্ষায় ছিলেন সংগ্রামী আর প্রত্যয়ী এই তরুণদের সাফল্য দেখার আশায় । কিন’ তা হলো না । তার আগেই অনাকাঙ্ক্ষিত অপমৃত্যু থামিয়ে দিয়েছে অদম্য এই চার তরুণের যাত্রাপথ । ভেঙে দিয়েছে বাবা-মায়ের স্বপ্ন । মানুষের অসততা আর লোভের কারণে জীবনপ্রদীপ নিভে গেল স্বপ্নবান চার তরুণের ।
তৌহিদুল ইসলাম, শাহীন মিয়া, হাফিজুর রহমান ও দীপ্ত সরকার এই চারজনই ছিলেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) বস্ত্র প্রকৌশল (টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র । শিক্ষানবীশ প্রকৌশলী হিসেবে ময়মনসিংহের ভালুকায় স্কয়ার ফ্যাশন নামের একটি কারখানায় যোগ দিয়েছিলেন । কারখানার পাশেই একটি ছয়তলা ভবনের নিচতলায় ফ্লাট ভাড়া নিয়ে একসঙ্গে থাকতেন চার বন্ধু । ৫ এপ্রিল তাদের ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার কথা । তার আগেই গত ২৪ মার্চ রাতে ওই ফ্লাটে বিকট বিস্ফোরণ ঘটে । পুলিশ বলছে, অবৈধ গ্যাস সংযোগের লিকেজ থেকে ছড়িয়ে পড়া গ্যাসের বিস্ফোরণ ঘটে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে । যার দায় লোভী ভবন মালিক আর গ্যাস কোম্পানির সংশ্লিষ্ট অসাধু ব্যক্তিরা ।
বিস্ফোরণে ফ্লাটের দেয়াল পর্যন্ত ভেঙে যায় । ছিটকে পড়ে আসবাবপত্র, জানালার কাচ । বিস্ফোরণ ও আগুনে ঘটনাস’লেই মারা যান তৌহিদুল । গুরুতর দগ্ধ তিনজনকে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস’ায় মারা যান শাহীন মিয়া । বৃহস্পতিবার গভীর রাতে হাফিজুর এবং গত শুক্রবার সকালে দীপ্ত সরকার জীবনযুদ্ধে হেরে যান ।
২. রাজধানী ঢাকার শান্তিনগরের ১৬তলা বিশিষ্ট গ্রিনপিস অ্যাপার্টমেন্টের ১৬ তলারই একটি ফ্লাটে থাকেন সিপু রহমান নামের এক ব্যক্তি । গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি তাঁর সাত বছরের মেয়ে আলবিরাকে নিয়ে লিফটে নিচে নামছিলেন । গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসে বের হওয়ার সময় লিফটের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দরজায় আটকে যায় আলবিরা । এ সময় দরজার ধাক্কায় প্রচণ্ড আঘাত পায় সে । একপর্যায়ে আলবিরাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন । ওই ভবনের বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, লিফটি বেশ কিছুদিন ধরে নষ্ট ছিল । ঠিকমতো মেরামত ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে ।
৩. এছাড়া প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা, মারামারি, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত, নৌকাডুবি, অগ্নিকাণ্ড, লঞ্চ দুর্ঘটনা, ডাকাতি, ভুল চিকিৎসা আর রোগে শোকে মৃত্যুর ঘটানাতো আছেই ।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দেশের তালিকায় এখনো বাংলাদেশের অবস’ান এক নম্বরে। প্রতিদিন কত মানুষ অসতর্কতা আর অবহেলার কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ দিচ্ছে আর তার সাথে কয়েকগুণ বেশি মানুষ দুর্ঘটনার কারণে চিরদিনের জন্যে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে।
এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর খবর প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠছে। নদী বা পুকুরে ডুবে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, অরক্ষিত দালান বা ছাদ থেকে পড়ে, দেয়াল ধসে কত বিচিত্রভাবে মানুষ মরছে এ দেশে। ঘর থেকে বের হলে জীবিত বা অক্ষত দেহে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তাও নেই এ দেশে।
সড়কগুলো যেন মৃত্যুফাঁদ। কখন কোথায় মৃত্যুদূত ওঁৎ পেতে আছে আমরা কেউ জানি না। শুধু সড়কেই নয়, ঘরেও তো কেউ নিরাপদ নই।
যে মেধাবী চার তরুণ গ্যাস বিস্ফোরণের কারণে মৃত্যুবলণ করল তারাতো ঘরেই ছিল। কে জানত নিরাপদ ঘরের মধ্যে থেকেও তাদের অপঘাতে প্রাণ দিতে হবে। কিংবা ফ্লাট বাড়ির লিফটের দরজার আঘাতে যে শিশুটি মৃত্যুবরণ করল সে মৃত্যুর ব্যাখ্যা কী হতে পারে? পিতার সামনে শিশুটি মৃত্যুবরণ করল একজন পিতা হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে সে শোক, সে কষ্ট ভোলার কোনো উপায় রইল কী?
৪. বেশি মানুষের দেশ বলেই কি মানুষের দাম এই দেশে এত কম। জীবনের মূল্য এত তুচ্ছ? উন্নত বিশ্বে মানুষের প্রতি এত অবহেলা কি কখনো সম্ভব । ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় কোনো নারী গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে সে নারী ও তার ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্য রাষ্ট্র সবধরনের নিরাপত্তা ব্যবস’া সুনিশ্চিত করে আগে । অনাগত সে শিশুর জন্য রাষ্ট্র আগাম সব ব্যবস’াই করে রাখে। তাদের রাষ্ট্রে আরেকটি নাগরিকের জন্ম হচ্ছে এটি তাদের জন্য পরম আনন্দের সংবাদ। ফলে সে শিশু ভূমিষ্টের পর তার সুচিকিৎসা কোথায় হবে, কেমন হবে তার পড়াশোনা কোথায় হবে ইত্যাদি বিষয় রাষ্ট্র পূর্ব থেকেই ব্যবস’া করে রাখে। তার পাশাপাশি আমাদের দেশে ?
এখানেতো গর্ভবতী মায়ের সুচিকিৎসা দেওয়ার পুরোপুরি ব্যবস’াও নেই। শিশুদের স্বাস’্যসেবা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত ব্যবস’া নেই। এদেশে পর্যাপ্ত চিকিৎসাকেন্দ্র নেই, চিকিৎসক নেই, খাঁটি ওষুধ নেই, রোগ নির্ণয়ের ব্যবস’া নেই। এতসব নেই এর মধ্যেই এখানে প্রতিদিন হাজার শিশু জন্ম নেয়। চরম অবহেলা, নিরাপত্তাহীনতায় তারা বেড়ে ওঠে। বেঁচে থাকে এবং এতসব ঝুঁকি মাথায় নিয়ে লড়াই করতে করতে এক সময় জীবনযুদ্ধে পরাজয় মেনে এই সুন্দর পৃথিবী থেকে অকালে বিদায় নেয় ।
জন্ম নিলে মরতে হবে তাতে কোনো দ্বিমত নেই । দ্বিমত থাকলেও বেঁচে থাকার উপায় নেই । কিন’ সে মৃত্যু যদি স্বাভাবিক মৃত্যু হয় তাতেও কারো আপত্তি নেই । কিন’ কারো অবহেলার কারণে, কারো লোভের কারণে, কারো দুর্নীতির কারণে, কারো স্বেচ্ছাচারিতার কারণে এত মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না । একটি রাষ্ট্রের প্রধান কাজই হলো তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া। এরপরে আসতে পারে অন্যসব মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন । মানুষেরই যদি নিরাপত্তা না থাকে তাহলে অন্য কোনো উন্নয়ন দিয়ে কী লাভ হবে মানুষের ।
প্রতিটি অকালমৃত্যুই সমাজ ও রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি । এত মৃত্যু, রাষ্ট্র ও সমাজকে কী পরিমাণ ক্ষয় করে দিচ্ছে তা হয়ত আমরা অনুধাবনই করতে পারছি না । ব্যক্তির অকাল মৃত্যু একটি পরিবারের কী পরিমাণ ক্ষতি করছে তা আপাত দৃষ্টিতে পরিমাপ করার উপায় নেই । একটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওযার অর্থ সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া আর সমাজের এই ব্যাপক ক্ষতি বিনাশ করছে রাষ্ট্রের সামর্থকে । দুর্বল করে দিচ্ছে রাষ্ট্রের ভিতকে ।
অথচ আমরা সামান্য সচেতন হলে, নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে, কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে এত মৃত্যু, এত ক্ষয় রোধ করা সম্ভব হতো । যে বাড়িওয়ালার অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেওয়ার কারণে গ্যাস বিস্ফোরণ হলো এবং তাতে চার মেধাবী তরুণ প্রাণ হারালো তার যথার্থ বিচার কি হবে ? অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেওয়া এমনিতেই বেআইনি । এই লোকটি বছরের পর বছর গ্যাস কোম্পানির কিছু অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশে যে অপরাধ করেছে তার জন্য এতদিন তাকে কোথাও জবাবদিহি করতে হয়নি । অবৈধ সংযোগ নিয়ে সে ব্যক্তি বছরের পর বছর রাষ্ট্রকে ঠকিয়েছে । আজ তার সেই অবৈধ কাজের ফলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দায় সে ব্যক্তি এড়াবে কী করে ? কিন’ প্রশ্ন হলো, এই ব্যক্তির শাস্তি কি আদৌ হবে ?
রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ লিফটে আটকে পড়ে যে শিশু মৃত্যুবরণ করল সে অ্যাপার্টমেন্টের দায়িত্বশীলদেরও বিচার কি হবে ? এত এত অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ীদের প্রকৃত বিচার কি হয়েছে, হচ্ছে কিংবা ভবিষ্যতে হবে ?
মানুষে পরিপূর্ণ বলে মানুষের প্রতি এত অবহেলা প্রকৃতি মেনে নেবে না । এত ক্ষয়, জীবনের এত অপচয় রাষ্ট্রের অকল্যাণই শুধু বৃদ্ধি করবে ।
কামরুল হাসান বাদল ,লেখক,কবি, সাংবাদিক ও টিভি ব্যক্তিত্ব,ও সংগঠক

সর্বশেষ সংবাদ