অসহিষ্ণু সমাজ অমানবিক সমাজ-কামরুল হাসান বাদল, লেখক,কবি, সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 28/02/2018-01:05pm:    আমরা এত অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছি যে, এখন কথা বলার ক্ষেত্রে করছি তর্কাতর্কি, তর্কাতর্কির ক্ষেত্রে করছি কলহ, কলহের ক্ষেত্রে করছি মারামারি, মারামারির ক্ষেত্রে করছি খুনোখুনি। সমাজের উচ্চ শ্রেণি থেকে শুরু করে নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত পরিলক্ষিত হচ্ছে এই চিত্র, এই পরিসি’তি। আমাদের মধ্য থেকে লোপ পেয়েছে সৌভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, মমতা ও ভালোবাসা। পরস্পরের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সমীহভাব প্রদর্শনে আমরা ভীষণ কৃপণ হয়ে উঠছি। আর এর ভয়াবহ শিকার হচ্ছে দেশের শিশুরা। তারা একটি অমার্জিত, অভদ্র, অশোভন পরিবেশে বড় হয়ে উঠতে উঠতে নিজেরাই হয়ে উঠছে অভদ্র, অশোভন, অমার্জিত ও নিষ্ঠুর।
যে সমাজে বেড়ে উঠছে শিশুরা সেখান থেকে তারা মানবতার শিক্ষা পাচ্ছে না। মানুষ হবার প্রেরণা পাচ্ছে না। সুনাগরিক হয়ে উঠবার শিক্ষা পাচ্ছে না। শুধু নিজ দেশে নয়, বিশ্ব পরিসি’তিও আজ কোনো দেশে, কোনো সমাজে একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠার অনুকূলে নয়। সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় প্রতিদিন যা দেখি কিংবা আমাদের শিশুরা যা দেখছে, যুদ্ধের ভয়াবহতা, নিষ্ঠুরতা, তাতে একটি শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং সহজেই একটি শিশুর মন ও মনন থেকে মানবতাবোধ, মমত্ববোধ লোপ পাচ্ছে।
সমাজে কোথাও কোনো সুবাতাস নেই। সুখবর নেই। বড়দের দলাদলি, মারামারি, স্বার্থপরতা, মিথ্যাচার, নিষ্ঠুরতা, প্রতারণা দেখতে দেখতে বড় হচ্ছে শিশুরা। আর এর প্রভাবেই সে শিশুটি বড় হয়ে অবচেতনতায় একই আচরণ করছে। পরিসি’তি এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে, নিজ সন্তানদের প্রতি, নিজ পাড়ার শিশুদের প্রতি আস’া রাখতে পারি না। দলবদ্ধ কিশোর-তরুণ, যাদের শরীর থেকে এখনো মাতৃদুগ্ধের গন্ধ দূর হয়নি তাদের দেখে ভয়ে সিঁটকে যাই। কারণ এখন এই কিশোর-তরুণরাই যেন আমাদের সকল দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেপরোয়া এই কিশোর-তরুণদের কাছে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি রাষ্ট্র প্রশাসনও যেন অসহায় হয়ে পড়েছে।
স্কুলশিক্ষার্থী কিশোর আদনান হত্যার রেশ কাটতে না কাটতে নগরে খুন হলো আরেক কিশোর। গত শুক্রবার রাতে নগরের সদরঘাট এলাকায় ক্রিকেট খেলা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে পাঁচবন্ধু মিলে ছুরিকাঘাতে খুন করে কিশোর ইব্রাহিমকে। পুলিশ বলছে, এ ঘটনার সূত্রপাত কিশোর বয়সের ‘হিরোইজম’ থেকে। এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া দু’কিশোর হত্যার দায় স্বীকার করে গত রোববার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কিশোররা যে তথ্য দিয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। তাদের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, গ্রেফতার হওয়া রনি সদরঘাট সাহেবপাড়া এলাকার কিশোর তরুণদের একটি গ্রুপের ‘বড় ভাই’। একই এলাকায় আরেকটি গ্রুপের বড় ভাই নিহত ইব্রাহিম। মাস দেড়েক আগে ক্রিকেট খেলা নিয়ে দ্বন্দ্বের জের হিসেবে ইব্রাহিম রনিকে চড়-থাপ্পর দেয়। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে এক সময় ইব্রাহিমকে হত্যার পরিকল্পনা করে রনি ও তার গ্রুপের কয়েকজন। ঘটনার দিন ইব্রাহিমকে রাস্তায় পেয়ে রনি ও তার বন্ধুরা মারধর করে এবং এক পর্যায়ে এলোপাথাড়ি ছুরিকাঘাত করে। ঘটনাস’লেই মৃত্যু হয় ইব্রাহিমের।
গত প্রায় এক দশক ধরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় নগরে গ্যাং কালচার গড়ে উঠছে। উঠতি বয়েসি কিশোর-তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে এই গ্যাং কালচারে। পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠছে নানা ধরনের গ্রুপ। অনেক সময় তারা রাজনৈতিক দলের স’ানীয় নেতাদের প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ঢাকার উত্তরায় এক কিশোর শিক্ষার্থীর খুনের পর বাংলাদেশে এ ধরনের গ্যাং কালচারের সংবাদ প্রকাশ পায়। গত ১৪ জানুয়ারি জামালখান আইডিয়াল স্কুলের সামনে ছুরিকাঘাতে খুন হয় কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদনান ইসফার। সে খুনের সাথে জড়িতদের সবাই ছিল কিশোর-তরুণ।
অপরাধের ক্ষেত্রে কিশোর অপরাধ বা গ্যাং কালচার নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। পশ্চিমা বিশ্বে গত শতকে নগরায়ণের ফলে এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। আমাদের দেশে নগরায়ণের কুফল হিসেবে এটিকে কেউ কেউ দেখলেও পুরোটা সত্য নয়। কারণ কিশোর-তরুণদের এই বেপরোয়া আচরণ গ্রামাঞ্চলেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমাদের সন্তানদের জন্য বিনোদনের ব্যবস’া চাই, খেলার মাঠ চাই বলছি বটে কিন’ সে খেলার মাঠও যদি সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির বদলে রক্তারক্তির ঘটনার জন্ম দেয় তাহলে দেশের কয়েক কোটি কিশোর-তরুণদের বিনোদন, ক্রীড়ার ব্যবস’া কী করে হবে। নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে। সমাজে এই যে ক্ষয় ধরেছে, আমাদের সন্তানরা যে দিনদিন নিষ্ঠুর ও অমানবিক হয়ে উঠছে এর কারণ বিশ্লেষণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতামত এক্ষেত্রে খুব জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ সমাজকে নিরাপদ না করে পুলিশ প্রহরায় তো খেলা থেকে বিনোদন সম্পন্ন করা সম্ভবপর নয়। এধরনের ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা পরিসি’তির অবনতি বলে চালিয়ে দেওয়ার উপায় নেই। পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে খেলার মাঠে গিয়ে কাউকে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। এই ঘটনাগুলো সমাজের অবক্ষয়ের চিত্র। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় খুব সহসাই খঁজে বের করতে হবে।
কিশোর তরুণদের হিরোইজম নতুন কিছু নয়। খেলাধুলা বা নানা বিষয়ে আগেও বিভিন্ন সময়ে মারামারি-কলহ হয়েছে। তবে তখন তা মাঠ থেকে আর বেশি দূর বিস্তৃত হয়নি। এখন সামান্য চড়-থাপ্পরের প্রতিক্রিয়ায় যদি খুনোখুনির মতো ঘটনা ঘটে তবে তা সমাজের জন্য ভয়াবহ পরিসি’তি সৃষ্টি করবে। আমাদের সময়ে কিংবা আমাদের আগে বা পরেও শিশু-কিশোরদের মনে হিরোইজম ছিল না তা নয়। কখনও খেলার মাঠে মারামারি হয়েছে। তবে তা মাঠের বাইরে আসেনি খুব একটা। পাড়ায়-পাড়ায় মারামারিও হয়েছে তবে তা হকিস্টিক, লাঠি, চাকু, রিকশার চেইন কখনো কখনো ‘মাছ মার্কা’ ছুরি পর্যন্ত গড়িয়েছে। সামান্য কথা কাটাকাটি থেকে খুনখারাবি খুব একটা ঘটেনি আমাদের সময়ে। কথা কাটাকাটি বা মারামারির সময়ে পাড়ার কোনো গুরুজনকে দেখে থমকে গেছে সবাই, পালিয়ে গেছে হিরো’রা। সমাজের সর্দাররা মিলে কলহ মিটিয়ে দিয়েছে। সালিশ-বৈঠক করে দুপক্ষকে মিলিয়ে দিয়েছে। এখন সে সমাজবদ্ধতা নেই, সামাজিক অনুশাসন নেই। পরস্পরকে মান্য করার প্রবণতাও নেই।
বয়স্ক, গুরুজনদের সে স’ান এখন দখল করেছে ‘বড়ভাই’রা। যারা এদের শাসন করার পরিবর্তে উস্কানি ও প্রশ্রয় দিচ্ছে। প্রায় দুগ্ধপোষ্য শিশুদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দিচ্ছে। অপরাধ সংঘটিত করার পর এই পিচ্চি অপরাধীরা সেই ‘বড় ভাই’দের কাছে আশ্রয় নিচ্ছে। বড় ভাই’রা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষে এই অপরাধীদের লালন করছে। আর ‘বড় ভাই’রা কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। নেতাদের আনুকুল্য পাচ্ছে।

সর্বশেষ সংবাদ