ভাষা আন্দোলনে সংবাদপত্রের ভূমিকা মো.ওসমান গনি. লেখক:সাংবাদিক ও কলামিস্ট

পোস্ট করা হয়েছে 13/02/2018-08:00pm:    বাঙালি জাতির বাংলা ভাষা আদায়ের জন্য এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল ঢাকার রাজপথে।সেদিন তাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রাস্তা-ঘাট।পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বহু চেষ্টা করেও তারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে পারেনি।বীরজনতা বাঙালির প্রতিরোধের মুখে সেদিন পাকিস্তানী বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।বাংলার সর্বস্তরের মানুষের একটাই দাবি ছিল, ‘বাংলা’ হবে পূর্ব পাকিস্তানের রাস্ট্র ভাষা।বাঙালি তাদের সেই দাবিকে বাস্তবে রুপ দিয়েছিল।বাংলা ভাষা কে সেদিন রাষ্ট্র ভাষা প্রতিষ্ঠিত করতে যেয়ে সেদিন এদেশের অগনিত মানুষ তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এদেশে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠিত করে গেছে।ভাষার জন্য শহীদ
হয়েছে,রফিক,জব্বর,সালাম,বরকতসহ আর অনেক লোক।বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার জন্য সে সময়ে মানুষের পাশাপাশি, সংবাদপত্র গুলোও বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।ভাষা আন্দোলন তথা এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সপক্ষে লড়াই করেছে সে সময়ের সংবাদপত্রগুলো। ভাষা আন্দোলনে সংবাদপত্রগুলোর কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিল এর প্রকৃত প্রমাণ পাওয়া যায় ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনাসংবলিত ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক-এর শহীদ সংখ্যার প্রচার মাত্রা দেখে। ১৯৪৮-১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন চলাকালীন প্রকাশিত হতো আবুল কালাম শামসুদ্দিন সম্পাদিত দৈনিক আজাদ, আবদুস সালাম সম্পাদিত পাকিস্তান অবজারভার, আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিক দৈনিক ইত্তেহাদ, সাপ্তাহিক সৈনিক, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত সাপ্তাহিক ইত্তেফাক। এ ছাড়াও বাংলা ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে যে সব পত্রিকার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল সেগুলো হলো, ঢাকা থেকে খন্দকার আবদুল কাদেরের সম্পাদনায় ‘নতুন দিন’, ফেনী থেকে খাজা আহমদের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘সংগ্রাম’ এবং চট্টগ্রাম থেকে প্রগতিশীল গোষ্ঠীর ‘সীমান্ত’, মাহমুদ আলীর সম্পাদনায় সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘নওবেলাল’। এসব সংবাদপত্র খবর, প্রতিবেদন, সংবাদ-নিবন্ধ, উপ-সম্পাদকীয় এবং কবিতা, গান, কার্টুন ইত্যাদি প্রকাশের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনে শুধু জনমতই সংগঠিত করেনি, ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য থেকে পদত্যাগ করে এক অনন্য দৃষ্টাস্ত স্থাপন করেন দৈনিক আজদ পত্রিকার সম্পদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন ও সাপ্তাহিক নওবেলাল সম্পাদক মাহমুদ আলী। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে কাজ করায় অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক আবদুস সালাম ভয়াবহ সরকারি নির্যাতন ভোগ করেন এবং তাকে কারাগারে আটক করা হয়। রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ সদস্য ছিলেন জিন্দেগী, ইনসান ও ইনসাফ পত্রিকার সম্পাদকরা।
সাপ্তাহিক সৈনিক প্রথম প্রকাশিত হয় ১৪ নভেম্বর, ১৯৪৮ (২৮ কার্তিক, ১৩৫৫)। সৈনিক শুরু থেকেই বাংলা ভাষা প্রশ্নে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। সৈনিক-এ বাংলা ভাষা বিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য ও খাজা নাজিম উদ্দিনের বক্তৃতার তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করিবার চক্রান্তকে রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে ,নাজিম উদ্দিনের বক্তৃতায় প্রদেশব্যাপী বিক্ষোভ।’ নাজিম উদ্দিনের বিবৃতির প্রতিবাদ করে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিসের ঢাকা কেন্দ্রের আহ্বায়ক মাহফুজুল হক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তমদ্দুন মজলিসের সম্পাদক শাহাবুদ্দীন খালেক সংবাদপত্রে যে বিবৃতি দেন তাও ওই সংখ্যা সৈনিকে প্রকাশিত হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে এবং কয়েকজন শহীদ হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় সপ্তাহিক সৈনিক-এর শহীদ সংখ্যা। লাল কালিতে ও লাল বর্ডার দিয়ে প্রকাশিত এই সংখ্যায় খবরের উল্লেখযোগ্য শিরোনামগুলো ছিল, ‘শহীদ ছাত্রদের তাজা রক্তে রাজধানী ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত। মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে ছাত্র সমাবেশে নির্বিচারে পুলিশের গুলিবর্ষণ। গত বৃহস্পতিবার ৭ জন নিহত, ৩ শতাধিক আহত, ৬২ জন গ্রেফতার, শুক্রবারেও ব্যাপক সংখ্যক লোক হতাহত, রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষা করার শপথ বিঘোষিত।সাপ্তাহিক সৈনিক-এর এই সংখ্যার জনপ্রিয়তা এতই ছিল যে, মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার কপি পত্রিকা বিক্রি হয়ে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ একইদিনে তিনটি সংস্করণ বের করতে বাধ্য হন।
ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্নে ১৯৪৭ সালের ২২ জুন কলকাতার রবিবাসরীয় বিভাগে ‘বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ এই শিরোনামে লেখক-সাংবাদিক আবদুল হকের একটি প্রবন্ধের প্রথম অংশ ছাপা প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় অংশটি ছাপা হয় ২৯ জুন। প্রবন্ধটিতে বাংলার ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে বলা হয়ে, আমরা কেন আমাদের দেশে ইংরেজি উর্দু-হিন্দু বলতে বাধ্য থাকব? আমাদের দেশে যারা বাস করে সেই সব ইংরেজ বা উর্দু-হিন্দু ভাষীরা কেন বাংলা শিখতে বাধ্য হবে না? আমার মতো এই যে, এদেশে যেসব ভারতীয় অথবা অবাঙালি বাস করবে, তাদের বাংলা শিখতে হবে, যদি তারা এদেশে বাস করতে চায় এবং আমাদের সঙ্গে চলতে চায়। বাংলা শেখা তাদেরই গরজ। তাদের জন্য ইংরেজী-উর্দু-হিন্দি শেখা আমাদের গরজ নয়, বরং আমাদের পক্ষে ঘোর অমর্যাদাকর।’ পত্রিকাটি এই ধরনের আরও বহু রচনায় উদ্যোগী ছিল।
১৯৫২ সালে পূর্ব বাংলার বেশ কটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক তখন ছাপা হতো ৯ হাটখোলা রোডের প্যারামাউন্ট প্রেস থেকে। ইত্তেফাক প্রথম পৃষ্ঠায় ১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারির ঘটনাবলীর সংবাদ শিরোনা ছিল, ‘দেশের কাছে লাল ফেব্রুয়ারির শহীদদের ডাক আসিয়াছে।’ ‘বাংলা ভাষা সংগ্রামকে সফল করিয়া রক্তের প্রতিশোধ নাও।’ ‘নুরুল আমিন ও প্রতিশ্রুতির পিচ্ছিল পথে পা বাড়াইয়াছে। জনগণ হইতে বিচ্ছিন্ন সরকার আজ মিলিটারির জোরে বাঁচিয়া আছে।’ শুধু ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনাবলিই নয়, পরেও ভাষা আন্দোলনের পক্ষে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে এই পত্রিকাটি।
তরুণ প্রাণের অকৃত্রিম হৃদয়াকুতি এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের একটি উপযুক্ত পত্রের প্রকাশনার তাগিদ থেকেই ১৯৪৯ সালের জুন মাসে ঢাকার ১০৭ ইসলামপুর থেকে প্রকাশিত হয় ‘অগত্যা’। যার কর্ণধার প্রতিভাদীপ্ত একদল সমবয়সী তরুণ, পরবর্তীকালে এদের অধিকাংশই বাংলাদেশের ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। অগত্যার প্রকাশক ও মুদ্রাকর হিসেবে নাম ছাপা হতো আবু সাঈদ নাসির-এর। এবং সম্পাদক ফজলে লোহানী। ‘অগত্যা’ ছাপা হতো পুরনো ঢাকার রমাকান্ত নন্দী লেনের পাইওনিয়ার প্রেস থেকে। ১৯৪৮ সালের প্রথম ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে ১৯৫২ সালের দ্বিতীয় দফা সর্বাত্মক বাংলা ভাষা আন্দোলন পর্যন্ত সময়কাল বিদ্রুপাত্মক এবং তীব্র সমালোচনামূলক ভাষায় যেভাবে মাসিক ‘অগত্যা’ অবাঙালি ও উর্দু আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে, তা এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত তথা সামগ্রিকভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সপক্ষে সেই দুঃসময়ে মাসিক ‘অগত্যা’ ছিল বলিষ্ঠ ও সোচ্চার কণ্ঠস্বর। নিদারুণ আর্থিক সংকটে ১৯৫২ সালের মার্চ মাস থেকে অগত্যার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।
এছাড়া বাংলা ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে যাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল সেগুলো হচ্ছে, ঢাকা থেকে খন্দকার আব্দুল কাদেরের সম্পাদনায় ‘নতুন দিন’, ফেনী থেকে খাজা আহমদের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘সংগ্রাম’ এবং চট্টগ্রাম থেকে প্রগতিশীল গোষ্ঠীর ‘সীমান্ত’। অপরদিকে ধর্মের ‘জিকির’ তুলে এবং পাকিস্তানের অখন্ডতার বজায় রাখার বাহানা করে যেসব মাসিক পত্রিকা বাংলা ভাষা আন্দোলনের তীব্র বিরোধীতা করেছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মওলানা আকরম খাঁ সম্পাদিত মাসিক মোহাম্মদী। এরপরই সরকারি মালিকানার মাসিক ‘মাহে নও’। এর সম্পাদক ছিলেন কমরেড মুজাফফর আহমদ এর জামাতা কবি আব্দুল কাদের। এছাড়া মাসিক ‘দিলরুবা’ ও মাসিক ‘নওবাহার’-এর ভূমিকা ছিল দারুণ প্রতিক্রিয়াশীল। যারা উর্দু ভাষার সমর্থক।
লেখক:সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সর্বশেষ সংবাদ