বিশ্ব সভ্যতার পথপ্রদর্শক বাংলাদেশ- খন রঞ্জন রায় লেখক ও প্রকাশক

পোস্ট করা হয়েছে 05/02/2018-06:32pm:    ৫৫ হাজার বর্গমাইলের ক্ষুদ্র বাংলাদেশ। শিল্প, শিক্ষা, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক বিনির্মানে এই দেশটির মানুষ ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। আড়াই হাজার বছর পূর্বে নরসিংদী জেলায় উয়ারী বটেশ্বরে গর্তবসতীয়া গড়ে তুলে ছিল নগর সভ্যতা। তারই সূত্র ধরে উত্তরসূরীরা আধুনিক বিশ্ব নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। নতুন নতুন আবিস্কারের চিন্তা চেতনার মাধ্যমে বিশ্বকে আকাতরে দান করছে।
এই বাংলাদেশই যুগে যুগে বিশ্বের নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, অধিকার বঞ্চিত মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন জনাকয়েক মহাপুরুষ। যাঁর ক্ষণজন্মা, দশক-শতকেও নয়, সহ¯্রাব্দে হয়তবা দু’চারজন জন্মে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদেরই একজন। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো প্যারিসে অনুষ্ঠিত এর দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে ৩০ অক্টোবর ২০১৭ তারিখ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তা সংস্থাটির ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ অন্তর্ভুক্ত করেছে। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা-বিশেষজ্ঞ কমিটি কর্তৃক দু’বছর ধরে প্রামাণ্য দালিলিক যাচাই-বাছাই শেষে ইউনেস্কোর মহাপরিচালকের সম্মতিক্রমে এটি সংস্থার নির্বাহী কমিটি কর্তৃক চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। এই স্বীকৃতির ফলে বাঙালির ইতিহাসের মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রণোদনা সৃষ্টিকারী ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ মানবজাতির মূল্যবান ও ঐতিহ্যপূর্ণ সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত ও গৃহীত হল। স্বাধীনতার জন্য আতেœাৎসর্গকৃত ৩০ লাখ শহীদ আর সম্ভম হারানো কয়েক লাখ মা-বোনসহ আমাদের সবার জন্য এটি এক মহা-আনন্দ ও বিরল সম্মানের বিষয়।
৭ই মার্চ ১৯৭১- একটি মহাকাব্যিক ভাষণকে ঘিরে এই দিনটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই অনন্য ভাষণটি কালের যাত্রার ধ্বনি হয়ে মহাকালের পানে, মহামানবের তীরে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। যা ছিল আমাদের হৃদয়ে গাঁথা তা আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বরাবরই বলে আসছিলেন সেই অবিসাংবাদিত উচ্চারণ পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম সেরা ভাষণ।
১৯৯২ সাল থেকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য সম্পদের স্বীকৃতি ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে আসছে। এর লক্ষ-উদ্দেশ্য হচ্ছে দালিলিক ঐতিহ্য ও স্মৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সংলাপ, আর্ন্তজাতিক সহযোগিতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও শান্তির চেতনা লালন করতে পারে। যুদ্ধবিগ্রহ, লুণ্ঠন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ইত্যাদি কারণে দেশে-দেশে বিশ্ব ঐতিহ্য বিনষ্ট বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। আবার সম্পদের অপ্রতুলতার কারণেও তা বিনষ্ট বা বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। এসব দিক বিবেচনায় ইউনেস্কোর এ কর্মসূচির গুরুত্ব অপরিসীম।
স্বীকৃতি দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ এখন বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস। যুগান্তকারী এই ভাষণ নিজেদের পাশাপাশি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস সর্ম্পকে বিশ্ববাসীর মধ্যে নতুন করে জানার আগ্রহ সৃষ্টি করবে। মানবজাতির বিকাশের পথ-পরিক্রমায় স্বাধীনতাকামী জাতিকে এই ভাষণটি সর্বদা অনুপ্রাণিত করবে, সাহস যোগাবে।
প্রতিটি জাতির জীবনে এমন কিছু ঘটনা থাকে, সবকিছুকে ছাপিয়ে যা সমগ্র বিশ্বের অবিভাজ্য অংশ হয়ে উঠে খাবার সেলাইন আবিস্কার সে রকমই একটি ঘটনা। যার তুলনা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।
আইসিডিডিআরবিতে কর্মরত ২৮ বছরের অভিজ্ঞ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সামসুল আলম খাবার স্যালাইন আবিস্কার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন মাত্রা যোগ করেন। পৃথিবী সৃষ্টি থেকে আজ পর্যন্ত ভেষজ, ইউনানি, আয়ুর্বেদিক, কবিরাজী, হোমিওপ্যাথিক, অ্যালোপ্যাথিক, বিলুপ্ত, অর্ধ বিলুপ্ত এবং প্রচলিত ১ লক্ষ ৮৬ হাজার ৪১২ টি ঔষুধ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) তালিকাভুক্ত করে। তার মধ্যে সবচেয়ে সহজলভ্য কমদামে বেশী লোকের জীবন রক্ষা করেছে খাবার স্যালাইন। শুধুমাত্র ২০০৭-২০১৭, ১০ বছরে ১ কোটি ৩০ লক্ষ শিশু ৭০ লক্ষ বৃদ্ধা ও গর্ববতী মহিলা অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে, যা কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই।
ইধঃঃবৎ খধঃব ঃযধহ ঘবাবৎ ইংরেজি ভাষার এই প্রবাদ বাঙালি সমাজেও মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। একটি বিষয় অর্জিত না হওয়ার চেয়ে দেরিতে হওয়াও ভাল। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) খাবার স্যালাইন আবিস্কারক সামসুল আলমের জন্ম দিন ১৩ জুলাইকে বিশ্ব ওরস্যালাইন দিবস (ডঙজখউ ঙজঝঅখওঘঊ উঅণ) ঘোষণা করে। আর তাতেই দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানোর মতো আনন্দ পাই। অবিভুক্ত ভারতের বর্ষীয়াণ গবেষক অধ্যাপক গোপাল কৃষ্ণ গোখলে বলেছিলেন ডযধঃ ইবহমধষ ঞযরহশং ঞড়ফধু ওহফরধ ঞযরহশং ঞড়সড়ৎৎড়.ি যা সরোজিনী নাইডুসহ আরো অনেকের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে, তা হচ্ছে বাঙালিরা আজ যা চিন্তা করে গোটা ভারতবর্ষ সেটা পরবর্তীতে অনুসরণ করে। আর বর্তমানে বলা যায় বাংলাদেশ আজ যা চিন্তা করে গোটা বিশ্ব সেগুলো আগামীতে গ্রহণ করে।
২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশের সকল ডিপ্লোমা পেশাজীবী, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে ২৫ নভেম্বর জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস ঘোষণা ও উদযাপন করে আসছে। ১ম জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস ২০১৪ এর শ্লোগান ছিল “ডিপ্লোমা শিক্ষার মূল্যায়ন দেশ ও জাতির উন্নয়ন”। ২০১৫ তে ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবসের শ্লোগান ছিল ‘টেকসই উন্নয়নে ডিপ্লোমা শিক্ষা’। মাত্র ২ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে ডিপ্লোমা শিক্ষার ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে। প্রাইমারি শিক্ষার মান উন্নয়নে ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন এবং মা ও শিশুর মৃত্যুর হার কমানের লক্ষে ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি মত নতুন ২টি ডিপ্লোমা কোর্স চালু হয়।
হাওর, দ্বীপ, উপকূল, বরেন্দ্র, পাহাড়ী সীমান্ত উপজেলায় ২১৭ ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট নতুন করে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ডিপ্লোমা শিক্ষার হার ২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নতি ঘটে। ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের মেধা ও শ্রমের ফলে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিঁছু বার্ষিক আয় বৃদ্ধি পায়। তাছাড়াও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কার্য্যালয়ে ৮টি বিভাগে স্বতন্ত্র ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবনা বিবেচনাধীন।
দেশে প্রতিবছর গড়ে ১৪ লক্ষ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এর অর্ধেক তরুণকে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে ১০টি সরকারি/বেসরকারিভাবে কৃষি, ভেটেনিরারি, লেদার, পলিটেকনিক, টেক্সটাইল, মেডিক্যাল টেকনোলজি, নার্সিং, প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, মেডিকেল ও ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হচ্ছে।
বারার, মোবাইল ব্যাংকিং, এয়ারহোস্টেজ, পর্যটন, সাংবাদিকতা, বিমান পরিচালনা, সাবমেরিন, মহাকাশযান, নিউক্লিয়ার ইত্যাদি বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্সসহ সকল পণ্য ও পেশায় কমপক্ষে ৫০০ (পাচঁশত) নতুন ডিপ্লোমা কোর্স চালু হবে। ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ ও ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত হবে।
আজকে যারা ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত তারা সবাই ১৯৭১সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান, নাতি-নাতনী। তাদের চিন্তা-চেতনা সাহস, উদ্দম একটু বেশী থাকাটা স্বাভাবিক। তারা বিশ্ব নিয়ে চিন্তা করতে পারে। আর এ কারণেই তারা ২০১৬ সাল থেকে বিশ্ব ডিপ্লোমা (ডড়ৎষফ উরঢ়ষড়সধ ঊফঁপধঃরড়হ উধু) শুরু পালন করছে।
১ম বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস ২০১৬’র শ্লোগান ছিল ‘গ্রাম উন্নয়নে বিভাগীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড’ হয় বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস ২০১৭ এর শ্লোগান ছিল ‘পল্লী উন্নয়নে বিভাগীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড’। জাতিসংঘ কর্র্তৃক প্রতিবছর ২৫ নভেম্বর বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস পালন করা হলে বিশ্বের সকল দেশের ডিপ্লোমা শিক্ষার মান ও মর্যাদা একই হবে। প্রতিবছর নতুন নতুন বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্স চালু হবে। ১০-২০ হাজার নতুন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা হবে। ইনস্টিটিউটগুলোতে মর্ণিং, ডে, ইভিনিং, নাইট চার শিফট শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হবে। রাজ পরিবারের আলালের দুলাল, বাসার কাজের লোক, ভিখারী, বস্তিবাসী, এতিম, পঙ্গু, যুদ্ধাহত, শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত, নারী, অধিকার বঞ্চিত পথ শিশুরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবেন। ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে নতুন বিশ্ব গড়ে উঠবে। তরুণদের মাদকাশক্ত, জঙ্গীবাদে অংশগ্রহণ ও মারামারি বন্ধ হবে। ধনী-গরীব শহর গ্রামের আয় ব্যবধান দূর হবে। আয় বৈষম্যের কারণে যে সামাজিক অস্থিরতা, তার অবসান হবে।
বিশ্বের প্রতিটি নাগরিক তাদের জন্মগত মৌলিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার সুযোগ পাবেন। ২০১৫ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ সকল দেশে সকল অঞ্চলে সমভাবে বাস্তবে রূপ নিবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা, জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তিনিও গোতেরেস, ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বো কোভার এর নিকট আহবান, তারা যেন ২০১৮ সালের ২৫ নভেম্বর ইউনেস্কো ও জাতিসংঘের উদ্যোগে ৩য় বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস (৩ৎফ ডড়ৎষফ উরঢ়ষড়সধ ঊফঁপধঃরড়হ উধু) পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ২৫ নভেম্বর বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস স্বীকৃতি লাভ করলে বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে এক অনন্য উচ্চতায়। আমরা সেই উচ্চ শিখড়ের চূড়ায় অবস্থানের কল্পনা করি।
কযধহধৎধহলধহৎড়ু@মসধরষ.পড়স

সর্বশেষ সংবাদ