উৎসবের রং ফিকে হয়ে যাবে-কামরুল হাসান বাদল, লেখক,কবি, সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 04/01/2018-11:36am:    সারাদেশে যখন বই উৎসব চলছে তখন রাজধানী ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এমপিওভুক্তির দাবিতে আমরণ অনশন পালন করছেন দেশের নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। বছরের প্রথমদিন নতুন ঝলমলে বইহাতে শিশুদের উৎফুল্ল ছবির পাশাপাশি আন্দোলনরত শিক্ষকদের ম্লান ও কান্নাজড়িত চেহারা দেখে মনে হলো এই উৎসব সত্যিকার অর্থে বর্ণিল ও বর্ণাঢ্য হয়ে ওঠেনি। খুব ভালো হতো এইসব শিক্ষকরাও যদি এই উৎসবের অংশ হয়ে উঠতে পারতেন। তাঁরা যদি তাঁদের শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়ে শিশুদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারতেন। কিন’ তা হয়নি। দুঃখজনকভাবে তা হয়নি। শিক্ষকদের দুর্দশা দেখতে, ম্লান মুখ দেখতে, তাদের কান্না দেখতে কে পছন্দ করে জানি না। বছরের প্রথম দিন সোমবার বই উৎসবের মধ্যদিয়ে চার কোটি ৩৭ লাখ ছয় হাজার ৮৯৫ জন শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে ৩৫ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার ১৬২টি নতুন বই তুলে দেওয়া হলো। গত শনিবার গণভবনে কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দিয়ে ২০১৮ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
এবার প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের দুই কোটি ৪৯ লাখ ৮৩ হাজার ৯৯৩জন শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে তুলে দেওয়া হচ্ছে ১০ কোটি ৭০ লাখ ৩৭ হাজার ৩০৪ টি চার রঙা পাঠ্যপুস্তক। এছাড়া পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, চাকমা, মারমা, গারো, ত্রিপুরা, সাদরি শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের ভাষায় দেশের ২৪ জেলায় পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা হচ্ছে। এরমধ্যে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির ‘আমার বই’ ৩৪ হাজার ৬৪২টি, একই পরিমাণ অনুশীলন খাতা এবং প্রথম শ্রেণির ৭৯ হাজার ৯৯২টি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ করা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ছয়টি বিষয়ে বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনের বই দেওয়া হচ্ছে। বই ও অনুশীলন খাতাসহ আরও ছয় ধরনের পঠন-পাঠন সামগ্রী বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। একই সাথে ৯৬৩জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর হাতে ব্রেইল পদ্ধতির পাঠ্যপুস্তকও দিচ্ছে সরকার।
সবকিছু মিলিয়ে বছরের প্রথমদিন বই উৎসবের মতো ঘটনাটি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী ও উদাহরণযোগ্য কাজ। প্রায় সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থীর হাতে প্রায় সাড়ে ৩৫ কোটি নতুন বই তুলে দেওয়া খুব সহজসাধ্য কাজ নয়। বর্তমান সরকারের অর্জনের মধ্যে এই ঘটনাটি সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকতে পারি। কিন’ কোনো কোনো ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে। বছরের প্রথমদিন এত শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সবাইকে ছাড়িয়ে গেছি।
বই উৎসব, নির্দিষ্ট সময়ে পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণ, ফল প্রকাশ এবং প্রযুক্তির ব্যবহারে শিক্ষামন্ত্রণালয় প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। কিন’ সরকারের বিশাল এই সফলতা অর্জনে শুধু সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদেরই অবদান আছে তা তো নয়। আজ এমপিওভুক্তির আন্দোলন যারা করছেন তাদের অবদান ও অংশগ্রহণের কথা ভুলে গেলে তো চলবে না। বরং এই শিক্ষকরাই বছরের পর বছর বেতন না পেয়ে, খেয়ে না খেয়ে, আধবেলা খেয়ে, জমিতে হালচাষ করে শিক্ষকতার কাজ করে গেছেন। তাদেরই অনেক শিক্ষার্থী আজ দেশের নামকরা ও সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করছে কিংবা কেউ কেউ শিক্ষা সমাপনও করেছে।
এমপিও (মান’লি পেমেন্ট অর্ডার) ভুক্তির আন্দোলন এবারই নতুন নয়। এর আগেও তারা এমন আন্দোলন করেছেন। উপায় না দেখে কিংবা সরকার শেষ পর্যন্ত বিবেচনা করবে এমন আশায় তারা আন্দোলন স’গিত করে কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেছেন। দেশের আট হাজারের বেশি নন-এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার এক লক্ষাধিক শিক্ষক ২০১৩ সালে একই দাবি নিয়ে ১২ দিন রাজধানীর সড়কে অবস’ান করেছিলেন। সে সময় পুলিশ আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর পেপার স্প্রে ব্যবহার করেছিল।
শিক্ষকদের ওপর এমন নির্মম আচরণ দেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক নিন্দার ঝড় তুলেছিল। ফলে শিক্ষামন্ত্রী তাদের দাবি বিবেচনা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন এবং আন্দোলনরত শিক্ষকরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে ফিরে গিয়েছিলেন। আবার ২০১৫ সালে প্রথমে কেন্দ্রীয় শহীদমিনারের সামনে, পরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তারা আন্দোলনের উদ্দেশে অবস’ান নিয়েছিলেন।
এমপিওভুক্তির কিছু শর্তও আছে। তবে সরকারের সদিচ্ছা ও সুষ্ঠু নীতিমালা থাকলে তা কঠিনও কিছু নয়। এটি একটি সরকারি স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতি অর্জন করার জন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভৌগলিক দূরত্ব, জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রাপ্যতার শর্ত পূরণ করতে হয়। শিক্ষাবোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয় বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রেজিস্টার্ড হতে হয়। সরকার অনুমোদিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারী ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষার্থী থাকতে হয়। এছাড়া পাবলিক পরীক্ষায় কাম্য ফলাফল লাভ করাও অন্যতম শর্ত। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পর এই শর্তগুলো পূরণেও সরকারি সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। অনেকে বলে থাকেন দেশে কোনো কোনো স’ানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। অভিযোগ মিথ্যে নয়। অনেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে, খ্যাতির মোহে কিংবা নিজের বা নিজ আত্মীয়র নাম ‘অমর’ করে রাখার উদ্দেশ্যেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে থাকেন। এদের অনেকে প্রভাব খাটিয়ে তা এমপিওভুক্ত করিয়ে নেন। এ ধরনের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে শর্ত পূরণ করতে না পারায় এমপিও হারিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা রোধের দায়িত্বও সরকারের। যে কোনো কেউ, যে কোনো স’ানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করবেন কেন? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য নীতিমালা তো একটি আছে নিশ্চয়ই। অথবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আগে অনেক কিছু প্রাথমিক শর্ত পালনের বিধিতো নিশ্চয়ই আছে। এসব ভঙ্গ করে অপ্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে তার দায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। আর সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি প্রয়োজনীয় হয় এবং অধিকাংশ শর্ত পূরণ করে থাকতে পারে তাহলে তাদের এমপিওভুক্ত করার দায়িত্বও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। শিক্ষার কথা বললে খরচের কথা বলা হয়। কিন’ বাস্তব সত্য হলো, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দেওয়া তো ‘খরচ’ নয়। এটি হচ্ছে জাতি ও দেশের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট বিনিয়োগ। সরকারকে ভাবতে হবে তারা শিক্ষাকে কীভাবে অগ্রাধিকার দেবেন। দেশের এত অগ্রগতি হয়েছে। প্রতি বছর বাজেটের আকার লাফিয়ে লাফিয়ে বড় হচ্ছে। তারপরও এখনো কেন শুনতে হবে শিক্ষাখাতে অপ্রতুল বরাদ্দের কথা। এই যদি হয় একটি শিক্ষাবান্ধব বলে দাবিদার একটি সরকারের নীতি তাহলে অন্য সময়ে কী হাল হবে। এত যে উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে তার মধ্যে কত অংশ উন্নয়নের ভাগে পড়েছে শিক্ষাখাত? ভাবতে হবে শিক্ষাখাতেও কোনটি আগে জরুরি, সুদৃশ্য ভবন, চলন্ত সিঁড়ি না কি শিক্ষকদের মর্যাদাপূর্ণ বেতন নিশ্চিত করা।
অস্বীকার করছি না, বর্তমান সরকার অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি করেছেন। পদমর্যাদাও বাড়িয়েছেন। কিন’ তা খুব সুশৃঙ্খলভাবে হয়েছে তা-ও নয়। অনেক সময় যারা আন্দোলন করেছে তাদের দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চাপে পড়ে মেনে নিয়েছে কিন’ সবকিছুর জন্য যে একটি সুষ্ঠু নীতিমালার দরকার তা শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনুধাবন করেনি। অবকাঠামো উন্নয়নের অবশ্যই দরকার আছে। তবে সবচেয়ে বেশি দরকার মানবিক উন্নয়ন, যা সুষ্ঠু শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব।
শিক্ষকদের অভুক্ত রেখে আমরা তাদের কাছ থেকে মানসম্মত শিক্ষা আশা করতে পারি না। জর্জ ইলিয়ট বলেছিলেন, ‘খালি পেটে কেউ কখনো বিচক্ষণ হতে পারেন না’। একথাটি আমাদের স্মরণে রাখা দরকার। দেশকে উন্নত করতে, একটি উন্নত জাতি গঠন করতে সুশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই এবং সে শিক্ষা হতে হবে প্রগতিশীল, আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক। নানা ধারায় বিভক্ত শিক্ষা পদ্ধতি দেশে শ্রেণি বিভক্তি তৈরি করছে। অনেককে সার্টিফিকেটধারী করে তুলছে কিন’ প্রকৃত শিক্ষিত, জ্ঞানী ও মানবিক করে তুলছে না।
আসলে শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দরকার। তা না হলে জাতিকে জঙ্গিবাদ, কূপমণ্ডূকতা ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত করা যাবে না। তবে সে আমার বড় প্রত্যাশা। আপাতত শিক্ষকদের দুবেলা খাওয়ার, মাথা গুঁজবার এবং সামান্য চিকিৎসা লাভের ব্যবস’া করুক সরকার। লক্ষাধিক শিক্ষককে অভুক্ত রেখে, হাজার হাজার শিক্ষককে রাস্তায় রেখে বই উৎসবের রং ফিকে হয়ে যাবে।

সর্বশেষ সংবাদ