কোটিপতি রাজনীতিক বনাম গরিবের নেতা-কামরুল হাসান বাদল, লেখক,কবি, সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 29/12/2017-02:36pm:    কেউ কাউকে নেতা বানাতে পারে না এবং নেতা হিসেবে কাউকে কোথাও বসিয়েও দেওয়া যায় না। নেতা তৈরি হয় মানুষের মধ্যে থেকে। বঙ্গবন্ধু নেতা হয়ে উঠেছিলেন একটি সাধারণ পরিবার থেকে নিজ যোগ্যতা, মেধা, একাগ্রতা, দক্ষতা ও দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুণে। চট্টগ্রামের মহিউদ্দিন চৌধুরীও নেতা হয়ে উঠেছিলেন একইভাবে। তিনিও সাধারণ পরিবার থেকে রাজপথে মিটিং মিছিল করে সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখের সাথী হয়ে জনগণের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। তাঁকে কেউ নেতা বানাননি। তিনি নিজ যোগ্যতায় নেতা হয়ে উঠেছিলেন। জনগণ বিশ্বাস করেছিলো মহিউদ্দিন চৌধুরী যা করেন এবং বলেন তা সাধারণ মানুষের জন্য অন্তর থেকে করেন। সেখানে কোনো ফাঁক নেই। নেতা হিসেবে মহিউদ্দিন চৌধুরী ভালো বক্তাও ছিলেন না যতটা সংগঠক ছিলেন। তিনি গুছিয়ে বক্তৃতা দিতে পারতেন না কিন্তু তার সে অগোছালো বক্তৃতা শোনার জন্য মানুষ জড়ো হতো এবং ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতো। তিনি খুব ঠোঁটকাটা স্বভাবের মানুষ ছিলেন। অনেকের সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন এমনকি গালাগালও করতেন তবুও মানুষ তাঁর কাছে যেতেন। কারণ অনেকে বিশ্বাস করতেন শেষ পর্যন্ত মহিউদ্দিন চৌধুরী সঠিক কাজটিই করবেন। সঠিক সিদ্ধান্তটিই নেবেন।
তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর রাজনৈতিক স্থান কে পূরণ করবেন তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেকে বলছেন তিনি উত্তরসূরী তৈরি করেননি। যুক্তিটি আমার কাছে গুরুত্বহীন মনে হয়েছে। কারণ আগেও বলেছি কেউ কাউকে নেতা বানাতে পারে না। নেতা হয়ে উঠতে হয়। আজ যেমন অনেকে বলছে চট্টগ্রামের অভিভাবক হারিয়েছে কিংবা গরিবদের পক্ষে বলার কেউ নেই। এটাই সত্যি, এটা বাস্তবতা। মহিউদ্দিন চৌধুরী নিজেকে ওই স্থানে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। জনগণের পরীক্ষায় তিনি পাস করেছিলেন। আজিজ–জহুর–হান্নান–মান্নান কেউ মহিউদ্দিন চৌধুরীকে টেনে নিয়ে নেতার আসনে বসিয়ে দেননি। একজন ছাত্রনেতা পরবর্তীতে শ্রমিক রাজনীতি করা মহিউদ্দিন নিজের যোগ্যতায় গণমানুষের নেতায় পরিণত হয়েছিলেন।
তাঁর জানাজার সময় অনেকের সাথে দেখা হয়েছে কথা হয়েছে। এদের মধ্যে একজন আমাকে বললেন, দেখবেন দেশের দুই দলের দুই প্রধান নেতা ছাড়া আর কারো জানাজায় এত লোক হবে না। আমি তাঁর কথাকে উড়িয়ে দিতে পারিনি।
সাধারণ মানুষ থেকে সমাজের অগ্রসর শ্রেণির অনেকেই যখন বলছেন মহিউদ্দিন ওই প্রজন্মের শেষ রাজনীতিক, যাঁরা গণমানুষের জন্য রাজনীতি করতেন তখন তা প্রণিধানযোগ্য বলে ধরে নিতে হয় এবং চট্টগ্রামের তথা দেশের রাজনীতির বিষয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠতে হয়। বর্তমান সংসদকে ইতিমধ্যে অনেকে কোটিপতিদের ক্লাব বলে অভিহিত করেছেন। এটিও দেশের রাজনীতির জন্য একটি অশনি সংকেত বলে ধরে নিতে বাধ্য হই আমরা। আমরা লক্ষ করেছি কোটিপতি নয় এমন অনেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে কিংবা মন্ত্রীত্ব পেয়ে মাত্র কয়েক বছরে কোটিপতি বনে গেছেন সামান্য কয়েকজন ব্যতিক্রমী রাজনীতিক ছাড়া। ফলে আমরা ধরে নিতে পারি সামনের নির্বাচনেও হয়ত একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। প্রধান প্রধান দলে নব্য কোটিপতিদের ভিড় বাড়বে এবং এদের মধ্যে থেকে এমপি অথবা মন্ত্রী হবেন অনেকেই। ফলে এমন জনপ্রতিনিধিদের সাথে সাধারণ মানুষের যোগসূত্র থাকবে অত্যন্ত ক্ষীণ। এঁরা সাধারণ মানুষের অভাব–অনুযোগ কিছুই বুঝতে সক্ষম হবেন না কিংবা তাঁরা যেহেতু মনোনয়ন টাকার বিনিময়ে অথবা প্রভাবশালী মহল বিশেষের চাপে লাভ করে থাকেন সেহেতু জনগণের প্রতি, ভোটারের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা কম থাকবে। বর্তমানেই যা অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠছে। অনেক নির্বাচনী এলাকায় তাই নির্বাচিত এমপির একটা গ্রুপ আর সে এলাকার দলের তৃণমূল কর্মীদের আরেকটি গ্রুপ। এমপি নির্বাচিত হয়ে তিনি তাঁর ইচ্ছার শাসন প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর নির্বাচনী এলাকায়। মনোনয়ন কেনা বা চাপিয়ে দেওয়া এইসব সাংসদের সাথে স্থানীয় ও প্রকৃত ত্যাগী কর্মী সমর্থকদের সুসম্পর্ক থাকে না এবং তাতে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের মানুষের গড় আয় ১৬শ মার্কিন ডলার পেরিয়ে গেছে। দেশের কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু তাতে ফায়দা হয়নি গরিবের। বরং তাতে ধনী গরিবের বৈষম্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে হতদরিদ্র লোকের সংখ্যা কমেছে। দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে এমন লোকের সংখ্যাও কমেছে কিন্তু ধনী গরিবের মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে, বৈষম্য বেড়েছে। এটা একটি দেশের অর্থনীতির ভালো চিত্র নয়। গত ২০ ডিসেম্বর প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তৈরি করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে কোটি পাতি আমানতকারীর সংখ্যা এখন ৬৮ হাজার ৮৯১ জন। এর মধ্যে গত এক বছরের ব্যবধানে নতুন করে বেড়েছে ৬ হাজার ৪৭৩ জন। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে ২০১৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট কোটিপতি আমাতনকারীর সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৪১৮ জন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকে ৬৮ হাজার ৮৯১ জন কোটিপতির মধ্যে ৫০ কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ রাখা ব্যক্তির সংখ্যা ৮৫৩ জন। এ চিত্র বলে দিচ্ছে প্রতি বছর কী পরিমাণ মানুষ নতুন করে কোটিপতিতে পরিণত হচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ একটি অনলাইন মিডিয়াকে বলেছেন ‘কোটিপতি আমানতকারী বাড়ার অর্থ হলো টাকাওয়ালাদের কাছে ব্যাংক জিম্মি হয়ে পড়ছে। এটা হয়েছে কল্যাণ অর্থনীতির নীতি থেকে সরে যাওয়ার কারণে। তিনি বলেন ‘বাংলাদেশ এখন পুরোপুরি ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিকে অনুসরণ করছে। যা মূলত আমেরিকার নীতি। এই নীতিতে মূলত জোর জুলূম করে যেনতেনভাবে টাকা বানানো হয় এখন বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে।’ একই প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বাড়ার ফলে সমাজে একটি বিশেষ শ্রেণি ক্রমেই ধনী হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সমাজে বৈষম্যও বাড়ছে।
তাহলে এই বৈষম্যপূর্ণ সমাজে গরিবের পক্ষে কথা বলবে কে? যাঁরা কোটিপতির প্রতিনিধি, যাঁরা একটি সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির প্রতিনিধি, যিনি বা যাঁর সাথে জনগণের সামান্যতম যোগাযোগ নেই তিনি তাঁর শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা না করে গরিব জনগণের কথা বলবেন কি? অথবা তাঁরা শেষ পর্যন্ত জনগণের বিশেষ করে গরিবের স্বার্থ দেখবেন এমন বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছেন কি? চট্টগ্রামের অন্য কোনো নেতার বিষয়ে মানুষ ভাবে কি তিনি গণমানুষের? তিনি গরিবের নেতা? আমার তো মনে হয় ভাবে না। ভাবলে বা অন্য নেতাদের প্রতি এমন বিশ্বাস থাকলে তবে কেন তারা বলছে, মহিউদ্দিনই ছিলেন প্রকৃতপক্ষে গরিবের নেতা?
কাউকে খাটো করে দেখানোর উদ্দেশ্যে লেখাটি লিখিনি। লিখেছি, এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্যে। মানুষের জন্যে রাজনীতি করলে, মানুষকে ভালোবাসলে মানুষ তা ভক্তি, ভালোবাসা আর ঋণ স্বীকারের মাধ্যমে পরিশোধের চেষ্টা করে। অর্থ–বিত্ত কিংবা সম্পদের পাহাড় মৃত্যুর পর গুণগান করতে পারবে না, ভালো–মন্দের সাক্ষ্য দিতে পারবে না। পারবে শুধু মানুষ। গণমানুষের নেতা হয়ে উঠতে পারলে মানুষ তাকে শেষ পর্যন্ত যোগ্য সম্মানই দেবে। যে সম্মান ও ভালোবাসা মহিউদ্দিন চৌধুরী অর্জন করে গেছেন।
আমি বরাবরই আশাবাদী মানুষ। তাই আমি এখনো বিশ্বাস করি কেউ না কেউ উঠে আসবেন মানুষের কাতার থেকে যিনি মানুষের কল্যাণের কথা বলবেন। ভাববেন আর গরিবের নেতা হয়ে উঠবেন। আওয়ামী লীগ এক সময় এদেশে গরিবের দল ছিল। এই দলটিকে গরিবের দল হিসেবে টিকিয়ে রাখতে কেউ না কেউ উঠে আসবেন। প্রধানমন্ত্রী তরুণদের নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। তিনি তাদের হাতেই আগামীর বাংলাদেশকে অর্পণ করে যেতে চান ফলে তরুণদেরই সুযোগ আছে প্রকৃত নেতা হয়ে ওঠার। গরিবের নেতা হয়ে ওঠার। মনে রাখতে হবে এদেশের জন্ম হয়েছিল একটি সমতা ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে জাতির জনক দেশকে যে পথেই ধাবিত করছিলেন। লুটপাটের সংস্কৃতি বন্ধ করা না গেলে একটি কল্যাণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে না । Email – [email protected]

সর্বশেষ সংবাদ