বহুত্ববাদী সমাজই আধুনিক ও মানবিক সমাজ-কামরুল হাসান বাদল, লেখক,কবি, সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 20/12/2017-11:06am:    লেখক,কবি, সাংবাদিক কলামিস্ট ও টিভি ব্যক্তিত্ব,
১. মাস দেড়েক আগে পাথরঘাটা গির্জায় গিয়েছিলাম। আমার ছেলের বন্ধুর বিয়ের ধর্মীয় পর্বে যোগ দিতে। বেশ কয়েক বছর পরে যাওয়া হলো সেখানে। এক সময় প্রায়-ই যাওয়া হতো। বিশেষ করে আমার ছেলে যে সময় সেন্ট প্লাসিড্‌স স্কুলে পড়তো।
খ্রিস্টানদের বাড়ি-ঘর, উপাসনালয়, ক্লাব সবকিছুই থাকে ঝকঝকে তকতকে, এমন কি তাদের কবরস্থান পর্যন্ত। শুধু নিজেরটুকু নয়, তারা নিজেদের চারপাশকেও পরিচ্ছন্ন রাখতে ভালোবাসে। সেন্ট প্লাসিড্‌স, সেন্ট স্কলাস্টিকা এক সময় পূর্ণ মিশনারি স্কুল ছিল। গির্জার পাশে প্রতিষ্ঠিত এই দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে পুরো এলাকাটিই এক সময় শান্ত এবং সুনিবির ছিল। আমি অনেকবার গির্জায় গেছি, তাদের প্রার্থনার ভঙ্গি এবং প্রার্থনার কথাগুলো বেশ লাগতো আমার। গির্জাটি ছিল পরিচ্ছন্ন-পরিপাটি। প্রতি রোববার এবং তাদের বিশেষ দিনগুলোতে গির্জাটি গমগম করতো ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের উপস্থিতিতে।
এবার গিয়ে কিছুটা হতাশ হলাম। গির্জার চারপাশে হেঁটে, গির্জার অভ্যন্তরে সমস্তটা দেখে আমার মন ভীষণ খারাপ হলো। দেখে মনে হয় কোথাও যেন কিছু একটা ঘটেছে। খুব অলক্ষে-নীরবে। সেই আগের ঝকঝকে তকতকে চিত্রটি একটু ম্লান হয়েছে। কোথায় যেন একটা শূন্যতা, কিংবা কিছু একটার অভাববোধ হয়েছে। গির্জার পেছনের দিকে অভ্যন্তরে দেখলাম দেয়ালের রং এমনকি সামান্য পলেস্তরাও খসে গেছে। মনে হয় বেশ ক’বছর রং করা হয়নি। একটু দারিদ্র্যের ছাপও কি পড়েছে? ভাবছিলাম।
২. আমার ছেলেটির বয়স তখন ছয় কি সাত। সে সময় কয়েকদিন ধরে জ্বরে ভুগছিলো সে। চিকিৎসক পরামর্শ দিলেন দিনে কয়েকবার তাকে গরম স্যুপ খাওয়াতে। আমি তখন আলকরনে থাকি। বাসার কাছাকাছি নিউমার্কেটের দক্ষিণে জামান হোটেলের ওপরে চিং লোং চাইনিজ রেস্তোরাঁ। অনেক পুরনো চাইনিজ রেস্তোরাঁর একটি। মালিক লালু ভাই খ্রিস্টান, আমার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বেশ সজ্জন এবং বন্ধুবৎসল। একদিন সকাল দশটা সাড়ে দশটার দিকে স্যুপ কিনতে আমার স্ত্রীসহ চিং লোংয়ে গেলাম। দোতলায় উঠে রেস্তোরাঁর সদর দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করতেই দেখলাম, লালু ভাই ক্যাশ কাউন্টারের সামনে চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করছেন। রেস্তোরাঁর কর্মচারীরা সবাই প্রার্থনার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে তাতে অংশ নিচ্ছেন। আমরা দুজনও দাঁড়িয়ে গেলাম তাঁদের দেখাদেখি। লালু ভাই তখনও আমাকে দেখেননি। এক পর্যায়ে তিনি বিশ্বের সকল ধর্মের, বর্ণের মানুষের শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে তাঁর প্রার্থনা শেষ করলেন। আমি অভিভূত হলাম। এমন উদার ও মানবিক প্রার্থনায় এর আগে আমি কখনো অংশগ্রহণ করিনি। আমার মন ভরে গেল।
৩. ঠিক তার কাছাকাছি একটি সময়ে আমার শ্বশুরবাড়িতে আয়োজিত একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আমি সপরিবারে উপস্থিত ছিলাম। তাঁদের বৈঠকখানায় মৌলানা সাহেবরা ফাতেহা পাঠের পর মোনাজাত করছেন। পরিবারের সবাই সেই কক্ষে, আমি শুধু বাইরে একটি চেয়ারে বসে আছি। আমি মোনাজাতের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরপর সমবেতদের ‘আমিন’ ‘আমিন’ শব্দও শুনছি। এক সময় মোনাজাত শেষ হলো। আমার ছেলে রুম থেকে বেরিয়ে এসে আমার গলা জড়িয়ে বলল, পাপা একটি জায়গায় আমি ‘আমিন‘ বলিনি। আমি চট করে বুঝে গেলাম, আমার ছেলে মোনাজাতের কোন অংশে ‘আমিন’ বলেনি।
আমি মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক। ধর্ম শুধু বিশ্বাসের বিষয় নয়, সংস্কৃতির অংশও। ফলে মুসলিম সম্প্রদায়ের আমরা সবাই প্রায় একই সংস্কৃতিতে বড় হয়েছি এবং এখনো বিরাজ করছি। ফলে এ ধরনের মিলাদ-মাহফিল, ওয়াজ মাহফিল বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মৌলানারা কী বলে থাকেন, মোনাজাতে কী বলেন তা আমরা কম বেশি সবাই জানি।
৪. মুসলমানরা এক ধরনের ‘ইনফিউরিটি কমপ্লেক্সে’ ভোগেন। তারা সন্দেহজনিত মনোবিকারেও ভোগেন। তাই একমুখী জ্ঞানের অধিকারী অধিকাংশ মৌলানারা মনে করেন বিশ্বের অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা ছাড়া অন্যকোনো কাজ নেই। ফলে এরা কথায় কথায়, মোনাজাতে, দোয়ায় অন্য ধর্মাবলম্বীদের শুধু বিনাশই কামনা করেন। তারা এক প্রকার বিদ্বেষ ছড়িয়ে থাকেন। কথায় কথায় ইহুদি নাসারা বলে গালাগাল করে থাকেন যদিও এই ইহুদি নাসারাদের যাবতীয় কল্যাণকর আবিষ্কারের পরিপূর্ণ সুবিধা গ্রহণে তারা কখনো কার্পণ্য করেন না। ইহুদি- নাসারা বা অন্য ধর্মের লোকদের পেছনে ষড়যন্ত্র খুঁজে খুঁজে সময় ব্যয় না করে মানবকল্যাণে যদি তারা ব্রতী হতেন তাহলে মুসলমানরাও বিশ্বের অগ্রগতির ক্ষেত্রে আরও বেশি অবদান রাখতে পারত। একটি মাত্র উদাহরণ দিই- বিশ্বে বর্তমানে ইহুদি ধর্মে বিশ্বাসী লোকের সংখ্যা ১ কোটি ৪০ লাখ এর মধ্যে ১৮০ জন নোবেলজয়ী। অন্যদিকে মুসলিমের সংখ্যা ১৩০ কোটি অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন মুসলমানের বিপরীতে ইহুদির সংখ্যা ১জন, সেখানে মুসলমানদের মধ্যে নোবেলজয়ীর সংখ্যা মাত্র ৫জন। পৃথিবীকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে যারা এগিয়ে নিয়ে গেছেন, পৃথিবীকে যাঁরা মানুষের বাসযোগী করে তুলেছেন, পৃথিবীর সেরা আবিষ্কারগুলো যাঁরা করেছেন তাঁরা অধিকাংশই ইহুদি। আসলে পিছিয়ে পড়া মানুষ কিংবা জনগোষ্ঠীই ‘ইনফিউরিটি কমপ্লেক্সে’ ভুগে থাকে। এই সংকীর্ণতা থেকে, এই কূপমণ্ডূকতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে মুসলিমরা অগ্রসর হতে পারবে না। আর গতিহীন কোনো কিছুই বিশ্বে টিকে থাকতে পারে না।
৫। চট্টগ্রাম বন্দর শহর হওয়ার কারণে হাজার বছর আগে থেকেই বিশ্বের নানা দেশের, নানা ধর্মের মানুষের আগমন ঘটেছে এখানে। ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে আসা নানা দেশের লোকদের সাথে নানা ধর্ম প্রচারকরাও এসেছে এই ভূখণ্ডে। ফলে চট্টগ্রামের প্রাচীন ইতিহাসে আমরা এই বৈচিত্র্যময় ধর্ম ও বর্ণের অস্তিত্ব পাই। ইংরেজদের আগে পর্তুগিজরা এসেছে এই ভূখণ্ডে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পথ ধরে এ দেশে ইংরেজ শাসনের সাথে সাথে তাদের খ্রিস্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটেছে উপমহাদেশের অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামেও। তবে ইংরেজদের এই উপমহাদেশে আগমনের প্রায় ৩০০ বছর আগে চট্টগ্রামে খ্রিস্টান ধর্মের লোক বসবাস করত। চট্টগ্রামের পাথরঘাটার যে গির্জাটির কথা বলছি তার নাম মূলত পর্তুগিজ ক্যাথলিক চার্চ এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৫০০ থেকে ৬০০ বছর আগে। এই গির্জার আশেপাশেই ছিল এই ধর্মের বিশ্বাসীদের বসবাস। পর্তুগিজরা স্থানীয়ভাবে ফিরিঙ্গি নামে পরিচিত ছিল। এরা শহরের যে এলাকায় বসবাস করতো তা ফিরিঙ্গিবাজার হিসেবেই পরিচিত হয়ে ওঠে। শহরের আলকরণ ও ফিরিঙ্গিবাজার ছাড়াও পাথরঘাটায় এক সময় প্রচুর খ্রিস্টান বাস করতো। এরা এক প্রকার ইংরেজিতে কথাবার্তা বলতো। এদের জীবনযাপনও ছিল পশ্চিমাদের মতো। পোশাক-পরিচ্ছদও ছিল অনেকটা পশ্চিমা ধাঁচের। তবে এ নিয়ে তাদের কখনোই কোনো বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে বলে শুনিনি। আলকরণ, পাথরঘাটা ও ফিরিঙ্গি বাজারে প্রচুর মুসলিম পরিবার বসবাস করলেও তাদের সাথে এই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উল্লেখ করার মতো কোনো সংঘাতেরও খবর জানা যায়নি। এর জন্য স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকদের সহনশীলতাকে শ্রদ্ধা জানাতে হয়। ৬। আজ থেকে ২০/৩০ বছর আগেও এইসব এলাকায় প্রচুর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বসবাস ছিল। বর্তমানে সে সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশেরও কম এখন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সংখ্যা। অর্থাৎ দেশ থেকে শুধু হিন্দু সম্প্রদায় নয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকও চলে যাচ্ছে।
হিন্দু সম্প্রদায় চলে যাচ্ছে, তার কারণ আছে। এবং সে কারণগুলি প্রতিনিয়ত ঘটছে এবং তা দৃশ্যমান। খ্রিস্টানদের সাথেও ঘটছে তবে তা বেশি খবর হয়ে আসে না। কারণ দেশে এই সম্প্রদায়ের সংখ্যাতো এমনিতেই কম। এরপরও গির্জায় বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। চট্টগ্রামে হয়ত ঘটেনি। তবে কোথাও না কোথাও কোনো ছন্দপতন ঘটেছে। যেভাবেই হোক এই দেশ, এই ভূমি উক্ত সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।
৭। অন্য সম্প্রদায়ের কাছে বর্তমান বাংলাদেশ যে খুব বেশি সহনশীল নয় তা ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমাজে সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার ফলে অন্য ধর্মাবলম্বীদের মনে সংশয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। একটি সমাজ তখনই আধুনিক, মানবিক বলা যায় যখন তার ভেতর সব ধর্মের, বর্ণের, শ্রেণির মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে। তাদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকবে।
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি স্বাধীনও হয়েছিল এমন চেতনা ও আদর্শকে ধারণ করে। কিন্তু রাষ্ট্রটিকে সে পথে বেশিদিন চলতে দেওয়া হয়নি। ৪৬ বছরের মধ্যে ২৬ বছরই দেশ শাসন করেছে যারা সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছে, ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে তারা। ফলে সমাজে দিনদিন সাম্প্রদায়িকতার অবাধ-উত্থান ঘটেছে। এই ২৬ বছর রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে বিসর্জন দিয়ে ধর্মান্ধতাকে জাগিয়ে তোলা হয়েছে।
৮। এক সময় এই শহর নানা ধর্মের, নানা বর্ণের মানুষদের উৎসবে মুখর থাকত। আজ পাথরঘাটা গির্জার জৌলুস হারিয়ে যাচ্ছে। আগামীতে হয়ত অন্য সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ের জৌলুস হারাবে। আমরা হয়ত এখনো উপলব্ধি করতে পারছি না, এইসব জৌলুসের সাথে বাঙালির অসাম্প্রদায়িকতা, বহুত্ববাদী, মানবিক জৌলুসও হারিয়ে যাবে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক

সর্বশেষ সংবাদ