মহিউদ্দিন ভাই অ’নরে সালাম »»কামরুল হাসান বাদল- লেখক,কবি, সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 16/12/2017-08:06am:    »» লেখক,কবি, সাংবাদিক কলামিস্ট ও টিভি ব্যক্তিত্ব,
এমন জানাজা দেখেনি চট্টগ্রামের মানুষ। এত জনারণ্য, এত শোক, এত ভালোবাসাও নিকট অতীতে দেখেনি কেউ। গতকাল শহরের যেন সব সড়কগুলো, সড়কে চলাচলকারী মানুষগুলো এসে মিশেছিল লালদীঘির মাঠে। এই জনারণ্যকে ধারণ করার সামর্থ্য ছিল না লালদীঘি মাঠের। তাই মাঠ উপচে, মাঠের চারপাশ উপচে এই জনসমাগম ছড়িয়ে পড়েছিল মাঠের এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত। মাঠের দক্ষিণে ফিরিঙ্গি বাজারের কবি নজরুল ইসলাম সড়ক, পশ্চিমে রাইফেল ক্লাব, উত্তরে সিরাজউদ্দৌলা সড়ক আর পূর্বে শাহ আমানত (রা.) এর মাজার ছাড়িয়েও মানুষ অংশ নিয়েছে জানাজায়। শোকেবিহ্বল জনতা শেষ বিদায় জানিয়েছে তাদের প্রিয় নেতা চট্টলবীর মহিউদ্দিন চৌধুরীকে। তারপরও বহু মানুষ জানাজায় অংশ নিতে না পারায় দুঃখ নিয়ে বাড়ি ফিরেছে শেষমেশ।
বৃহস্পতিবার রাত ৯ টার পর থেকে শহরে তাঁর আবার অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত জনতা সংবাদপত্র অফিস, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মুহুর্মূহু ফোন করে প্রিয় নেতার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চেয়েছে। এই উৎকণ্ঠা আর উদ্বিগ্নের প্রহর মধ্যরাতও ছাড়িয়ে যায়। নগরীর যে বেসরকারি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল সেখানে সাধারণ মানুষ ছাড়াও ভিড় করেন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের নেতা-কর্মীরা। তারা শুধ একটি সংবাদই পেতে চায়, তারা জানতে চায় তাদের প্রিয় নেতা কেমন আছেন। দীর্ঘদিন ধরে শরীরের নানা জটিলতায় ভুগেছিলেন তিনি। যে জন্য তাঁকে নভেম্বরে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর হার্টে আবার দুটো রিং পরানো হয়। এরপরই তিনি তাঁর মাতৃভূমিতে ফিরে আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রবল ইচ্ছা বা জেদের কারণে পরিবার তাঁকে বাধ্য হয়ে ঢাকা এনে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু সেখানেও তিনি থাকতে চাননি। ফিরে আসতে চেয়েছিলেন তাঁর প্রিয় শহর চট্টগ্রামে, যে শহরকে সতের বছর ধরে মেয়র থাকাকালীন তিনি তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন।
তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর সময় ফুরিয়ে আসছে? দেহটুকু রাখতে চেয়েছিলেন তাঁর আবাল্য প্রিয় চট্টগ্রামের মাটিতে?
কী জানি! হবে হয়তো! মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতো নেতা, যিনি একাধারে ধার্মিক এবং আধুনিক তিনি হয়ত আমরা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি জানেন এবং আন্দাজ করতে সক্ষম। জীবিতকালে যিনি অনেক সম্ভবকে অসম্ভব এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতেন এবং যিনি ছিলেন প্রবল ইচ্ছাশক্তির অধিকারী তাঁর বেলায় অনেক কিছুই ঘটে যাওয়া সম্ভব। যে মাঠকে ঘিরে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু, যে মাঠে তিনি জাতির জনকের ছয় দফা কর্মসূচির জনসভাসহ পরবর্তিতে সবকটি জনসভা আয়োজনের কর্মী ছিলেন, যে মাঠের মঞ্চ কাঁপিয়েছেন অন্তত অর্ধ শতক ধরে, যে মাঠে তিনি অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি, নেতা ও সহযোদ্ধদের জানাজার আয়োজন করেছেন, গতকাল সে মাঠেই অনুষ্ঠিত হলো তাঁর নামাজে জানাজা। লাখো জনতার শোক ও অনুতাপে ভারী হয়ে উঠেছিল সে লালদীঘির মাঠ।
ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগের রাজনীতি করে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মোট ১৭ বছর। ১৯৯১ সালে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বুকে বয়ে যায় এক প্রলয়ংকরী সাইক্লোন। সে সময় স্বজনহারা, সম্পদহারা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পরম আত্মীয়ের মতো। জলে ভেসে যাওয়া লাশ নিজের হাতে গোসল করিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করেছেন। এর দু’বছর পর চট্টগ্রামে পতেঙ্গা এলকায় নৌবাহিনীর সাথে স্থানীয়দের সংঘর্ষের সময় অসীম সাহসিকতার সাঙ্গে তিনি সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এসময়ও তিনি নিহত ব্যক্তিদের গোসল থেকে দাফনের কাজে অংশ নিয়েছেন এবং সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। মোট কথা যখন যেখানেই সাধারণ মানুষ নির্যাতিত হয়েছে সেখানে তিনি প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, কোনো রক্তচক্ষুকে তিনি ভয় করেননি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে তখন তিনি চট্টগ্রামের নির্বাচিত মেয়র। সে সময় সরকার একটি মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে বন্দর সম্পর্কিত একটি চুক্তি করার জন্য সমঝোতা স্মারক করেছিল। সে চুক্তির ফলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি সে চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন, এমনকি তৃতীয় একজনকে দিয়ে আদালতে মামলা পর্যন্ত করিয়েছিলেন। দেশের স্বার্থ , জনগণের স্বার্থ, সর্বোপরি চট্টগ্রামের স্বার্থকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছিলেন দলের আনুগত্যের ওপরে। হাটহাজারীর নন্দীরহাটের সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা যখন প্রশাসন ও স্থানীয় সাংসদও প্রশমিত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তখনও সেখানে তিনি ছুটে গেছেন এবং স্থানীয় মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে সাথে নিয়ে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করেছিলেন। হেফাজতের তাণ্ডবের বিরুদ্ধেও তিনি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন একা অসীম সাহসের সঙ্গে।
তিনি যে ১৭ বছর মেয়রের দায়িত্বে ছিলেন সে সময়কে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সুর্বণকাল হিসেবে ধরতে হয়। জনসেবার জন্য উদগ্রীব মহিউদ্দিন চৌধুরী কখনো সরকারি অনুদানের জন্য অপেক্ষা করেননি। আয়বর্ধক প্রকল্প বাড়িয়ে তিনি সিটি করপোরেশনকে স্বাবলম্বী করেছেন, স্বনির্ভর করেছেন এবং উন্নয়ন করেছেন। তিনি করের বোঝা চাপিয়ে নাগরিকদের জীবনকে কখনো অতিষ্ঠ করেননি। তাঁর সময়ে নগরীর সমস্ত সড়ক ছিল মসৃণ, তাঁর আমলে চসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছিল সুশৃঙ্খল। শিক্ষাক্ষেত্রে অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন তিনি। স্বাস্থ্যখাতকে নিয়ে গিয়েছিলেন জনগণের সাধ্য ও সামর্থ্যের মধ্যে। স্বাস্থ্য-শিক্ষা-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সড়ক সংস্কার নিয়ে তাঁর আমলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ছিল দেশের অন্য সিটি করপোরেশনের জন্য মডেল স্বরূপ। এই খ্যাতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও। তাঁর ব্যর্থতার চেয়ে সাফল্য এত বেশি যে, তাঁর নিন্দার চেয়ে প্রশংসা এত বেশি যে, তা এই পরিসরে লিখে শেষ করা যাবে না। তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন আমরা অনেকেই হয়ত তাঁর সঠিক মূল্যায়নও করতে পারিনি। এখন মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে চট্টগ্রাম যখন অভিভাবকহীন হলো তখন হয়ত অনুধাবন করতে পারব মহিউদ্দিন চৌধুরী চাটগাঁবাসীর মাথার ওপর কত বিশাল ছাতা ছিলেন।
এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা ভয়কে ভ্রুকুটি করেছেন জীবনভর। জাতির জনকের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে তাঁর দল করেছেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এবং ১৯৭৫ সালে ঘাতকরা যখন বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল তখন তিনি সে হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আবার ভারতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের, যাঁরা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। মৃত্যু অবধি তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে লালন করে গেছেন এবং তিনি, মহিউদ্দিন চৌধুরীই ছিলেন বোধহয় ওই প্রজন্মের শেষনেতা যাঁরা প্রকৃত অর্থে আওয়ামী লীগার ছিলেন।
জানাজা শেষ হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামবাসীর শোক যেন শেষ হবার নয়। অপরাহ্নে তখন সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে পশ্চিমাকাশে। বিবর্ণ সে রোদের আলোয় শোকাতুর মানুষরা লালদীঘির চারপাশে দাঁড়িয়ে ম্লানমুখে তখনও বিদায় জানাচ্ছিল মহিউদ্দিন চৌধুরীকে।
বলছিল অনেকে- মহিউদ্দিন ভাই অ’নরে সালাম!

সর্বশেষ সংবাদ