শহীদুল্লা কায়সার এখনও জীবন্ত তার কর্মে : শমী কায়সার

পোস্ট করা হয়েছে 14/12/2017-12:12pm:    শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সার। একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদাররা তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। ওই সময় তার মেয়ে শমী কায়সারের বয়স ছিল ২ বছর। বাবার বিভিন্ন লেখা আর ডায়েরি পড়ে পড়ে বড় হন তিনি। এখন বাবার ছবি শুধুই নিঃশব্দ কান্নার উপলক্ষ হয়ে রয়েছে শমী কায়সারের জীবনে। প্রতিদিন সূর্য ওঠে, আলো উঁকি দেয়। কিন্তু শহীদুল্লা কায়সার আর কখনোই ফিরে আসেননি। বাবার অপ্রকাশিত লেখা নিয়ে শমী কায়সার। শমী কায়সার জানান, বাবার কোলে ঘুমাতেন তিনি। কিন্তু এ সুযোগটি প্রতিদিন হতো না। বাবা প্রায়ই আত্মগোপনে থাকতেন। মায়ের কাছ থেকে শুনেছেন, সুযোগ পেলে বাবা যখন বাসায় আসতেন সন্তানদের নিয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠতেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কাল রাত থেকে পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নিধনযজ্ঞে মেতে ওঠে। বাবা ওই সময় ঢাকাতেই আত্মগোপন করেছিলেন। তিনি অনেককে ভারতে চলে যেতে সাহায্য করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ চিত্র নিজে প্রত্যক্ষ করে তা ইতিহাসে বিধৃত করতে চেয়েছেন। অবশেষে তিনি নিজেই ইতিহাসে পরিণত হয়েছেন। স্বাধীনতার মাত্র দু’দিন আগে পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর আলবদররা বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। বাবা আর কখনোই ফিরে আসেননি। শমী কায়সার জানান, ছোট্ট ছোট্ট কাগজে, ডায়েরিতে থাকা লেখাগুলো পড়লে চোখের জলে বুক ভেসে যায়। বাবার এসব অপ্রকাশিত লেখাগুলো স্বাধীনতার পর থেকে মায়ের কাছেই ছিল। কয়েক বছর ধরে অপ্রকাশিত লেখাগুলো প্রকাশের উদ্যোগ নেন তিনি। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে বাবার লেখা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ‘শহীদুল্লা কায়সার-সংশপ্তক’ নামক একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। ৫৮ মিনিটের প্রমাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে শহীদুল্লা কায়সারের বেড়ে ওঠা, কলকাতায় তারুণ্যে উদ্দীপ্ত এক তরুণের পথচলা। আরও আছে যৌবনে প্রতিবাদী যুবকের দর্শনসহ রাজনৈতিক, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের অজানা অনেক তথ্য। অপ্রকাশিত লেখাগুলোর সমন্বয়ে একটি প্রকাশনী বই প্রকাশের কাজ করছে। ২১ শে ফেব্রুয়ারির বই মেলায় বইগুলো প্রকাশিত হবে। শমী কায়সার বলেন, বাবার অপ্রকাশিত লেখাগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই হচ্ছে চিঠি। জেলে থাকা অবস্থায় বাবা বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা, তার ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন ও ভাইদের নিয়ে চিঠি লিখেছেন। নতুন প্রজন্ম এ লেখা থেকে স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ ধারণ করবে। বাবার ছোট ছোট লেখায় কী যে জাদু রয়েছে তা পড়লেই বোঝা যায়। তিনি গল্প ও উপন্যাসের কাজ শুরু করেছিলেন যা শেষ করতে পারেননি। তিনি তিন পর্যায়ে ৮ বার বন্দি জীবন কাটিয়েছেন এবং জেল জীবনের এ দীর্ঘ সময়ে তিনি পড়াশোনা ও সাহিত্যচর্চা করেছেন নিবিষ্ট মনে। ‘সারেং বউ’, ‘রাজবন্দীর রোজনামচা’, ‘সংশপ্তক’ ছাড়াও কারাগারে বসেই তিনি অধিকাংশ গল্প-উপন্যাস রচনা করেছেন। ঢাকা কারাগারে বসেই লিখেছেন সারেং বৌ নামের বিখ্যাত সেই উপন্যাসটি। যেটির জন্য তাকে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার দেয়া হয়। ২১ শের বই মেলায় শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সারের বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হচ্ছে জানিয়ে জার্নিম্যান বুকসের কর্ণধার কবি-সাহিত্যিক তারিক সুজাত জানান, শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সারের অপ্রকাশিত ডায়েরি, লেখা, চিঠি ও কবিতার সমন্বয়ে তার প্রকাশনা থেকে বই প্রকাশিত করছেন। শমী কায়সার ও অধ্যাপক পান্না কায়সারের কাছ থেকে তার অসংখ্য লেখা সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশেষ করে চিঠিগুলো খুব একটা পড়া যাচ্ছে না। তারপরও খুব যতœ সহকারে ছোট ছোট পাতায় লেখা চিঠিগুলো স্ক্যানিং করা হচ্ছে। একটি বিশেষ টিম এসব লেখা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, অপ্রকাশিত লেখা নিয়ে যেসব বই প্রকাশিত করা হচ্ছে সেসব বইয়ের নাম এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি। তার লেখায় সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার ও যুদ্ধাকালীন সময়ের ঘটনা ওঠে এসেছে। শহীদ শহীদুল্লা কায়সারের স্ত্রী অধ্যাপিকা পান্না কায়সার বলেন, রায়েরবাজারে আমি একটা একটা করে লাশ উল্টে দেখেছি, খুঁজেছি। কোনো স্ত্রীর ভাগ্যে যেন এমনটি না ঘটে। শহীদুল্লা এখনও আমার কাছে জীবন্ত, যেন প্রতি রাতেই তার সঙ্গে আমার কথা হয়। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সিগারেটের সাদা কাগজে সে কিছু কথা লিখত, যা পরে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যেত। তিনি যেমন বিচিত্র বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, তেমনি বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখেছেন। এছাড়া কারাজীবনে তিনি অসংখ্য কবিতা, গল্প, রম্যরচনা, চিঠিপত্র এবং নিয়মিত ডায়েরি লিখেছেন। অধ্যাপক পান্না কায়সার জানান, শহীদুল্লা কায়সারের বেশকিছু উপন্যাস ও গল্প-প্রবন্ধ অপ্রকাশিত ছিল। দুটি অসম্পূর্ণ উপন্যাস তার আছে। তবে এসব রচনার অধিকাংশই তিনি কারাগারের লোহার ফটকের অভ্যন্তরে লিখেছেন। ‘কবে পোহাবে বিভাবরী’ কারাগারের বাইরে লেখা তার একমাত্র উপন্যাস। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি এটি রচনা করেন। শহীদুল্লা কায়সার ‘কবে পোহাবে বিভাবরী’ উপন্যাসটি লেখা শুরু করেন মুক্তিযুদ্ধের সময়। বইখানি চারটি খণ্ডে সমাপ্ত করার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু দু’খণ্ড লেখার পর বইটি অসমাপ্ত থেকে যায়। এ উপন্যাসটিতে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার ও ধ্বংসলীলার চিত্র এঁকেছেন তিনি বিরাট এক ক্যানভাসে। মুক্তিযুদ্ধের অস্থিতিশীল ও প্রতিকূল সময়ে শহীদুল্লা কায়সার এ উপন্যাসটি লিখেছেন। চারদিকে হত্যা, ধ্বংস, অগ্নিসংযোগের মধ্যে রাত জেগে তিনি লিখতেন। ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাণ্ডুলিপি মাটির তলায় পুঁতে রাখতেন কায়েতটুলির বাড়িতে। রাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট স্থান থেকে পাণ্ডুলিপি উঠিয়ে নিয়ে আসতেন এবং ডুবে যেতেন লেখার মধ্যে। ‘কবে পোহাবে বিভাবরী’তে ঔপন্যাসিক মোট তিনটি স্থানকে বেছে নিয়েছেন তার কাহিনীর প্রেক্ষাপট হিসেবে- ব্যাপকভাবে ঢাকা শহর, বুড়িগঙ্গা পাড়ের জায়গাটি যেখান দিয়ে লাখ লাখ ঢাকাবাসী অতিক্রম করেছে এবং শেষটি হল চট্টগ্রাম। উপন্যাসে লেখা লাইন, প্রসব বেদনায় কাতর মহিলাটির আর্তনাদ শোনা গেল। রাস্তার ওপরে হাজার হাজার মানুষের চোখের সামনে বাচ্চা ধরতে হচ্ছে, নৌকার গলুইর ওপর বসে মা সন্তানের জন্ম দিচ্ছে। গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসতে না বসতেই বাচ্চা বেরিয়ে আসছে। এ কিসের আলামত। শহীদুল্লা কায়সার বিরচিত পরবর্তী যে উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রয়ে যায় তার নাম ‘দিগন্তে ফুলের আগুন’। গঠনশৈলী প্রশ্নে ‘দিগন্তে ফুলের আগুন’ বিশেষ মনোযোগের দাবিদার কারণ এটি একটি পত্রোপন্যাস। শমী কায়সার ও অধ্যাপক পান্না কায়সারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি শহীদুল্লা কায়সারের সাংবাদিক জীবন ছিল অনন্য। ১৯৫৬ সালে কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১৮৮০-১৯৭৬) পরিচালিত ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’ পত্রিকায় তিনি যোগদান করেন। এভাবেই শহীদুল্লা কায়সারের সাংবাদিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান কর্তৃক সামরিক আইন জারি হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে ১৪ অক্টোবর তাকে গ্রেফতার করা হয়। জননিরাপত্তা আইনে তাকে এ পর্যায়ে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত আটক রাখা হয়। জেলে আটকের সময়ও তিনি লিখে গেছেন।

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক