একটি অসুস্থ জাতি আর উদ্ধত ওষুধ ব্যাপারীরা-কামরুল হাসান বাদল

পোস্ট করা হয়েছে 12/12/2017-08:26pm:    »» লেখক,কবি, সাংবাদিক কলামিস্ট ও টিভি ব্যক্তিত্ব,
২০১৫ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রামের একদল সাংবাদিক বন্ধুর সাথে ব্যাংকক গিয়েছিলাম। সে দলে ছিলেন চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা হাসান ফেরদৌস। একদিন রাতের খাবারপর্ব শেষ হওয়ার পর তিনি অনুরোধ করলেন তাঁর সঙ্গে ব্যাংকক হাসপাতালে যাওয়ার। কারণ জানতে চাইলে তিনি জানালেন তাঁর আরেক সাংবাদিক বন্ধু চট্টগ্রাম থেকে আসার সময় তাঁকে এই হাসপাতালের এক চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে একটি নির্দিষ্ট মলম কিনতে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন। তাঁর বন্ধুটি বলে দিয়েছেন ওষুধটি ব্যাংকক হাসপাতাল থেকেই কিনতে হবে।
অনেকেই জানেন, ব্যাংকক হলো রাতের শহর। রাতের খাবারের পাট চুকাতেই মধ্যরাত। ঘড়িতে দেখলাম রাত ১২ টা। এত রাতে যাওয়া নিরাপদ হবে কিনা এবং গেলেও ওষুধটি পাওয়া যাবে কিনা প্রশ্ন করতেই হাসান ফেরদৌস অভয় দিয়ে জানালেন, ব্যাংককের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ ভালো এবং রাত হলেও ওষুধ কিনতে সমস্যা হবে না।
অতপর আমরা একটি ট্যাক্সিক্যাব ভাড়া নিয়ে রওনা দিলাম ব্যাংকক হাসপাতালের দিকে। আমি ভেবে নিয়েছিলাম, হাসপাতালের সামনে সারি সারি ওষুধের দোকান থাকবে এবং এর মধ্যে যে কোনো দোকান থেকে মলমটি কিনে নেব। আমার ভুল ভাংতে দেরি হলো না। হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ঢুকে ধারনাটি একেবারে পাল্টে গেল। হাসপাতাল লেখা না থাকলে ধরে নিতাম এটি একটি পাঁচতারা হোটেল। হাসপাতালের সামনে সারি সারি দোকানতো দূরের কথা মানুষও নেই। ছিমছাম এবং সুনসান। আমরা কম্পাউন্ডে উঠে ইনফরমেশন সেন্টারটি খুঁজে বের করলাম। তাঁদের বিষয়টি জানাতেই তাঁরা নিয়ে এলেন পাশের একটি ওয়ার্ডে। তাতে লেখা আছে ইমারজেন্সি ওয়ার্ড। দেখলাম কোনো ভিড় নেই। বেডে একজনই মাত্র রোগী। তার চারপাশে চিকিৎসক নার্স মিলে ৫/৬ জন তাঁকে সেবা দিচ্ছেন। ইমার্জেন্সির বেড এবং তাতে চিকিৎসাসেবার নমুনা দেখে আমার চকিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের দৃশ্যগুলো মনে পড়ল। আমাদের দেখে ফ্রন্ট ডেক্সে বসা নার্সটি কারণ জানতে চাইলেন। বলার পর পাশের রুমে বসতে বলে ফোনে কারো সাথে আলাপ করে নিলেন। বলে রাখা ভালো পর্যটন থাইল্যান্ডের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হলেও স্থানীয়রা ইংরেজি বোঝে খুব কম এবং বলে তার চেয়েও কম। আমার ধারণা ব্যাংককের সাধারণ মানের দোকানের কর্মচারীদের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষ বেশি ইংরেজি বোঝে।
ওয়েটিং রুমে কিছুক্ষণ বসার পর কিশোর বয়েসি একটি ছেলে এসে তার সাথে যাওয়ার ইঙ্গিত করলো। আমরা বেশ কিছু ওয়ার্ড, করিডোর পেরিয়ে একটি ওয়েটিং রুমের মতো হলে ঢুকলাম। এটি আয়তনে অনেক বড়। দেয়ালকে পিছনে রেখে কাউন্টারে সাজানো আছে প্রায় চল্লিশেক কম্পিউটার। তবে এত রাতে ওয়েটিং রুমে কোনো রোগী নেই এবং তিনটি মাত্র কাউন্টারে কর্মরত অবস্থায় দেখা গেল ২ তরুণী ও এক তরুণকে। আমাদের এতক্ষণ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল যে কিশোরটি সে কম্পিউটারের সামনে বসা তরুণটির কাছে নিয়ে গিয়ে আমাদের দেখিয়ে তাদের মাতৃভাষায় বিষয়টি বুঝিয়ে দিল। এবার আমরা ব্যাখ্যা করলাম কী উদ্দেশ্যে হাসপাতালে এসেছি। তরুণটি ব্যবস্থাপত্রটি হাতে নিয়ে ইশারায় আমাদের বসতে বললেন। এক সাথে প্রায় শ তিনেক বসতে পারবে এমনভাবে পাতানো চেয়ারের দুটিতে আমরা বসে আক্ষেপ করলাম এত দুর্গতি জানলে ওষুধের জন্য আসতামই না। ১০/১৫ মিনিট পরে তরুণটি জানালেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে আমাদের প্রয়োজনের কথা জানিয়ে মেইল করা হয়েছে। চিকিৎসক একটি মিটিংয়ে আছেন। ফ্রি হয়ে মেইল দেখে উত্তর দিলে আমাদের জানাতে পারবেন আমাদের ওষুধ দিতে পারবেন কিনা। আরও প্রায় আধঘন্টা অপেক্ষার পর আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। তরুণটি জানালেন চিকিৎসক মেইলের উত্তর দিয়েছেন এবং শুধুমাত্র এক ফাইল দেবার অনুমতি দিয়েছেন। আমরা কাউন্টারে টাকা জমা দিয়ে তাঁদের দেখিয়ে দেওয়া স্টোরে গিয়ে কাঙ্খিত ওষুধটি সংগ্রহ করলাম।
থাইল্যান্ড এশিয়ার একটি মধ্য আয়ের দেশ। এখানে একটি ওষুধ কিনতে এত আনুষ্ঠানিকতা করতে হলে এর চেয়ে উন্নত কিংবা ইউরোপ–আমেরিকা কানাডা অস্ট্রেলিয়ার অবস্থা সহজেই অনুমেয়। যারা দেশের বাইরে যান কিংবা যাদের আত্মীয় পরিজন এমন দেশগুলোতে বসবাস করেন তারা খুব ভালো করেই বুঝবেন ওসব দেশে হাতের কাছে ওষুধ পাওয়া যায় না। মুড়ি–মুড়কির মতো ওষুধ বিক্রি হয় না ওসব দেশে। দু–চার–দশ কিলোমিটারের মধ্যে একটি ওষুধের দোকান খুঁজে পাওয়া দুস্কর। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অনেক দেশে ওষুধ বিক্রি করে না। অনেক দেশে সরকারি হাসপাতালই ওষুধের যোগান দেয়, বাইরে থেকে ওষুধ কেনার উপায় নেই সেখানে। এমন কি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে নেপালেও পথে পথে এত ওষুধের দোকান দেখতে পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশে এই চিত্রটি ভিন্ন। শহরের কিছু ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বাদ দিলে দেখা যাবে কয়েকটি দোকানের পরপরই একটি করে ওষুধের দোকান। শহরের পাড়া–মহল্লা থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায়েও দেখা যায়। কোথাও এক সাথে কয়েকটি দোকানঘর উঠেছে। তাতে নিশ্চিতভাবে একটি ওষুধের, একটি চায়ের এবং তৃতীয়টি মোবাইলে টাকা রিচার্জ করার দোকান। বাংলাদেশে ফার্মেসি ছাড়াও মুদির দোকান এমনকি পানের দোকানেও ওষুধ বিক্রি হয়। এসব দোকানে গ্যাস্ট্রিক, মাথা ব্যথা, পেট খারাপের মতো অত্যন্ত কমন কিছু রোগের ওষুধ পাওয়া যায়। অনেকেই পান বিড়ির সাথে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট কেনেন এমন দোকান থেকে। গ্রামে এমন অনেক দোকানে দেখেছি। দোকানদারকে পাড়ার পরিচিত কারো ছেলে বা মেয়ে এসে বলছে, বাবার জ্বর জ্বর লাগছে, বলছে ওষুধ দিতে। দোকানদারও সামান্যতম না ভেবে জ্বরের ওষুধ তুলে দিচ্ছেন শিশুর হাতে। বাংলাদেশে এত ওষুধের দোকানের আধিক্য দেখে বোঝা যায় জাতিটি কত রুগ্ন ও অসুস্থ। বাংলাদেশে এমন কোনো পরিবার আছে যেখানে কোনো না কোনোভাবে রোগাক্রান্ত মানুষ নেই? চল্লিশ পেরুনো কয়জনকে পাওয়া যাবে যার ডায়াবেটিস নেই? কতজন মানুষের কিডনি, লিভার, হৃদপিন্ড সুস্থ আছে? উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন না এমন মানুষের সংখ্যা কত? গ্যাস্ট্রিক নেই এমন কয়জন আছেন বাংলাদেশে? এতো শুধু শারীরিক রোগের কথা বললাম। দেশে মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ আছেন এমন মানুষের সংখ্যা কত? হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে গেলে বোঝা যায় এদেশের মানুষ কতটা সুস্থ আছে। ভারতের কিছু নামকরা হাসপাতাল টিকে আছে বাংলাদেশের রোগীদের কারণে।
বাংলাদেশের শিশুদের মতো বিশ্বের কোনো দেশের শিশু এমন রোগাক্রান্ত নয়, এত জটিল রোগে আক্রান্ত নয়। কিছু কিছু রোগ আছে যা শুধু আবহাওয়া বা পরিবেশের কারণে হয়। দেশে থাকতে রোগে ভুগছে অথচ দেশের বাইরে গেলে সুস্থ এমন ঘটনাও আছে। কিছুদিন আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বলা হয়েছিল, দুষণের কারণে বিশ্বে প্রতি ছয় জনের একজন মৃত্যুবরণ করছেন। বাংলাদেশে এই সংখ্যা প্রতি চারজনে একজন।
পরিবেশ দুষণের কারণ ছাড়া বাংলাদেশের মানুষের রোগাক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ আমাদের অনিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা। ভেজাল, নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ, পচা, বাসী এবং অস্বাস্থ্যকর স্থানে তৈরি খাবার খেতে খেতে দেশের মানুষের স্বাস্থ্য প্রচন্ড ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছে। বাংলাদেশে এমন পণ্য খুব কম আছে যার নকল বা ভেজাল নেই বাজারে। আমাদের দেশের ভোগ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। ফলে প্রতিদিন আমাদের খাদ্য তালিকায় যা থাকে তার অধিকাংশই স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক। আমাদের দেশের হোটেল রেস্তোরাঁ বেকারিতে যা তৈরি হয় তার অধিকাংশই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। দেশে উৎপাদিত পণ্যও নিরাপদ নয়। আমাদের শস্য তাও নিরাপদ নয়। আমাকে এক কৃষি কর্মকর্তা বলেছিলেন, বেগুন গাছ রোপণ করা থেকে শুরু করে বেগুন তোলা পর্যন্ত অন্তত দু’শ বার কীটনাশক স্প্রে করা হয়। আমাদের এমন কোনো ফলন নেই যাতে কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় না। এমনকি শাক, যা আমরা সামান্য তা’য়ে রান্না করি।
ফসলে কীটনাশক প্রয়োগের কিছু নিয়ম আছে। কোন ফসলে কী বিষ এবং কোন মাত্রায় তা প্রয়োগ করতে হবে তার বিশ্বস্বীকৃত মান আছে। কোন বিষ ছিটানোর কতদিন পর তা খাওয়ার জন্য উপযোগী হবে তারও হিসাব নির্ধারণ করা আছে কিন্তু আমাদের দেশে কে মানছেন এমন বিধিনিষেধ। আমরা যে সয়াবিন তেল খাই তা কতটা পরিশুদ্ধ তা জানি না। এদেশে তো মাস্টার গাম দিয়েও বাঘাবাড়ির এক নম্বর গাওয়া ঘি তৈরি করা হয়। ব্রয়লার মুরগিকে খাদ্য হিসেবে বা ফার্মের মাছকে খাদ্য হিসেবে কী খাওয়ানো হয় এবং তা কতটা স্বাস্থ্যসম্মত তা আমরা জানি না। দেশে আন্তর্জাতিক মানের বয়লার চিকেনের অভাব আছে বলে এদেশে ‘ম্যাকডোনাল্ড’ তাদের বিক্রয়কেন্দ্র খোলেনি। ‘কেএফসি’ মান বজায় রাখতে পারছে না বলে চট্টগ্রাম শাখাটি বন্ধ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের খাদ্যমান যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে তা দেশের বাইরে অবস্থান করেন এমন পরিবার তাদের সন্তানদেরসহ দেশে আসলে খুব বেশি টের পান। এদেশে মরা মুরগি চালিয়ে দেওয়া হয় হোটেলে। এদেশে পুকুরের মাছ তোলার খরচ বাঁচাতে মাছ তুলতে পুকুরে বিষ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। পচা, বাসী, ভেজাল খাবারতো নিত্যদিন খাচ্ছি বিভিন্ন হোটেল–রেস্তোরাঁয়। নিজের ঘরে যা খাচ্ছি তা–ও তো নিরাপদ নয়। কারণ কিনে তো নিয়ে যাচ্ছি সেই ভেজাল পণ্যই।
এ দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ এই ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে অসুস্থ হচ্ছেন। তারপর সুস্থ হওয়ার জন্য যে ওষুধ খাচ্ছেন তা ভেজাল হওয়ায় সুস্থ না হয়ে উল্টো মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছেন। মাঝখানে অনেকের আবার ভেজাল ও মানহীন চিকিৎসকের পাল্লায় পড়ার দুভার্গ্যও হয়। এদেশে ওষুধে ভেজাল হয়। এমন কি শিশু ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল হয়। ওষুধের দোকানগুলো ভেজাল, নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করে তা সকলে জানে কিন্তু তাদের কিছু বলার সামর্থ্য যেন কারুরই নেই।
আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু গ্রামে একটি ওষুধের দোকান খুলেছিলেন। মাস ছয়েক করার পর তা বন্ধ করে দিলেন। কারণ জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন, ওষুধের দোকানে নকল ওষুধ না বেচলে লাভ হয় না তেমন। কারণ ওষুধে মার্জিন খুব কম। যারা প্রতিদিন প্রচুর বিক্রি করেন তারা নকল ওষুধ বিক্রি না করেও লাভ করতে পারেন। নকল–ভেজাল ওষুধ বিক্রির কৌশল জানতে চাইলে তিনি জানান, বিক্রেতা ক্রেতা বুঝে নকল ওষুধ ধরিয়ে দেয়। বোকা–সরল এবং কম লেখাপড়া জানা সাধারণ ক্রেতাদেরই নকল ওষুধ গছিয়ে দেওয়া হয়। তার মতে বিক্রি হওয়া ওষুধের ৫০ শতাংশই নকল। আর নকল ওষুধ ধরার উপায় খুব কঠিন। ফার্মাসিস্ট ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে নকল ও ভেজাল ওষুধ শনাক্ত করা কঠিন।
নকল ও ভেজাল ওষুধ ছাড়াও ওষুধের দাম নিয়েও আছে চরম নৈরাজ্য। মানুষ সাধারণত ওষুধের দোকানে দরদাম করে না। কারণ এত এত ওষুধের ভিড়ে প্রকৃত দাম জানাটাও কঠিন। ফলে ওষুধের দোকানদার হিসাব করে যত টাকা দাবি করেন ক্রেতারা তাই পরিশোধ করে থাকেন। বছর দুয়েক আগে এন্টাসিড প্লাস সাসপেনসন পাওয়া যেত ৩৫ টাকায়। হঠাৎ করে দুয়েক সপ্তাহ ওষুধটি বাজার থেকে গায়েব হয়ে গেল। এরপরে যখন আবার বাজারে সরবরাহ বাড়ল তখন তার দাম এক লাফে উঠে গেল ৭০ টাকায়। এখন সম্ভবত ৭৫ টাকা। এভাবে কখন, কেন ওষুধের দাম বাড়ে তা ক্রেতাদের জানার উপায় নেই। ওষুধ কোম্পানিকেও এর জন্য কোথাও জবাব দিতে হয় বলে মনে হয় না। যে কারণে বাংলাদেশের ওষুধ বাজার নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় চলে বছরের পর বছর যদিও ওষুধ প্রশাসন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব আছে বাংলাদেশে।
ভেজাল ও নকল ওষুধের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালিত হয়ে থাকে। চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসনের অভিযান নিয়ে ওষুধের পাইকারি বাজার হাজারী লেনে বেশ অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিবার অভিযানে হাজারী গলি থেকে বিপুল পরিমাণ নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ উদ্ধার করা হয়। কোনো কোনো দোকান মালিককে জরিমানা করা হয়। প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয় কিন্তু এরপর আবার স্বাভাবিক নিয়মে সেখানে নকল ওষুধ বিক্রি হয়। ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি হয়। মূলত ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রির নামে এক ধরনের প্রতারণা চলছে দেশে। দেশের বেশিরভাগ ফার্মেসিতে ফুড সাপ্লিমেন্টের নামে ভেজাল, নকল ও মানহীন পণ্য বিক্রি করছে ফার্মেসিগুলো। আমদানিকারকরা ফুড সাপ্লিমেন্ট আমদানি ও তার বাজারজাত করার জন্য সিন্ডিকেটও গড়ে তুলেছে। ব্যবস্থাপত্রে অপ্রয়োজনীয় ফুড সাপ্লিমেন্ট লেখার জন্য আমদানিকারকরা চিকিৎসকদের নানা ধরনের অবৈধ সুবিধা ও উপটৌকন দিয়ে থাকেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞার পরও কিছু শ্রেণির চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রে রোগীদের ফুড সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশ্বের উন্নত দেশে কোনো কোম্পানির ওষুধের ব্র্যান্ড নাম লেখেন না চিকিৎসকরা। তারা শুধু জেনেটিক নামটিই লিখে থাকেন। ফলে সেখানে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা চিকিৎসককে প্রভাবিত করার সুযোগ পান না। চিকিৎসকরাও কোনো কোম্পানির সুবিধা গ্রহণ করে তাদের মানহীন ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লেখার সুযোগ পান না। বাংলাদেশের বাজারে মানহীন ওষুধ বিক্রি হওয়ার পেছনে চিকিৎসকরাও কম দায়ী নন। তারা ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পক্ষান্তরে কোম্পানির কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করে তাদের মানহীন ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লিখে দিয়ে রোগীদের ঠকাচ্ছেন, প্রতারিত করছেন। চিকিৎসকদের চেম্বারের দরজায় কিংবা হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক চেম্বারে মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের ভিড় দেখে বোঝা যায় এ বিষয়ে উভয় পক্ষ কেমন তৎপর। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে ঘাপটি মেরে থাকা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা চিকিৎসকের চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসা রোগীর ব্যবস্থাপত্র নিয়ে কাড়াকাড়ি করেন। তারা তড়িঘড়ি করে মোবাইলে ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলার জন্য রোগীদের হাত থেকে ব্যবস্থাপত্রটি এক প্রকার ছিনিয়ে নেন। এ বিষয়ে আমার একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। বছর দশেক আগে, তখন মোবাইলে মোবাইলে ছবি তোলার এত সুযোগ ঘটেনি। এমনি একদিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে ডাক্তার দেখিয়ে বের হয়ে একটি ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছি ওষুধ কেনার জন্য। পকেট থেকে বের করে ব্যবস্থাপত্রটি হাতে নিতেই একজন তা আমার কাছ থেকে এক প্রকার ছিনিয়ে নিয়ে দৌড় দিলেন। আমার ব্যবস্থাপত্র ছিনতাই হয়েছে ভেবে আমি যখন চিৎকার করছিলাম তখন দোকানদার বললেন, আপনার প্রেসক্রিপসন ফটোকপি করতে গেছেন। এখনই চলে আসবে। ‘ছিনতাইকারী ঠিকই কিছুক্ষণ পর আসলেন এবং আমার ব্যবস্থাপত্র ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন, কিছু মনে করবেন না। আমি ততক্ষণে অনেক কিছু মনে করেছি। তা ঝাড়ার উদ্যোগ নিতেই দোকানদার ভদ্রলোক বললেন, বেশি কিছু বলবেন না, কারণ এখানে ওরা দলে ভারী আর আপনি একা।
এই ওষুধ ব্যাপারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন থেকে অভিযান পরিচালনা করতে গেলেই তারা দোকান বন্ধ করে দেয়। ওষুধের দোকানে ধর্মঘট ডাকে। ঐ ওষুধ ব্যাপারীরা ভালো করেই জানে এই জাতি অন্যকিছু ছাড়া চলতে পারলেও ওষুধ ছাড়া একদিনও চলতে পারবে না। ফলে এক সময় প্রশাসন শিথিল হয় আর ওষুধ ব্যাপারীরা মহাউৎসাহে আবার নেমে পড়ে মানহীন, মেয়াদহীন, নকল, ভেজাল ওষুধ বিক্রির মহোৎসবে।
একদল জাতিকে রুগ্ন করে রাখছে। আরেক দল তা পুঁজি করে কোটিপতি হচ্ছে। আর আমরা সাধারণ মানুষ বেঁচে আছি এক অলৌকিক উপায়ে।
[email protected]

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।