অনাগ্রহ অনীহার ঘুরপাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা-খন রঞ্জন রায়,

পোস্ট করা হয়েছে 05/10/2017-06:55pm:    ।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির ক্ষেত্রে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার দাবি উঠেছে অনেক দিন আগেই। এ নিয়ে বিস্তর কথা চালাচালি হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন পর্যন্ত একমত হতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১২ লাখ শিক্ষার্থীকে দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে বেড়াতে হয়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এটা যে কত বড় মানসিক চাপ, তা ভুক্তভোগীরাই বলতে পারে। ভর্তি পরীক্ষার তারিখও শিক্ষার্থীদের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সম্ভাব্য ভর্তি পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪ অক্টোবর থেকে। শুরুতেই বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা। এই প্রতিষ্ঠানে যাদের ভর্তির সুযোগ হবে না তাদের ছুটতে হবে অন্যত্র। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ অক্টোবর। পরদিন ২১ অক্টোবর চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ। খুলনায় যারা ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে তাদের কি পরদিন চট্টগ্রামে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সম্ভব? এমন তারিখ সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে। ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে অদ্ভুত এক পদ্ধতি অনুসরণ করছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কয়েক বছর আগেও কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের লিখিত পরীক্ষা ছিল। কোথাওবা এমসিকিউ। আবার এগুলোর মধ্যেও আছে নানা যোগ-বিয়োগের হিসাবনিকাশ। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনিটভিত্তিক পরীক্ষা, আবার ইউনিটেও রয়েছে বিভাগভিত্তিক পরীক্ষা। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মেধা স্কোরের সঙ্গে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার নম্বর যোগ করা হয় আবার কোথাও হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরমের মূল্যের রয়েছে রকমফের। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ২০০ থেকে ৫০০ বা তারও বেশি টাকা পর্যন্ত ফরমের মূল্য রাখা হয়। ঢাকা, জগন্নাথ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের একবারই ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ দেয়। সব মিলিয়ে বৈচিত্রময় আইনকানুনের সঙ্গে এ সময় শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মুখোমুখি হতে হয়। যন্ত্রনাদায়ক এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। তবে এর কোনো সমাধান হচ্ছে না। মূলত বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনাগ্রহেই আটকে আছে এ পদ্ধতি। গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। আলোচনার টেবিল গরম হয়েছে টকশোতে। এমনকি সমন্বিত ভর্তির ব্যাপারে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ আগ্রহ প্রকাশ করলেও উপাচার্যরা একমত হতে পারেননি। এর উপর এবার দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা কমবেশি বন্যাকবলিত। ঘরহীন মানুষগুলো পথপানে চেয়ে থাকে শুধু কিছু ত্রাণসামগ্রী কিংবা অন্যের দেওয়া দু’মুঠো খাবারের আশায়। ক্ষেতের ধান, পুকুরের মাছ, গোয়ালের গরু, মাথা গোঁজার ঠাঁই, গাছ, হাঁস-মুরগি কিছুই আজ আর আগের মতো নেই। এসব পরিবারের সন্তানদের অনেকেরই আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া হবে না। কোথায় পাবে এত ফরম কেনার টাকা। ৫-৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম কিনে ভর্তি পরীক্ষা দিতে কমপক্ষে ২০-৩০ হাজার টাকা লাগবে। ওদের পক্ষে সম্ভব না। পঞ্চগড় থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে খুলনা, খুলনা থেকে রাজশাহী, রাজশাহী থেকে সিলেট ঘুরে ঘুরে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া। এরপর সারা রাতের ভ্রমণক্লান্তি শেষে পর্যাপ্ত খাবার, ঘুম, টয়লেট সুবিধা না নিয়ে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার কক্ষে প্রবেশ করে। দেশের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষায় আনা-নেওয়া করতে একদিকে অভিভাবকদের যেমন পকেটে টান পড়ে, তেমনি ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা ক্লান্ত-অবসন্ন হয়ে যায়। তদুপরি কয়েক মাস ধরে চলতে থাকা ভর্তি পরীক্ষার জন্য জাতির লাখো/কোটি কর্মঘন্টা শিক্ষা সময় অপচয় হয়। এত ভোগান্তি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও তাঁদের সন্তানদের পোহাতে হয় না। কারণ তাদের জন্য কোটা আছে। বাংলাদেশের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নতুন নয়। সর্বপ্রথম স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সম্মিন্বিত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ ভর্তির উদ্যোগে গ্রহণ করে। তারপর হেলথ টেকনোলজি ও মেডিকেল স্কুল ভর্তি কার্যক্রম চালু করে। দু-দশক আগেও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, হেলথ টেকনোলজি ইনস্টিটিউট, মেডিকেল স্কুলে টাকার বিনিময়ে ছাত্রদের ভর্তি করা হতো। কেন্দ্রীয় পরীক্ষার মাধ্যমে স্বাস্থ্য বিষয়ক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি তালিকা তৈরি করে। চিকিৎসা শিক্ষা ও পেশার মান উন্নয়নে উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অনুসরণ করে নার্সিং অধিদপ্তর একটি পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি ৩১২ টি নার্সিং কলেজ, বিএসসি ইন নার্সিং, নার্সিং ইনস্টিটিউটের ডিপ্লোমা ইন নার্সিং, ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন করে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ১৮ দিনের মধ্যে সরকারি ৯১টি এবং বেসরকারি ৪১৮টি ইনস্টিটিউটে ৪৮টি বিভাগে ছাত্র ভর্তি কার্যক্রম সফলতার সাথে সম্পন্ন করে। ২০১৭ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশে পাবলিক সার্ভিস কমিশন একটি পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যাডার ও ননক্যাডার সার্ভিসে ৪ হাজার ৭১২ পদে নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজন করে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির সদস্যভূক্ত সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, জনতা ব্যাংক লিমিটেড, রূপালী ব্যাংক লিমিটেড, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) কর্মকর্তা (সাধারণ) পদে একটি সমন্বিত পরীক্ষার মাধ্যমে ৩ হাজার ৪৬৩ জন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড একযোগে মাসব্যাপী নয় লাখ শিক্ষার্থীকে উচ্চ মাধ্যমিকে সফলভাবে ভর্তি সম্পন্ন করে থাকে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত/অনিয়মিত ৩২ লাখ শিক্ষার্থীকে ঘরে বসেই এক ক্লিকে ভর্তির যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের প্রথম মানদ- সনদ আর দ্বিতীয় সক্ষমতার পরিচায়ক চুম্বক ভর্তি পরীক্ষা। বলা হচ্ছে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় গবেষণাকেন্দ্র। গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, বিকাশ ও বিতরণই হলো উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। এখান থেকে গবেষণালব্ধ জ্ঞান দেশ তথা বিশ্বের কল্যাণে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে বিরাজ করছে উল্টো প্রবণতা। গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলো এ থেকে সরে যাওয়ায় লক্ষ্যচ্যুত হচ্ছে। তবে প্রকৃত উদাহরণ হলো স্বাধীনতার ৫ দশকের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা, শিক্ষক নিয়োগে সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষা, শিক্ষক নিয়োগে সম্মিলিত নিয়োগ নীতিমালা এবং সমন্বিত সিলেবাস ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন। গবেষণার বিষয়বস্তু নির্ধারণ সংক্রান্ত কোন পদক্ষেপই নেওয়া হয় নাই। সবাই চান সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষা হোক। তারপরও হচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালগুলোর অনীহা, অনিচ্ছার কারণে। সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষা হলে কীভাবে হবে, কারা প্রশ্ন করবে, কীভাবে সে প্রশ্ন দেশের বিভিন্ন স্থানে যাবে, আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে পরিমাণ টাকা আয় করতে পারত, তা আর পারবে কি-না? বড় একটা আয়ের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে কি-না? প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষার দায়ভার কে বা কারা নেবে? ফল প্রকাশে স্বচ্ছতা থাকবে কি-না? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনৈতিকভাবে, তদবিরের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা যায় না, তা রক্ষা করা যাবে কিনা! হয়তো হাজারো প্রশ্নের কারণে সম্ভব হচ্ছে না সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষা। সময়ের চাহিদার কারণে অনেক পুরনো কিংবা ঐতিহ্যনির্ভর ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসাটা দোষের কিছু নয়। সবার জন্য যা কল্যাণকর তার সবকিছু উদারনৈতিকভাবে করা উচিত। কোন বিশ্ববিদ্যালয় বড়, কোন বিশ্ববিদ্যালয় ছোট কিংবা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা ঐতিহ্য আছে, তা না ভেবে বরং আসুন ভাবি, জাতি হিসেবে আমরা কত উদার, জাতি হিসেবে আমাদের যে ঐতিহ্য আছে, তার কথা। সময় অনেক আগেই এসেছে, আমরা এগিয়ে আসতে পারিনি। এখনই সময় কিছু করার। বিষয়টি নিয়ে সরকার ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিবগের্র কঠোর নির্দেশনা প্রত্যাশা করি।
মো. আবুল হাসান, আহ্বায়ক খন রঞ্জন রায়, সদস্য সচিব বিশ্ববিদ্যালয় বঞ্চিত জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন পরিষদ ৮৭, চট্টেশ্বরী রোড, চকবাজার, চট্টগ্রাম

সর্বশেষ সংবাদ