হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি - মো.ওসমান গনি লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

পোস্ট করা হয়েছে 05/10/2017-06:52pm:    সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের আগেকার সময়ের পুরাতন সংস্কৃতি।আগেকার সময়ে আমাদের গ্রামবাংলার প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে ছিল আমোদ-প্রমোদের কতই না আয়োজন।যা দেখে শুনে সে সময়ের মানুষেরা আনন্দ, উল্লাসে ও হেঁসেখেলে বেড়াতো।মানুষের মানুষের মধ্যে ছিল নিবিড় আত্মার সম্পর্ক।কিন্তু সে রকমটা এখন আর আমাদের দেশে সচরাচর দেখা যায় না।মানুষগুলো কেমন করে যেন একে অপর থেকে দূরে চলে যায়,নাই আর আগের মতো মানুষের মধ্যে ভালবাসার সেতুবন্ধন।আস্তে আস্তে মানুষ হয়ে উঠেছে হিংসাপারায়ণ।সমাজে এমনও মানুষ রয়েছে কেউ কারও চেহারাতো দেখা দূরে থাক তার ছায়াটা সহ্য করতে পারে না।এমনটা হওয়ার একটাই কারন আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের রেখে যাওয়া সংস্কৃতিকে ধরে না রাখার কারনে।এই আধুনিক ডিজিটাল যুগের কারনে আমাদের থেকে পুরাতণ সব রকমের সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে।আমাদের বাংলাদেশের যে সংস্কৃতি তা আবহমান কাল থেকে পরম্পরায় চলে আসছে। তবে বাঙালি জাতির সংস্কৃতি যতটা সমৃদ্ধ অন্য কোনো জাতির সংস্কৃতি এতটা সমৃদ্ধ নয়। বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় গুণটা হলো মানবতাবাদ। পরস্পরের ভালোবাসা। যদি সেময়ের সংস্কৃতির সঙ্গে আমরা বর্তমান যুগের সংস্কৃতির তুলনা করি তাহলে দুটোর মাঝে বিস্তর ফারাক লক্ষ করা যাবে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি বিখ্যাত প্রবন্ধের নাম “সংস্কৃতির ভাঙা সেতু”। এই প্রবন্ধে তিনি তখনকার বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত সত্য রূপ তুলে ধরেছেন। তিনি তার প্রবন্ধে বলেছেন আমরা এখন যে সমাজে বসবাস করছি তাকে শুধু ভাঙা সেতুর সঙ্গেই কেবল তুলনা করা যায়। বাঙালি জাতির সংস্কৃতির কয়েকটি কাল রয়েছে, তার মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময় এবং পূর্ব বাংলার নব জাগরণ বাঙালি সংস্কৃতি একটি কাল। এই সময়ে যে সংস্কৃতি ধারা সৃষ্টি হয় সেখানে দেখা যায় পুরাতন সংস্কৃতির বেড়া জাল ভেঙে নতুন ধারা চালু হয়। একটি শিক্ষিত সমাজ আর মধ্যবিত্ত পরিবার নির্ণয় শুরু হতে থাকে। তখনো সামাজিক ক্ষেত্রে বেশকিছু রীতিনীতি লক্ষ করা গেছে। যৌথ পরিবার তার মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সে যৌথ পরিবার এখন আর তেমন দেখাই যায় না। সেকালের সংস্কৃতির মধ্যে সামাজিক সংস্কৃতিই বেশি লক্ষ করা যায়। আর সংস্কৃতির স্তম্ভ হলো গ্রাম। আগেকার সময়ে দেখা যেত,সমাজের কেউ বিপদে পড়লে বাকিরা তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাকে সাহায্য করেছে।তার সমস্যা সমাধান করছে সমাজের লোকেরা।তার মনে করত, প্রতিবেশীর বিপদ মানেই সমাজের প্রতিটা মানুষের বিপদ। তাদের মধ্যে লেখাপড়া কম থাকলেও ভালোবাসার প্রগাঢ়তা ছিল অনেক বেশি।তাদের মধ্যে আত্মার সম্পর্ক এতই গভীর ছিল যে, ছেলে-মেয়েদের বিবাহ দেওয়া, মসুলমানী করানোসহ যেকোন কাজ করার আগে সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিত। সমাজে একজন নেতা বা সমাজপতি থাকত তার কথামতো বা পরামর্শে যেকোন কাজ করা হতো।এলাকার সভা-সমাবেশ বা যা কিছুই করা হতো সব কিছুই সমাজের নেতার বা সমাজপতির পরামর্শক্রমে করা হতো।এলাকার লোকজনের বিপদ-আপদে সমাজপতি ও তার আশেপাশের লোকজন দৌড়ে আসত।সবাই বসে সম্মিলিতভাবে সমস্যার সমাধান করত।কোর্ট-কাচারিতে মামলা খুব কমই হতো।এলাকার সমস্যা এলাকাতে সমাধান হতো।কিন্তু বর্তমান সময়ে আর সে রকম দেখা যায় না।কেউ কারও কথা শোনে না।কেউ কাউকে মান্য করে না।সবাই মনে করে আমি বেশী বুঝি।এ কারনেই আমাদের দেশে তথা সমাজে ব্যবিচার ও অনাচার বেড়ে গেছে। সে সময়ের সমাজ ব্যবস্থা কতই না ভালো ছিল। সমাজে কোন বড় অনুষ্ঠান হলে সমাজপতি বা সমাজের নেতা সমাজের তার আওতাধীন সকল লোকজন কে দাওয়াত দিত।বাড়ির উঠানে বা বাড়ির পাশে খোলামাঠে মাদুর বা বাঁশ বিছিয়ে দিত।লোকজন সবাই সারিবদ্ধভাবে বসে খানা খাইত।আর তখন খানা পরিবেশন করা হতো, কলাপাতা বা শালুক পাতার মধ্যে।মনের আনন্দে তারা পেট ভর্তি করে খেত।আর আনন্দ উল্লাস করত।সে সময়ে সমাজপতি বা সমাজনেতার মূল্যায়ণ ছিল খুবই বেশী।কিন্তু সে রকম কলাপাতা বা শালুত পাতাতে খাওয়ার দৃশ্য আজ তেমন চোখে পড়ে না। কিন্তু আজ সামাজিক বিয়েগুলো আর বড় অনুষ্ঠানগুলো সেভাবে হয় না। মুরুব্বীদের কথার কোনো ধার ধারে না। নিজেদের ইচ্ছামতো বিয়ে-সাদি করছে আবার নিজেদের ইচ্ছাতেই যখন-তখন ছাড়াছাড়ি হচ্ছে। পরিবারের কারো বিবাহ দেওয়ার প্রয়োজন হলে সমাজের লোকজন উভয় পক্ষের ছেলে-মেয়ের বংশের খোঁজ নিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত নিত। সে সময়ে ছেলে-মেয়ের চেহারার চেয়ে বংশ পরিচয়ই তাদের কাছে মুখ্য ছিল। কিন্তু এখন অনেকে তার নিজের বংশের নামই জানে না, তাহলে অন্যের বংশ পরিচয়ের জানার আগ্রহ থাকবে কিভাবে? তারপর কোন ছেলে-মেয়ের বিয়ে ঠিক হলে এলাকার লোকজনকে নিয়ে ছেলে বা মেয়ের বাড়িতে দাওয়াত খেতে যেত।এলাকার ছেলে-মেয়েরা দল বেঁধে দুলার সাথে পায়ে হেঁটে মেয়ের বাড়িতে যাইত রাতের বেলায়।মেয়ের বাড়িতে কলা গাছ ও বেতপাতা দ্বারা দুলার জন্য গেইট নির্মাণ করে রাখত মেয়ের পক্ষ লোকজন।দুলা সেখানে গিয়ে বসলে পরে মেয়ের পক্ষের লোকজনের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়ে দুলাকে গেইট পার হতে হইত।পরের দিন দুপুর বেলা ছেলের বা তার এলাকার সমবয়সীদের নিয়ে দলবেঁধে বিয়াইওয়ালা খাওয়ার জন্য মেয়ের বাড়িতে হাজির হত।সেটার আনন্দটাই ছিল আলাদা।খুব মজা হতো।এখন আর সে রকমের কলাগাছের গেইট ও নাই আর নেই কোন আনন্দ উল্লাস।ছোটবেলায় মায়ের মুখে শুনেছি, গ্রামে নাকি একটা রীতি ছিল ভাদর মাসে মেয়েরা যদি বাপের বাড়ি যায় তাহলে সমস্ত মাস বাপের বাড়ি থাকতে হতো। তা না হলে অমঙ্গল হবে। আবার কারো বাড়িতে বেড়াতে গেলে মিষ্টি বা রসগোল্লার সঙ্গে পান-সুপারি আনতেই হবে। আত্মীয়দের জন্য বৈশাখ-জৈষ্ট্য মাসে আমের,আষাঢ় মাসে কাঁঠাল আর হাতুর,ভাদ্র মাসে তালের পিঠা,কার্তিক মাসে চিড়ামুড়ির, অগ্রাহায়ন ও পৌষ মাসে শীতের পিঠার দাওয়াতে ব্যবস্থা ছিল।জামাই ও ব্যায়াই আনন্দ ও উল্লাস করে বেড়াতে যেত।কিন্তু আজ তা সময়ের সাথে সাথে বিলিন হয়ে যেতে শুরু করছে।বর্তমান যুগের ছেলে-মেয়েরা উপরোক্ত কথাগুলোর নাম তারা কখনও শুনে ও নাই। নতুন আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে গেলে সাধ্যমতো উপহার দিত। এখন আর সে নিয়ম কেউ পালন করে না। নবান্ন, শীত, বর্ষার দিনে পিঠা-পুলির ধুম পড়ে না। মেয়েরা বাপের বাড়িতে আগের মতো সোয়ারি হয়ে বেড়াতে আসে না। এখন আর যৌথ পরিবার নেই সব ভেঙে ছারখার হয়ে গেছে। সব একান্নবর্তী পরিবার। যার ফলে সমাজে অনেক অনিয়ম চালু হয়েছে। খেলাধুলার ক্ষেত্রেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। সেকালের খেলাধুলা ছিল সব মজার মজার দেশি খেলা। হা-ডু-ডু, কানামাছি, বৌ-ছি, গোল্লাছুট, লবণ দাঁড়ি, ডাংগুলি, মার্বেল। আশ্বিন মাস এলেই নদীর ধারে মেলা বসত, নৌকা বাইচ হতো, এখন সেভাবে আর মেলাও হয় না, নৌকা বাইচও হয় না। মেলাতে কত রকম মাটির হাঁড়ি-পাতিল পাওয়া যেত। এখন আর সে খেলাগুলো নেই। পাড়ার ছেলে-মেয়েরা দল বেঁধে এখন আর কানামাছি, বৌ-ছি খেলে না। ছেলেরা ছেলেরা দোস্ত পাতাই না, মেয়েরা মেয়েরা সই পাতাই না। এখন আর বিকাল হলে সব কাজ সেরে কেউ প্রতিবেশীর বাড়িতে বেড়াতে যায় না। আহ! কত দোস্ত, কত সই ছিল। এখন নেই। এখন আর কোনো মায়ের মুখে বা বোনের মুখে শুনি না, আমার সই কেমন আছে! সইরে কত কাল দেখি না। কোনো বাবা ছেলেকে হাত ধরে বলে না,চল আমার দোস্ত বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। আগে বিনোদন বলতে শুধু যাত্রা বা গ্রামে গ্রামে গানের আসর বসত। মারফতি, বাউল, মুর্শিদী, ভাটিয়ালী, পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া কত রকম গান হতো। সারা দিন কাজ করে রাতে সবাই যেকোনো একটি বাড়িতে একত্রিত হয়ে আসরে যোগ দিত। সবাই সবার বাড়িতে যেত কোথাও কোনো বাধা ছিল না। সবাই ছিল ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ, অতি আপন জন। এখন আর সে ভালোবাসা নেই। এখন কেউ কারো বাড়িতে যায় না, বাড়িগুলোর মধ্যে অনেক ভাগ। এখন আর গানের আসর বসে না। আবার একশ্রেণীর লোক ছিল জীবন বাঁচানোর জন্য গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে গাজী কালুর পট কইত।বাড়ির নারী-পুরুষ সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনত।আবার আরেক শ্রেনির লোক বাড়িতে বাড়িতে বায়োস্কোপ দেখাইত।তাও বাড়ির লোকজন মনোযোগ দিয়ে দেখত ও শুনত।গাজী কালুর পটে গায়ক আগাম ভবিষ্যতের কর্মকান্ডের কিছু ইঙ্গিত দিয়ে থাকতেন।যা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় কিছুটা দেখা যায়। চৈত্র মাসে আমাদের এলাকায় নতুন কিছু ফসল উঠত, যেমন পিঁয়াজ, কলাই, ছোলা, ধানসহ আরো অনেক ফসল। এই সময় এলাকায় হালখাতার ধুম পড়ে যেত। এখন আর শুভ হালখাতা সে ভাবে চোখে পড়ে না। গ্রামের গৃহস্থ্য বাড়িতে গরু দিয়ে ধান মাড়াই করার দৃশ্য ছিল অপূর্ব। এখনকার সংস্কৃতি বলতে তেমন কিছু নেই। যা আছে মিশ্র সংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতি। বাঙালিয়ানা বলতে যা বোঝায় সেটা আর কেউ বহন করে না। আমাদের বসবাস সংস্কৃতির ভাঙা সেতুর সঙ্গে। নেই কোনো ভালোবাসা, নেই কোনো মানুষে মানুষে মমত্ববোধ। এ সমাজ কেমন যেন অস্থির হয়ে আছে। সবাই ব্যস্ত যে যার মতো। সময় অতি দ্রুত চলে যায়। জীবনের স্বাদ অপূর্ণ রয়ে যায়। হিংসা প্রতিহিংসায় চলছে দিনাতিপাত। আমার আবহমান কালের সংস্কৃতি এখন কেউ ধারণ করে না, বহন করে না যুগ যুগ ধরে চলে আসা কত রীতি। বাঙালি জাতি হিসাবে আমাদের পুরাতন সংস্কৃতিগুলোকে ধরে রাখার কোন ব্যবস্থা হবে করতে পারব কিনা জানি না? লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট তারিখ:৫.১০.১৭.

সর্বশেষ সংবাদ