হায়! অসাধারণ! কী চমৎকার দেখা গেল …কামরুল হাসান বাদল, লেখক,কবি, সাংবাদিক কলামিস্ট

পোস্ট করা হয়েছে 27/09/2017-10:37am:    অভূতপূর্ব ও অসাধারণ এক ঘটনা ঘটল গত রোববার রাজধানীর রমনা পার্কের উল্টোদিকে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন সুগন্ধার সামনে। উল্টো পথে চলা গাড়িগুলো একের পর এক আটকাচ্ছে পুলিশ। সব গাড়িগুলোই দামি, যার অধিকাংশই সরকারি। নিয়ম ভেঙে এত গাড়ি আসছিল যে, মামলা দিতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছিল।
কী ঘটেছিল সেদিন? বছরের অন্যান্য দিনের মতোই ছিল রাজধানী সেদিন। ছিল চিরাচরিত ট্রাফিক জ্যাম। ছিল গাড়ির দীর্ঘ সারি। আর ছিল প্রতিদিনকার মতো নিয়ম ভেঙে উল্টো পথে গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতা। এই দৃশ্যই দেখতে অভ্যস্ত ঢাকাবাসী। সাধারণ মানুষ দেখে বাস, মিনিবাস, টেম্পো, ট্যাক্সিতে বসে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাফিক জ্যামে আটকে আছেন। অনেক সময় পুলিশের গাফেলতি কিংবা অসহায়ত্বও দেখেন। দেখেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাফিক জ্যামে তাদের আটকে থাকতে হলেও কিছু কিছু গাড়ি নির্দ্বিধায় ও নির্ভয়ে আইন ভঙ্গ করে উল্টো পথে দিব্যি চলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ জানে ওসব দামি গাড়ির ভেতরে কারা বসে আছেন। তারা জানে ওই দামি গাড়ির আরোহীদের থামানোর মুরোদ নেই পুলিশের। আইন ওদের জন্য নয়, আইন সাধারণের জন্যে, ওরা সব অসাধারণ!
কিন্তু গত রোববার ওই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছে। পুলিশ খব সাহসী হয়ে উঠেছে। তারা ধরে ধরে জরিমানা করে দিচ্ছেন। এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখার জন্য সেখানে লোকের ভিড় জমে যাচ্ছে। এই দৃশ্য সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরার জন্য সাংবাদিকরা ভিড় করছেন। দামি গাড়িতে বসা ‘অসাধারণ’ মানুষগুলো মুখ লুকাতে চাইছেন। ওদের অনেকে পুলিশকে বারবার তাগাদা দিচ্ছেন দ্রুত মামলার কাজ সেরে নিতে। এই বিব্রতকর অবস্থা থেকে তারা নিষ্কৃতি চান। সম্ভবত তারা পুলিশের ওই আকস্মিক পরিবর্তনে বিস্মিতও হয়েছেন। সেদিন উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে সমাজের ‘অসাধারণ’ ব্যক্তিদের মধ্যে যারা শাস্তি পেয়েছেন তাদের মধ্যে ছিলেন, প্রতিমন্ত্রী, সাংসদ, সচিব, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ, পুলিশ, সেনা কর্মকর্তা, সাংবাদিক, বিচারক ও ব্যবসায়ী। এই কাজতো তারা প্রতিদিনই করেন।
পুলিশ গত রোববার তাদের বাধা দিতে সাহস করল কী করে? এর খবর পুলিশই জানিয়েছে। সেদিন বিকেল চারটার দিকে সুগন্ধার সামনে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের উপস্থিতিতে পুলিশ এ অভিযান শুরু করে। এ সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
অভিযানের সময় বাস ও অন্যান্য যানবাহন থেকে সাধারণ মানুষ চেঁচিয়ে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের অনুরোধ জানাচ্ছিলেন। অভিযান চলাকালে এক পুলিশ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকর্মীদের বলছিলেন, একটা মামলা বা দেড় দুই হাজার টাকা জরিমানা তো ওনাদের কোনো বিষয় না। আপনারা জাতির সামনে ওনাদের সুন্দর মুখটা তুলে ধরেন। তাতেই কাজ দেবে। সে সময় একেকটা গাড়ি ধরার পর পুলিশ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ ডাকছিলেন ক্যামেরা এদিকে আসেন, আরেকটা আসছে।
পুলিশ কর্মকর্তার কথামতো জাতির সামনে তুলে ধরার পরও কি কাজ হয়েছে? এই ‘অসাধারণ’ ব্যক্তিদের মধ্যে সবাই কি লজ্জিত বা অনুতপ্ত হয়েছেন? যদি হতেন পরের দিন একই কাজ করলেন কী করে একজন সচিব? পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় সচিবের গাড়িটি গত সোমবার উল্টো পথে বাড়ি ফিরছিলো। এ সময় গাড়িতে বসা ছিলেন সচিব নিজে। সোমবার বাংলামোটরে আবারও অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখানে আবারও আটক করা হয় সমবায় সচিবের গাড়ি। আগের দিন জরিমানা করা ৪০টি গাড়ির মধ্যে এই গাড়িটিও ছিল।
কে বলেছিলেন তা মনে নেই। তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা। তিনি বলেছিলেন, নতুন কোনো দেশে গিয়ে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন তার প্রমাণ খুব সহজে পাবেন যদি আপনি বিমানবন্দর থেকে আপনার গন্তব্যে যেতে যেতে সে দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা খেয়াল করেন। বাংলাদেশের মানুষ আইনের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল তা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দেখেই বোঝা যায়। তবে সমস্যা হলো বাংলাদেশের পরিস্থিতি সাধারণভাবে আঁচ করার চেয়েও ভয়ানক খারাপ। গত রোববার আইন ভঙ্গ করে যারা শাস্তি পেয়েছেন তারা কেউ কেউ আইন প্রণয়ন করেন। কেউ কেউ সে আইন প্রয়োগ করে আইনভঙ্গকারীকে গ্রেফতার করেন এবং কেউ কেউ তাদের বিচার করেন। অর্থাৎ একটি সমাজের মূল মানুষ তারাই যারা এই রাষ্ট্রটি পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এখন তারাই যদি আইন ভঙ্গ করেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের ইচ্ছামতো চলাফেরা করেন তাহলে সাধারণ মানুষ কী করবে? যারাই আইন শেখাবেন, যারাই আইন মেনে চলে অন্যকে আইন মানতে উদ্বুদ্ধ করবেন তারাই যখন আইনভঙ্গ করেন তখন কী হবে এই রাষ্ট্রের? এরজন্য কি এই ‘বড়’ লোকদের কোনো শাস্তি হবে? গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকে এই বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অভিমত ছাপা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের মতে, সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে কেউ অপরাধ করেননি। অপরাধ করেছেন গাড়ির চালকেরা। আর অপরাধ করেছেন গাড়ির মালিক। গাড়ির মালিক হচ্ছে সরকার, সরকারি চাকরিজীবীরা নন। তাই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
অথচ সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৮৫ অনুযায়ী, স্বাভাবিক শৃঙ্খলা বা চাকরির শৃঙ্খলার পরিপন্থি বা আচরণবিধির যেকোনো শর্ত লঙ্ঘন অথবা কোনো কর্মকর্তা বা ভদ্রলোকের জন্য শোভনীয় নয় এমন কোনো আচরণ অসদাচরণ বলে বিবেচিত হবে। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোজাম্মেল হক বলেছেন, আমাদের দেশে তো মামলাই হয় না। তবু তো যারা আইন লঙ্ঘন করেছেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কিছু করার নেই।‘ বেশ ভালো কথা। মামলাই তো যথেষ্ট। এটুকুই বা হয়েছিল কখন?
ঘটনাটি অভূতপূর্ব অসাধারণ বলে উল্লেখ করেছিলাম শুরুতে। কারণ এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। মাঠ পর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সার্জেন্টরা সাধারণত মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, টেম্পো, ট্রাক, বাস, মিনিবাস ইত্যাদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। দামি গাড়ি আর তা যদি হয় কোনো ‘অসাধারণ’ মানুষের সেখানে পুলিশ অন্ধ ও বধিরের ভূমিকা পালন করে থাকে। সেদিন দুদক চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে তারা কিছু সাহসী হয়ে উঠেছিলেন। এই কাজটি দুদক চেয়ারম্যানের ওপর অর্পিত কাজের অংশ নয়। ফলে তিনি হয়ত আর কখনোই এভাবে সড়কে দাঁড়াবেন না। এবং আবার কখনো হয়ত এই ‘অসাধারণ’ ব্যক্তিদের আইন ভঙ্গ করার বিরুদ্ধে পুলিশ শক্ত অবস্থান নেবে না।
মনে করুন স্বাভাবিক সময়ে একজন পুলিশ সার্জেন্ট একজন সচিবের গাড়িকে জরিমানা করলেন। এরপর সে সার্জেন্টের ভাগ্যে কী ঘটতো? দোষী সাব্যস্ত হওয়া সচিব তাঁর একই পদমর্যাদার স্বরাষ্ট্র সচিবকে ফোন করতেন। আর স্বরাষ্ট্রসচিব একজন সামান্য সার্জেন্টের ঔদ্বত্বে ক্রোধান্বিত হয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ফোন করে বলতেন, সেই সার্জেন্টকে লংগদুতে বদলি করে দিতে। হয়ত এমনও বলা হলো আগামী ১২ ঘণ্টার মধ্যে তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে।
কাজেই প্রশ্ন হলো, আইন কি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হচ্ছে দেশে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি নিরপেক্ষ ও নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারছে? কিংবা করছে? যে অনিয়মের জন্য একজন পাবলিককে শাস্তিভোগ করতে হবে সে একই অনিয়মের কারণে পাবলিক সার্ভেন্টের শাস্তি হবে না কেন? সমাজের কিংবা রাষ্ট্রের যে বা যারা সাধারণ মানুষের কাছে অনুকরণীয় তিনি বা তাঁরা যখন নিয়মভঙ্গ করেন এবং তার জন্য কোনোপ্রকার অনুতাপ বোধ না করেন তাহলে সাধারণ মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে কী করে? জাতির জনক তো দেশটিকে গণমানুষের রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল প্রকৃতপক্ষে জনযুদ্ধ। সে জনযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রাষ্ট্রটিকে জনমানুষের করে গড়ে তুলতে হবে। গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যে বাধাগুলো আছে তা জনতার মিলিত প্রতিরোধে দূর করতে হবে। জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার মধ্যে সকল কিছুকে আনতে না পারলে সমাজ বা রাষ্ট্রে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা পাবে না।
লেখক,কবি, সাংবাদিক কলামিস্ট-কামরুল হাসান বাদল,

সর্বশেষ সংবাদ
এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ করোনায় পোশাক কারখানায় ৫৫ শতাংশ কাজ কমে গেছে: রুবানা হক