ডিজিটাল পাঠদানে শিক্ষকদের আগ্রহ কম - মোঃ ওসমান গনি,সাংবাদিক, কলামিস্ট

পোস্ট করা হয়েছে 14/09/2017-07:33am:    ডিজিটাল পাঠদানে কম আগ্রহ শিক্ষকদের পরিদর্শন প্রতিবেদনে ৮ সমস্যা চিহ্নিত পাঠানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে * অবহেলা, অদক্ষতা ও কনটেন্ট তৈরিতে অনাগ্রহ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে সৃজনশীল লেখাপড়া করানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু শিক্ষকদের আগ্রহের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে ডিজিটাল পদ্ধতির এ পাঠদান কার্যক্রম। অবহেলা, অদক্ষতা ও কনটেন্ট তৈরিতে আগ্রহের ঘাটতিসহ ৮ কারণে সরকারের উদ্যোগ সফল হচ্ছে না। জানা গেছে, সারা দেশে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে পাঠদান কার্যক্রম মনিটরিং করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। সংস্থাটি রোববার এ পদ্ধতিতে পাঠদানের ওপর একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়েছে। তাতে উল্লিখিত সমস্যাগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মাউশি পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. শামসুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, ‘ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদানের এ ধারণা আমাদের দেশে নতুন। শিক্ষকদের অনেকেই নানা কারণে এর সঙ্গে এখন পর্যন্ত খাপ খাওয়াতে পারেনি। তবে আমরা মনিটরিং চালিয়ে যাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘কিছু সমস্যা আছে। আমরা তা চিহ্নিত করেছি। এর মধ্যে দ্রুত সমাধানযোগ্য সমস্যা অল্পকিছু দিনের সমাধান করা হবে। অবকাঠামোগত সমস্যা ২০১৮ সালের মধ্যে সমাধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো ৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে চিহ্নিত সমস্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- কনটেন্ট তৈরিতে শিক্ষকদের অনাগ্রহ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে শিক্ষকদের পাঠদানে আগ্রহের ঘাটতি, আইসিটি সামগ্রী পরিচালনায় অদক্ষতা। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বলেছে, ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের সংখ্যা অপ্রতুল। আইসিটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। উপজেলা পর্যায়ে ইন্টারনেট সমস্যা, বিশেষ করে ধীরগতি, লোডশেডিং, ভৌত অবকাঠামোগত ও ক্লাসরুম সংকটের কথাও বলেছে কিছু প্রতিষ্ঠান। আবার অনেকে বলেছে, কনটেন্ট তৈরি ও মাল্টিমিডিয়ার ওপর দেয়া প্রশিক্ষণের মেয়াদ পর্যাপ্ত ছিল না। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে পাঠদানে শিক্ষকদের কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেন্দ্রিক বাস্তবায়িত অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্প ভূমিকা রেখেছে। এক্ষেত্রে প্রকল্প থেকে বিভিন্ন কার্যক্রমে বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করা হয়। এছাড়া মাউশির অধীন বাস্তবায়িত বিভিন্ন প্রকল্প থেকে মাল্টিমিডিয়া সামগ্রী, ল্যাপটপ, ইত্যাদি দেয়া হয়েছে। প্রায় তিনশ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৬ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ক্লাসরুম নির্মাণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা প্রচলন’ শীর্ষক একটি প্রকল্পও আছে। বর্তমানে ওই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় চলছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম কার্যক্রম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) ও এটুআই প্রকল্পের পরিচালক কবির বিন আনোয়ার রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদানের বিষয়টিতে হয়তো আশানুরূপ ফল আমরা পাচ্ছি না। এক্ষেত্রে ইন্টারনেটের ধীরগতি, লোডশেডিং বা সোলার প্যানেল নষ্টসহ কিছু বাস্তব সমস্যা আছে। অনেক কিছুই রাতারাতি উন্নয়ন সম্ভব নয়। তবে আমরা সুফল পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। প্রতি বছর কনটেন্ট তৈরিতে দক্ষ শিক্ষক তৈরি করছি। কনটেন্ট তৈরিতে সেরা ৫০০ শিক্ষক নিয়ে আমরা কক্সবাজারে কর্মশালা করেছি। কনটেন্ট তৈরি করেন এমন শিক্ষক আছেন ২ লাখ। তারা টিচার্স পোর্টালে তাদের কনটেন্ট দেন। সেখান থেকে সাধারণ শিক্ষকরা বিষয়ভিত্তিক সহায়তা নিতে পারছেন। সুতরাং এক্ষেত্রে দ্বার উম্মুক্ত, সমস্যা থাকার কথা নয়। তারপরও আমরা চিহ্নিত সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নিচ্ছি। পাশাপাশি মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।’ মাউশির একজন কর্মকর্তা জানান, মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হলে অনেক নতুন বিষয় এবং জ্ঞান শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের আত্মস্থ হয়। এতে সৃজনশীলতা বাড়ে। এ কারণে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে ক্লাসরুম সক্রিয় হচ্ছে কিনা বা পাঠদান হচ্ছে কিনা- তা মনিটরিং করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে অনলাইনে ড্যাসবোর্ডের মাধ্যমে তথ্যগ্রহণ করা হয়। প্রতিদিন কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কতটি ডিজিটাল পদ্ধতির পাঠদান করে তার তথ্য প্রতিষ্ঠান প্রধানকেই (ড্যাসবোর্ডে) আপলোড করতে হয়। সেই তথ্য থানা, জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ের পর শিক্ষা অফিস পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দাখিল করে। কিন্তু এ প্রক্রিয়ার মধ্যে জোড়াতালি আর ফাঁকিবাজির দিক প্রবল। আছে নানা গলদও। তাই মাল্টিমিডিয়ায় পাঠদান পদ্ধতি যতটা কার্যকর হওয়ার কথা ততটা হয়নি। কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অলস পড়ে আছে সরবরাহ করা ল্যাপটপ, প্রজেক্টর, ইন্টারনেট মডেম। আবার কোথাও ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হয়ে গেছে এসব মূল্যবান উপকরণ। তথ্যপ্রযুক্তি সামগ্রী ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার বা প্রধান শিক্ষকের কক্ষে-বাড়িতে নিয়ে যাওয়া বা বস্তাবন্দি করে রাখার মতো ঘটনাও আছে। অনেকে ক্লাস না নিয়েও ড্যাসবোর্ডে ক্লাস নেয়ার মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন। পরিদর্শনে গিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তারা উল্লিখিত বেশ কয়েকটি ঘটনা পেয়েছেন বলে নাম প্রকাশ না করে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। মাল্টিমিডিয়ায় ক্লাস নেয়া বা কনটেন্ট তৈরি না করার ব্যাপারে ঢাকার বুয়েট গার্লস স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ আশুতোষ চন্দ্র সরকার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানে ৫জন শিক্ষক ডিজিটাল পাঠদান ও কনটেন্ট তৈরির প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। বাকিরা শিখে নিয়েছেন। বুয়েটের প্রতিষ্ঠান হওয়ায় আমরা হয়তো ফাঁকি দিতে পারি না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ৪০ মিনিটের একটি ক্লাসের জন্য কনটেন্ট তৈরিতে ২-৩ ঘণ্টা লেগে যায়। এটা যেমনি শ্রমসাধ্য, তেমনি অধ্যয়নেরও বটে। এ কারণে শিক্ষকদের অনেকেই এদিকে মনোযোগ দেয়ার চেয়ে কোচিং-টিউশনিতে বেশি আগ্রহী। তাই কেউ হয়তো কনটেন্ট না বানিয়েই পাঠদান করেন। আবার কেউ পোর্টাল থেকে কনটেন্ট কাস্ট-পেস্ট (শিক্ষক পোর্টাল থেকে হুবহু নেয়া) করে চালিয়ে দেন। গ্রামাঞ্চলের অনেক শিক্ষক বলে থাকেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কম বেতন হওয়ায় তারা কোচিং-টিউশনির প্রতি বেশি আগ্রহী হন।’ ব্যানবেইসের (বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ৭৬ শতাংশ বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর আছে। এ ধরনের প্রায় ৮৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সুবিধাও আছে।

সর্বশেষ সংবাদ