রাজ্জাক আমাদের সুবর্ণকালের নায়ক-কামরুল হাসান বাদল, লেখক,কবি, সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 22/08/2017-09:44am:    যে সময় উপমহাদেশের অনেকে চলচ্চিত্রে ক্যারিয়ার গঠনের লক্ষ্যে ভারতের মুম্বাইয়ে পাড়ি জমাচ্ছিলেন সে সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে এক যুবক তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাড়ি জমালেন চলচ্চিত্রে নিজের আসন করে নেবেন বলে। পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রপাড়া টালিগঞ্জে জন্ম নেওয়া যুবকটি যখন পূর্ব পাকিস্তানে এলেন সে সময় ঢাকায় চলচ্চিত্র শিল্প ভালোমতো বিকাশ লাভও করেনি। স্বপ্নবান সে যুবক, সংগ্রামী সে যুবক নিজ মেধা, শ্রম, অধ্যাবসায় ও অভিনয়গুণে এদেশের চলচ্চিত্রে প্রধান পুরুষ হয়ে উঠেছিলেন, হয়ে উঠেছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক। তাঁর জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার টালিগঞ্জে ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি। ১৯৬৪ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশে আসেন। তাঁর রক্তে ছিল অভিনয়ের বীজ।
কলকাতার খানপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন সরস্বতী পূজা উপলক্ষে মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের জন্য নির্বাচিত হন তিনি। সেটি তাঁর প্রথম অভিনয়। ঢাকায় এসে প্রথমদিকে রাজ্জাক পাকিস্তান টেলিভিশনে ঘরোয়া নামের একটি ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেন। সে সময় টেলিভিশনের এত জনপ্রিয়তা ছিল না। খুব কম মানুষের ঘরে ছিল টেলিভিশন সেট। বৃহত্তর পরিসরে অভিনয় ও কাজের ইচ্ছায় অনেক চেষ্টা তদবির করে পরিচালক জব্বার খানের সহকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। এর পাশাপাশি কয়েকটি ছবিতে ছোটখাটো কিছু চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি জহির রায়হানের বেহুলা ছবিতে প্রথমবারের মতো নায়কের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ লাভ করেন। এরপর আর হোঁচট খেতে হয়নি তাঁকে। এক নাগাড়ে অভিনয় করে গেছেন ৫০ বছরেরও অধিক সময়ে ৩০০ বাংলা ও উর্দু ছবিতে। পরিচালনা করেছেন ১৬টি চলচ্চিত্র। শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন মোট পাঁচবার। এ ছাড়া ইন্দো-বাংলা কলা মিউজিক পুরস্কার আজীবন সম্মাননা, বাচসাস পুরস্কার, আজীবন সম্মাননা, ইফাদ ফিল্ম ক্লাব আজীবন সম্মাননা, ব্যাবিসাস আজীবন সম্মাননাসহ ২০১৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আজীবন সম্মাননা ও ২০১৪ সালে মেরিল প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা লাভ করেন। গত এক দশকের মতো তিনি টালিগঞ্জের অনেক ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন। তিনি জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে কাজ করেছেন।
গত শতাব্দির ষাট দশকের শেষদিক থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে দোর্দণ্ডপ্রতাপে অভিনয় করেছেন তিনি। বিশেষ করে ষাট দশবের শেষ থেকে ৮০ দশক পর্যন্ত এ দেশের সিনেমাপাগল দর্শকের কাছে প্রচণ্ড জনপ্রিয় নায়ক ছিলেন রাজ্জাক। তাঁর মতো চুলের স্টাইল, তাঁর কাপড়চোপড়, তাঁর অভিনয় রীতিকে অনুসরণ করতেন অনেক অভিনেতাও। তরুণদের চোখে তিনি ছিলেন রোমান্টিক হিরোর মডেল। অনেকে রাজ্জাকের মতো কথা বলতেও চেষ্টা করতো। তাঁর বন্ধু এবং চলচ্চিত্র পত্রিকা চিত্রালীর সম্পাদক আহমেদ জামান চৌধুরী নায়করাজ হিসেবে প্রথম তাঁকে অভিষিক্ত করেছিলেন। ৭০ দশকে তিনি আমাদেরও মোহবিষ্ট করে রেখেছিলেন। রাজ্জাকের ছবি মানেই তখন দারুণ হুলুস্থুল।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সমাজ মানসে একটি ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের আগে নায়কের চরিত্র ছিল শান্ত, ভদ্র ক্লাসের ফার্স্ট বয় ধরনের। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে জহিরুল হক পরিচালিত রংবাজ ছবিটি মুক্তি পায়। সে ছবির নায়ক এতদিনের নায়কের ভাবমূর্তি ভেঙে ড্যাশিং ইমেজ নিয়ে বেরিয়ে এলেন আর রাতারাতি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে নতুন ধারা, নতুন ইতিহাস যোগ করলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অন্যসব কিছুকে ফেলে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প দাঁড়িয়ে গেল।
তাঁর পরে অনেকেই এসেছেন চলচ্চিত্রে কিন্তু রাজ্জাকের পরিপূরক কেউ হয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর বিখ্যাত ও জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের মধ্যে নীল আকাশের নীচে, জীবন থেকে নেয়া, অশ্রু দিয়ে লেখা, ওরা ১১জন, অবুঝ মন, আলোর মিছিল, গুণ্ডা, অনন্ত প্রেম, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা, বড় ভালো লোক ছিল, রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
সুপারহিট ছবি অনন্ত প্রেম তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি। তাঁর সর্বশেষ ছবি কার্তুজ (২০১৪)। তাঁর স্ত্রীর নাম খাইরুন্নেছা, যাঁকে তিনি ভালোবেসে লক্ষ্মী বলে ডাকতেন। রাজলক্ষ্মী প্রডাকশন নামে তাঁর প্রযোজনা সংস্থাও ছিল। তাঁর সন্তান রেজাউল করিম (বাপ্পারাজ), নাসরিন পাশা শম্পা, রওশন হোসেন বাপ্পি, আরফিন আলম ময়না ও খালিদ হোসাইন (সম্রাট)।
গতকাল সোমবার ৬টা ১৩ মিনিটে দেশের চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তী নায়করাজ ইন্তেকাল করেন। (ইন্না….রাজেউন) এর আগে তাঁকে হার্ট অ্যাটাক অবস্থায় রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত নায়করাজ দেশের চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে ভেবেছেন। শিল্পীর বা এই শিল্প সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যায় ছুটে এসেছেন।
প্রয়াত শিল্পী বশির আহমেদ একবার একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন একটি ঘটনার কথা। নায়ক রাজ্জাকের অনেক গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন বশির আহমেদ। একদিন তিনি বাসায় হারমোনিয়াম বাজিয়ে তাঁরই একটি গান গাইছিলেন ছবিতে যার লিপ্সিং করেছিলেন রাজ্জাক। গান শুনে তাঁর বাসার গৃহকর্মী কিশোরটি নাকি বলেছিল, ‘স্যার আইজক্যা রাজ্জাকের গান গাইতাছে’। আমাদের এবং আমাদের আগের ও পরের প্রজন্মের অনেককে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন তিনি। আমরা এখনও যখন কৈশোর-তরুণ বা যৌবনকালের স্মৃতিচারণ করি সেখানে কোনো না কোনোভাবে স্পষ্টে কিংবা প্রচ্ছন্নে রাজ্জাকের উপস্থিতি টের পাই।
রাজ্জাক এভাবেই বেঁচে থাকবেন বাংলার মানুষের মনে, তাঁর ভক্ত ও অনুরক্তদের মনে। কারণ রাজ্জাক আমাদের সুবর্ণকালের নায়ক।

সর্বশেষ সংবাদ