ইতিহাসের কালো অধ্যায় ১৯৭৫-রাজন ভট্টাচার্য

পোস্ট করা হয়েছে 15/08/2017-05:55am:    ইতিহাসের কালো অধ্যায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। সেদিন ঘাতকরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যা করে। রক্তের হোলি খেলায় মেতে উঠেছিল তারা। পরিকল্পিতভাবে ঠা-া মাথায় চালানো হয় ইতিহাসের নির্মম ও বর্বরোচিত এ হত্যাযজ্ঞ। ভয়াবহ সে দিনটির কথা উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দীতে। মর্মন্তুদ জবানবন্দী থেকে পাওয়া যায় সেদিনের ভয়াবহতার চিত্র। জানা যায় ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন ৩২ নম্বরের বাড়িটির ভেতরে-বাইরে। শুধু তাই নয়, নৃশংসভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খুনীরা উল্লাস প্রকাশ করেছিল। রাজনৈতিক সহযোগিতায় তারা বিভিন্ন দেশে নিরাপদে পালিয়ে যায়। এখানেই ক্ষান্ত থাকেনি তারা, বিদেশের মাটিতে বসে বিভিন্ন টেলিভিশন সাক্ষাতকারে হত্যাকা-ের বিশদ তুলে ধরে সাক্ষাতকার দেয়। ‘আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি’ ॥ মামলার ১নং সাক্ষী ও বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহকারী মুহিতুল ইসলাম (মরহুম) আদালতকে বলেছিলেন, ১৯৭২ সালের ১৩ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে সহকারী হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। ছিলেন...। ১৯৭৪ সালের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রেসিডেন্ট পিএ কাম রিসিপশনিস্ট...। ...রাত একটার সময় টেলিফোনমিস্ত্রী আবদুল মতিন তাকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে উঠিয়ে বলেন ‘রাষ্ট্রপতি আপনাকে টেলিফোনে ডাকছেন।’ তখন ভোর সাড়ে ৪টা-৫টা হবে। চারদিক ফর্সা হয়ে গেছে। বাড়ির চারদিকে বৈদ্যুতিক আলোও জ্বলছিল। তাড়াতাড়ি গিয়ে টেলিফোন ধরলে রাষ্ট্রপতি দোতলা থেকে বললেন ‘সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করেছে’ জলদি পুলিশ কন্ট্রোলরুমে টেলিফোন লাগা। নির্দেশমতো টেলিফোন লাগিয়েও লাইন পাওয়া যাচ্ছিল না। ঠিক তখন রাষ্ট্রপতি দোতলা থেকে এসে বললেন ‘পুলিশ কন্ট্রোলরুমে লাগাতে বললাম লাগালি না? জবাবে বললেন ‘চেষ্টা করছি লাইন পাচ্ছি না।’ এ সময় গণভবন এক্সচেঞ্জের লাইন পাওয়া গেলেও কেউ উত্তর দেয় না। রাষ্ট্রপতি তার হাত থেকে টেলিফোন নিয়ে বললেন ‘আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি।’ ঠিক ওই সময় একঝাঁক গুলি দক্ষিণ দিকের জানালার কাঁচ ভেঙ্গে অফিসঘরের দেয়ালে লাগে। অন্য ফোনে চীফ সিকিউরিটি অফিসার মহিউদ্দিনের ফোন ধরলে জানালা দিয়ে অনর্গল গুলি আসে এবং ভাঙ্গা কাঁচে তার ডান হাতের কনুই কেটে রক্ত ঝরতে থাকে। কিছুক্ষণ পর গুলি বন্ধ হলে কাজের ছেলে আবদুল ওরফে সেলিম উপর থেকে পাঞ্জাবি-চশমা এনে দিলে বঙ্গবন্ধু ওই পাঞ্জাবি-চশমা পরে বারান্দায় এসে ‘আর্মি সেন্ট্রি, পুলিশ সেন্ট্রি, এত গুলি হচ্ছে তোমরা কী কর’ এই বলে উপরে চলে যান। তারপর শেখ কামাল উপর থেকে এসে বলেন ‘আর্মি ও পুলিশ ভাই, আপনারা আমার সাথে আসেন’- তখন ৩-৪ জন কালো ও খাকি পোশাকধারী সশস্ত্র আর্মি এসে খাকি পোশাকধারী মেজর হুদা শেখ কামালের পায়ে গুলি করে। শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল বলে পরিচয় দিলে সঙ্গে সঙ্গে শেখ কামালকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। ওই ফায়ারের গুলি তার হাঁটুতে ও ডিএসপি নূরুল ইসলামের পায়ে লাগে। তারা দুজন ও আরেকজন অফিসার পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলে মেজর হুদা তাদের চুল ধরে টেনে তোলে এবং গেটের সামনে লাইনে দাঁড় করায়। ওই লাইনে পুলিশের লোক ও টেলিফোনমিস্ত্রী আবদুল মতিনও ছিল। হঠাৎ একজন অস্ত্রধারী আর্মি এসে স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশ অফিসারকে গুলি করে। গুলিতে তিনি মারা যান। তারপর কয়েকজন আর্মিকে তাদের পাহারায় রেখে বাকিরা ফায়ার করতে করতে দোতলার দিকে উঠে যায়। কিছুক্ষণ পর বঙ্গবন্ধুর উচ্চ কণ্ঠস্বর, তারপর গুলির শব্দ এবং দোতলায় মহিলাদের আহাজারি ও আর্তচিৎকার শুনতে থাকে। পেছনের রান্নাঘর থেকে কাজের বুয়া, গোয়ালঘর থেকে রাখাল আজিজ, উপর থেকে শেখ নাসেরকে এনে লাইনে দাঁড় করায়। শেখ নাসেরের হাতে তখন গুলির রক্তাক্ত জখম ছিল। শেখ নাসের বললেন, ‘স্যার, আমি তো রাজনীতি করি না- কোন রকম ব্যবসা করে খাই। তখন পাহারারত একজন আর্মি বলল, শেখ মুজিব ইজ বেটার দ্যান শেখ নাসের।’ ...উপর থেকে কাজের ছেলে আবদুর রহমান ওরফে রমা ও শেখ রাসেলকে আর্মিরা নিয়ে আসে। শেখ রাসেল তাকে জাড়িয়ে ধরে বলে- ‘ভাইয়া আমাকে মারবে না তো।’ শিশু রাসেলকে মারবে না সে ধারণাতেই তিনি বললেন- না ভাইয়া তোমাকে মারবে না। তারপর একজন আর্মি তার কাছ থেকে রাসেলকে জোর করে ছাড়িয়ে নেয়। তখন রাসেল তার মায়ের কাছে যেতে চাইলে তাকে মায়ের কাছে নেবে বলে দোতলার দিকে নিয়ে যায়। এরপর তিনি গুলির শব্দ শোনেন। আমাকে এখানেই মেরে ফেল প্রসিকিউশনের ২নং সাক্ষী রহমান (রমা) বলেন, ১৯৬৯ সালে কাজের লোক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসেন। ঘটনার রাতে তিনি ও সেলিম (আবদুল) দোতলায় বঙ্গবন্ধুর বেডরুমের সামনে বারান্দায় ঘুমিয়েছিলেন। আনুমানিক ভোর ৫টার দিকে হঠাৎ বেগম মুজিব দরজা খুলে বাইরে এসে বলেন, দুষ্কতকারীরা সেরনিয়াবাতের বাসা আক্রমণ করেছে। বেগম মুজিবের কথা শুনে তিনি তাড়াতাড়ি লেকের পাড়ে গিয়ে দেখেন কিছু আর্মি গুলি করতে করতে তাদের বাড়ির দিকে আসছে। তখন আবার বাসায় এসে বঙ্গবন্ধুকে পিএ রিসিপশনিস্টের রুমে কথা বলতে দেখেন। দোতলায় এসে বেগম মুজিবকে ছোটোছুটি করতে দেখেন। তিনি উপরে গিয়ে আর্মিরা বাসা আক্রমণ করেছে বলে শেখ কামালকে ওঠান। কামাল তাড়াতাড়ি একটা প্যান্ট ও শার্ট পরে নিচের দিকে যান। তার স্ত্রী সুলতানা দোতলায় আসেন। দোতলায় গিয়ে একই ভাবে আর্মিরা বাসা আক্রমণ করেছে বলে শেখ জামালকে ওঠান। শেখ জামালও তাড়াতাড়ি প্যান্ট, শার্ট পরে তার মার রুমে যান। সঙ্গে তার স্ত্রীও যান। তখন খুব গোলাগুলি হচ্ছিল। এই পর্যায়ে শেখ কামালের আর্তচিৎকার শুনতে পান। তার আগে বঙ্গবন্ধু দোতলায় এসে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। প্রচ- গোলাগুলি এক সময় বন্ধ হলে বঙ্গবন্ধু দরজা খুলে বাইরে এলে আর্মিরা তার বেডরুমের সামনে চারপাশে তাকে ঘিরে ফেলে। আর্মিদের লক্ষ্য করে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোরা কী চাস, কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?’ তারা বঙ্গবন্ধুকে তখন সিঁড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। সিড়ির ২-৩ ধাপ নামার পর নিচের দিক থেকে আর্মিরা বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েন। ...বেগম মুজিব দরজা খুললে আর্মিরা রুমের ভেতরে ঢুকে শেখ নাসের, শেখ রাসেল, বেগম মুজিব এবং তাকে নিচের দিকে নিচ্ছিল। সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে বেগম মুজিব বলেন, ‘আমি নামব না আমাকে এখানেই মেরে ফেল। এ কথার পর আর্মিরা তাকে দোতলায় তার রুমের দিকে নিয়ে যায়। একটু পরই রুমে গুলির শব্দসহ মেয়েদের আর্তচিৎকার শুনতে পান। আর্মিরা শেখ নাসের, শেখ রাসেল ও তাকে নিচের তলায় এনে লাইনে দাঁড় করায়। সেখানে সাদা পোশাকের একজন পুলিশের লাশ দেখেন রমা। শেখ রাসেল মার কাছে যাবে বলে তখন কান্নাকাটি করছিল এবং মুহিতুল ইসলামকে ধরে বলছিল, ভাই আমাকে মারবে না তো? তখন একজন আর্মি তাকে বলল, ‘চলো তোমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাই।’ এই বলে তাকে দোতলায় নিয়ে যায়। একটু পরেই দোতলায় কয়েকটি গুলির শব্দ ও আর্তচিৎকার শুনতে পান রমা। যেভাবে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুকে মামলার চতুর্থ সাক্ষী আবদুল কুদ্দুছ শিকদার তার জবানবন্দীতে হত্যার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, আনুমানিক ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা ও মেজর নূর বঙ্গবন্ধুর বাড়ির বারান্দায় আসে। বারান্দায় শেখ কামালকে দাঁড়ানো দেখে ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা হাতের স্টেনগান দিয়ে শেখ কামালকে গুলি করে, গুলি লেগে রিসিপশন রুমে ছিটকে পড়ে যান শেখ কামাল। পুনরায় ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা হাতের স্টেনগান দিয়ে শেখ কামালকে গুলি করে। এরপর বজলুল হুদা, মেজর নূর বাড়ির পুলিশ-আনসার ও কাজের লোকদের গেটের কাছে এক লাইনে দাঁড় করায়। এবার মেজর মহিউদ্দিন তার ল্যান্সারের লোকজন নিয়ে গুলি করতে করতে বাড়ির দোতলার দিকে যায়। এ সময় আমাদেরও সঙ্গে যেতে হুকুম দেয়। আমি ওদের পিছে পিছে যাই। ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা ও মেজর নূর সিঁড়ির উপরে চৌকির দিকে যেতে থাকে। এ সময় মেজর মহিউদ্দিন ও তার ফোর্সকে বঙ্গবন্ধুকে নিচের দিকে নামিয়ে আনতে দেখি। আমি ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা ও মেজর নূরের পেছনে দাঁড়ানো ছিলাম। এ সময়ে মেজর নূর ইংরেজীতে কী যেন বলল। মেজর মহিউদ্দিন ও তার ফোর্স এক সাইডে সরে যায়। এ সময় বঙ্গবন্ধু বলেন, তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে? ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা ও মেজর নূর তাদের হাতের স্টেনগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। এরপর বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ির ওপর চিৎ হয়ে পড়ে যান এবং মৃত্যুবরণ করেন। বঙ্গবন্ধুর পরনে ছিল লুঙ্গি, গায়ে পাঞ্জাবি, এক হাতে সিগারেটের পাইপ। অন্য হাতে ম্যাচ ছিল। আবদুল কুদ্দুছ শিকদার তার জবানীতে বলেন, মেজর নূর, মেজর মহিউদ্দিন নিচে নেমে আসে। কিছুক্ষণ পর মেজর আজিজ পাশা তার ফোর্স নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় বঙ্গবন্ধুর বেডরুমের সামনে যায় এবং দরজা মেলার জন্য বলে, দরজা না মেলায় গুলি করে। তারপর বেগম মুজিব দরজা খুলে দেন। বেগম মুজিব লোকজন নামাবার জন্য কাকুতি মিনতি করেন। কয়েকজন ফোর্স বেগম মুজিবের হাত ধরে শেখ নাসের, শেখ রাসেল ও একজন চাকরকে রুম থেকে বের করে নিয়ে যায়। বেগম মুজিব সিঁড়ির কাছে এসে বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। বেগম মুজিবকে পুনরায় বঙ্গবন্ধুর বেডরুমে নিয়ে যায়। মেজর আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেউদ্দিন রুমের ভেতরে হাতের স্টেনগান দিয়ে সকলকে গুলি করে। বঙ্গবন্ধুর বেডরুমের ভেতরে বেগম মুজিব, শেখ জামাল, শেখ কামালের স্ত্রী ও শেখ জামালের স্ত্রীকে গুলি করে তারা নিচে নেমে আসে। আমিও পিছে পিছে যাই। আমি বাড়ির উত্তর পাশের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠি। বঙ্গবন্ধুর রেডরুমে যাই। এই সময়ে বেগম মুজিবের লাশ, শেখ কামাল ও শেখ জামালের স্ত্রীকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখি। শেখ রাসেলের মাথার মগজ ও চক্ষু বের হয়ে আছে। রুমের ভেতর ফোর্সরা আলমারির ড্রয়ার খুলছে, আলমারি তছনছ করছে, মূল্যবান জিনিসপত্র হ্যান্ডব্যাগে ঢোকাচ্ছে। সুবেদার মেজর আবদুল ওহাব জোয়ারদার বেডরুমের মধ্যে একটা আলমারি থেকে একটি ব্রিফকেস বের করে। কিছু স্বর্ণালঙ্কার ও বিদেশী মুদ্রা ব্রিফকেসের মধ্যে ভরে। রুমের সবাই মালামাল নিয়ে আসার সময় একটা ব্রিফকেস, একটা রেডিও, একটি টেলিভিশন নিয়ে আসে। এগুলো রাস্তার ধারে একটা জীপে নিয়ে ওঠায়। এ সময়ে মেজর বজলুল হুদাকে মেজর ফারুক কী যেন জিজ্ঞাসা করে। তখন বজলুল হুদা বলে, অল আর ফিনিশড। প্রসিকিউশনের ১৬নং সাক্ষী মেজর শহিদুল্লা আদালতকে জানান, ঘটনার সময় তিনি ১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের ‘বি’ স্কোয়াড্রনে ছিলেন। ১৫ আগস্ট সকালে তার ইউনিটের ডিউটি অফিসার শহরে তাদের স্কোয়াড্রনের সৈনিকরা কোথায় আছে খুঁজে বের করার জন্য তাকে নির্দেশ দেয়। তিনি ইউনিসেফের একটি ট্রাকে করে শহরে বের হয়ে পথে কয়েক জায়গায় আর্টিলারির সৈনিকদের কাছে জিজ্ঞাসা করে মিরপুর রোডে কলাবাগানের কাছে তাদের সৈনিকদের খোঁজ পায়। প্রসিকিউশনের ১৭নং সাক্ষী হাবিলদার গানার সামছুল ইসলাম আদালতকে বলেন, ...রাত প্রায় সাড়ে তিনটার সময় ৬টি ট্রাকের সঙ্গে ৬টি কামান ‘হুক’ করে মুভ করে। তিনি মেজর মহিউদ্দিনের কামানে ছিলেন। হাবিলদার আবুল বাসার, হাবিলদার কালাম ও হাবিলদার আবু তাহের অন্যান্য কামানে ছিল। কামান ও ট্রাকগুলি কলাবাগান সোজা ধানম-ি লেকের পাশে ভোর ৪টার সময় পৌঁছলে মেজর মহিউদ্দিনের নির্দেশে কামানগুলি বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ও রক্ষীবাহিনী হেডকোয়ার্টারের দিকে তাক করে বসানো হয়। কিছুক্ষণ পর বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিক থেকে হাল্কা হাতিয়ারের গুলির শব্দ শুনে মেজর মহিউদ্দিনের নির্দেশে ৪ রাউন্ড কামানের গুলি ছোড়েন। সকাল থেকে মেজর মহিউদ্দিনের হুকুমে কামান গুলি ক্লোজ করে ট্রাকের সঙ্গে ‘হুক’ করে শহরের বিভিন্ন সড়ক টহল দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যান। রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় ট্যাঙ্ক দাঁড়ানো অবস্থায় দেখেন। ব্যারাকে গিয়ে শোনেন বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের অন্যদের হত্যা করা হয়েছে। আরও শোনেন মেজর ডালিম, মেজর নূর, মেজর হুদা, মেজর শাহরিয়ার, মেজর আজিজ পাশা, ক্যাপ্টেন জোবায়ের সিদ্দিকী, ক্যাপ্টেন মোস্তফাসহ অন্যান্য অফিসার বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার ঘটনায় জড়িত ছিল। বেপরোয়া ডালিম প্রসিকিউশনের ১৯নং সাক্ষী দফাদার সহিদুর রহমান বলেন, ...রাত প্রায় ৪টার সময় ইউনিফরম পরা মেজর ডালিম স্টেনগান হাতে তার গাড়িতে উঠে গাড়ি এ্যাডভান্স করতে বলে। একটি ট্রাক তাদের গাড়ি অনুসরণ করতে থাকে। মগবাজার চৌরাস্তা পার হলে মেজর ডালিম গাড়ি থামিয়ে পেছনের ট্রাক থেকে ফোর্স নামিয়ে মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়ির চারদিকে মোতায়েন করে। ১০-১৫ মিনিট পর ফিরে এসে জীপ চালাতে বলে। শেরাটন হোটেলের কাছে গেলে সেরনিয়াবাতের বাড়িতে গুলির শব্দ শোনে। তখন মেজর ডালিম জীপ ফিরিয়ে সেরনিয়াবাতের বাড়ির দিকে আসে। স্টেনগানসহ গাড়ি থেকে নেমে সেরনিয়াবাতের বাড়ির উত্তর-পূর্ব কোনায় রাস্তার ওপর দাঁড়ায়। তখন তিনি গাড়িতে বসে দুই রাকাত ফজরের নামাজ পড়ে নেন। কিছুক্ষণ পর মেজর ডালিম এসে রেডিও সেন্টারে যায়। তখন আরেকজন আর্মি অফিসার সশস্ত্র অবস্থায় এলে দুজন কথা বলতে বলতে ভেতরে যায়। তিনি রেডিও সেন্টারে রেইসকোর্সেও ট্যাঙ্ক দেখেন। সেখানে ফোর্সদের কাছে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে বলে মেজর ডালিম রেডিওতে ঘোষণা দিচ্ছে বলেও শোনেন। কিছুক্ষণ পর মেজর ডালিম বাইরে এসে ধানম-ি ৩২নং রোডের মাথায় জীপ থামিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যায়। পেছনে একটি খোলা জীপে সশস্ত্র আর্মি ছিল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে আর্মি হেডকোয়ার্টারে যায়। আর্মি হেডকোয়ার্টারে স্টেনগানসহ নেমে উগ্রভাষায় গালিগালাজ করতে করতে হেডকোয়ার্টারে ঢুকে পড়ে। পরে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহকে হেডকোয়ার্টার থেকে বাইরে নিয়ে আসে। পেছনে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানসহ উর্ধতন আর্মি অফিসাররা ছিল। সেখানে মেজর ডালিম অন্য একটি সশস্ত্র গাড়িতে উঠে রেডিও সেন্টারে চলে যায়। পাঁচ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি যাও প্রসিকিউশনের ২০নং সাক্ষী আইনউদ্দিন মোল্লা বলেন, ঘটনার সময় তিনি সরকারী পরিবহন পুলের ড্রাইভার ছিলেন। ১৫ আগস্ট ভোর প্রায় ৫টার সময় তার ঘরের কলিংবেল বেজে ওঠে। তখন বাথরুমে অজু করছিলেন তিনি। তাড়াতাড়ি বাসার সামনে গেলে কর্নেল জামিল উপর থেকে বলেন, তাড়াতাড়ি গাড়ি রেডি করো এবং গণভবনে গিয়ে সকল ফোর্সকে হাতিয়ার ও গুলিসহ ৫ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার জন্য বলো। তখনই গণভবনে গিয়ে ফোর্সদের এ নির্দেশ শোনান। ফিরে এসে সরকারী গাড়ির পরিবর্তে কর্নেল জামিলের নির্দেশমতো তার ব্যক্তিগত গাড়িতে করে তাকে নিয়ে ধানম-ির ২৭নং রোডের মাথায় বয়েজ স্কুলের গেটে পৌঁছলে সেখানে গণভবন থেকে আগত ফোর্সগুলোকে দেখেন। তখন দ্রুত সোবহানবাগ মসজিদের কাছে গেলে দক্ষিণ দিক থেকে শোঁ-শোঁ করে গুলি আসতে থাকে। কর্নেল জামিল সেখানে গাড়ি থামিয়ে গাড়িতে বসে থাকেন। তাকে ফোর্স এ্যাটাক করানোর জন্য বললে জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা ওয়ার ফিল্ড নয়, ফোর্স এ্যাটাক করালে সিভিলিয়ানের ক্ষতি হতে পারে।’ এরপর তিনি প্রতিপক্ষের অবস্থান জেনে আসার জন্য নির্দেশ দিলে তিনি গাড়িতে চাবি রেখে দেয়ালঘেঁষে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে যেতে থাকলে দক্ষিণ দিক থেকে আর্মির পোশাক পরিহিত ৫-৬ জন অস্ত্রধারীকে কর্নেল জামিলের গাড়ির দিকে দৌড়ে যেতে দেখেন। অবস্থা খারাপ বুঝে কর্নেল জামিলকে পেছনে যাওয়ার জন্য হাত দিয়ে ইশারা দেন। স্যার, স্যার, বলেও কয়েকবার আওয়াজ করেন। তাতেও কর্নেল জামিল তাকাননি। সে সময় আর্মি ও অস্ত্রধারী লোকগুলো গাড়ির কাছে পৌঁছে যায়। কর্নেল জামিল দুই হাত উঠিয়ে তাদের কিছু বলার বা বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা কর্নেল জামিলকে লক্ষ্য করে ২-৩টি ফায়ার করলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। ওই আর্মিও ড্রাইভার খুঁজতে থাকলে তিনি ভেতর দিয়ে মোহাম্মদপুর ফায়ার ব্রিগেডে চলে যান। অফিসে এসে দেখি মোশতাক চেয়ারে বসা প্রসিকিউশনের ৪৬নং সাক্ষী মোখলেছুর রহমান ভূঁইয়া আদালতকে বলেন, সাক্ষ্য দেয়ার সময় তিনি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সেক্রেটারিয়েটে কর্মরত ছিলেন। ১৫ আগস্ট সকাল প্রায় ৭টার দিকে অফিসে এসে জানতে পারেন তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। একই ঘটনায় কর্নেল জামিলকেও হত্যা করার কথা শোনেন। কিছুক্ষণ পর শুনতে পান যে, ব্রিগেডিয়ার মাসরুল হক, ক্যাপ্টেন শরীফ আজিজ ও লে. গোলাম রব্বানীকেও আর্মিরা ধরে নিয়ে গেছে। তারপর তারা সবাই ভয় পেয়ে অফিস থেকে চলে যায়। কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বিকেল সাড়ে তিনটার সময় তিনি আবার অফিসে এসে দেখেন খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসা। তার পাশে তাহের উদ্দিন ঠাকুর, ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেমসহ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং আর্মি অফিসার মেজর ফারুক, মেজর রশিদ, মেজর ডালিম, মেজর পাশা, মেজর শাহরিয়ার, মেজর নূর, মেজর বজলুল হুদা, সুবেদার মোসলেম বসা। তারপর তিন বাহিনীর প্রধানসহ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, ডিজিএফআই প্রধান আসেন। তারা তিনতলায় একটি মিটিং করেন। মিটিং শেষে খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হিসেবে জাতির উদ্দেশে সন্ধ্যা ৭টায় রেডিও-টেলিভিশনে ভাষণ দেন। এরপর প্রতিদিন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও আর্মি অফিসারদের খন্দকার মোশতাক সাহেবের সঙ্গে দেখাসাক্ষাত করার জন্য আসতে দেখেন। সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ প্রসিকিউশনের ৪৭নং সাক্ষী মেজর জেনারেল (অব) খলিলুর রহমান আদালতকে জানান, ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে ব্রিগেডিয়ার হিসেবে পাকিস্তান থেকে ফেরত আসেন তিনি। প্রায় দুই মাস পর তাকে বিডিআরের ডাইরেক্টর হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তখন তিনি সশস্ত্র বাহিনীতে ক্ষুব্ধভাব লক্ষ্য করেন। তখন সামরিক বাহিনীর জন্য আলাদা বেতন কমিশন গঠন না করার কারণে সামরিক বাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ ছিল। সামরিক, বেসামরিক যৌথ বেতন কমিশনে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন জেনারেল জিয়া। কিন্তু জে. জিয়া এ বিষয়টি কমিশনে তুলে ধরেন নাই। তাছাড়া জে. জিয়া নম্বরের ভিত্তিতে জে. শফিউল্লাহর সিনিয়র থাকা সত্ত্বেও তাকে সেনাপ্রধান না করায় আর্মি অফিসাররা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। তখন এই সমস্যা দূর করার জন্য শুনেছেন জে. জিয়াকে আর্মি থেকে অবসর দিয়ে এ্যাম্বাসেডার করে বিদেশে পাঠিয়ে দেবে। এছাড়া ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি শুনতে পান যে, খন্দকার মোশতাককে মন্ত্রিপরিষদ থেকে বাদ দেয়া হবে। ১৫ আগস্ট সকালের বর্ণনা দিয়ে খলিলুর রহমান আদালতকে জানান, গোলাগুলির শব্দ শুনে রেডিও অন করে রেডিওতে মেজর ডালিমের কণ্ঠে শোনেন ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।’ তারপর অফিসে গিয়ে এই পরিস্থিতি সম্পর্কে সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে আলোচনাকালে সকাল প্রায় নয়টার দিকে রেডিওতে পরবর্তী সরকারের প্রতি তিন বাহিনীর প্রধানের আনুগত্য ঘোষণা শোনেন। আনুমানিক সাড়ে নয়টার দিকে কয়েক আর্মি ক্যাপ্টেন তার কাছে এসে বলেন, তারা মেজর রশিদ ও মেজর ফারুকের কাছ থেকে একটা বার্তা নিয়ে এসেছেন। বার্তাটি ছিল, আমরা জুনিয়ররা যা করার করেছি, এখন আপনারা সিনিয়ররা এসে পরিস্থিতি সামলান এবং দেশটাকে বাঁচান। অন্যান্য সিনিয়র অফিসার রেডিও স্টেশনে আছে, আপনিও দ্রুত চলে আসুন। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সেই মতো কাজ করুন। এরপর তারা অফিসারদের সঙ্গে আলোচনায় একমত হলেন। আমি ডালিম বলছি... প্রসিকিউশনের ৩৭নং সাক্ষী মোঃ রিয়াজুল হক আদালতকে বলেন, তিনি বাংলাদেশ বেতারে স্টেশন প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার সময় বাংলাদেশ বেতার ভবনে রেডিও ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। ওই সালের ১৫ আগস্ট শুক্রবার আগেই নির্ধারিত ডিউটি রোস্টার অনুযায়ী তার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত অফিস ছিল। ...কিছুক্ষণ পর রেডিও স্পীকারে শুনতে পান ‘আমি মেজর ডালিম বলছি, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে, আর্মি ক্ষমতা দখল করেছে, কার্ফু জারি করা হয়েছে।’ চারজন বসা অবস্থায় বাইরে থেকে একটি টেলিফোন আসে। টেলিফোনটি তিনি ধরলে অপর প্রান্ত থেকে বলে ‘আমি মেজর রশিদ বলছি, মেজর ডালিমকে দাও।’ তখন কন্ট্রোলরুমে দাঁড়িয়ে থাকা এক সিপাহীকে বললাম ‘মেজর ডালিমকে ডেকে আনেন।’ ডালিম টেলিফোনে কথা বলে। ডালিম টেলিফোনে বলছে, ‘গোলাবারুদ পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

সর্বশেষ সংবাদ