আউটসোর্সিং: দ্রুত গতির ইন্টারনেট চাই কামরুল হাসান বাদল

পোস্ট করা হয়েছে 26/07/2017-10:55pm:    এই সময়ে প্রায় পুরো দেশটি বন্যার কবলে। সব নদনদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তলিয়ে গেছে খেতের ফসল, পুকুরের মাছ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবজির খেত। ফলের বাগান। ভেসে গেছে বীজতলা। ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন। নদী ভাঙনের শিকার বিপুল জনগোষ্ঠী। প্রতিদিন, প্রতিরাত এমনকি প্রতিমুহূর্তে দেশের নদীকূলবর্তী এলাকা ভাঙছে। নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ছে বাপ-দাদার ভিটা। ঠিকানাহীন, উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছে শত শত পরিবার। ভিটে মাটির সাথে সাথে মানুষ তার স্মৃতিচিহ্নগুলোও হারাচ্ছে। ভিটেমাটিহারা এই মানুষগুলো বেঁচে থাকার তাড়নায়, কর্মসংস্থানের আশায় ভিড় করবে কোনো কোনো শহরে। আশ্রয় নেবে কোনো নিরাপত্তাহীন বস্তিতে। একদিন তা-ও ভেঙে যাবে। আগুনে পুড়ে যাবে, পাহাড়ের মাটিতে চাপা পড়বে। কেউ কেউ মারা যাবে। আর যারা বেঁচে থাকবে তারা আবার উদ্বাস্তু ও ঠিকানাবিহীন মানুষে পরিণত হবে। শুধু গ্রাম নয়। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি শহরও পানিতে ডুবে আছে। বিশেষ করে বন্দর শহর চট্টগ্রাম পানিতে ভাসছে কয়েকদিন ধরে। কোনো কোনো এলাকায় কোমর সমান পানি। কোনো কোনো এলাকা ডুবে আছে দিনের পর দিন। অনেকের ঘরে চুলা জ্বলে না। অনেকের কাজের অভাবে চুলা জ্বালাতে সমর্থ হচ্ছে না। মানুষ কাজে যেতে পারছে না। দিনমজুর তার কাজ পাচ্ছে না। রিকশাচালক তার রিকশা নিয়ে ডুবে থাকা সড়কে নামতে সাহস পাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারছে না। চাকরিজীবীরা যেতে পারছেন না তাদের কর্মস্থলে। জীবন যেন স্থবির হয়ে আছে। জীবন যেন থমকে গেছে। এত সব মন খারাপের ভেতর। এত কষ্ট, বিপদ আর নিদারুণ জীবন সংগ্রামের ভেতর, অনেক বৃষ্টির পর একটি উজ্জ্বল সকালের মতো একটি সুসংবাদ মনকে কিছুটা হালকা করে দিল। গত ২৩ জুলাই কয়েকটি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানতে পারলাম, বিশ্বে অনলাইন শ্রমদাতা (আউটসোর্সিং) দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় বলে জানিয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও পাঠদান বিভাগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট (ওআইআই)’ এর একটি সমীক্ষা প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে। এই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ভারত অন্যসব দেশের চেয়ে এগিয়ে প্রথমস্থান অধিকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তিন-এ। আউটসোর্সিং বা অনলাইন কাজের ক্ষেত্রে ভারত ২৪ শতাংশ অধিকার করেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১৬ শতাংশ ও যুক্তরাষ্ট্র ১২ শতাংশ। পাকিস্তান, ফিলিপাইন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, রাশিয়া, ইতালি ও স্পেন বাংলাদেশের পেছনে অবস্থান করছে। আমেরিকান শব্দ ‘ড়ঁঃংরফব ৎবংড়ঁৎপরহম’ থেকে আউট সোর্সির ধারণাটি এসেছে। এটি ব্যবসা ক্ষেত্রে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বা ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অন্যকে দিয়ে নিজের কাজ করিয়ে নেয়াকে বোঝায়। অর্থাৎ নিজ প্রতিষ্ঠানের কাজ বাইরের লোকদের দিয়ে করানোর মতো। যে সব দেশে শ্রমের দাম খুব বেশি তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেক কাজ করিয়ে নেয় অপেক্ষাকৃত সস্তা শ্রমের দেশগুলো থেকে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে এই খাতে সম্ভাবনা প্রচুর। সবকিছু ঠিক থাকলে এই খাত আমাদের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের চেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে। বর্তমানে দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ আউটসোর্সিং পেশার সঙ্গে জড়িত। এই পেশার একটি সুবিধা হচ্ছে নিজের শোবার ঘর থেকে শুরু করে যে কোনো জায়গায় বসে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করা যায়। এর জন্য প্রয়োজন শুধু ইন্টারনেট সংযোগসহ কম্পিউটার বা ল্যাপটপ। ২০১৪ সালে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন-’এ একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বেলাল সরকার নামে এক তরুণের সফলতার কথা বলা হয়েছিল, যিনি চিরিরবন্দরে মতো এক প্রত্যন্ত জায়গায় থেকেও এই মাধ্যমে কাজ করে শূন্য থেকে কোটিপতিতে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশের জন্য এই সংবাদ নিঃসন্দেহে অনেক আশাব্যঞ্জক। পশ্চিমা গণমাধ্যম কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বাংলাদেশের নেতিবাচক সংবাদ প্রচারে বিশেষ আগ্রহী। তারা বাংলাদেশকে বন্যা কবলিত দেশ, দরিদ্র ও হতশ্রী একটি দেশ হিসেবে দেখাতে খুব পছন্দ করে। আমি লক্ষ করেছি অনেক বিদেশি সাংবাদিক বিশেষ করে টিভি সাংবাদিক কোনো প্রতিবেদন দিতে গিয়ে পিটিসির সময় ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে ঢাকা বা দেশের বস্তি এলাকা কিংবা অগোছালো কোনো এলাকা বেছে নেন। এই নেতিবাচক প্রচারের বিপরীতে বাংলাদেশের যে অসাধারণ উত্থান ঘটেছে, বাংলাদেশ যে বিস্ময়করভাবে নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে তা বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দেশ স্বীকার করলেও দূরভিসন্ধিমূলকভাবে কিছু কিছু পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম শুধু নেতিবাচক দিকগুলোই প্রচারে বেশি আগ্রহী। একটি সময়ে তড়াবিহীন ঝুড়ি বলে উপহাস করা হয়েছিল যে দেশকে সে দেশটি এখন আউটসোর্সিং ক্ষেত্রে সেই বাঘা দেশটিকেও ডিঙিয়ে গেছে তা কম গৌরবের সংবাদ নয়। বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে বিপ্লব ঘটিয়েছে। ১৬ কোটি মানুষের জন্য তার প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদন করে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ স্থানে। বিশ্বে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হারে এখন সবচেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। আম উৎপাদনে সপ্তম ও পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে রয়েছে। বিশ্বে সবজি উৎপাদনে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। গত এক দশকে পাঁচগুণ বেড়েছে সবজি উৎপাদন। এই লেখাটি যখন প্রকাশ হবে, আমি জানি জলাবদ্ধতার কারণে সেদিনও অনেকের কাছে পৌঁছাবে না দৈনিকটি। অনেক বিড়ম্বনার পরও যাদের কাছে পৌঁছালে তারা হয়তো জলমগ্ন অবস্থাতেই পত্রিকাটি পড়বেন। তার বা তাদের এই দুর্বিষহ অবস্থায় এই সাফল্যের কথাগুলো তাদের কাছে খুবই অর্থহীন মনে হবে। শ্রাবণ মাসে অনেকের কাছে তা আষাঢ়ে গল্প বলে মনে হবে। অনেকে হয়তো ছুঁড়েও ফেলে দিতে পারেন কাগজটি। কিন্তু যারা শেষ পর্যন্ত পড়বেন তারাই জানতে পারবেন যে, আমি নিশ্চিতভাবে সাধারণ মানুষের জয়যাত্রার কথা, তাদের সাফল্যের কথা তুলে ধরতে চেয়েছি। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে যে সেক্টরগুলোর সাফল্য তুলে ধরেছি, গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে তার প্রত্যেকটিই কোনো না কোনোভাবে ব্যক্তি উদ্যোগের সাফল্য। তবে হ্যাঁ সে ক্ষেত্রে সরকার, রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানেরও অবদান আছে, তবে তা ব্যক্তির অর্থাৎ উদ্যোক্তার ইচ্ছাশক্তির চেয়ে বেশি নয়। সময়মতো সার, কীটনাশক ও সেচের জন্য বিদ্যুৎ পেয়েছে। মৎস্যচাষিরা সুদমুক্ত ঋণ পেয়েছে, সবজি বা ফল চাষের জন্য উন্নতমানের বীজ পেয়েছে এবং প্রয়োজনে কৃষি বিভাগের সহযোগিতা বা পরামর্শ পেয়েছে। তারপরও বলতে হবে, সবকিছুই কি খুব সহজে মিলেছে? আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প ব্যক্তি উদ্যোগের ফল। আমাদের রেমিট্যান্স তা-ও ব্যক্তি উদ্যোগের ফল। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কৃষক বা উৎপাদকরা তাদের উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। এর পাশাপাশি যদি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের কথা ভাবি সেখানে নিরাশ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। অন্তত বর্তমান জলে ডোবা শহর দেখে ভাবতে হবে উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তি উদ্যোগের পাশে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ কতটা চরমভাবে ব্যর্থ। দখল ও দূষণ থেকে খালকে রক্ষা করতে না পারা, অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে হারিয়ে যাওয়া খাল উদ্ধার করতে না পারা, পাহাড় কাটা বন্ধ করতে না পারা, জলাধার ভরাট রোধ করতে না পারা সবকিছুই প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। ব্যক্তি উদ্যমের কাছে রাষ্ট্রীয় এই ব্যর্থতা খুব প্রাণে বাজে। আউটসোর্সিংয়ের বেলায়ও তাই। বেগম খালেদা জিয়া তার শাসনামলে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার কী তা বুঝতেই পারেননি। বর্তমান সরকার সে বিষয়ে অনেকটা আধুনিক হলেও ব্যক্তি উদ্যমের সাথে দ্রুত এগুতে পারছে না। তাই এখনো এ ধরনের পেশায় জড়িত তরুণদের দাবি জানাতে হয়, দ্রুতগতির ইন্টারনেট চাই। তরুণরা এগিয়ে আছে, তরুণরা মুখিয়ে আছে, তারা কাজ করতে চায়। তারা কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিতে চায়। তাদেরকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিষয়ে তারা কারো কাছে আবদার করছে না। তারা বলছে সরকার টাকার বিনিময়ে তাদের উন্নতমানের ইন্টারনেট সেবা পেতে সহায়তা করুক। এরপর যা করার তা তরুণরাই করবে। কবি, সাংবাদিক লেখক

সর্বশেষ সংবাদ