আর কতকাল আদুরীরা অনাদরে থাকবে - কামরুল হাসান বাদল, লেখক,কবি, সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 19/07/2017-12:44pm:    অনেকদিন পর আদুরী একটু হেসেছে। হাসতে ভুলে গিয়েছিল আদুরী। আনন্দ কাকে বলে তা-ও ভুলে গিয়েছিল সে। তাই যে দিনটির জন্য দীর্ঘ চার বছর ধরে অপেক্ষা করেছিল সেদিনে, সেক্ষণেও প্রাণ খুলে হাসতে পারল না শিশু আদুরী। নিজের ওপর চার বছর আগে ঘটা নির্মম-নিষ্ঠুর নির্যাতনের মামলার রায়ে নির্যাতনকারী গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান নদীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে নির্যাতিতা আদুরী। রায়ে খুশি তার মা সাফিয়া বেগম, খালা শাহিনুর বেগম, মামা মামলার বাদী নজরুল চৌধুরীসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও।,
আদুরীর পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাহমিদা আক্তার রিংকি।,
চার বছর আগে ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী আদুরীকে নির্যাতন করে মৃত ভেবে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার ওই আলোচিত মামলার রায় গতকাল মঙ্গলবার প্রদান করেন ঢাকার ৩ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জয়শ্রী সমাদ্দার।,
গৃহকর্ত্রী নদীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। এ টাকা নির্যাতিত আদুরীকে দিতে হবে। অপর আসামি নদীর মা ইসরাত জাহান খালাস পেয়েছেন। নির্যাতনের সময় গৃহকর্ত্রী নদী আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়ায় জিহ্বা ক্ষতিগ্রস্ত, তাই স্বাভাবিক মানুষের মতো কথাও বলতে পারে না আদুরী। রায়ের পর অস্পষ্ট ভাষায় সে বলেছে, নির্যাতনের বিচার পেয়েছি, আমি খুশি। সন্তোষ জানিয়ে বড় ভাই সোহেল মৃধা বলেন, আমার বোনরে নিয়া যে এই দোজগের আগুনে ফালাইছেন, সেই চুন্নু মিয়া আগে থাইকা ছাড়া পাইয়া যাওয়ায় কষ্ট হইছিল। তয় মূল অপরাধীর সাজায় খুশি।,
মা সাফিয়া বেগম বলেন, যতই অভাব-অনটন থাউক, আইজ মাইয়াডার দশা এইরহম অইবে, হ্যা, বোঝলে কামে দেতাম না। তারে যে এই দশা করছে, তার শাস্তি পাইছি, ভালো লাগতাছে।,
২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর বারিধারা ও ডিওএইচএস তেলের ডিপোর মাঝামাঝি রেললাইনসংলগ্ন ডাস্টবিন থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয় কঙ্কালসার ও মৃতপ্রায় গৃহকর্মী আদুরীকে। উদ্ধারের সময় তার শরীরে ছিল অসংখ্য নির্যাতনের চিহ্ন। পল্লবীর ১২ নম্বর সেকশনের ২৯/১, সুলতানা প্যালেসের দ্বিতীয় তলায় সাইফুল ইসলাম মাসুদের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতো শিশু আদুরী। দীর্ঘদিন মারধর, গরম খুন্তি ও ইস্ত্রির ছ্যাঁকা, ব্লেড দিয়ে শরীর পোঁচানো, মাথায় কোপ, মুখে আগুনের ছ্যাঁকা, খেতে না দেওয়াসহ নানা নির্মম-নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে মৃত ভেবে ওই ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলেন মাসুদের স্ত্রী গৃহকর্ত্রী নদী ও তার পরিবারের লোকজন। প্রায় দেড় মাস আদুরীকে চিকিৎসা দেওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। যখন তাকে রিলিজ দেওয়া হয়, তখনও সে ভালোভাবে কথা বলতে পারতো না। শরীর ছিল প্রচণ্ড দুর্বল। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ওই বছরের ৭ নভেম্বর আদুরী চলে যায় পটুয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে।,
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের ওপরই যে নির্যাতন হচ্ছে তা নয়। এর বাইরেও প্রতিদিন নানাভাবে শিশুরা নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে।,
দু বছর/চার বছরের শিশুদের ওপরও যৌন নির্যাতন করা হচ্ছে। যৌন নির্যাতনের হাত থেকে ছেলেশিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। যে মাদ্রাসায় মা-বাবারা শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য পাঠান সেখানেও শিশুরা, ছেলে/ মেয়ে নির্বিশেষে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এটি একটি অসভ্য, অমানবিক সমাজ ব্যবস্থার চিত্র।,
বাংলাদেশে জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ এখনো চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তারা যেখানে নিজেদের খাবারই জোটাতে পারে না সেখানে একাধিক সন্তানের মুখে ভালোমন্দ কী তুলে দেবে। এই পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে দেশের মধ্যবিত্ত ও বিত্তশালী লোকেরা। আর এই কাজে এগিয়ে আসে ওই দরিদ্র শ্রেণিরই কিছু অসৎ ও লোভী মানুষ, যারা সামান্য দালালি প্রাপ্তির বিনিময়ে গরিব ঘরের শিশুদের সরবরাহ করে শহুরে বড়লোকদের ঘরে। কিছু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এই শিশুদের বরণ করে নিতে হয় এক অমানবিক দাসত্বের জীবন। এদের কোনো বিশ্রাম নেই। বিনোদন নেই। ভালো খাবার নেই, এমন কি এদের জন্য একটু মায়া বা ভালোবাসাও নেই বড়লোকদের। যে পরিবারে কাজ করে দরিদ্র শিশুরা সে ঘরেই তার বয়সি শিশুও থাকে যাদের জীবন আনন্দময়, সুখময়, শান্তিময় করতে গলধঘর্ম হতে হয় এই নিরীহ নিষ্পাপ শিশুদের। তারপরও এদের ভাগ্যে সামান্য অবসর জোটে না। সামান্য ভুলভ্রান্তির জন্য ক্ষমা মেলে না।,
আদুরীর মতো নির্মম নির্যাতন নেমে আসে তাদের জীবনে। আমরা মাঝেমধ্যে দুএকজন আদুরীর ঘটনার কথা জানতে পারি। জানতে পারি যখন সে ঘটনা কোনোভাবে বাইরে চলে আসে। দিনের পর দিন আদুরীকে নির্যাতন করা হয়েছে। ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার আগে সে খবর আমরা ভদ্রজনেরা জানতেও পারিনি। এত নির্যাতনের পরও যদি আদুরী কর্মক্ষম থাকতো অর্থাৎ গৃহকর্ত্রী নদীর কাজ করে দেওয়ার মতো শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতো তাহলে তাকে ডাস্টবিনে ফেলে না দিয়ে ঘরে রাখা হতো, কাজ করানো হতো এবং তার ওপর নির্যাতন অব্যাহত রাখা হতো।,
আমি ধিক্কার জানাই ওই সমাজকে, যে সমাজ তার শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারে না, যে সমাজ ২ বছরের একটি শিশুকে যৌন নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই দিতে পারে না, যে সমাজ মাদ্রাসায়ও একটি শিশুকে যৌন নির্যাতন ও বলাৎকারের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না।,
এ সমাজে জৌলুস বেড়েছে, উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে, বড় বড় ব্রিজ, সড়ক, স্থাপনা হচ্ছে। চোখ ধাঁধানো শপিং মল হচ্ছে। খাওয়ার হোটেল, থাকার হোটেল হচ্ছে। মসজিদ হচ্ছে, মাদ্রাসা হচ্ছে, মন্দির হচ্ছে, সেখানে ধার্মিকদের ভিড় বাড়ছে, কিন্তু এই জৌলুস, এই উন্নয়ন, এই ধর্মচর্চার অপর পিঠে অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা, অনৈতিকতা, অসাধুতা, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। মনে হয় এসব কিছুই মেকি। আমাদের প্রকৃত উন্নয়ন এখনো সুদূরপরাহত। আমাদের মননের যে উন্নয়ন, আমাদের মানবতাবোধের যে উন্নয়ন, আমাদের সহমর্মিতার যে উন্নয়ন, সে উন্নয়ন এখনো হয়নি। বাইরে বেশভুষায়, জীবনযাপনে আধুনিক হলেও আমাদের মনোজগৎ এখনো মধ্যযুগে। এত আলোর ঝলকানির মধ্যেও আমাদের মনোজগতের বাস গভীর অন্ধকারে।,
দেরিতে হলেও আদুরী বিচার পেয়েছে। নির্যাতনকারী গৃহকর্ত্রী নদীর যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। তাকে যে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে তা আদুরীকে দেওয়া হবে ক্ষতিপূরণ হিসেবে। কিন্তু তাতে কি সত্যি ক্ষতিটা পূরণ হবে আদুরীর? আদুরী স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না। তার জিহ্বার জড়তা এখনো কাটেনি। নির্যাতনের বিভীষিকা আদুরী এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। নদীর কঠিন থেকে কঠিনতম সাজাও তো আদুরীর আনন্দময় শিশুকাল ফিরিয়ে দিতে পারবে না। আদুরীর জীবন থেকে সে বিভীষিকাময় দিন ও রাতের দুঃস্বপ্নগুলো মুছে ফেলা যাবে না। আদুরীকে বিচার পাইয়ে দিতে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এ বিচার সেদিনই যথার্থ হবে যেদিন এই দেশে আর কোনো আদুরী নির্যাতিত হবে না। আর কোনো শিশুকে পেটের দায়ে দাসত্বের জীবন বেছে নিতে হবে না।,
লেখক : কবি ও সাংবাদিক

সর্বশেষ সংবাদ