শিশু নির্যাতন একটি বর্বর সমাজের চিত্র- কামরুল হাসান বাদল, লেখক,কবি, সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 12/07/2017-02:24pm:    কেউ একজন ছবিটি ফেসবুকে আপলোড করেছিল। ছবিটি দেখে আমি শিউরে উঠেছি, ভালো করে তাকাতে পারিনি। এরপর থেকে বারবারই মনে হচ্ছে এই বর্বরতা কী করে সম্ভব? একটি শিশুর সাথে এই ধরনের নিষ্ঠুর আচরণ একজন সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সম্ভব হলো কীভাবে। আমি ভীষণ দুর্বলচিত্তের মানুষ। বীভৎস কোনো দৃশ্য দেখতে পারি না। নিষ্ঠুরতা আমার সহ্য হয় না। আমি ভাবি মানুষের রাগ থাকতে পারে। রাগের বশে দুচারটি চড়-থাপ্পর দেওয়া যেতে পারে; কিন্তু তাই বলে সামান্য ভুলের জন্য এমন কঠিন, নিষ্ঠুর ও অমানবিক শাস্তি। ১০ বছর বয়সী আমেনা পড়ে আছে ফেনী সদর হাসপাতালের বেডে। তার শরীরের পেছনের প্রায় পুরোটা জুড়ে গভীর ক্ষত। চামড়া ঝলসে গেছে। নির্যাতনের ফলে শিশুটি সম্ভবত মানসিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অসংলগ্ন কথা বলছে চিকিৎসকদের সাথে। এখন পর্যন্ত আমেনার কোনো স্বজনের খবর পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, সে পরশুরাম উপজেলার সীমান্তবর্তী বিলোনিয়া এলাকার আবুল কাশেম ও শেফালীর মেয়ে। আমেনা যতটুকু বলতে পেরেছে তাতে জানা যায়, বছর কয়েক আগে তার মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে তাদের এক আত্মীয় তাকে ফেনী শহরে নূরীয়া মসজিদের পেছনে আফরোজা ম্যানসনে গৃহকর্মীর কাজ দেয়। এরপর থেকে শুরু হয় আমেনার দাসীর জীবন। এ বিষয়ে আমেনা যা বলেছে, ‘কিছুদিন পর গৃহকর্ত্রী আফরোজা আমাকে ঢাকায় তার মেয়ের বাসায় পাঠান। ওই বাসায় নির্যাতন চালাতো তার মেয়ে। ঠিকমতো কাজ না করার অজুহাতে একদিন চুলার আগুন দিয়ে আমার পেছনের অংশ ঝলসে দেন’। এই ঘটনার পর আমেনাকে আবার ফেনীতে আফরোজা ম্যানসনে পাঠিয়ে দেয়া হয়, সেখানে আফরোজাও তার ওপর অত্যাচার চালায়। আমেনা বলেছে, ‘একদিন আমাকে রাতের অন্ধকারে ঘর থেকে বের করে দেয়, আমি ফেনী রেলস্টেশনে গিয়ে আশ্রয় নিই’। এই সমাজে সবাই আফরোজা বা তার মেয়ের মতো নয়। ফেনী রেলস্টেশন থেকে আমেনাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন ফেনী শহরের তাজিয়া রোডের বাসিন্দা মিজানুর রহমান। মিজান গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘শনিবার রাতে বাসায় ফেরার পথে আমেনাকে এই অবস্থায় দেখে বাসায় নিয়ে যাই। রাতে আমার বাসায় রেখে সকালে হাসপাতালে ভর্তি করি’। রোববার রাতে পুলিশ ও সাংবাদিকরা আফরোজা ম্যানসনে গিয়ে ঘর তালাবদ্ধ দেখতে পান। আফরোজা ফেনী পৌরসভা চত্বর এলাকার আনন্দ কমিউনিটি সেন্টারের মালিক শামছু মিয়ার স্ত্রী। হাসপাতালের ডাক্তার বলেছেন, ‘আমেনার পিঠসহ পেছনের প্রায় পুরোটাজুড়ে গভীর ক্ষত রয়েছে। ক্ষত তিন চার মাস আগে হওয়ায় ইনফেকশন হয়ে গেছে। অমানুষিক নির্যাতনের শিকার আমেনা কিছুটা অসংলগ্ন আচরণ করছে। তার শারীরিক অবস্থা নাজুক’। মঙ্গলবার ভোরে আফরোজাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ মাসের ১ তারিখের আরেকটি ঘটনা। কথিত চুরির অভিযোগে ১০ বছরের শিশু রাজু হাওলাদারকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন চালানো হয়। সেদিন পাশের ঘরের জাহাঙ্গির হাওলাদারের ঘর থেকে আট হাজার টাকা চুরি হয়। চুরির অভিযোগে রাজুকে বাড়ির সামনে থেকে ধরে নিয়ে যায় তিন যুবক সজীব হোসেন, সাইদুল ইসলাম ও লিটন হাওলাদার। তারা রাজুকে একটি নির্জন বাড়িতে নিয়ে গিয়ে হাত-পা বেঁধে ঘরের আড়ার সাথে ঝুলিয়ে রাখে এবং রাজুর শরীরের বিভিন্ন স্থানে লাঠি দিয়ে আঘাত করে। আগুন দিয়ে রাজুর হাতে ছ্যাঁকা দেয় তারা। শিশুটিকে এখন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সাবিনার বয়স ১১ বছর। ছয় মাস ধরে কাজ করতো মিরপুর ডিওএইচএসে লে. কর্নেল তসলিম আহসানের বাসায়। একদিন সকালে ডিম পোচ করতে গিয়ে অসাবধানতায় কুমুসটি ভেঙে ফেলে সাবিনা। আর এ কারণে গৃহকর্ত্রী আয়েশা লতিফ সাবিনার বুকে-পিঠে-হাতে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেন। রুটি বানানোর বেলুন দিয়ে পেটান। আঘাতে কালো হয়ে ফুলে গেছে, প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে সাবিনার দুটি চোখ। সাবিনা বলেছে, ম্যাডাম (আয়েশা লতিফ) প্রায় সময় তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাতো। এই ধরনের শিশু নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গেলে নির্যাতনের মহাভারত রচিত হবে হয়ত। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও অংসখ্য শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তার কয়টির খবরই বা আমি রাখি। সিংহভাগ নির্যাতনের খবরতো সংবাদমাধ্যমে আসেই না। বিশেষ করে গৃহকাজে নিয়োজিত শিশুদের প্রতি অমানবিক আচরণের সামান্য কয়েকটি আমাদের নজরে আসে শুধু। তা-ও সাবিনা-আমেনাদের মতো নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে কিংবা তা প্রকাশ হয়ে পড়লে। শুধু দেশে নয়, কয়েকদিন আগে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি এক কূটনীতিক তার বাংলাদেশি গৃহকর্মীকে নির্যাতন করে সে দেশের পুলিশের মুখোমুখি হয়েছেন। গৃহকর্মীদের সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা ২০১৫ নামে একটি নীতিমালা প্রকাশ করে। এই নীতিমালা ২০১৫ সালের ডিসেম্বরেই পাশ হয়ে। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতি সামান্য পাল্টেছে বলে মনে হয় না। আমাদের সমাজে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে গৃহকর্মী রাখার রেওয়াজ আছে। সে ক্ষেত্রে তারা শিশুদেরই বেশি পছন্দ করে কারণ তাদের অধিকাংশকেই বেতন-ভাতা দিতে হয় না। বাংলাদেশের আইনে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও তা খুব একটা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। গৃহকাজে ছাড়াও বিভিন্ন ঝুকিপূর্ণ কাজেও শিশুদের অংশগ্রহণ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। শিশুরা যে শুধু কাজই করছে তা নয়। এ ক্ষেত্রে তাদের নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয় সবচেয়ে বেশি। বড়দের গায়ে সহসা হাত তোলা যায় না ফলে বড়দের ক্ষেত্রে অনেক সময় শুধু গালাগালিতে পার পাওয়া সম্ভব কিন্তু শিশুদের বেলায় গালাগালির সঙ্গে জোটে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতনও। আমরা জানিই না কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিন কতশিশু অত্যন্ত অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কারণ কর্মরত শিশুরা এই নির্যাতনকে তাদের কাজের অংশ হিসেবেই মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারি না একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে এমন নিষ্ঠুর আচরণ, নির্যাতন দিনের পর দিন করা সম্ভব হয়ে ওঠে কী করে। তারা কি মানসিকভাবে সুস্থ? আমি বুঝতে পারি না সমাজটাও কি আদৌ সুস্থ? সুস্থ হলে প্রতিদিন এত এত নিষ্ঠুর কাণ্ডগুলো ঘটছে কীভাবে? যারা এই নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছে তারাও কি এমন একটি নিষ্ঠুর পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছিলেন? না কি সমাজে আমরা কোনো মানবিক বোধের চর্চাই অব্যাহত রাখিনি। সমাজে যে ক্ষয় ধরেছে তাকে রোধ করতে পারিনি। কোথাও একটি সমস্যা চলছে আমাদের মনোজগতে। ভাবতে হবে। লেখক : কবি, সাংবাদিক

সর্বশেষ সংবাদ