ন্যায়বিচার যখন গণমানুষের শেষ ভরসা-ফকির ইলিয়াস

পোস্ট করা হয়েছে 21/01/2017-11:22am:    ফকির ইলিয়াস - যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ প্রতিনিধিঃ ======================================== শেষ পর্যন্ত রসরাজ জামিন পেয়েছেন। গত বছরের ২৯ অক্টোবর ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননার ছবি পোস্ট করার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ফেসবুকে ‘অবমাননাকর’ পোস্ট দেয়ার ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় জামিনে কারামুক্ত হয়ে আড়াই মাস পর বাড়ি ফিরছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রসরাজ দাস। ঘটনা পরিক্রমায় এখন জানা যাচ্ছে মিছেই রসরাজকে ফাঁসানো হয়েছিল। ওই হামলার ঘটনায় নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান আঁখিকে গ্রেফতার করা হয়েছে অতিসম্প্রতি। এর আগে আঁখির ব্যক্তিগত সহকারী উত্তম কুমার দাস (২৫) ও ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মনোরঞ্জন দেবনাথকেও (৪০) আটক করে পুলিশ।
মিডিয়ার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, হরিপুর ইউনিয়ন থেকে ১৪-১৫টি ট্রাক ভরে মানুষ আসার পর নাসিরনগরের হিন্দু পল্লীতে হামলা হয়। যেসব ট্রাকে হামলাকারীরা এসেছিল সেগুলোর ব্যবস্থা ও অর্থের জোগান চেয়ারম্যান আঁখি দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করে।
এরই মধ্যে নাসিরনগরের ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তকারীরা জানতে পারেন রসরাজের মোবাইল ফোন থেকে ধর্মীয় অবমাননার ছবি আপলোড হয়নি। ওই ছবি সম্পাদনা করা হয়েছিল হরিণবেড় বাজারে আল আমিন সাইবার পয়েন্ট এন্ড স্টুডিও থেকে, যার মালিক জাহাঙ্গীর আলম নামে এক ব্যক্তি। জাহাঙ্গীর আলম তার সাইবার ক্যাফে থেকে ধর্মীয় অবমাননাকর ছবিটি প্রিন্ট করে লিফলেট আকারে তা এলাকায় বিতরণ করেন। গত বছরের ২৮ নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়ার পর জাহাঙ্গীর ১৬৪ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তা স্বীকারও করেন। জাহাঙ্গীর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আশুতোষ দাসের নাম বলেন, যিনি রসরাজের ফেসবুক আইডি ও পাসওয়ার্ড জানতেন। কী জঘন্য সংবাদ! কী হীন মানসিকতা! বাংলাদেশে আসলে চলছে একটি দূরাচারী কালচার! এর মূল হোতা কে? কারা এর নেপথ্যে?
খুলনার রূপসা উপজেলায় এক কীর্তন গায়ককে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। উপজেলার পিঠাভোগ গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে প্রফুল্ল বিশ্বাসের (৬০) লাশ উদ্ধার করা হয় বলে জানান রূপসা থানার পরিদর্শক জিয়াউল হক। তিনি বলেছেন, পিঠাভোগ গ্রামের পালপাড়ায় এক অনুষ্ঠানে কীর্তন গেয়ে রাত ১২টার দিকে বাড়ি ফেরেন। স্ত্রী বাবার বাড়ি বেড়াতে যাওয়ায় রাতে একাই বাড়িতে ছিলেন। এরকম গুপ্ত হত্যা চলছে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে। নদীতে লাশ পাওয়া যাচ্ছে। এর প্রতিকার কি? সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার মামলার রায় হয়েছে। রায়ে নারায়ণগঞ্জের বিচারিক আদালত ৩৫ আসামির ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। এই রায়কে দেশের আইন বিশেষজ্ঞরা ‘দৃষ্টান্তমূলক’ বলে অভিহিত করেছেন। নিত্যদিন মানুষ খুনের ঘটনায় যে নারায়ণগঞ্জ খবরের শিরোনাম হতো; সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, বালু উত্তোলন, নদী দখলের কারণে নেতিবাচক খবর হতো নারায়ণগঞ্জ।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার রায়ে জনগণ সন্তুষ্ট হবে। এই ঘৃণ্য অপরাধে যে একটা ভীতির সৃষ্টি হয়েছিল সেই ভীতি দূর হবে। সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার মামলার রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন। আইনমন্ত্রী বলেন, যারা এ ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত এর সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালত পেয়েছেন। আমি যতটুকু আইন জানি, যদি হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হয় তাহলে ফাঁসি দেয়াটা হচ্ছে ফার্স্ট পানিশমেন্ট। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার রায়ে সব আসামির শাস্তি বিচার বিভাগের ওপর মানুষের আস্থা আরো বাড়িয়েছে বলে মনে করেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। বিচারপতি সিনহা বলেছেন, ‘অপরাধী যত বড়ই হোক না কেন, সে দায়মুক্তি পাবে না। চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলা প্রভাবশালী আসামি র‌্যাবের কতিপয় কর্মকর্তা লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, যা সমগ্র জাতিকে স্তম্ভিত করেছে।’ দেশের বিচারাঙ্গনের শীর্ষ পদে নিজের দায়িত্ব নেয়ার দুই বছর পূর্তিতে দেয়া এক বাণীতে এই মত প্রকাশ করেন তিনি। বাণীতে প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মামলা জট, আইনের সংস্কার, বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত ও জনবল সংকট, বিচার বিভাগের সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্ক ইত্যাদি নানা বিষয়ে নিজের মত তুলে ধরেন। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিচার বিভাগের ভূমিকা অপরিহার্য মন্তব্য করে তিনি বলেন, সংবিধানের মূল চেতনায়, বিচার বিভাগ এর সীমার বাইরে গিয়ে অন্য বিভাগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না।
‘তেমনিভাবে আমিও প্রত্যাশা করি রাষ্ট্রের অন্যান্য বিভাগ বিচার বিভাগের দায়িত্ব পালনে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করবে না। দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে অপরিহার্যভাবে সৃষ্ট শীতল সম্পর্ককে ইতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করলে প্রত্যেক বিভাগের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রভূত কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে’- যোগ করেন তিনি। মাননীয় প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন, ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে সব আদালতে ২৭ লাখ ৬০ হাজার ২৪০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। একই সময় ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে দেশের সব আদালতে মামলা নিষ্পত্তির পরিমাণ ছিল ২৪ লাখ ২৩ হাজার ৮৩৮। তিনি বলেছেন, ‘বিগত ২ বছরে মামলা নিষ্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪০২টি। ফলে নিষ্পত্তির হার ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।’ একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে অপরাধ প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন নতুন ধরনের অপরাধ হচ্ছে। সেই তুলনায় আইনের শাসন যথার্থভাবে সফল করা যাচ্ছে না। কেন যাচ্ছে না, তার কারণ খুঁজতে হবে। আমরা দেখছি- একটি শ্রেণি মানুষের স্বপ্ন দখল করতে মরিয়া। সরকার অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ধমক দিয়ে কথা বলবেন আর সরকারের এমপি, মন্ত্রীরা এমন হীন কর্মের মদদ দেবেন- তা তো চলতে পারে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বখাটে, দখলদার, লুটেরা সবাই মানবতার ভিন্নপক্ষ। এরা সব সময়ই সত্য এবং ন্যায়ের বিপক্ষে। বিএনপি-জামায়াতের অমানবিক কর্মকাণ্ড থেকে মুক্তি চেয়েছিল মানুষ। কিন্তু আজ আওয়ামী লীগের ভেতরে ঢুকে পড়া হাইব্রিড লুটেরা ও বখাটে শ্রেণি রাষ্ট্রের মানুষকে আরো অতিষ্ঠ করে তুলছে। এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জরুরি ব্যবস্থা নেয়া দরকার। যে কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির বিষয়গুলোকে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সে জাতি নৈতিকভাবে বলিষ্ঠ হতে পারে না। সুবিচারের দরজা অবারিত হতে হবে সবার জন্য। এখানে ধনী-দরিদ্র, ক্ষমতাবান-অক্ষম, এমন কোনো শ্রেণি বিভেদের প্রশ্ন কখনোই আসা উচিত নয়। অথচ বাংলাদেশে তেমনটিই হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি সেক্টরে বেড়ে ওঠা বেনিয়া শ্রেণি নিয়ন্ত্রণ করছে সাধারণ মানুষের জানমাল। কালো টাকার মালিকরা তাদের ব্যবহার করছে লাঠিয়াল হিসেবে। একটা কথা আমরা জানি এবং মানি, সুবিধাবাদীরাই আগুন লাগা বাড়ির অবশিষ্টাংশ লুটপাট করে নেয়। ওয়ান ইলেভেনের সময়ও আমরা এমন কিছু নব্য লুটেরা দেখেছি। এখন তো দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তাহলে আমাদের এমন ছোবল দেখতে হবে কেন?
বাংলাদেশে পেশিশক্তি ও কালো টাকার এই যে মহড়া দেখানোর প্রতিযোগিতা, তা ধ্বংস করে দিচ্ছে দেশের মননশীল মানুষের মেরুদণ্ড। প্রজন্ম সাহস পাচ্ছে না দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে। বরং তাদেরই কেউ কেউ টেন্ডার, চাঁদাবাজি, ভাগ-বাটোয়ারায় অংশ খেতে কক্ষচ্যুত হয়ে দলীয় সন্ত্রাসী বনে যাচ্ছে। অথচ আমরা জানি, এই বাঙালি জাতির তরুণ প্রজন্মই বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল। তাহলে আজ এই প্রজন্মের এত সামাজিক অবক্ষয় কেন? এর কিছু কারণ আছে। তার অন্যতম হলো রাষ্ট্র মেধাবী প্রজন্মকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে বারবার কার্পণ্য দেখিয়েছে। ফলে পচনশীল সমাজ ব্যবস্থার ছত্রছায়ায় অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত নেতৃত্বের দাপট গণমানুষের স্বপ্নের বাংলাদেশের দখল নেয়ার অপচেষ্টা করেছে। দেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে মানুষ যে চেষ্টা করছে না, তা কিন্তু নয়। তারপরও নিষ্পেষণের করাঘাতে মানুষ বারবার পরাজিত হয়েছে লুটেরা শ্রেণির কাছে। একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র সুসংহত করার জন্য দেশপ্রেম কতটা অপরিহার্য, তা বিশ্বের যে কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পারি।
আমরা জানি, মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত দ্বিগুণের বেশি হয়েছে বাংলাদেশের জনসংখ্যা। ভূমি বাড়েনি। বরং বাসস্থানের অন্বেষণ হরণ করছে ক্ষেতের জমি। তাই জনবহুল এ রাষ্ট্রে অভাব-অভিযোগ বাড়ছে। হয়তো আরো বাড়বে। তাই যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা, মননশীল সমাজ গঠন এবং আইনসিদ্ধ সামাজিক অবকাঠামো বিনির্মাণ ছাড়া এ সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। এ সত্যটি বিশেষ করে দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের অনুধাবন করতে হবে। মানুষের আশ্রয় হচ্ছে ন্যায়বিচার। তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে কোনো মূল্যে। খুনি যে কাউকে ক্ষমা করে না- তা আমরা দেখছি। আমরা দেখছি, ক্ষমতাসীনদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের রূপ। টাঙ্গাইলে মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহম্মেদ হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলার প্রধান আসামি সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা ও তার তিন ভাইকে জেলা আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বহিষ্কৃৃত অপর তিন ভাই হলো- শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার মেয়র শহিদুর রহমান খান মুক্তি, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা এবং টাঙ্গাইল চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও আওয়ামী লীগের সদস্য জাহিদুর রহমান খান কাকন। তাদের বহিষ্কারের পর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা শহরে আনন্দ মিছিল করেছে। টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা ও তার তিন ভাইকে দল থেকে বহিষ্কার করায় ফারুক আহম্মেদের স্ত্রী নাহার আহম্মেদ স্বস্তি প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি স্বামীর হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। ২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি, মুক্তিযোদ্ধা ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহম্মেদকে হত্যা করে শহরের কলেজ পাড়ায় তার বাসার সামনে ফেলে রাখা হয়। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী নাহার আহম্মেদ বাদী হয়ে টাঙ্গাইল মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দীর্ঘদিন তদন্তের পর সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানাসহ চার ভাইয়ের নাম উঠে আসে। পরে এমপি রানাকে প্রধান আসামি করা হয়।
এগুলো কিসের আলামত? সরকারকে তা ভাবতে হবে। না ভাবলে আরো বড় খেসারত তাদের দিতে হতে পারে।

সর্বশেষ সংবাদ