পাঠ্যপুস্তকে ভুল নাকি সর্ষের ভেতরে ভূত-- কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 12/01/2017-08:36am:    কয়েকদিন আগে এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছিলাম। সেখানে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ এক শিশুর হাতে নতুন বই দেখে খুব আগ্রহের সাথে তা উল্টে পাল্টে দেখছিলাম। বাংলা বই দেখতে গিয়ে একটি কবিতায় চোখ আটকে গেল। কবিতার শিরোনাম ‘মানবধর্ম’ লেখক লালন শাহ দেখে ভীষণ চমৎকৃত হলাম। ‘সব লোকে কয় লালন কী জেত (জাত) সংসারে’। এটি মূলত লালনগীতি।’ মানবধর্ম নাম দিয়ে কবিতা আকারে ছাপা হয়েছে বইতে। লক্ষ বা উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে।,“এই পাঠের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বুঝতে সক্ষম হবে যে ধর্ম বা সম্প্রদায়গত পরিচয়ের চেয়ে মানুষ হিসেবে পরিচয়টাই বড়। তারা জাতগত বা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি বা মিথ্যে গর্ব করা থেকে বিরত থাকবে।” এ টুকু দেখে, পড়ে আমি ভীষণ চমৎকৃত হয়েছি। মনটা যেন ভরে গেল আনন্দে। শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে এমন একটি অসাধারণ লেখা সন্নিবেশিত করায় আমি মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন কমিটিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে, সরকারকে। যে বয়সে শিশুদের যথার্থ বিকশিত হওয়ার সময় সে সময় তাদের সামনে এমন অসাধারণ একটি দর্শন ও সত্য তুলে ধরার জন্য আমি ভীষণ আনন্দিত হয়েছি। ভেবে রেখেছিলাম সরকারের এই মহৎ উদ্দেশ্য, লক্ষ ও সাফল্য নিয়ে একদিন কিছু লিখব। লিখব কারণ আমি ১ জানুয়ারির বই উৎসবকে শুধু উৎসব হিসেবে নয়, একটি বিপ্লব হিসেবে দেখি। একদিনে এক কোটির ওপর শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া খুব সহজ কাজ নয়। বিশ্বের অর্ধেকের চেয়ে বেশি দেশ আছে যাদের জনসংখ্যাও এক কোটি নেই। বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে ইউরোপের কোনো কোনো দেশের সকল নাগরিককে একদিন এক সেট বই তুলে দেওয়ার মতো ঘটনা। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বেশি বলে, কিংবা বাঙালিরা প্রশংসাকৃপণ বলে এমন একটি ঘটনা নিয়ে, সাফল্য নিয়ে খুব বেশি উচ্চবাচ্য নেই দেশে। ৩৫ কোটির অধিক বই একদিনেই এবং বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার মতো ঘটনা বিশ্বে বিরল। তাই বই উৎসবটিকে আমি বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করেছি। বর্তমান সরকার ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠা করতে চায় একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। কাজেই সে লক্ষে সরকার শিক্ষাব্যবস্থাসহ নানা কিছু ঢেলে সাজাবে তা-ই স্বাভাবিক। বর্তমানে বিশ্ব পরিস্থিতি মানবতার, অহিংসার, ভালোবাসার পক্ষে নয়। ইসলামী জঙ্গিবাদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে নানা ধর্মীয় ও বর্ণবাদী গোষ্ঠী। এর মধ্যে ইসলামী জঙ্গিদের আক্রমণে মুসলিম দেশসহ বিভিন্ন দেশে প্রতিদিন প্রচুর সাধারণ ও নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। চিরজীবনের জন্য পঙ্গু হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। বাংলাদেশও জঙ্গিবাদের হুমকির মধ্যে আছে। ইতিমধ্যে জঙ্গিবাদী তৎপরতায় ভয়াবহ ও নারকীয় হত্যাকান্ডের ঘটনাও ঘটেছে। জঙ্গিরা প্রথমে টার্গেট কিলিং পরে গুপ্তহত্যা এবং শেষের দিকে হোটেল আর্টিজান ও শোলাকিয়ার ঈদের জামাতে হামলার মতো প্রকাশ্য তৎপরতায় এসেছে। এখনো কিছুদিন পর পর জঙ্গি আস্তানা আবিষ্কৃত হচ্ছে। সেখান থেকে গ্রেফতার করা হচ্ছে অনেক জঙ্গিকে। সম্প্রতি এক অভিযানে দুর্ধর্ষ জঙ্গি জাহেদ, মারজান নিহত হয়েছে। অন্যদিকে সমাজেও এখন ধর্মীয় প্রভাব অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের ভেতর সাম্প্রদায়িকতা, কূপমন্ডুকতা, অমানবিকতা এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সমাজে উদারতা, সৌভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধ অনেকাংশে কমে গেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান ঘটেছিল তারা এক নাগাড়ে ২১ বছর এবং পরবর্তীতে ২০০১ থেকে ২০০৬ মিলিয়ে মোট ২৬ বছর এ দেশে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়েছে নানা ক্ষেত্রে। এর জন্য তারা ইতিহাসে মিথ্যা তথ্যের সমাবেশ ঘটিয়েছে। শিক্ষাক্রমে ও পাঠ্যপুস্তকে মিথ্যা, বানোয়াট কাহিনি ছেপেছে। ধর্মীয় উসকানির মাধ্যমে অন্ধ, কূপমন্ডুক ও সাম্প্রদায়িক প্রজন্ম তৈরি করেছে। এখন সমাজে তার চিত্র ও ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করছি আমরা। এই অপশক্তির সমর্থকরা সমাজ থেকে বিলীন হয়ে যায়নি। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আছে বলে তারা নিশ্চিহ্নও হয়ে যায়নি। তারা ঘাপটি মেরে বসে আছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে। সুযোগ বুঝে তারা তাদের ইঞ্ঝিত কাজটি সিদ্ধ করে নেয়। শিক্ষাক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী কী ধরনের প্রসার ঘটিয়েছে তা বাংলাদেশের সচেতন মানুষ মাত্রই অবগত আছেন। শুরু থেকেই তারা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রচুর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে যেখানে মূলত সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের শিক্ষাটিই প্রদান করা হয়। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার জন্য কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে। অষ্টম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইতে ‘মানবধর্ম’ নামের লালনগীতিটি অন্তর্ভুক্ত করা তারই একটি অংশ। কিন্তু পূর্বেই যে বলেছি সরকারের নানান স্তরে জামায়াতি তথা প্রতিক্রিয়াশীল তথা জঙ্গিবাদী ভাবধারার লোকজন রয়ে গেছে, তাদের প্রচেষ্টা ও কারসাজিতে সরকারের ভালো উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে। মানবধর্ম কবিতাটি দেখে আমি যে উদ্দীপ্ত হয়েছিলাম তা দুদিনেই চুপসে গেল যখন পাঠ্যসূচির নানা স্তরে ভুল, বিচ্যুতি ও বিকৃতির সংবাদ প্রকাশ হতে থাকল। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম পাঠ্যপুস্তক সংশোধন যা মূলত বিকৃতি সেখানে সাম্প্রদায়িক শক্তির কীভাবে বিজয় হয়েছে। আমার চুপসে যাওয়া, অবাক বা বিস্মিত হওয়া শেষ অবধি হতাশায় রূপান্তরিত হলো যখন দেখলাম এই বিকৃতির জন্য হেফাজতে ইসলাম ও চরমোনাইয়ের পীর সরকারকে ধন্যবাদ জানায়। অর্থাৎ বুঝে গেলাম এই অপশক্তি কীভাবে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। এক্ষেত্রে তারা বিজয় লাভ করেছে। অথচ দাবি ছিল, একটি উদার উন্নত, শিক্ষিত, অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ একটি জাতি গঠনের লক্ষে মাদ্রাসা বিশেষ করে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন আনার। তাদের পাঠ্যসূচিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর জীবনী অন্তর্ভুক্ত করার। তাদের পাঠ্যপুস্তক থেকে জঙ্গিবাদে উসকানি দেয়, অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ায় এমন কিছু বাদ দেওয়ার। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। এখনো মাদ্রাসায় পড়ানো হয় বাংলাদেশ চেতনাবিরোধী লেখা আর মূল শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়া হয় প্রকৃত, সাহসী লেখকদের লেখা। কওমী মাদ্রাসাগুলোয় কোনো অমুসলিম মনিষীদের লেখা, জীবনী বা অবদান পড়ানো হয় না। এর ফলে কোনো শিক্ষার্থী পূর্ণ জ্ঞান নিয়ে বিকশিত হয় না। পৃথিবীর সমুদয় আলো থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, চিকিৎসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্পকলায় পৃথিবী আজ যেখানে এসেছে তার পেছনেতো অমুসলিম মনীষীদের অবদানই সবচেয়ে বেশি। অমুসলিম বলে তাদের লেখা এবং তাদের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কিছু জানতে না দেওয়া মানেতো তাকে জোর করে অন্ধ করে রাখা। ইহুদী-নাসারা বলে তাদের গালিগালাজ করে তাদের উদ্ভাবনকে ব্যবহার করার মধ্যে প্রতারণা, শঠতা, নীচুতা, ক্ষুদ্রতাই আছে শুধু সততা নেই। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অনুমোদিত বইগুলোতে যে ভুল আছে তার মধ্যে কিছু আছে অমনোযোগিতা ও অসতর্কতাজনিত। যা সংশোধনযোগ্য। যেমন বানান ও বাক্য গঠনে ভুল, তথ্যগত বিকৃতি ইত্যাদি। এই কারণে শিক্ষামন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এবং এ পর্যন্ত তিনজনকে ওএসডি করেছেন। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির যে অনুপুবেশ ঘটেছে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। তাই আমরা এখনো জানি না এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান শেষ পর্যন্ত কী হবে। আমরা আওয়ামী লীগ এবং এই সরকারের ওপর আস্থা রাখতে চাই যে, তারা সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী অপশক্তির কাছে নতজানু হবে না। এবং তাদেরকে কখনোই নিজেদের মিত্র হিসেবে বিবেচনা করবে না। এই দেশের সাম্প্রদায়িক শক্তি যে কখনোই আওয়ামীলীগের পক্ষে থাকবে না তার নজির ইতিহাসে বহুবার আছে। বরং আওয়ামীলীগকে মনে রাখতে হবে যে দল বা সরকারের কোনো কাজের প্রশংসা যখন এই গোষ্ঠী করবে তখন বুঝতে হবে আওয়ামীলীগ তার নিজের অবস্থানে নেই। এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তার কল্যাণে শিক্ষার্থীরা এখন পরীক্ষার্থীতে পরিণত হয়েছে। তাঁর কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে আমাদের মূল ধারার শিক্ষায় এত নিরীক্ষা না চালিয়ে মাদ্রাসাগুলোকে কীভাবে মূলধারায় আনা যায় সে চেষ্টা করা। কারণ দেশের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী এখন মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়াশোনা করছে। তাদের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে আনতে না পারলে আমাদের সমস্যা দিনদিন আরও বাড়তে থাকবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভুল ইতিহাস পড়ে জঙ্গিবাদী শিক্ষা নিয়ে বড় হবে আর দেশে জঙ্গিবাদী হামলা হবে না তাতো হতে পারে না।

সর্বশেষ সংবাদ
কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।  তথ‌্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি মহোদয়ের শুভ জন্মদিন আজ