জননিরাপত্তায় রাষ্ট্র ও সমাজের সফলতা-ব্যর্থতা- ফকির ইলিয়াস : কবি ও সাংবাদিক।

পোস্ট করা হয়েছে 07/01/2017-04:43pm:   
একটি রাষ্ট্রে জননিরাপত্তা যখন ভেঙে পড়ে, তখন মানুষের অসহায় না হয়ে উপায় থাকে না। একজন এমপিকে খুন করা হয়েছে। তার নিজ বাড়িতেই তিনি খুন হয়েছেন। মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন গাইবান্ধার এমপি ছিলেন। তিনি ক্ষমতাসীন দলেরই একজন সংসদ সদস্য। এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত করতে পারেনি সরকারি বিভিন্ন বাহিনী। সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যার ঘটনাকে সন্ত্রাসীদের নতুন কৌশল বলে মনে করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনমনে আতঙ্কের জন্য এই কৌশল হতে পারে। তদন্তে সব কিছুকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে।
গাইবান্ধায় এমপি লিটন নানা কারণেই আলোচিত ছিলেন। তিনি মৌলবাদী-জঙ্গিবাদীদের ঘাঁটি বলে পরিচিত এলাকাটিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাহস নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি প্রায় একাই ওই এলাকায় ঘাতক রাজাকার শিরোমনি গোলাম আযমকে ঠেকিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে লিটনের স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি সাংবাদিকদের বলেছেন, বিগত ১৯৯৮ সালের ২৬ জুন সুন্দরগঞ্জ ডিডাব্লিউ ডিগ্রি কলেজ মাঠে জামায়াত-শিবির আয়োজিত জনসভায় গোলাম আযমের বক্তব্য দেয়ার কথা ছিল। সে সময় স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের এই সভা পণ্ড করে দিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ লিটন তার বন্দুক হাতে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ওই জনসভায় প্রবেশ করে গোলাম আযমকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়েন। এতে জনসভাটি পণ্ড হয়ে যায়। ফলে সেই থেকে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার বাহিনী লিটনকে যে কোনো মূল্যে হত্যার টার্গেট করে রেখেছিল। সে সময় তার গুলিতে আহত জামায়াতের ফতেখাঁ গ্রামের ক্যাডার হেফজসহ আরো দুর্ধর্ষ জামায়াত ক্যাডাররা লিটনকে মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে এবং মোবাইল করে দীর্ঘদিন থেকেই হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল।
এই নির্মম হত্যা তারই জের বলে উল্লেখ করে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, গোলাম আযমের ওই সভা পণ্ডের রেশ ধরেই জামায়াত-শিবিরের খুনিরাই তার স্বামীকে হত্যা করেছে। তিনি মর্মান্তিক এই হত্যার বিচার চান এবং দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ২০১৫ সালের ২ অক্টোবর ভোরে শিশু শাহাদত হোসেন সৌরভকে গুলি ছোড়ার একটি পরিকল্পিত মিথ্যা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমপি লিটনের লাইসেন্সকৃত রিভলবার ও শটগান জব্দ করে নেয়া হয়। খুনি জামায়াত-শিবির চক্র জানত তার বাড়িতে তাদের প্রতিরোধ করার মতো কোনো অস্ত্র নেই। সেই সুযোগে বাড়িতে এসে পরিকল্পিতভাবে খুনিরা তাকে হত্যা করতে সাহসী হয় বলে স্মৃতি জানান। প্রয়াত এমপির স্ত্রী যে কথাগুলো বলেছেন তা সবার ভেবে দেখা দরকার। তিনি বলেছেন, প্রতিদিন বিকেলে অনেক নেতাকর্মী বাড়িতে থাকতেন। এ ছাড়া তার বাড়িতে পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা ছিল রাতে। সাধারণত সন্ধ্যার আগেই নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে এমপি লিটন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে বামনডাঙ্গা রেলস্টেশন-সংলগ্ন তার অফিসে গিয়ে বসেন এবং রাত ৯টা থেকে ১০টা অবধি সেখানে থাকেন। কিন্তু কেন জানি না সেদিন কোনো নেতাকর্মী তার বাড়িতে ছিলেন না। ..তিনি ও তার ভাই বাড়ির উঠানের রান্নাঘরের কাছে ছিলেন। সে সময় গুলির শব্দ শুনতে পান এবং লিটন ঘর থেকে বাড়ির ভেতর দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে বলেন, ওরা আমাকে গুলি করেছে, আগে ওদের ধর। এ সময় তিনি বুকে হাত দিয়ে ছিলেন এবং বুকের বাম পাশ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। কী মর্মান্তিক দৃশ্য! এটাই কি দেখতে চেয়েছিল এই বাংলাদেশ? লিটন হত্যার মাধ্যমে কে কি মেসেজ দিতে চেয়েছে সরকারকে? সরকার কি তা পাচ্ছে?
এর আগেও আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রীরা ঘাতকের হাতে খুন হয়েছেন। গত ১২ বছরে গুলি ও গ্রেনেড হামলায় নিহত হন আওয়ামী লীগের তিন এমপি-মন্ত্রী। ২০০৪ সালে গাজীপুরে হত্যা করা হয় আহসান উল্লাহ মাস্টারকে। পরের বছর হবিগঞ্জে বোমা হামলায় প্রাণ হারান সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া। এসবের এক দশক পেরিয়ে গেলেও একটি মামলারও চূড়ান্ত রায় আসেনি। এদিকে গত কয়েক বছরে জঙ্গি সংগঠনের নামে হত্যার হুমকি পেয়েছেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ নানা শ্রেণি-পেশার অন্তত ৫০ জন।
টঙ্গীতে এক জনসভায় গুলি করে হত্যা করা হয় আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টারকে। হবিগঞ্জে জনসভা শেষে বের হয়ে যাওয়ার সময় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ হত্যা করা হয় তিনজনকে। এ ঘটনায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সিলেটের বরখাস্ত সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান, মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি তাজউদ্দিনসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়। ২০১৫ সালের জুনে সিলেটের দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে শুরু হয় বিচার। এক দশকেরও বেশি সময় পার হলেও নিষ্পত্তি হয়নি বিচার কাজ।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য (সাবেক ও ক্ষমতাসীন) আততায়ীদের হাতে নিহত হয়েছেন। ১৯৭২ সালের ৬ জুন সন্ত্রাসীরা খুলনা থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত আব্দুল গফুরকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর ১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারি সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন বরিশালের মঠবাড়িয়া থেকে নির্বাচিত এমপি সওগাতুল আলম সহুর। একই বছরের ৩ মে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থেকে নির্বাচিত নুরুল হককে হত্যা করা হয়। ১৯৭৪ সালের ১০ জানুয়ারি হত্যা করা হয় ভোলা থেকে নির্বাচিত এমপি মোতাহার উদ্দীন আহমেদকে। একই বছরের ১৬ মার্চ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন নরসিংদীর মনোহরদী থেকে নির্বাচিত এমপি ফজলুর রহমান। ওই বছরই ১ আগস্ট ও ডিসেম্বরে মাত্র চার মাসের ব্যবধানে হত্যা করা হয় ময়মনসিংহের এডভোকেট ইমান আলী এমপি এবং কুষ্টিয়ার কুমারখালী আসন থেকে নির্বাচিত এমপি গোলাম কিবরিয়াকে। আর ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি হত্যা করা হয় নেত্রকোনার সাংসদ আব্দুল খালেককে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। মন্ত্রিসভার সদস্য ও আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি আব্দুর রব সেরনিয়াবাতকেও সে রাতে হত্যা করে ঘাতকরা। এসব ঘটনা জাতি ভুলবে কি করে?
এ হামলা অব্যাহত রয়েছে। খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জেড এ মাহমুদকে (ডন) লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে দুর্বৃত্তরা। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এক পথচারী নারীর গায়ে লাগে। শিপ্রা কুরুর (৫০) নামের ওই নারীকে হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
খবর বেরিয়েছে- গাইবান্ধায় এমপি লিটন খুন হওয়ার পর জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত ২২ জেলার এমপিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদর দফতর থেকে ওই সব জেলার এসপিদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। ওইসব জেলার এমপিদের সার্বক্ষণিক গানম্যানের পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশি তৎপরতা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে এমপিদের পরামর্শও নিতে বলা হয়েছে। এর আগে ঝিনাইদহ-৪ আসনের এমপি আনোয়ারুল আজিম খুন হওয়ার আশঙ্কায় থানায় কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। ওই এমপিরও নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঝুঁঁকিপূর্ণ জেলাগুলো হচ্ছে নীলফামারী, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, বগুড়া, ফেনী, লক্ষীপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, সিলেট, ঝিনাইদহ, নারায়ণগঞ্জ, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, পাবনা, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এটি ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার। বাংলাদেশের সব আসনের এমপিকেই গানম্যানসহ ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেয়া দরকার। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও এর সমমর্যাদার সবারই নিরাপত্তা আরো জোরদার করা দরকার। কারণ সব কিছু পেরিয়ে ২০১৭ সাল চোরাগোপ্তা হত্যার বছর হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মনে রাখতে হবে ঘাতকরা কিন্তু বসে নেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তাই সরকার ও নীতিনির্ধারকদের হাত গুটিয়ে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক সফলতার অনেক দিক আছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ব্যর্থতা দৃশ্যমান। এটা কাটিয়ে উঠতে হবে। মনে রাখা দরকার, আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কখনো শেষ হয় না। আর হয় না বলেই রাজনীতিকদের চোখ-কান খোলা রাখতে হয়। সিদ্ধান্ত নিতে হয়- গণমানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে। ------------------------------------------

সর্বশেষ সংবাদ
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়ম দুর্নীতি অনুসন্ধান করা হবে: দুদক চেয়ারম্যান কক্সবাজার রেড জোন,শনিবার থেকে আবারো লকডাউন এবার ঘরে বসে তৈরি করুন জিভে জল আনা কাঁচাআমের জুস সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সফল অস্ত্রোপচার, দোয়া কামনা চট্টগ্রামের -১৬ বাঁশখালীর এমপিসহ পরিবারের ১১ সদস্য করোনা আক্রান্ত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্র্ধ্বগতিতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে আজ বছরের দ্বিতীয় চন্দ্রগ্রহণ পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হওয়ার নি‌র্দেশ আইজিপি’র  তথ‌্যমন্ত্রী  ড. হাছান মাহমুদ এমপি র  শুভ জন্মদিনে শুভ কামনা।