সব দায় কি শুধু শেখ হাসিনার- কামরুল হাসান বাদল-কবি ও সাংবাদিক

পোস্ট করা হয়েছে 15/12/2016-09:34am:    ১। ভদ্রলোক আমার স্বল্প পরিচিত। পথে-ঘাটে কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা হলে, কেমন আছেন? কিংবা আপনার অমুক দিনের লেখাটি পড়েছি। এ ধরনের কথাবার্তা হয়। একদিন ফোনে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, একটি তথ্য জানার জন্য ফোন করলাম। কুশল বিনিময়ের পর বললাম বলুন। শেখ হাসিনা কি মিয়ানমারেরও প্রধানমন্ত্রী? জানতে চাইলেন তিনি। প্রশ্নটি শুনে প্রথমে একটু চমকে গেলাম। স্বাভাবিক হয়ে সামান্য পরে বললাম কেন বলছেন। ‘একটি জায়গায় দেখলাম ব্যানারে লেখা-রোহিঙ্গাদের হত্যা কেন শেখ হাসিনা জবাব চাই। তাঁর স্যাটায়ারটি বুঝতে পেরে হেসে বললাম তাই না কি। কী আর করবেন? তারপর বেশ উত্তেজিত কণ্ঠে তিনি সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার বর্ণনা দিলেন। তাঁর অনেক কথা আমার কাছে বেশ যৌক্তিক বলেই মনে হয়েছে।
২। নারায়নগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী প্রচারণা এখন তুঙ্গে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে এবার সেলিনা হায়াত আইভিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। গতবার তিনি ছিলেন বিদ্রোহী প্রার্থী। আইভির চরম প্রতিদ্বন্দ্বী শামীম ওসমান এবার ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে আইভিকে সমর্থন দিচ্ছেন। গত কয়েকদিন আগে তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী আদেশ দিলে তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করে আইভির জন্য প্রচারণায় অংশ নেবেন। নারায়নগঞ্জের আওয়ামী লীগের রাজনীতি এবং তাতে শামীম ওসমান ও আইভিদের অবস্থান আজ আবার উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। পাঠক মাত্রই তা জানেন। গতবার আইভি আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন কিন্তু নির্বাচনে তিনিই জয়লাভ করেছিলেন। তবে পরে দল তাকে ক্ষমা করে এবং তিনি আওয়ামী লীগের একজন হিসেবেই মেয়রের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এ বিষয়ে লক্ষণীয় গতবার যখন আইভি আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন তখন আইভির প্রতি কিছু সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন যেমন সহানুভূতিশীল ছিলেন এবার আওয়ামীলীগের সরাসরি প্রার্থী হওয়ায় এবার তা দেখা যাচ্ছে না। বরং কেউ কেউ উল্টো আইভির দোষ-ত্রুটি, দুর্বলতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। অনেকে তাঁকে আক্রমণের লক্ষ বস্তুতে পরিণত করেছেন।
৩। আওয়ামীলীগ একটি ‘মাল্টিক্লাশ’ ও সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক দল। এই দল ক্ষমতার রাজনীতি করে। কাজেই যে কোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনমুখি একটি দল। এই দল যারা করেন তারা তাই সাধারণ মানুষের আবেগ-অনুভূতি, ঘৃণা-প্রত্যাখান, গ্রহণ-বর্জন ইত্যদিকে মূল্য দেন, বিবেচনা করেন। বিশ্বের সবদেশেই এ ধরনের রাজনৈতিক দলগুলো এই কাজটিই করেন। এটি কোনো ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক দল নয়। (সশস্ত্র ক্যাডার নয় এই ধরনের ক্যাডারের আবার অভাব নেই এই দলে) সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সংগঠন বলে এর কর্মী সমর্থকদেরও সঠিক কোনো তথ্য নেই বা থাকে না এমন দলগুলোর কাছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে গিয়ে একদিন আইভির সমর্থকরা আইভিকে একটি পিতল দিয়ে নির্মিত নৌকা প্রতীক উপহার দেন। নৌকার ওপর অক্ষর কেটে লেখা আরবিতে আল্লাহু আকবর। এই নৌকা হাতে আইভির ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই নৌকা যখন আইভিকে দেওয়া হয় তখন সম্ভবত তার সমর্থকরা োগানও দিয়েছে। আল্লাহু লেখা সম্বলিত ছবিটি সাথে সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। ব্যস এবার ক্ষেপে ওঠেন অনেকে, যাদের অধিকাংশ গত নির্বাচনে অন্ধভাবে আইভিকে সমর্থন করেছিলেন। তারা আইভির হাতে আল্লাহু লেখা নৌকা দেখে আওয়ামী লীগের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করতে নেমে পড়েন। একজন প্রবাসী লিখলেন, আগে আওয়ামীলীগ ছিল মুসলিম আওয়ামীলীগ পরে আওয়ামী লীগ এখন আবার আওয়ামী মুসলিম লীগে পরিণত হয়েছে। এমন কিংবা এর চেয়েও আরও বেশি আক্রমণাত্মক স্ট্যাটাস লেখা হয়েছে যা এখানে উল্লেখ করা বাহুল্য মনে করছি, কারণ আমি আলোচনাটি এ মন্তব্যটি ধরেই করতে চাই। আল্লাহু লেখা সম্বলিত এই নৌকা আইভির হাতে দেখে যারা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন তাদের কাছে আমার বিনীত প্রশ্ন, সেদিন যখন আইভির সমর্থকরা তাঁকে এই নৌকা দিচ্ছিলেন তখন নৌকায় আল্লাহু লেখা দেখে তা গ্রহণ না করাই কি সমীচিন ছিল আইভির? মানে নৌকায় আল্লাহু লেখা দেখে তা গ্রহণ না করে সমর্থকদের ফিরিয়ে দিয়ে, এটা আমার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয় বলাই কি উচিত ছিল আইভির? এখন তার হিন্দু অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকায় তার সমর্থকরা কৃষ্ণের বাঁশি বাজানোর ছবিসহ নৌকা প্রতীক উপহার দিলে আইভি কি তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলতে পারবেন, ‘এই প্রতীক আমি গ্রহণ করতে পারব না।’ বাস্তবতা না বুঝে, তাকে মোকাবেলা না করে নিরাপদ দুরত্বে থেকে ভাইরালি অনেকে বিপ্লবী হয়ে উঠতে পারেন। তা সহজও ভীষণ। যারা প্রতিনিয়ত মাঠে ময়দানে থাকেন গণমানুষের রাজনীতি করেন তারাই পরিস্থিতি বুঝে রাজনীতি করেন? নিরাপদ দূরত্বে থেকে কিংবা দু-চার পাঁচজন কর্মী সমর্থক নিয়ে চায়ের টেবিলে বা ফেসবুকে ঝড় তোলা আর বাস্তবতাকে মোকাবেলা করা এক কথা নয়। সমাজকে প্রগতির পথে আনতে, মানবতার পথে আনতে, আলোর পথে আনতে সামান্যতম অবদান না রেখে আজ সবকিছুর জন্য আওয়ামীলীগ আর শেখ হাসিনাকে দায়ী করা একটি ‘ফ্যাশনে’ পরিণত হয়েছে। যে বেশি বেশি আওয়ামীলীগ ও শেখ হাসিনাকে গালাগাল করেন তিনি বা তাঁরা যেন ততই ‘ইন্টেলেকচুয়াল।’
৪। সংবিধানে বিসমিল্লাহ কেন? দায়ী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম কেন? দায়ী শেখ হাসিনা। পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি কেন? দায়ী শেখ হাসিনা। মাদ্রাসায় জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না দায়ী শেখ হাসিনা। মন্দিরে আক্রমণ কেন? দায়ী শেখ হাসিনা। সমাজ এত সাম্প্রদায়িক কেন? দায়ী শেখ হাসিনা। জঙ্গিবাদের উত্থান কেন? দায়ী শেখ হাসিনা। এমন অজস্র ঘটনা ও কারণের জন্য শেখ হাসিনাকে দায়ী করা হয় যা এখানে লিখে শেষ করা যাবে না। এর উত্তর দেওয়ার আগে আরবি কবি কাহলিন জিবরানের একটি গল্প বলি। সম্ভবত এটি এই কলামে আগেও একবার লিখেছিলাম। আরবদেশে এক সময় সাধারণত ঘোড়া বা উটে চড়ে যাতায়াত করতো। এমনই এক লোক সারাদিন ঘোড়ায় করে সন্ধ্যার দিকে একটি সরাইখানায় আশ্রয় নিলেন, বাইরে তার ঘোড়াটি বেঁধে রেখে। সকালে ঘুম থেকে জেগে সরাইখানার বাইরে যেখানে ঘোড়াটি বেঁধেছিল সে, দেখে ঘোড়াটি নেই। চুরি হয়ে গেছে। লোকটি ঘোড়া হারিয়ে মাথায় হাত দিয়ে কান্নাকাটি করতে লাগল।দিনের বেলা ওই পথ দিয়ে যারাই যায় তারাই তাকে জিজ্ঞেস করে কাঁদবার কারণ। শুনে একজন বলে, ভালোই হয়েছে, তুমিতো বোকা। ঘোড়া বাইরে রেখে ঘুমাচ্ছিলে কেন? আরেকজন বলে, বোকা, ঘুমাচ্ছিলে ভালো কথা, রাতে একবার দুবার ঘোড়াটি আছে কি-না দেখেও যাবে না। এভাবে সবাই ঘোড়া চুরি হওয়ার জন্য ঘোড়ার মালিককেই দায়ী করে গেল। এক পর্যায়ে লোকটি এমন একটি দলকে থামিয়ে দিয়ে বলল, চুপ কর তোমরা। ঘোড়া চুরি হয়েছে আমার। আর সে ভোর থেকে তোমরা শুধু আমাকেই গালাগাল করে যাচ্ছ। যে ঘোড়া চুরি করেছে তাকে তো তোমরা একটি গালিও দিলে না।
যে প্রগতিশীলরা আজ বিসমিল্লাহ, নিয়ে রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে, জঙ্গিবাদ নিয়ে, সমাজে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার নিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া নিয়ে শেখ হাসিনাকে গালাগাল করেন তারাতো কখনো ওই সমস্যাগুলো যিনি বা যারা সৃষ্টি করে গেছেন তাদের বিরুদ্ধে টু শব্দটিও করেন না। এর কোনোটিইতো শেখ হাসিনা বা তার দলের সৃষ্ট সংকট নয়। বরং এই দলই সংবিধানে- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা সন্নিবেশিত করেছিল। এই দল বা এই দলের নেতা বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার পর দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেছিলেন। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও ধর্মনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন করেছেন জেনারেল জিয়া। স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসিত করেছেন, তাদের মন্ত্রী বানিয়েছেন, ধর্মীয় রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করেছেন। সমাজে ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি করেছেন। জেনারেল এরশাদ তার পূর্বসূরী জিয়ার আদর্শ সমুন্নত রেখেছেন। এক পা এগিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এবং তাঁর সময়েই সমাজকে বেশি বেশি সাম্প্রদায়িক করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এরশাদ এদেশে সংখ্যালঘু পরিবার ও মন্দিরে হামলা চালিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করেছে। দেশে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেছে। জিয়াউর রহমান পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের পুনর্বাসিত করতে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে চিরস্থায়ী অশান্তি তৈরি করে দিয়ে গেছেন। ১৯৭৫ এর পর জিয়া-এরশাদ-খালেদা সব মিলিয়ে মোট ২৬ বছর দেশের মৌলিক নীতি বিরোধী কাজ করে গেছেন। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রটিকে ক্রমে ক্রমে একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা করেছেন। সামরিক শাসন দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করেছেন। সমাজে দুর্নীতির অবাধ বিস্তার ঘটিয়েছেন। এবং সমাজে আদর্শ ও মূল্যবোধের অপমৃত্যু ঘটিয়েছেন।
৫। দেশের মধ্যে অবস্থিত হলেও ধর্মীয় ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি বিশেষ এলাকা। এখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। তাদের ভূমি ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে প্রায় সকলকিছুই দেশের সমভূমিতে বসবাসরতদের চেয়ে আলাদা। জিয়াউর রহমান সেখানে বাঙালি মুসলমানদের জোর করে ‘সেটল’ করতে গিয়ে যে অশান্তি, অবিশ্বাস আর সংঘাত তৈরি করে দিয়ে গেছেন তা থেকে মুক্তির পথ আছে বলে মনে হয় না। ১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনা শান্তি বাহিনীর সাথে শান্তিচুক্তি করেন। চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধারা এখনো বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়নি। এই শান্তি চুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত না হওয়ার পেছনে কী কারণ এবং কোন কোন গোষ্ঠী তার বিরোধীতা করছে তা দেশের বোদ্ধা শ্রেণির না জানার কথা নয়। কিন্তু তারপরও তাঁরা যখন এর জন্য শুধু একমাত্র শেখ হাসিনা বা তার সরকারকে দায়ী করেন তখন তাঁদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ জাগ্রত হয় আসলে তাঁরা কাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে চাইছে। বা পরোক্ষে তাঁরা কাদের পক্ষে বলছেন। বিশ্বে ধর্মীয় উন্মাদনা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উন্মাদনা থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থে ও অস্ত্রে গঠিত আইএস নামক ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী শুধু মুসলিম বিশ্বের জন্যই নয় সারা বিশ্বের সব দেশের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশেও এদের আদর্শিক অনুসারী আছেন অনেকে। ’৭৫ এর পর থেকে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় মধ্যপ্রাচ্যের টাকা এসেছে হাজার হাজার কোটি। দেশের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেক পড়াশোনা করে এসব মাদ্রাসায়। যেখানে মুক্তিযুদ্ধ বা আমাদের গৌরবের ইতিহাস পাঠ নিষিদ্ধ। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একটি সাম্প্রদায়িক দল-রাষ্ট্র ক্ষমতায়। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে চলছে রোহিঙ্গা নির্যাতন, যারা ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলিম। এই পরিস্থিতিতে ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশে, যাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে ‘রাষ্ট্র’ নামক একটি ধারণারও ধর্ম থাকে সেখানে একটি সেক্যুনার রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিচালনা খুব সহজসাধ্য নয়।
রাষ্ট্র অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক গড়ে তোলার জন্য ব্যাপক জনসমর্থনেরও প্রয়োজন। শেখ হাসিনার সরকার ‘নারী নীতি’ ঘোষণার পর পর এর বিরুদ্ধে প্রথমবার প্রতিবাদ সমাবেশের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে ‘হেফাজতে ইসলাম’। তারা সরকারকে নারী নীতি প্রত্যাহারের দাবি জানায়। এবং এর বিরুদ্ধে ১৩ দফা দাবি পেশ করে। আমি বিনীতভাবে জানতে চাই তখন হেফাজতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোন কোন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, নারী সংগঠন রুখে দাঁড়িয়েছিল। সাঈদীর রায়ের পর সারা দেশে যেভাবে সন্ত্রাস চালিয়ে কোনো কোনো স্থানে সরকার তথা প্রশাসনকে অসহায় অবস্থায় নিপতিত করেছিল তখন দেশের আর কোন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছিল। সাম্প্রদায়িক আক্রমণ হওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনের আগে কোন কোন রাজনৈতিক দল বা অন্যান্য সংগঠন এসব নির্যাতিত মানুষের পাশে মানুষের সাথে দাঁড়িয়েছিল। ঘটনা ঘটার পর নিন্দা জানানো ছাড়া সমাজে এ ধরণের ঘটনা রোধে তাদের দলীয় বা সাংগঠনিক কী কী ব্যবস্থা ছিল।
৫। আমি বলছি না সবকিছুতেই সরকারের অর্থাৎ শেখ হাসিনার পক্ষে থাকলে হবে। অবশ্য সরকারের ভুল কাজের সমালোচনা হবে। সঠিক পথে পরিচালনার জন্য একটি প্রেসার গ্রুপ থাকতে হবে। দেশে যেখানে একটি যথার্থ বিরোধী দল নেই সেক্ষেত্রে অন্যান্য উপায়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। তাই বলে সবকিছু শেখ হাসিনার কাঁধে চাপিয়ে দিলে তো চলবে না। নিজেদেরও অনেক দায়িত্ব পালন করতে হবে। আওয়ামী লীগ যদি আবার আওয়ামী মুসলিম লীগ হয়েও থাকে তার জন্য এই দলকে এককভাবে দায়ী করা যাবে না। স্বাধীনতার ৪৫ বছরে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীরাই ২৬ বছর ক্ষমতায় ছিল। এই রাষ্ট্রটিকে, এই সমাজটিকে তারাই দিনে দিনে সাম্প্রদায়িক বানিয়ে রেখে গেছে। এই জঞ্জাল পরিষ্কার করা একা সরকারের দায়িত্ব নয়। জনগণকেই এগিয়ে আসতে হবে। আর জনগণকে উজ্জীবিত করার দায়িত্ব সবাইকে নিতে হবে। আমরা যারা একটি উদার প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা চাই।
একটি সময় বলা হতো, শেখ হাসিনা তার পিতার হত্যার বিচার করতে পারবেন না। কিংবা করবেন না। অথচ শেখ হাসিনা তা করেছেন। এবং তা দেশের প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থার অধীনে করেছেন। বিশ্বের অনেক জাতীয়তাবাদী নেতা, যারা এভাবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নিহত হয়েছিলেন কিন্তু তাঁদের অধিকাংশেরই হত্যার বিচার হয়নি। করা সম্ভব হয়নি। শেখ হাসিনা তা করেছেন। বলা হতো শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবেন না। তিনি তাঁর নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ারজন্য এই বিচার ঝুলিয়ে রাখবেন। সালাউদ্দিন কাদের, মীর কাশিম আলির ফাঁসির রায় কার্যকরের কয়েক ঘন্টা আগেও বলা হয়েছে, সরকার তাদের সাথে দরকষাকষি করছেন, আসলে ফাঁসি হবে না। দেশে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হয়েছে। ফাঁসি হয়েছে দোর্দন্ড প্রতাপশালী সাকা ও মীর কাশিমেরও। শেখ হাসিনার দুর্ভাগ্য হচ্ছে এদেশে তিনি যেভাবে ডানপন্থিদের দ্বারা আক্রান্ত হন ঠিক সেভাবে বামপন্থিদের দ্বারাও আক্রান্ত হন। ডানেরা তাঁকে হত্যা করতে চায়। আর বামেরা বোঝেন না শেখ হাসিনা বেঁচে আছেন বলেই এখনও বাংলাদেশটা বেঁচে আছে। email:[email protected]

সর্বশেষ সংবাদ