আমাদের জীবনচিত্রে যুদ্ধাপরাধীদের ছায়া-ফকির ইলিয়াস : কবি ও সাংবাদিক।

পোস্ট করা হয়েছে 10/12/2016-11:26pm:    যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ প্রতিনিধিঃ ====১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশের সমাজে মিশে গিয়েছিল যুদ্ধাপরাধীরা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরলতার সুযোগ নিয়ে, একটি চক্র ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। তারপরও ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এরা ছিল ঘাপটি মেরে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরেই এরা নিজ স্বরূপ নিয়ে সামনে চলে আসে। আমাদের জন্য খুব দুঃখজনক কথা হচ্ছে, এই প্রজন্মের অনেকেই প্রকৃত সত্য অনেক ঘটনাই জানে না। তারা জানে না, কিভাবে এদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, সমাজ, রাজনীতিতে এরা দুষ্টগ্রহের মতো বেড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক উর্দিকে ‘হালাল’ করার একমাত্র পথ ছিল মৌলবাদকে কাছে টানা। জিয়াউর রহমান সেই কাজটি খুব দক্ষতার সঙ্গে করেছিলেন। তিনি শাহ আজিজুর রহমান, মশিউর রহমান যাদু মিয়া, খান এ সবুর, ড. আলীম আল রাজী এ রকম নেতাদের দলে টেনেছিলেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে মোকাবেলার জন্য তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের’ নামে রাজাকারদের পুনর্বাসন করেছিলেন। সবচেয়ে বেদনার কথা হলো, জিয়া এবং এরশাদ পরবর্তী সময়ে এসব যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারচক্রের নামে বিভিন্ন স্থাপনারও নামকরণ করেছিলেন। স্বাধীনতাবিরোধীদের নামে এসব স্থাপনাগুলোর মধ্যে আছে- মানবতাবিরোধী অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক বিএনপি নেতা আব্দুল আলিমের নামে বগুড়া জেলা পরিষদ মিলনায়তন। যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের নামে হবিগঞ্জের মাধবপুরের নোয়াপাড়ায় বাসস্ট্যান্ড ও কায়সারনগর এলাকা। একাত্তরে পাবনার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান প্রয়াত বিএনপি নেতা সাইফুদ্দীন ইয়াহইয়াহ খান মজলিসের নামে সিরাজগঞ্জে ইয়াহইয়াহ স্কুল অ্যান্ড কলেজ। রাজাকার ও শান্তি কমিটির নেতা আব্দুর রাজ্জাক মিয়ার নামে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে ‘শহীদ আব্দুর রাজ্জাক রোড’। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার রাজাকার ও শান্তি কমিটির স্থানীয় চেয়ারম্যান এন এম ইউসুফের নামে ‘ইউসুফ গনি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, লংলা ইউসুফ কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্য মাহতাব উল্লাহর নামে ‘মাহতাব-সায়েরা হাই স্কুল’। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে রাজাকার আব্দুল আজিজের নামে ডেলকা এমসি হাইস্কুল ও বেলকা রোডে রায়জীবন ইউনিয়ন কমপ্লেক্স। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ধর্মপুরে স্বাধীনতাবিরোধী আব্দুল জব্বারের নামে আব্দুল জব্বার ডিগ্রি কলেজ। নোয়াখালীর চৌমুহনীর রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্য তরিকুল্লার নামে হাজী তরিকুল্লাহ রোড। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায় রাজাকার মিয়া মনসুর আলীর নামে মিয়া মনসুর আলী অ্যাকাডেমি। কুমিল্লার দরগাবাড়ী এলাকায় শান্তি কমিটির সদস্য রেজাউর রহমানের নামে ‘রেজাউর রহমান রোড’। নাটোরে রাজাকার আব্দুস সাত্তার খানের নামে মধু মিয়া রোড। নাটোরে রাজাকার কোসের উদ্দিনের নামে কোসের উদ্দিন রোড। পুরান ঢাকায় মুজাহিদ বাহিনীর মোহাম্মদ তামিমুল এহসানের নামে রাস্তা। পুরান ঢাকায় মুজাহিদ বাহিনীর কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ উল্লাহ ওরফে হাফেজ্জী হুজুরের নামে রাস্তা। নেত্রকোনার ফাইলাটি ইউনিয়নে রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আব্দুর রহমানের নামে হাজি আব্দুর রহমান হাইস্কুল। মেহেরপুরের মুজিবনগর এলাকার রাজাকার মিয়া মনসুর আলীর নামে আনন্দবাস মিয়া মনসুর আলী অ্যাকাডেমি। মেহেরপুর পৌর এলাকার রাজাকার ও শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান সবদার আলীর নামে রাস্তা ও মার্কেট। নরসিংদীর মনোহরদীতে সরকারি শিশু পরিবারের নামফলকে যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নাম, ঝিনাইদহের শৈলকুপায় রাজাকার ও শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান শফি আহমেদের নামে শফিপুর এলাকা ও শফিপুর পোস্ট অফিস। এর আগে এক রাষ্ট্রীয় আদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ‘খান-এ-সবুর’ সড়কের নাম প্রত্যাহার করে আগের ‘যশোর রোড’ নামটি ফিরিয়ে আনতে আদালতের দেয়া নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল। খুব অবাক করা কথা হচ্ছে, কোনো কোনো ছিঁচকে রাজাকারের নামেও বাংলাদেশে স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছিল। যা জাতীয়ভাবেই অত্যন্ত লজ্জার। স্বাধীনতাবিরোধীদের নামে স্থাপনা, সড়ক, অবকাঠামোর নাম বদলের আর্জি জানিয়ে ২০১২ সালে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেছিলেন মুনতাসীর মামুন ও শাহরিয়ার কবীর। সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে খুলনার খান-এ সবুর রোড এবং কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শাহ আজিজুর রহমান মিলনায়তনের কথা বলা হয়। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ওই বছরের ১৪ মে রুলসহ খান-এ সবুর ও শাহ আজিজুর রহমানের নাম ব্যবহার স্থগিতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেয় হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারীদের নামে স্থাপনা নিয়ে রুল জারি করা হয়।
গত বছর নভেম্বরে হাইকোর্ট আরো একটি নির্দেশনা দেয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনতাবিরোধীদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো পরিবর্তন করতে বলা হয়। অতি সম্প্রতি বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চ এক আদেশে দেশের বিশটি স্থাপনা থেকে এদের নাম মুছে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন।
এই মামলার শুনানি করেন ব্যারিস্টার এ কে রাশিদুল হক। আদেশের পর তিনি বলেছেন, ‘যারা মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দণ্ড পেয়েছেন, তাদের নামেও স্থাপনা রয়েছে। এখন পর্যন্ত সরকার সেগুলো পরিবর্তন করেনি এবং পরিবর্তনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগও নেই। বাঙালি হিসেবে আমাদের জন্য এটা লজ্জাজনক ও অগ্রহণযোগ্য।’
এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, শেখ হাসিনার সরকার এই দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পেরেছে, পারছে এবং তা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রাইব্যুনালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে কোনো ধরনের ডিফেন্স রাখার সুযোগ দেয়া হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে অভিযুক্তদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই বিচার করা হচ্ছে, হয়েছে। ২০১৩- এর অবরোধ সহিংসতার কথা আমাদের মনে আছে। এই কাজগুলো করা হয়েছিল এই যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাবার জন্যই। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারবিরোধী আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে বিএনপি-জামায়াত জোট হরতাল-অবরোধকেই প্রধান কর্মসূচি হিসেবে বেছে নিয়েছে বারবার। ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১২ জানুয়ারি দুই দিন বাদ দিয়ে ১০ দিন অবরোধ পালন করে এই জোট। তারও আগে ২০১৩ সালে বিএনপি জোট ২৬ নভেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ ধাপে ২৪ দিন অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। ওই সময়ে সহিংসতায় প্রাণ যায় ১২৭ ব্যক্তির। ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ২৬ থেকে ২৮ নভেম্বর, ৩০ নভেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর, ৭ থেকে ১৩ ডিসেম্বর, ১৭ থেকে ২০ ডিসেম্বর, ২১ থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দফা অবরোধ হয়েছিল। তার আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় ঘোষণার পর থেকে শুরু হয়েছিল টানা সহিংসতার। ওই সময়ে ‘বাঁশের কেল্লা’ নামে ফেসবুকের একটি পেইজে প্রচারণা চালিয়ে রেলে নাশকতায় নেমেছিল জামায়াত-শিবির। ২০১৩ সাল থেকে চালানো সহিংসতায় রেলে ৪০০ হামলায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল। মহাসড়ক কেটে দেয়া, গাছ কেটে নেয়াসহ বিভিন্নভাবে সড়ক খাতে ক্ষতি করা হয়। অবরোধ ছাড়াও ওই বছর থেকে বিভিন্ন সময়ে হরতাল ডাকা হয়েছিল। বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে এই যুদ্ধাপরাধীরা দাপট দেখিয়েছে। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য করে তারা তাদের শিকড় মজবুত করেছে। একটি পুরনো পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দণ্ডপ্রাপ্তরা বিভিন্ন সময়ে ছিলেন সরকারের মন্ত্রী ও এমপি। ক্ষমতার সুযোগে তারা গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসার মালিকানা নিয়ে হাজার কোটি টাকার সম্পদ আছে মাত্র আট যুদ্ধাপরাধীরই। ২০১০ সালের বিভিন্ন সময়ে কারাগারে যাওয়া যুদ্ধাপরাধীদের ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে যেসব সম্পদের কথা বলা হয়েছে সেটাই হাজার কোটি টাকার সমান। তবে এ হিসাব শুধু তাদের নিজেদের নামে ঘোষিত সম্পদের। জামায়াতের নেতা মীর কাশেম আলী ছিলেন কেয়ারী লিমিটেডের চেয়ারম্যান, ইবনে সিনা ট্রাস্টের সদস্য (প্রশাসন), ইবনে সিনা হাসপাতালের পরিচালক, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের পরিচালক, এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রাস্টের সদস্য ও ফুয়াদ আল খতিব চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের সদস্য। তিনি ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন, রাবেতা আল আলম আল ইসলামী, ইবনে সিনা ট্রাস্ট, এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রাস্ট, ফুয়াদ আল খতিব চ্যারিটি ফাউন্ডেশন এবং অ্যাসোসিয়েশন অব মাল্টিপারপাস ওয়েলফেয়ার এজেন্সিসের বিভিন্ন বোর্ড মিটিংয়ে উপস্থিতির জন্য নিয়মিত ভাতা পেতেন। এ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট অ্যান্ড বিজনেসম্যান চ্যারিটি ফাউন্ডেশন, আল্লামা ইকবাল সংসদ, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম, দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটি, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পিস, বায়তুশ শরফ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ইসলামিক ট্রাস্ট ও ইসলামিক ইকোনমিক্স রিসার্চ সেন্টারের। যে বিষয়টি না বললেই নয় তা হলো, এই কালো ছায়া থেকে প্রজন্মকে মুক্ত থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, যারা এ দেশের বিজয়কে মনে-প্রাণে মেনে নিতে পারেনি, তারা এখনো সুযোগ পেলে ইসলামী আন্দোলনের নামে জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। যেমনটি তারা ১৯৭১ সালে করেছিল। দেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বীজ বপনেও এই চক্রটি কি করেছে, তা কারো অজানা নয়। কিছু কিছু সত্য আছে যা ভুলে গেলে একটি জাতি বারবার হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
নিউইয়র্ক থেকে ফকির ইলিয়াস : কবি, কলাম লেখক।

সর্বশেষ সংবাদ